পূর্ব কলকাতার আনন্দপুরে ঘটে যাওয়া এই ভয়াবহ ঘটনা শহরের অগ্নি-নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। Anandapur fire incident শুধু একটি গুদামে আগুন লাগার খবর নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একাধিক পরিবারের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষা এবং প্রশাসনিক গাফিলতির অভিযোগ। প্রায় ১৯ ঘণ্টা পেরিয়েও আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে মৃত্যুর আশঙ্কা। দগ্ধ দেহাংশ উদ্ধারের খবর শহরজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এই ঘটনার অভিঘাত ফের মনে করিয়ে দিচ্ছে কলকাতার অতীতের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডগুলির তিক্ত স্মৃতি।
প্রায় উনিশ ঘণ্টা পেরিয়ে গিয়েছে। তবু আগুন নিভে যায়নি। পূর্ব কলকাতার আনন্দপুরের নাজিরাবাদের সেই বিশাল গুদাম দু’টি এখনও ধিকিধিকি করে জ্বলছে—ঠিক যেন কলকাতার বুকে জমে থাকা পুরনো ক্ষতগুলোকে আবার নতুন করে উসকে দিচ্ছে। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে পোড়া প্লাস্টিক, শুকনো খাবার আর মানুষের জীবনের শেষ চিহ্নের গন্ধ। চারপাশে নিস্তব্ধতার মধ্যে মাঝে মাঝেই ভেসে আসছে স্বজন হারানোর আর্তনাদ। সোমবার রাত ৯টা নাগাদ ঘটনাস্থল থেকে সাতটি দগ্ধ দেহাংশ উদ্ধারের খবর মিলেছে। তার আগে উদ্ধার হয়েছিল পুড়ে কঙ্কালসার হয়ে যাওয়া তিনটি দেহ। ঠিক কতজনের মৃত্যু হয়েছে, সেই হিসেব এখনও পরিষ্কার নয়। তবে পুলিশ সূত্রে খবর, এই অগ্নিকাণ্ডের পর এখনও পর্যন্ত ২০টি পরিবারের তরফে নিখোঁজ ডায়েরি করা হয়েছে থানায়। সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়—প্রতিটি সংখ্যার পিছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি অপেক্ষা, আর অসংখ্য প্রশ্ন।
এই আগুন শুধু আনন্দপুরের একটি গুদামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই আগুন যেন কলকাতার স্মৃতিতে জমে থাকা ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডগুলোর ছায়াকে আবার শহরের বুকে ফিরিয়ে এনেছে। স্টিফেন কোর্ট, আমরি হাসপাতাল, বড়বাজার—নামগুলো আবারও ঘুরে বেড়াচ্ছে মানুষের মুখে মুখে। প্রশ্ন উঠছে, এত বছর পরেও কি আমরা কিছু শিখিনি?
আরও পড়ুন : ১৫ বছর পর রিটার্ন টিকিট ফিরলো কলকাতা মেট্রোতে | জানুন, কবে থেকে পাবেন এই সুবিধা
আনন্দপুরের নাজিরাবাদে কীভাবে শুরু আগুন?
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, রবিবার গভীর রাত পেরিয়ে ভোর প্রায় ৩টে নাগাদ আনন্দপুরের নাজিরাবাদ এলাকায় অবস্থিত একটি নামী মোমো কোম্পানির গুদামে আগুন লাগে। গুদামটি ভর্তি ছিল নরম পানীয়, শুকনো খাবারের প্যাকেট এবং অন্যান্য অত্যন্ত দাহ্য সামগ্রীতে। আগুন লাগার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তা ভয়াবহ রূপ নেয়। কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় পুরো এলাকা। আশপাশের বাসিন্দারা প্রথমে বিস্ফোরণের মতো শব্দ শুনতে পান বলে দাবি করেছেন।
গুদামটির ভিতরে সেই সময় একাধিক শ্রমিক কাজ করছিলেন বলে স্থানীয়দের অনুমান। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় অনেকেই বেরিয়ে আসার সুযোগ পাননি। দমকল ও পুলিশ পৌঁছনোর আগেই পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যায়। গুদামের ভিতরে দাহ্য সামগ্রীর পরিমাণ এতটাই বেশি ছিল যে আগুন নেভাতে গিয়ে কার্যত যুদ্ধের মুখে পড়তে হয় দমকলকর্মীদের।
দমকল সূত্রে জানা যাচ্ছে, ঘটনাস্থলে একসঙ্গে ১২টি দমকল ইঞ্জিন কাজ করছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জল ঢালার পরেও সোমবার রাত পর্যন্ত আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। তার মূল কারণ হিসেবে উঠে আসছে কয়েকটি বিষয়—গুদামের ভিতরের তীব্র তাপমাত্রা, সংকীর্ণ প্রবেশপথ এবং ভিতরে থাকা বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক ও খাবারের প্যাকেট।
দমকল আধিকারিকদের একাংশের বক্তব্য, বাইরে থেকে আগুন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এলেও ভিতরের অংশে এখনও আগুন জ্বলছে। সেই কারণেই মাঝেমধ্যে আবার ধোঁয়া বেরোচ্ছে এবং নতুন করে আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকছে। এই পরিস্থিতিতে উদ্ধারকাজও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মৃত ও নিখোঁজ: সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে থাকা যন্ত্রণা
সোমবার রাত ৯টা নাগাদ ঘটনাস্থল থেকে সাতটি দগ্ধ দেহাংশ উদ্ধার হওয়ায় আতঙ্ক আরও বেড়েছে। তার আগে পাওয়া গিয়েছিল তিনটি পুড়ে যাওয়া দেহ। দমকল ও পুলিশ যৌথভাবে এখনও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে। কিন্তু আগুন পুরোপুরি না নেভায় উদ্ধারকাজ বারবার ব্যাহত হচ্ছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, এখনও পর্যন্ত ২০টি পরিবার থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করেছে। তাঁদের দাবি, আগুন লাগার সময় তাঁদের আত্মীয়রা ওই গুদামে কাজ করছিলেন। অনেকেই এখনও কোনও খবর পাননি। গুদামের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের চোখে শুধুই উৎকণ্ঠা—প্রিয়জন কি বেঁচে আছেন, নাকি আগুন সবকিছু শেষ করে দিয়েছে?
কলকাতার স্মৃতিতে ফিরে আসা ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডগুলি
আনন্দপুরের এই ঘটনা কলকাতার মানুষকে আবার মনে করিয়ে দিচ্ছে শহরের কয়েকটি ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের কথা।
স্টিফেন কোর্ট অগ্নিকাণ্ড (২০১০)
২০১০ সালের ২৩ মার্চ, পার্ক স্ট্রিটের ১৮ নম্বর বাড়ি স্টিফেন কোর্টে ভয়াবহ আগুন লাগে। সেই ঘটনায় ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। বহু মানুষ দমবন্ধ হয়ে ভিতরে আটকে পড়েছিলেন। দমকলের ভূমিকা ও ভবনের অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছিল।
আমরি হাসপাতাল অগ্নিকাণ্ড (২০১১)
২০১১ সালের ৯ ডিসেম্বর ভোরে ঢাকুরিয়ার আমরি হাসপাতালে আগুন লেগে সরকারি হিসেবে৮৯ জন, বেসরকারি হিসেবে আরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। হাসপাতালের বেসমেন্টে দাহ্য সামগ্রী রাখা এবং নিরাপত্তার চরম গাফিলতি এই বিপর্যয়ের মূল কারণ হিসেবে উঠে আসে।
বড়বাজারের অগ্নিকাণ্ড (২০০৮ ও ২০১৮)
২০০৮ সালের ১২ জানুয়ারি বড়বাজারের নন্দরাম মার্কেটে আগুন লেগে প্রায় চারদিন ধরে জ্বলে ১,২০০-র বেশি দোকান ছাই হয়ে গিয়েছিল। পরে ২০১৮ সালে বাগরি মার্কেটেও ভয়াবহ আগুন লাগে। দুই ক্ষেত্রেই অগ্নি-নিরাপত্তা ও উদ্ধারব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
স্ট্যান্ড রোড অগ্নিকাণ্ড (২০২১)
২০২১ সালে স্ট্যান্ড রোডের নিউ কয়লাঘাট বিল্ডিংয়ে আগুন লেগে ১০ জনের মৃত্যু হয়। ঘটনাটি আবারও দেখিয়ে দেয়, কলকাতার পুরনো ভবনগুলিতে আগুন মানেই কতটা বড় বিপদ।
এই অগ্নিকাণ্ড শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি সতর্কবার্তা। আনন্দপুরের নাজিরাবাদের আগুন এখনও পুরোপুরি নিভে যায়নি। কিন্তু এই আগুন ইতিমধ্যেই বহু জীবনের আলো নিভিয়ে দিয়েছে।
#আনন্দপুরঅগ্নিকাণ্ড, #KolkataFire, #AnandapurFire, #BreakingNews
(আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাশিফল আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল WhatsApp চ্যানেলে যোগ দিন! সবচেয়ে আগে পান জ্যোতিষ, অফবিট নিউজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনধারা ও অফবিট এক্সক্লুসিভ আপডেট —আমাদের WhatsApp Channel-এ যোগ দিন)
সাম্প্রতিক পোস্ট
- Gen Z-এর প্রেমের নতুন শব্দভান্ডার জানেন? ভালোবাসার নতুন ব্যাকরণ শিখুন | Gen Z Love Trends 2026
- ব্যস্ত সকালে এই ৫টি Tiffin Recipe রাখুন রোজের তালিকায় | Easy Tiffin Recipes
- ঠাকুর, দেবতা, ভগবান ও ঈশ্বর কি একই? গুলিয়ে ফেলার আগে জেনে নিন আসল তফাৎ | God vs Deity Meaning in Bengali
- জানুন, ব্যক্তি সুভাষের অনন্য প্রেমকাহিনী: সুভাষ ও এমিলি
- গান্ধী বনাম নেতাজি—মূল পার্থক্যটা কোথায়? | Gandhi vs Netaji

