একজন চাইতেন ‘অহিংসা’, অন্যজন চাইতেন ‘রক্ত’। একজন বলতেন ‘পাপকে ঘৃণা করো’, অন্যজন বলতেন ‘শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু’। ২৩শে জানুয়ারির এই পবিত্র দিনে জানুন ভারতের দুই মহাজাগতিক নক্ষত্রের আদর্শগত সংঘাত এবং Netaji vs Gandhi সম্পর্কের অজানা রসায়ন।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক : আজ ২৩শে জানুয়ারি। ভারতের ইতিহাসের এক অগ্নিগর্ভ দিন। আজ আমরা এমন এক রাষ্ট্রনায়ককে স্মরণ করছি, যিনি শিখিয়েছিলেন—স্বাধীনতা কেউ প্লেটে সাজিয়ে দেয় না, তা ছিনিয়ে নিতে হয়।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এই বিশাল রঙ্গমঞ্চে প্রধান চরিত্র মূলত দু’জন। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী এবং সুভাষচন্দ্র বসু। একজনকে জাতি ভালোবেসে নাম দিয়েছে ‘মহাত্মা’ বা ‘জাতির জনক’, অন্যজনকে দিয়েছে ‘নেতাজি’ বা ‘দেশনায়ক’।
দুজনেরই লক্ষ্য ছিল এক—ভারতের স্বাধীনতা। কিন্তু সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথ ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। উত্তর মেরু আর দক্ষিণ মেরুর মতোই তাঁদের আদর্শের ফারাক ছিল। অথচ, ইতিহাসের কি অদ্ভুত সমাপতন! সিঙ্গাপুর রেডিও থেকে সুভাষচন্দ্রই প্রথম গান্ধীজিকে “জাতির জনক” বলে সম্বোধন করেছিলেন। আবার গান্ধীজি সুভাষকে বলেছিলেন “দেশভক্তদের রাজকুমার” (Prince of Patriots)।
আজ নেতাজির জন্মজয়ন্তীতে আমরা আবেগের চশমা খুলে, রাজনৈতিক বিশ্লেষণের আতশকাঁচ দিয়ে দেখব এই দুই মহানায়কের সম্পর্কের টানাপোড়েন। জানব কোথায় ছিল তাঁদের মূল বিরোধ, আর কোথায় ছিল মিল।
অহিংসা বনাম শক্তি: আদর্শের সংঘাত (Means vs Ends)
গান্ধী ও নেতাজির বিরোধের মূল ভিত্তি ছিল তাঁদের দর্শন। গান্ধীজি বিশ্বাস করতেন ‘অহিংসা পরম ধর্ম’। তাঁর কাছে স্বাধীনতার চেয়েও বড় ছিল সত্য এবং অহিংসার পথ। তিনি বলতেন, “অসৎ উপায়ে অর্জিত স্বাধীনতা আমি চাই না।” তাঁর মতে, লক্ষ্য (End) এবং উপায় (Means)—দুটোই পবিত্র হতে হবে।
অন্যদিকে, সুভাষচন্দ্র ছিলেন একজন প্র্যাগমেটিক লিডার বা বাস্তববাদী নেতা। তাঁর দর্শন ছিল—”শত্রুকে বাগে আনতে হলে সাম, দাম, দণ্ড, ভেদ—সবই প্রয়োগ করতে হবে।” তিনি মনে করতেন, ব্রিটিশরা কোনো সাধু-সন্ন্যাসী নয় যে তাদের অহিংসা দিয়ে গলানো যাবে। লাঠির জবাব লাঠি দিয়েই দিতে হবে। নেতাজির কাছে ভারতের স্বাধীনতাই ছিল একমাত্র ধর্ম, তার জন্য তিনি শয়তানের সঙ্গেও হাত মেলাতে প্রস্তুত ছিলেন।
১৯৩৯: ত্রিপুরী কংগ্রেস ও ভাঙনের শুরু (The Flashpoint)
এই দুই ব্যক্তিত্বের সংঘাত চরমে পৌঁছায় ১৯৩৯ সালের ত্রিপুরী কংগ্রেস অধিবেশনে। সুভাষচন্দ্র তখন তরুণদের হার্টথ্রব। তিনি দ্বিতীয়বারের জন্য কংগ্রেস সভাপতি পদে দাঁড়ালেন। কিন্তু গান্ধীজি তা চাইলেন না। তিনি সুভাষের বিরুদ্ধে দাঁড় করালেন পট্টভি সীতারামাইয়াকে।
ভোটাভুটি হলো। গান্ধীজির সমস্ত প্রভাব সত্ত্বেও সুভাষচন্দ্র বিপুল ভোটে জিতে গেলেন। এই হার মেনে নিতে না পেরে গান্ধীজি এক ঐতিহাসিক বিবৃতি দিলেন— “পট্টভির হার আমারই হার।” (Pattabhi’s defeat is my defeat). এই একটি বাক্যেই কংগ্রেসের অন্দরমহলে ভূমিকম্প হয়ে গেল। সুভাষচন্দ্র বুঝলেন, গান্ধীজির আশীর্বাদ ছাড়া কংগ্রেস চালানো অসম্ভব। তিনি আদর্শের সঙ্গে আপস করলেন না। তিনি পদত্যাগ করলেন এবং নিজের পথ বেছে নিলেন। তৈরি হলো ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’।
বিশ্বযুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক নীতি (Worldview Clash)
১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে গান্ধী এবং নেতাজির মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গান্ধীজির যুক্তি ছিল নৈতিক। তিনি বলতেন, “বিপদের সময় ব্রিটিশদের আঘাত করা উচিত নয়। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের লড়াইয়ে আমাদের ব্রিটেনকে নৈতিক সমর্থন দেওয়া উচিত।”
সুভাষচন্দ্র এর তীব্র বিরোধিতা করেন। তাঁর যুক্তি ছিল—”ব্রিটিশদের বিপদই হলো ভারতের সুবর্ণ সুযোগ।” (India’s opportunity in England’s difficulty). তিনি বলেছিলেন, ইতিহাস বারবার সুযোগ দেয় না। এখনই আঘাত করার সেরা সময়। এই দর্শনের বশবর্তী হয়েই তিনি জার্মানি ও জাপানের সাহায্য নিয়েছিলেন, যা গান্ধীজি কখনোই মেনে নিতে পারেননি।
আরও পড়ুনঃ জানেন কি? নেতাজি ও রবীন্দ্রনাথের বন্ধুত্ব কেমন ছিল
সমাজতন্ত্র বনাম রামরাজ্য (Vision for Future India)
স্বাধীন ভারত কেমন হবে, তা নিয়েও দুজনের ভাবনায় আকাশ-পাতাল তফাৎ ছিল। গান্ধীজি চাইতেন ‘রামরাজ্য’—যেখানে গ্রাম হবে অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু। তিনি ভারী শিল্প বা ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশনের বিরোধী ছিলেন। তিনি চরকা এবং কুটির শিল্পের মাধ্যমে স্বনির্ভর গ্রামীণ ভারতের স্বপ্ন দেখতেন।
অন্যদিকে, নেতাজি ছিলেন আধুনিক সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী। তিনি জানতেন, আধুনিক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে ভারতকে শিল্পোন্নত হতে হবে। তিনি চাইতেন একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার, আধুনিক সেনাবাহিনী এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সমাজ। প্ল্যানিং কমিশনের (পরবর্তীকালে নীতি আয়োগ) ব্লু-প্রিন্ট আসলে নেতাজির মস্তিষ্কপ্রসূত ছিল, যা তিনি কংগ্রেস সভাপতি থাকাকালীনই তৈরি করেছিলেন।
শ্রদ্ধার আড়ালে লুকানো অভিমান
এত বিরোধ থাকার পরেও, ব্যক্তিগত স্তরে একে অপরের প্রতি তাঁদের শ্রদ্ধা ছিল অটুট। ১৯৪৪ সালে আজাদ হিন্দ ফৌজ যখন ভারতের দিকে এগোচ্ছে, তখন সিঙ্গাপুর রেডিও থেকে এক ভাষণে নেতাজি বলেছিলেন: “ভারতের এই পবিত্র মুক্তিইযুদ্ধে, হে জাতির জনক (Father of the Nation), আমরা আপনার আশীর্বাদ ও শুভেচ্ছা প্রার্থনা করি।”
ভাবা যায়? যে মানুষটি তাঁকে দল থেকে একপ্রকার বের করে দিয়েছিলেন, তাঁকেই তিনি সবার আগে সম্মান জানাচ্ছেন! আবার অন্যদিকে, ১৯৪২-এর ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে গান্ধীজি যখন “করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে” ডাক দিলেন, তখন অনেকেই বলেছিলেন—গান্ধীজি আসলে নেতাজির সংগ্রামী পথেই হাঁটছেন। বৃদ্ধ বয়সে গান্ধীজি আইএনএ-র বন্দি সেনাদের হয়ে সওয়ালও করেছিলেন।
কে ঠিক, কে ভুল?
আজ এত বছর পর বিচার করতে বসলে দেখা যায়, ভারত স্বাধীন হওয়ার জন্য গান্ধী এবং নেতাজি—উভয়কেই প্রয়োজন ছিল। গান্ধীজি ভারতের ঘুমন্ত জনগণকে জাগিয়েছিলেন, তাদের ভয় ভেঙেছিলেন। তিনি মাটি তৈরি করেছিলেন। আর নেতাজি সেই মাটিতে বারুদ বিছিয়ে তাতে আগুন দিয়েছিলেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এটলি স্বীকার করেছিলেন যে, নেতাজির আইএনএ-র বিদ্রোহের ভয়েই তাঁরা ভারত ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন।
তাই ২৩শে জানুয়ারির এই দিনে, আমরা যেন বিতর্কে না জড়িয়ে এই দুই মহামানবের ত্যাগকে কুর্নিশ জানাই। একজন ছিলেন জাতির ‘বিবেক’ (Conscience), আর অন্যজন ছিলেন জাতির ‘খড়গ’ (Sword)। দুইয়ে মিলে তবেই আমাদের এই স্বাধীনতা।
সাম্প্রতিক পোস্ট
- ‘মায়া ভরা রাতি’ আবার ফিরছে—অরিজিৎ সিং-এর কণ্ঠে নতুন করে জেগে উঠবে এক চিরন্তন গান
- আপনার সই কি বদলে দিতে পারে আপনার ভাগ্য? │ জানুন, সিগনেচারের অজানা রহস্য
- হঠাৎ বন্ধ UPI, দেশজুড়ে ডিজিটাল লেনদেনে বিপর্যয়—লক্ষ লক্ষ ব্যবহারকারী চরম সমস্যায়
- মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করলেন যুবসাথী প্রকল্পের │ জানুন, কীভাবে আবেদন করবেন, কবে থেকে মিলবে টাকা
- সাবধান! ১০০ কোটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন এখন হ্যাকারদের কবলে │ কিভাবে দেখবেন আপনার ফোন সুরক্ষিত কিনা?

