Asha Bhosle Bengali Songs: আশা ভোঁসলের কণ্ঠে গাওয়া দশটি বাংলা গানকে ঘিরে এক ব্যক্তিগত স্মৃতির ভ্রমণ—যেখানে সুর, আবেগ ও সময় একসূত্রে বাঁধা হয়ে ফিরে আসে আমাদের মনের খুব কাছের মুহূর্তগুলো।
সারাদিন আপনাদের নানা খবর, প্রতিবেদন আর তথ্যভিত্তিক লেখা দিয়ে থাকি। কিন্তু আজকের এই লেখাটা একটু আলাদা। পেশাগত দায়িত্বের জায়গা থেকে নয়, বরং একেবারে ব্যক্তিগত অনুভূতি থেকে লেখা এই কথাগুলো।
আমি বহুবার কিংবদন্তি শিল্পী আশা ভোঁসলেকে নিয়ে লিখেছি, তাঁর গান, তাঁর সাফল্য, তাঁর জীবন—সবই প্রতিবেদনের আকারে আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছি। কিন্তু আজকের লেখাটা কোনও রিপোর্ট নয়। আজকের লেখায় উঠে আসবে এক অখ্যাত লেখকের মনের কথা—যেখানে আশা ভোঁসলে হয়তো শুধুই একটি উপলক্ষ।
এই লেখার ভেতর দিয়ে ফিরে দেখা হবে ছোটবেলার নানা স্মৃতি, সেইসব মুহূর্ত যেগুলো জড়িয়ে আছে কিছু নির্দিষ্ট গানের সঙ্গে। এমন কিছু গান, যেগুলো সময় পেলেই এখনও শোনা হয়, আবার শোনার ইচ্ছে জাগে। এই গানগুলোর অনেকগুলোই আশা ভোঁসলের বাংলা গানের একেবারে শুরুর দিককার সৃষ্টি—যেগুলো হয়তো আশির দশকের তাঁর জনপ্রিয় হিট গানগুলোর থেকে আলাদা, কিন্তু নিজস্ব আবেগে ভরপুর।
প্রথমেই যে গানের কথা বলব, সেই গানকে আমি কোনো নম্বরের মধ্যে বাঁধতে চাই না। ছোটোবেলা থেকেই ক্যাসেট ছিল আমাদের ঘরে, আর সেই ক্যাসেট আমার ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গী হয়ে উঠেছিল। লালপাড় সাদা শাড়ি পরে ক্যাসেটের কভারে তাঁর ছবিটা আজও আমার চোখে ভাসে। সেই রূপে তিনি যখন রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়েছিলেন, তা সত্যিই মন ছুঁয়ে যেত।
আমার শোনা রবীন্দ্রসঙ্গীতগুলোর মধ্যে সেই ক্যাসেট থেকেই যে গানগুলো সবচেয়ে ভালো লেগেছিল—সবই হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া। বিশেষ করে “বড় আশা করে এসেছি গো কাছে ডেকে লও”, “জগতে আনন্দ যজ্ঞে”, “আমার বেলা যে যায়”—এই গানগুলো বারবার শোনা হতো। রবীন্দ্রসঙ্গীতে তাঁর কণ্ঠ ছিল অনবদ্য—একইভাবে সেই গানগুলিও আমার মনে গভীর ছাপ রেখে গেছে।
আরও পড়ুন : চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে যো দিল কো: ওমরাওজান থেকে আশা ভোঁসলের গজল জয়যাত্রা, জানুন সেই অজানা গল্প
সবচেয়ে প্রিয় গান (Asha Bhosle Bengali Songs) বেছে নেওয়া সত্যিই কঠিন। কারণ তাঁর গাওয়া অসংখ্য গানের মধ্যে থেকে মাত্র দশটি গানকে আলাদা করে বলা মানে যেন নিজের অনুভূতিকে সীমাবদ্ধ করে ফেলা। তবুও, এই লেখায় যে দশটি গান উঠে আসবে, সেগুলো নিছক জনপ্রিয়তার জন্য নয়—বরং লেখকের ব্যক্তিগত স্মৃতি, ভালো লাগা, আর সময়ের সঙ্গে গড়ে ওঠা এক গভীর সম্পর্কের জন্য।
এই লেখায় শুধু একজন লেখকের ভালো লাগা বা খারাপ লাগার কথা নয়, বরং সেই গানগুলোর মাধ্যমে আরও একবার ফিরে দেখা—একজন শিল্পীর সুরের জাদু। একইসঙ্গে, এই অখ্যাত লেখকের নিজের পক্ষ থেকেও এক নিঃশব্দ শ্রদ্ধা জানানো—যে শ্রদ্ধা হয়তো কোনও বড় মঞ্চে নয়, কিন্তু হৃদয়ের খুব কাছাকাছি।
তাহলে শুরু করা যাক—সঙ্গে থাকুক সেই দশটি গানের সম্ভার, যেগুলো শুধুই গান নয়, একেকটা স্মৃতি, একেকটা অনুভব।
এই তালিকার প্রথমেই যে গানটির কথা বলব, সেটি হল আশা ভোঁসলের গাওয়া সেই বিখ্যাত গান—“যেতে দাও আমায়, ডেকো না”। এই গানটির সুরকার ছিলেন আরডি বর্মণ, অর্থাৎ রাহুল দেব বর্মণ—বাংলা ও হিন্দি সংগীত জগতের এক অনন্য প্রতিভা। আর এই গানের কথায় প্রাণ দিয়েছিলেন গীতিকার গৌরী প্রসন্ন মজুমদার, যার কলম থেকে জন্ম নিয়েছে অসংখ্য কালজয়ী গান।
এই গানটি শুধু একটি সুর বা শব্দের মেলবন্ধন নয়—এ যেন এক গভীর অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। “যেতে দাও আমায়, ডেকো না”—এই লাইনগুলোর মধ্যে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, এক নীরব বিদায়ের সুর, যা আজকের দিনেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই বদলে যায়, কিন্তু কিছু গান থেকে যায় চিরকাল। আজ হয়তো শিল্পী আমাদের মধ্যে নেই, তিনি আমাদের ছেড়ে দূরে কোথাও পাড়ি দিয়েছেন—তবুও তাঁর কণ্ঠ, তাঁর সুরেলা গায়কি, তাঁর অনুভূতির ছোঁয়া আজও আমাদের মধ্যে বেঁচে আছে।
আমরা হয়তো তাঁকে আর সামনে থেকে দেখতে পাই না, কিন্তু তাঁর গানগুলোকে আমরা বাঁচিয়ে রাখতে পারি—আমাদের স্মৃতিতে, আমাদের অনুভূতিতে, আর অগণিত শ্রোতার হৃদয়ে। এই গানগুলোই যেন তাঁর অস্তিত্বের এক অমলিন ছাপ, যা সময় পেরিয়েও কখনও মুছে যায় না।
নিজের পছন্দের গানের কথা বলতে গেলে, অবশ্যই একের পর এক উঠে আসে সেইসব বিখ্যাত সুরের স্মৃতি। এই তালিকার দ্বিতীয় এবং তৃতীয় গান—দুটোই আমার কাছে ভীষণভাবে কাছের, ভীষণভাবে ব্যক্তিগত।
এই দুটি গানই শোনা যায় সেই বিখ্যাত সিনেমা “ছদ্মবেশী”-তে, যেখানে অভিনয় করেছিলেন মহানায়ক উত্তম কুমার। ছোটবেলায় প্রথম এই সিনেমাটি দেখার সময়ই গান দুটির সঙ্গে এক অদ্ভুত পরিচয় হয়েছিল—যা সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়েছে।
গানটি—“আমার দিন কাটে না”—একটা অদ্ভুত একাকীত্ব আর অপেক্ষার অনুভূতি নিয়ে তৈরি। আর পরের গানটি—“আরও দূরে চলে যাই”—যেন ভালোবাসার এক নীরব যাত্রা, যেখানে শব্দের থেকেও বেশি কথা বলে সুর।
আজও যদি কোনও রোমান্টিক মুহূর্তের আবহ তৈরি হয়—ব্যক্তিগত জীবনে হোক বা কোনও চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে—আমার মনে হয়, এই গান দুটো অনায়াসেই সেই পরিবেশকে জীবন্ত করে তুলতে পারে। এদের সুরে এমন এক আবেগ আছে, যা সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
বিশেষ করে “আরও দূরে চলে যাই” গানটির শুরুতেই যে শিসের প্রিলিউড ব্যবহার করা হয়েছে, তা এককথায় অসাধারণ। সেই ছোট্ট সুরের টান যেন গোটা গানটিকেই অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়—গানটিকে করে তোলে আরও অনবদ্য, আরও স্মরণীয়।
এই গানগুলো কখনও ভোলার নয়। কারণ এগুলো শুধু গান নয়—এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য ব্যক্তিগত স্মৃতি, কিছু প্রিয় মুহূর্ত, আর কিছু খুব কাছের মানুষের কথা। হয়তো সেই মানুষগুলোর অনেকেই আজ আর আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু গানগুলো রয়ে গেছে—তাদের স্মৃতির মতোই, নীরবে, গভীরভাবে।
আর তাই, এই গানগুলোর কথা বলতে গেলে—এ যেন শুধুই সংগীতের আলোচনা নয়, বরং এক টুকরো জীবনকে আবার ছুঁয়ে দেখা।
আশা ভোঁসলে নিজেই তাঁর এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, প্রথম বাংলা গান ছিল একটি রাগাশ্রিত গান—যার সুর দিয়েছিলেন তাঁরই ভাই, হৃদয়নাথ মঙ্গেশকর। সেই শুরু থেকে পরবর্তীতে তিনি বাংলা গানে যে অসাধারণ সব সৃষ্টি উপহার দিয়েছেন, তা সত্যিই অনবদ্য। তাঁর গাওয়া প্রতিটি গান যেন আলাদা আলাদা আবেগ, আলাদা আলাদা গল্প। তাই সেখান থেকে প্রিয় গান বেছে নেওয়া নিঃসন্দেহে ভীষণ কঠিন একটি কাজ।
আপনারা নিশ্চয়ই খেয়াল করছেন, এই তালিকায় যে গানগুলোর কথা বলা হচ্ছে, তার অধিকাংশই সাদা-কালো যুগের সিনেমা থেকে নেওয়া। কিন্তু সময়ের রঙ বদলালেও, এই গানগুলোর আবেদন কখনও ফিকে হয়নি। বরং এই গানগুলোই প্রমাণ করে—সত্যিকারের সুর কখনও পুরোনো হয় না। এই গানগুলো চিরকালীন, যা মানুষের মন থেকে কোনোদিন মুছে যাওয়ার নয়।
এবার আসি পরবর্তী গানে—“রাত এখনও অনেক বাকি”। এই গানটি শোনা যায় “জীবন সৈকতে” সিনেমায়, যেখানে পর্দায় একসঙ্গে দেখা গিয়েছিল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং অপর্ণা সেনের অসাধারণ জুটি।
এই গানের সুরকার ছিলেন বাংলা গানের এক বিশিষ্ট নাম—সুধীন দাশগুপ্ত। তাঁর সুরের বৈশিষ্ট্যই ছিল এক ধরনের সূক্ষ্ম আবেগ, যা খুব সহজেই শ্রোতার মনে দাগ কেটে যায়। শুধু সুরই নয়, এই গানটির কথাও লিখেছিলেন তিনি নিজেই—যা গানটিকে আরও গভীরতা দিয়েছে।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও অপর্ণা সেনের অভিনয়ের সঙ্গে সুধীন দাশগুপ্তের সুর আর কথার মেলবন্ধন—“রাত এখনও অনেক বাকি” গানটিকে করে তুলেছে এক অনন্য সৃষ্টি। এই গানটি যেন শুধু একটি রোমান্টিক মুহূর্ত নয়, বরং সময়কে থামিয়ে রাখার এক নীরব চেষ্টা—যেখানে রাত ফুরোতে চায় না, আর অনুভূতিগুলো থেকে যায় অনন্ত।
এর পরের যে গানটির কথা বলব, সেটি হল—“সাগর ডাকে আয়”। এই গানটি শুনলেই মনে হয়, যেন সত্যিই সমুদ্রের কাছে পৌঁছে যাওয়া যায়। গানের সুরের ভাঁজে ভাঁজে এমন এক মূর্ছনা রয়েছে, যা শ্রোতাকে টেনে নিয়ে যায় এক অদৃশ্য জগতে—যেখানে ঢেউয়ের শব্দ, জলের দোলা আর একাকী অনুভূতির মিশেল একসঙ্গে ধরা দেয়।
এই গানটির মধ্যে যেন সমুদ্রের নিজেরই একটা টান আছে—যেমন করে সাগরের জল মানুষকে ডাকে, টেনে নিয়ে যায় তার গভীরে, ঠিক তেমনই এই গানের সুরও শ্রোতাকে বারবার নিজের কাছে ফিরিয়ে আনে। এক অদ্ভুত আকর্ষণ, এক অজানা টান—যা ভাষায় পুরোপুরি বোঝানো যায় না, শুধু অনুভব করা যায়।
এই গানটিও শোনা যায় “জীবন সৈকতে” সিনেমায়। গানের কথা ও সুর—দুটোই সৃষ্টি করেছিলেন সুধীন দাশগুপ্ত। তাঁর সুরের জাদু আর কথার গভীরতা এই গানটিকেও করে তুলেছে অনবদ্য।
“সাগর ডাকে আয়” শুধু একটি গান নয়, এটি যেন এক ডাকে সাড়া দেওয়ার গল্প—একটা ভেতরের টান, যা আমাদের বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেইসব মুহূর্তে, যেখানে প্রকৃতি আর অনুভূতি এক হয়ে যায়। আর সেই কারণেই, এই গানটি আজও সমান জনপ্রিয়, সমান প্রাসঙ্গিক—সময়ের স্রোত পেরিয়েও যার আবেদন একটুও কমেনি।
তনুজা—এমন একজন অভিনেত্রী, যাঁকে নিঃসন্দেহে “মোহময়ী” বলা যায়। তাঁর অভিনয়ের জাদু এমনই ছিল যে, একেবারে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ের চরিত্র হোক বা কোনও অভিজাত পরিবারের মার্জিত নারী—সব চরিত্রেই তিনি নিজেকে ভীষণ স্বাভাবিকভাবে মেলে ধরতে পারতেন।
ঠিক তেমনই, যখন তাঁর লিপে শোনা যায় আশা ভোঁসলের গাওয়া—“কোন সে আলোর স্বপ্ন নিয়ে”, তখন গানটি যেন এক অন্য মাত্রা পায়। শুধু সুর বা কথা নয়, তনুজার অভিব্যক্তি আর উপস্থিতি গানটিকে আরও গভীর, আরও জীবন্ত করে তোলে।
এই গানটি শোনা যায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও তনুজার জনপ্রিয় জুটি অভিনীত সিনেমা “প্রথম কদম ফুল”-এ। এই ছবিটি নিজেই এক অনন্য সৃষ্টি, যেখানে সম্পর্ক, আবেগ আর গল্প—সবকিছুই খুব সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
গানটির গীতিকার ছিলেন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়—যাঁর লেখায় সবসময়ই এক ধরনের কবিত্ব আর সহজ অথচ গভীর অনুভূতির ছোঁয়া থাকে। আর সেই কথায় সুর আর কণ্ঠ দিয়েছেন আশা ভোঁসলে, যা গানটিকে করে তুলেছে স্মরণীয়।
এখানে আর একজনের কথা না বললেই নয়—সুবীর চট্টোপাধ্যায়। এই ছবির নির্মাণে তাঁর অবদানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, তনুজা এবং সুবীর চট্টোপাধ্যায়—এই তিনজনের উপস্থিতি ও সৃজনশীলতার মেলবন্ধনে ছবিটি হয়ে উঠেছিল সত্যিই অসাধারণ। “কোন সে আলোর স্বপ্ন নিয়ে” তাই শুধুমাত্র একটি গান নয়—এটি এক আবেগ, এক দৃশ্য, এক সময়ের প্রতিচ্ছবি—যেখানে সুর, কথা আর অভিনয় একসঙ্গে মিলে তৈরি করেছে এক অনবদ্য শিল্প।
এর পরের যে গানটির কথা বলব, সেটি একেবারেই অন্য রকম অনুভূতির। এমন এক গান, যা শোনা যায় তখন—যখন কোনও মানুষ তার বদ্ধ, একঘেয়ে জীবন থেকে বেরিয়ে একটু মুক্তি খুঁজতে চায়।
জীবনের ক্লান্তি, চাপ, নিয়মের বেড়াজাল—সবকিছুর মাঝখানে হঠাৎ যদি একটুখানি হাওয়া লাগে, একটুখানি আনন্দ এসে ছুঁয়ে যায়, তখন যে অনুভূতিটা হয়—এই গানটি যেন ঠিক সেই অনুভূতিকেই ছুঁয়ে যায়। এক মুহূর্তের আনন্দ, যা মানুষকে হঠাৎ করেই আরও রঙিন করে তোলে, আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। এই গানটি হল—“আজ গুনগুন, খুঁজে আমার…”—যা শোনা যায় “রাজকুমারী” সিনেমায়।
শোনা যায়, ছবিটি হয়তো ততটা বাণিজ্যিক সাফল্য পায়নি, কিন্তু তার গানগুলো দর্শক-শ্রোতার মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছিল। আর এই গানটি সেই তালিকার অন্যতম। উনিশো সাতষট্টি সালের এই গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন আশা ভোঁসলে। সুরকার ছিলেন রাহুল দেব বর্মণ—যাঁর সুরে সবসময়ই থাকত এক অন্যরকম আধুনিকতা আর প্রাণ। আর গানের কথায় ছিলেন গৌরী প্রসন্ন মজুমদার, যাঁর লেখা সহজ অথচ গভীর অনুভূতিতে ভরপুর।
এই সিনেমার পরিচালক ছিলেন সলিল সেন। আর পর্দায় ছিলেন উত্তম কুমার ও তনুজার জুটি—যা নিজেই ছিল দর্শকদের কাছে এক বড় আকর্ষণ। “আজ গুনগুন…” গানটি তাই শুধু একটি গান নয়—এটি যেন এক ছোট্ট মুক্তির জানলা, যেখানে এক মুহূর্তের জন্য হলেও মানুষ নিজের সমস্ত দুশ্চিন্তা ভুলে একটু হালকা হয়ে উঠতে পারে।
এবার যে গানটির কথা বলব, সেটি আমাদের ধীরে ধীরে সাদা-কালো ছবির জগৎ থেকে বের করে নিয়ে আসে এক নতুন সময়ে—এক নতুন সংগীতধারায়।
এই গানটি সেই ধরনের, যা আশির দশকের প্রচলিত বাংলা গানের ধারা থেকে অনেকটাই আলাদা। সাধারণত সেই সময়ে আশা ভোঁসলের গাওয়া গান বলতে আমরা হয়তো রাগাশ্রিত সুর বা আধুনিক পপ ঘরানার কথা ভাবি। কিন্তু এই গানটি যেন সেই চেনা গণ্ডির বাইরে—একেবারে অন্য স্বাদের, অন্য মেজাজের।
গানটি শোনা যায় “আপন” সিনেমায়, যা মুক্তি পেয়েছিল ১৯৮৭ সালে। এই ছবির পরিচালক ছিলেন বীরেশ চট্টোপাধ্যায়। আর সঙ্গীত পরিচালনায় ছিলেন রাহুল দেব বর্মণ—যিনি প্রতিবারই নতুন কিছু করার সাহস দেখিয়েছেন, আর এই গানটিও তার ব্যতিক্রম নয়।
এই গানের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল এর ভেতরে থাকা ফোক বা লোকসংগীতের আবহ। সুরের মধ্যে এমন এক মাটির গন্ধ আছে, যা শ্রোতাকে খুব সহজেই টেনে নিয়ে যায় এক গ্রামবাংলার অনুভূতিতে। অথচ, এটি সম্পূর্ণভাবে কোনও নির্দিষ্ট ঘরানায় বাঁধা নয়—না পুরোপুরি রাগাশ্রিত, না পুরোপুরি আধুনিক পপ—বরং এই দুয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক নিজস্ব পরিচয় তৈরি করেছে।
গানটির কথা—“হায় রে কালা, একি জ্বালা, বাঁশি শুনে ঘরে রইতে পারি না”—এই লাইনগুলোতেই যেন ধরা পড়ে এক অদ্ভুত আকুলতা, এক টান, যা মানুষের ভেতরের অস্থিরতাকে প্রকাশ করে। যেন দূরে কোথাও বাজতে থাকা বাঁশির সুর মানুষকে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে—সবকিছু ছেড়ে, সব বাঁধন ভেঙে। এই গানটি তাই শুধু একটি গান নয়—এটি এক অনুভূতির প্রকাশ, যেখানে সুর, শব্দ আর লোকজ আবহ একসঙ্গে মিশে তৈরি করেছে এক অনন্য সংগীত অভিজ্ঞতা।
এরপর যে গানটির কথা বলব, সেটি একেবারেই প্রেমের গান—নির্মল, কোমল আর অনুভূতিতে ভরা।
এই গানটি আরও বিশেষ হয়ে ওঠে কারণ এটি চিত্রায়িত হয়েছে এমন এক শিল্পীর উপর, যিনি অল্প বয়সেই বাংলা সিনেমায় নিজের অভিনয় দক্ষতার মাধ্যমে আলাদা জায়গা করে নিয়েছিলেন—প্রেম চৌধুরী। তাঁর উপস্থিতি, তাঁর অভিব্যক্তি এই গানটিকে দিয়েছে এক অনন্য মাত্রা।
গানটি শোনা যায় “অনুরাগের ছোঁয়া” সিনেমায়। নামের মধ্যেই যেমন ভালোবাসার ইঙ্গিত রয়েছে, তেমনই গানটিতেও রয়েছে সেই অনুরাগের মৃদু স্পর্শ—যা ধীরে ধীরে হৃদয়ের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে। এই গানে কণ্ঠ দিয়েছেন আশা ভোঁসলে। তাঁর কণ্ঠের মাধুর্য, সেই স্বাভাবিক আবেগ প্রকাশের ক্ষমতা—গানটিকে আরও গভীর, আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে।
সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন অজয় দাস, আর গানের কথা লিখেছেন গৌরী প্রসন্ন মজুমদার—যাঁর লেখায় সবসময়ই থাকে সহজ অথচ হৃদয়ছোঁয়া অনুভূতি। গানটি হল—“এমন আমার হারিয়ে যায় কোনখানে…”—এই লাইনগুলোর মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত হারিয়ে যাওয়ার অনুভব, এক মিষ্টি কষ্ট, যা ভালোবাসারই আরেক রূপ।
এই গানটি তাই শুধু একটি প্রেমের গান নয়—এটি এক নীরব অনুভূতি, এক অন্তর্লীন আবেগ, যা শোনার পর অনেকক্ষণ ধরে মনে রয়ে যায়।
শেষের যে গানটির কথা বলব, সেটি আমাদের নিয়ে যায় আরও একটু পেছনে—সত্তরের দশকের শুরুতে। এই গানটি নেওয়া হয়েছে ১৯৭২ সালের বাংলা সিনেমা “পিকনিক” থেকে। সেই সময়ের বাংলা সিনেমার গানগুলোর মধ্যে এক বিশেষ ধরনের সরলতা, আনন্দ আর নির্মল আবেগ ছিল—যা আজও শুনলে মন ভালো হয়ে যায়।
গানটি হল—“মন মেতেছে মন ময়ূরের কী খেলায়”।
এই গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন আশা ভোঁসলে। তাঁর কণ্ঠের সেই চিরচেনা মাধুর্য আর প্রাণবন্ততা গানটিকে করে তুলেছে আরও জীবন্ত, আরও উজ্জ্বল। যেন গানটির প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি সুরে লুকিয়ে আছে এক নিখাদ আনন্দের অনুভূতি।
সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন সুধীন দাশগুপ্ত—বাংলা গানের জগতে এক অত্যন্ত সম্মানিত নাম। তাঁর সুরের বৈশিষ্ট্যই ছিল এমন এক সহজ অথচ আকর্ষণীয় গঠন, যা খুব সহজেই মানুষের মনে জায়গা করে নিত। এই গানটিও তার ব্যতিক্রম নয়।
“মন মেতেছে মন ময়ূরের কী খেলায়”—এই লাইনগুলোর মধ্যেই যেন ধরা পড়ে এক উচ্ছ্বাস, এক মুক্ত আনন্দ, যেখানে মন নিজের মতো করে নাচতে চায়, উড়ে যেতে চায়। যেন জীবনের ছোট ছোট সুখগুলোকে উদযাপন করার এক নিখাদ মুহূর্ত।
এই গানটি তাই শুধু একটি পুরোনো দিনের স্মৃতি নয়—এটি এমন এক আনন্দের প্রতিচ্ছবি, যা সময় পেরিয়েও আজও ঠিক ততটাই সতেজ, ততটাই প্রাণবন্ত।
আমার কথা এখানেই শেষ করি— কিন্তু সুরের শিল্পীদের কখনও সত্যিই শেষ হয় না। তাঁদের মৃত্যু হয় না, তাঁরা থেকে যান—তাঁদের গানে, তাঁদের সৃষ্টিতে, আর সবচেয়ে বড় কথা, তাঁদের অসংখ্য শ্রোতার হৃদয়ের ভেতরে।
আজকের এই লেখার উদ্দেশ্যও ছিল একটাই—বাংলা গানকে নতুন করে ফিরে দেখা, আর সেই গানগুলোর মধ্যে দিয়ে একজন অসাধারণ শিল্পীকে অনুভব করা। বলিউডের এক জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী হয়েও তিনি যে অসংখ্য বাংলা গান আমাদের উপহার দিয়েছেন, সেগুলোর প্রতিটিই অনবদ্য, প্রতিটিই সময়কে ছাপিয়ে যাওয়া সৃষ্টি।
তাঁর গাওয়া সেরা গানের (Asha Bhosle Bengali Songs) তালিকা তৈরি করা সত্যিই অসম্ভব—কারণ তাঁর প্রতিটি গানই কোনও না কোনওভাবে শ্রেষ্ঠ। তাঁর অভিজ্ঞতা, তাঁর কণ্ঠের বৈচিত্র্য, তাঁর সুরের অনুভব—সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন এক অনন্য শিল্পী, এক জীবন্ত কিংবদন্তি।এমন এক বর্ষীয়ান শিল্পীর প্রয়াণে, আমার ব্যক্তিগতভাবে জানাই গভীর শ্রদ্ধা আর প্রণাম। এই শ্রদ্ধা, এই ভালোবাসা নিয়েই আজকের এই লেখা শেষ করলাম।
#AshaBhosle #BengaliSongs #RetroMusic #ClassicSongs #OldIsGold #RDBurman #BengaliCinema #MusicLovers #GoldenEra #SoulfulMusic
সাম্প্রতিক পোস্ট
- দিনের ২৪ ঘণ্টা বদলে দিতে পারে আপনার জীবন! জানুন, সময় ব্যবহারের এই সহজ কৌশল
- পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে তরুণ তুর্কিদের ঝড়! ভোটের ময়দানে কতটা প্রভাব ফেলছে যুব মুখ?
- শালিমার বাগের ভবিষ্যৎ রহস্য: প্রেম, স্মৃতি আর সময়কে ছাপিয়ে ভবিষ্যৎ কি বদলে দেবে ইতিহাস?
- বিতর্ক পিছু ছাড়েনি, মামলা মাথায় নিয়েই ভোটের ময়দানে! তৃণমূল-বিজেপির হেভিওয়েটদের ভোটযুদ্ধ ঘিরে উত্তাপ
- গ্যাস সিলিন্ডার দ্রুত শেষ হয়ে যায়? এই ৬টি সহজ টিপস জানলে সিলিন্ডার চলবে বেশি দিন

