Best Places to View Kanchenjunga: টাইগার হিল এখন অতীত! কাঞ্চনজঙ্ঘার গায়ে নিশ্বাস ফেলতে চান? লেন্সবন্দি করুন এই ৯টি অফবিট ও অ্যাডভেঞ্চারাস ভিউ পয়েন্ট | দূরবিন দিয়ে পাহাড় দেখা নয়, এবার পাহাড় দেখুন একদম ‘ফেস-টু-ফেস’। যেখানে কাঞ্চনজঙ্ঘার বিশাল দেওয়াল সূর্যকে আড়াল করে রাখে, আর জোছনা রাতে বরফের ওপর হিরের দ্যুতি খেলে। ট্রেকারদের স্বপ্ন Goechala থেকে শুরু করে অফবিট Chatakpur—চিনে নিন এমন ৯টি জায়গা, যা আপনার অ্যাস্ট্রো ও ল্যান্ডস্কেপ ফটোগ্রাফির সংজ্ঞা বদলে দেবে। রইল রুট ম্যাপ ও Kanchenjunga Photography Guide।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: “কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে যাব”—এই কথাটা শুনলেই আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে দার্জিলিংয়ের ম্যাল রোড বা টাইগার হিলের সেই জনসমুদ্র। হাজার হাজার মানুষের ভিড়, সেলফি স্টিকের গুঁতো, আর বহু দূর থেকে দেখা এক ফালি সাদা বরফের পাহাড়। আমরা তাতেই খুশি হই, হাততালি দিই।
কিন্তু আপনি কি জানেন, আসল কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ এটা নয়?
টাইগার হিল বা দার্জিলিং থেকে আমরা যা দেখি, তা হলো রানির দূরদর্শন। কিন্তু আপনি যদি পাহাড়ের সত্যিকারের প্রেমিক হন, যদি আপনি ফটোগ্রাফার হন, তবে ওইটুকুতে আপনার মন ভরার কথা নয়। আপনাকে যেতে হবে আরও কাছে। এতটাই কাছে, যেখানে পাহাড়ের বিশালতা আপনাকে ভয় পাইয়ে দেবে। যেখানে মনে হবে, হাত বাড়ালেই ওই হিমশীতল বরফ ছোঁয়া সম্ভব। যেখানে বাতাসের শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যায় না।
আরও পড়ুন : অ্যাস্ট্রো-ফটোগ্রাফি করতে চান? | এই ৫টি জায়গায় রাতের আকাশ দেখলে অবাক হবেন
আজ ‘চলি চলি’ আপনাদের সেই সব চেনা ছক ভেঙে নিয়ে যাবে এক অন্য উচ্চতায়। আজ আমরা কথা বলব না টাইগার হিল, লেপচাজগৎ বা দাওয়াইপানি নিয়ে। কারণ ওগুলো এখন বড্ড ‘কমন’। আজ আমাদের গন্তব্য সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গের এমন ৯টি জায়গা, যেখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে লেন্সবন্দি করা যেকোনো ফটোগ্রাফারের আজন্ম স্বপ্ন।
এই তালিকায় এমন জায়গা আছে যেখানে পৌঁছাতে গেলে আপনাকে পায়ে হেঁটে পেরোতে হবে কঠিন চড়াই, আবার এমন জায়গাও আছে যেখানে গাড়িতে বসেই আপনি দেখতে পাবেন ‘টুইন পিকস’। গোচে লা-র হাড়হিম করা পাস থেকে রাচেলা পাসের বুনো জঙ্গল—আসুন, কাঞ্চনজঙ্ঘার অন্দরমহলে প্রবেশ করি।

১. গোচে লা (Goechala), সিকিম: স্বপ্নের সবথেকে কাছে (The Ultimate Close-Up)
যদি প্রশ্ন করা হয়, “কাঞ্চনজঙ্ঘাকে সবথেকে কাছ থেকে কোথা থেকে দেখা যায়?”—তার একমাত্র উত্তর গোচে লা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৬,২০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই পাসটি কাঞ্চনজঙ্ঘার বেস ক্যাম্পের ঠিক আগে।
কেন এটি সেরা? (The Experience): গোচে লা কোনো সাধারণ ভিউ পয়েন্ট নয়, এটি একটি তীর্থস্থান। এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার পূর্ব মুখ (East Face) দেখা যায়। দৃশ্যটা কেমন জানেন? মনে হবে আপনার সামনে পৃথিবীর সবথেকে উঁচু এক শ্বেতপাথরের দেওয়াল দাঁড়িয়ে আছে। এখানে সূর্যোদয় দেখা এক অলৌকিক অভিজ্ঞতা। সূর্য যখন ওঠে, তখন তার প্রথম রশ্মি কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায় পড়ার আগে, পাহাড়ের পেছনের আকাশটা রক্তিম হয়ে যায়। তারপর ধীরে ধীরে পাহাড়ের চূড়াটা জ্বলে ওঠে। এখান থেকে পাহাড় এতটাই বিশাল দেখায় যে, আপনি ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্স ছাড়া পুরো পাহাড়টা ফ্রেমে ধরতেই পারবেন না। নিচে নীল জলের ‘সমিতি লেক’ (Samiti Lake) আর ওপরে বিশাল পর্বত—এই ফ্রেমটি পাওয়ার জন্য ফটোগ্রাফাররা মাইলের পর মাইল হাঁটতে রাজি থাকেন।
ফটোগ্রাফারদের টিপস:
- সমিতি লেক রিফ্লেকশন: গোচে লা পাস যাওয়ার পথে পড়ে সমিতি লেক। ভোরবেলা যখন জল স্থির থাকে, তখন লেকের জলে কাঞ্চনজঙ্ঘার প্রতিচ্ছবি বা রিফ্লেকশন পড়ে। এটি এই রুটের সেরা শট।
- মাউন্ট পান্ডিম: কাঞ্চনজঙ্ঘা ছাড়াও এখান থেকে মাউন্ট পান্ডিমকে মনে হয় যেন হাত দিয়ে ছোঁয়া যাবে।
- গিয়ার: এখানে মাইনাস টেম্পারেচার থাকে। তাই ক্যামেরার ব্যাটারি শরীরের গরমে রাখুন। ট্রাইপড খুব মজবুত হতে হবে, কারণ হাওয়ার গতিবেগ মারাত্মক।
কীভাবে যাবেন: এটি একটি কঠিন ট্রেক। ইউকসাম (Yuksom) থেকে যাত্রা শুরু করে সাচেন, সোখা, জোংরি, থামসিং হয়ে গোচে লা পৌঁছতে হয়। সময় লাগে ৮-১০ দিন।

২. জোংরি (Dzongri), সিকিম: ৩৬০ ডিগ্রির রাজকীয় প্যানোরমা
যারা গোচে লা পর্যন্ত কঠিন পথ হাঁটতে পারবেন না, তাদের জন্য জোংরি হলো বেস্ট অপশন। গোচে লা রুটের মাঝপথেই পড়ে এই জায়গাটি। উচ্চতা ১৩,০০০ ফুটের বেশি।
কেন এটি সেরা? (The View): জোংরি টপ (Dzongri Top) থেকে যে দৃশ্য দেখা যায়, তা টাইগার হিলকে লজ্জায় ফেলে দেবে। এখানে দাঁড়ালে আপনি ৩৬০ ডিগ্রি প্যানোরমিক ভিউ পাবেন। আপনার সামনে পরপর সাজানো থাকবে—কাঞ্চনজঙ্ঘা, কাবরু নর্থ, কাবরু সাউথ, রাথং, কোকতাং, পান্ডিম, সিমভো এবং নারসিং। মনে হবে বরফের পাহাড়ের এক বিশাল মিছিল আপনার সামনে দিয়ে যাচ্ছে। জোংরির বিশেষত্ব হলো—এখান থেকে ‘স্লিপিং বুদ্ধ’ অবয়বটি খুব স্পষ্ট বোঝা যায় না ঠিকই, কিন্তু প্রতিটি শৃঙ্গের স্বাতন্ত্র্য বা ডিটেলস বোঝা যায়। সূর্যোদয়ের সময় যখন ‘Alpenglow’ বা সোনালি আভা পাহাড়ের গায়ে লাগে, তখন মনে হয় স্বর্গে চলে এসেছেন।
ফটোগ্রাফারদের টিপস:
- সিলুয়েট শট: জোংরি টপে ভোর ৪টেয় পৌঁছতে হয়। সূর্য ওঠার ঠিক আগের মুহূর্তটা (Blue Hour) খুব জরুরি। তখন পাহাড়ের কালো সিলুয়েট আর পেছনের নীল আকাশের ছবি দারুণ আসে।
- টেলিফোটো লেন্স: প্রতিটি শৃঙ্গের ক্লোজ-আপ শট নেওয়ার জন্য ২০০মিমি বা তার বেশি জুম লেন্স ব্যবহার করুন। পাহাড়ের গায়ের টেক্সচার, গ্লেসিয়ারের ফাটল—সব ধরা পড়বে।
কীভাবে যাবেন: ইউকসাম থেকে ট্রেকিং করে ২ দিনের মধ্যে জোংরি পৌঁছানো যায়। এটি গোচে লা ট্রেকের চেয়ে সহজ এবং কম সময়ের।

৩. চটকপুর (Chatakpur), পশ্চিমবঙ্গ: জঙ্গলের ফ্রেমে কাঞ্চনজঙ্ঘা
সিকিমের কঠিন ট্রেকিং রুট ছেড়ে এবার নামি বাংলার মাটিতে। দার্জিলিংয়ের কাছেই সেনচ্যাল ওয়াইল্ডলাইফ স্যানচুয়ারির (Senchal Wildlife Sanctuary) গভীরে অবস্থিত ছোট্ট ইকো-ভিলেজ চটকপুর। টাইগার হিলের ঠিক উল্টো দিকের পাহাড়ে এর অবস্থান।
কেন এটি সেরা? (The Jungle Vibe): টাইগার হিলে যেখানে হাজার হাজার মানুষের ভিড়, চটকপুর সেখানে নিঝুম। এখানে মাত্র ১৯-২০টি ঘর। চটকপুরের ওয়াচ টাওয়ার থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার যে ভিউ পাওয়া যায়, তা টাইগার হিলের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়, বরং বেশি সুন্দর কারণ এখানে কোনো ‘লাইট পলিউশন’ বা ভিড় নেই। চটকপুরের ইউএসপি হলো এর জঙ্গল। ঘন পাইন, ওক আর ধুপির জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে যখন কাঞ্চনজঙ্ঘা উঁকি মারে, তখন সেটি এক অদ্ভুত ড্রামা তৈরি করে। এখানে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে মনে হয় অনেক বেশি রহস্যময়।
ফটোগ্রাফারদের টিপস:
- ন্যাচারাল ফ্রেমিং: পাইন গাছের ডালপালা বা জঙ্গলের সরু পথকে ফোরগ্রাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করুন। এতে ছবিতে গভীরতা বা ডেপথ (Depth) আসে।
- কুয়াশা ও রোদ: এখানে আবহাওয়া খুব দ্রুত বদলায়। কুয়াশা কেটে রোদ ওঠার মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি করার জন্য সেরা।
- পাখি ও পাহাড়: চটকপুর পাখিদের স্বর্গ। টেলিফোটো লেন্স দিয়ে কোনো রঙিন পাখি (যেমন ম্যাগপাই বা ব্লু হুইসলিং থ্রাশ) আর ব্যাকগ্রাউন্ডে ঝাপসা কাঞ্চনজঙ্ঘা—এই কম্বিনেশন ট্রাই করতে পারেন।
কীভাবে যাবেন: এনজেপি থেকে গাড়ি রিজার্ভ করে সোনাদা। সেখান থেকে জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে চটকপুর। পারমিট লাগে।

৪. রাচেলা পাস (Rachela Pass): তিন সীমানার নির্জন প্রহরী
এই জায়গাটির নাম অনেকেই শোনেননি। এটি নেওড়া ভ্যালি ন্যাশানাল পার্কের সর্বোচ্চ বিন্দু (১০,৩০০ ফুট)। এটি পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম এবং ভুটান—এই তিন জায়গার সীমানা বা ‘ট্রাই-জংশন’।
কেন এটি সেরা? (The Wild View): রাচেলা পাস হলো বাংলার সবথেকে বন্য এবং অফবিট ভিউ পয়েন্ট। এখানে পৌঁছানো মানে এক আদিম অরণ্যের স্বাদ পাওয়া। এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে দেখা যায় এক অন্য কোণ বা অ্যাঙ্গেল থেকে। যেহেতু এটি ভুটান সীমান্তের কাছে, তাই এখান থেকে ভুটানের পাহাড়গুলোও দেখা যায়। এখানকার ভিউ কোনো বাধাহীন। নিচে নেওড়া ভ্যালির ঘন জঙ্গল, যেখানে রেড পান্ডা আর রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের বাস, আর ওপরে তুষারশুভ্র কাঞ্চনজঙ্ঘা। বসন্তকালে এখানে রডোডেনড্রন ফোটে। লাল ফুলের গালিচা আর সাদা পাহাড়—এই কন্ট্রাস্ট ফটোগ্রাফারদের পাগল করে দেবে।
ফটোগ্রাফারদের টিপস:
- ল্যান্ডস্কেপ: এটি ল্যান্ডস্কেপ ফটোগ্রাফির জন্য আদর্শ। আকাশ এখানে গাঢ় নীল। পোলারাইজিং ফিল্টার (CPL) ব্যবহার করলে আকাশের নীল রং এবং পাহাড়ের সাদা রং আরও ফুটে উঠবে।
- ওয়াইল্ডলাইফ: ভাগ্য ভালো থাকলে রেড পান্ডার দেখাও মিলতে পারে, যার ব্যাকগ্রাউন্ডে থাকবে হিমালয়।
কীভাবে যাবেন: কালিম্পং জেলার লাভা বা চাসকাম গ্রাম থেকে ট্রেকিং করে রাচেলা পাস যেতে হয়। এটি অ্যাডভেঞ্চার প্রেমীদের জন্য।

৫. রিনচেনপং (Rinchenpong), পশ্চিম সিকিম: যমজ পাহাড়ের হাতছানি
পেলিং এখন খুব জনাকীর্ণ। তার ঠিক উল্টো দিকেই শান্ত, নিরিবিলি এক জনপদ হলো রিনচেনপং-কালুক। এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে মনে হয় যেন ঘরের বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে।
কেন এটি সেরা? (The Twin Peaks): রিনচেনপংয়ের বিশেষত্ব হলো এখান থেকে কুম্ভকর্ণ (Kumbhakarna) এবং কাঞ্চনজঙ্ঘা—এই দুটি শৃঙ্গকে পাশাপাশি খুব সুন্দর দেখায়। একে বলা হয় ‘টুইন পিকস’ ভিউ। এখানে পাহাড়ের বিস্তার বা রেঞ্জটা অনেক বড়। সকালে ঘুম ভেঙে জানলা খুললেই মনে হবে পাহাড় আপনার ঘরে ঢুকে পড়েছে। রিনচেনপংয়ের রবীন্দ্র স্মৃতি বিজড়িত বাংলো বা পুরোনো রেশম পথের ইতিহাস একে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
ফটোগ্রাফারদের টিপস:
- রিনচেনপং মঠ (Monastery): এখানকার সবথেকে আইকনিক শট হলো—রিনচেনপং গুম্ফার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ‘আদি বুদ্ধ’ বা ‘Ati Buddha’ মূর্তির পেছন দিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য। মূর্তির সোনালি রং আর পাহাড়ের সাদা রং মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
- ভ্যালি ভিউ: এখান থেকে নিচের গ্রাম এবং তিস্তা নদীর ভ্যালিও দেখা যায়। ভ্যালি এবং পাহাড়—দুটোকে এক ফ্রেমে রাখার চেষ্টা করুন।
কীভাবে যাবেন: শিলিগুড়ি থেকে জোড়থাং হয়ে রিনচেনপং। দূরত্ব প্রায় ১৩০ কিমি। পেলিং যাওয়ার পথেই পড়ে।
৬. উত্তরায় (Uttarey), পশ্চিম সিকিম: সিঙ্গালিলা রেঞ্জের গেটওয়ে
পশ্চিম সিকিমের একদম শেষ প্রান্তে, নেপাল বর্ডারের গায়ে লেগে থাকা এক বাটি আকৃতির উপত্যকা হলো উত্তরায়। এখান থেকেই শুরু হয় সিকিমের সিঙ্গালিলা ট্রেকিং।
কেন এটি সেরা? (The Unique Angle): উত্তরায় থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার ভিউ একদম অন্যরকম। এখান থেকে পাহাড়ের ‘সাউথ ফেস’ বা দক্ষিণ মুখ দেখা যায়। বিশেষ করে ‘চেওয়াতাঞ্জং পাস’ (Chewabhanjang Pass) থেকে যে দৃশ্য দেখা যায়, তা অবিস্মরণীয়। উত্তরায় গ্রামের সবুজ ধানক্ষেত, রঙিন কাঠের বাড়ি আর তার ঠিক পেছনে বিশাল কাঞ্চনজঙ্ঘা—এই দৃশ্য আপনাকে আল্পস পর্বতমালার কথা মনে করাবে। এখানে মাউন্ট সিমভো (Mt. Simvo)-কে খুব কাছে দেখা যায়।
ফটোগ্রাফারদের টিপস:
- টাইটানিক পার্ক: উত্তরায়তে একটি জাহাজের আকৃতির পার্ক আছে। সেখান থেকে পাহাড়ের ভিউ খুব সুন্দর।
- ভিলেজ লাইফ: শুধু পাহাড় নয়, এখানকার লিম্বু এবং শেরপা গ্রামের জনজীবনকে পাহাড়ের পটভূমিকায় তুলে ধরুন। গ্রামের সরু রাস্তায় হেঁটে যাওয়া স্কুল ছাত্রছাত্রী আর পেছনে কাঞ্চনজঙ্ঘা—এই ফ্রেমটি খুব ইমোশনাল।
কীভাবে যাবেন: পেলিং থেকে ডেন্টাম ভ্যালি হয়ে উত্তরায় পৌঁছানো যায়। রাস্তাটি অত্যন্ত সুন্দর, বিশেষ করে সিনশোর ব্রিজ (Singshore Bridge)-এর ওপর দিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা দারুণ।
৭. হি-বার্মিওক (Hee-Bermiok) ও ছায়াতাল: জলের আয়নায় পাহাড়
রিনচেনপংয়ের কাছেই আরও দুটি যমজ গ্রাম—হি এবং বার্মিওক। আর এখানকার গোপন রত্ন হলো ‘ছায়াতাল’ (Chayatal Lake)।
কেন এটি সেরা? (The Reflection): নামেই লুকিয়ে আছে এর রহস্য—’ছায়া’। হ্যাঁ, এখানকার ছায়াতাল লেকের জলে কাঞ্চনজঙ্ঘার নিখুঁত প্রতিচ্ছবি বা রিফ্লেকশন দেখা যায়। যারা গোচে লা-তে গিয়ে সমিতি লেক দেখতে পারবেন না, তারা গাড়িতে বসেই এখানে সেই একই অভিজ্ঞতার স্বাদ পাবেন। লেকের জল যখন শান্ত থাকে, তখন ওপরের আকাশ আর পাহাড় হুবহু নিচে নেমে আসে। এছাড়াও হি-বার্মিওক থেকে মাউন্ট কাবরু এবং মাউন্ট পান্ডিম খুব স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এটি একটি অফবিট হেরিটেজ ভিলেজ, তাই ভিড়ভাট্টা নেই।
ফটোগ্রাফারদের টিপস:
- লো অ্যাঙ্গেল শট: লেকের একদম পাড়ে ক্যামেরা নামিয়ে লো অ্যাঙ্গেল থেকে ছবি তুলুন। এতে লেকের জল এবং পাহাড়—দুটোই সমান গুরুত্ব পাবে।
- ওয়াটারফল: কাছেই আছে সিরিচঙ্ঘা ফলস (Sirichunga Falls)। ঝরনা এবং পাহাড়ের ল্যান্ডস্কেপ ফ্রেমে বন্দি করতে পারেন।
কীভাবে যাবেন: কালুক বা রিনচেনপং থেকে খুব কাছেই হি-বার্মিওক। ছায়াতাল লেকটি কিছুটা ওপরে।
কাঞ্চনজঙ্ঘা ফটোগ্রাফি গাইড: প্রো-লেভেল টিপস
এই জায়গাগুলোতে গেলেই যে ভালো ছবি উঠবে, তা নয়। কিছু গোল্ডেন রুলস মেনে চলতে হবে:
১. লেন্স সিলেকশন (Lens Choice):
- শুধু ওয়াইড অ্যাঙ্গেল নয়, টেলিফোটো লেন্স (৭০-২০০ মিমি বা তার বেশি) খুব জরুরি। কারণ পাহাড়ের গায়ে রোদ পড়ার পর বরফের যে টেক্সচার তৈরি হয়, বা মেঘের যে খেলা চলে, তা ক্লোজ-আপ শটেই ভালো বোঝা যায়।
- পাহাড়ের শৃঙ্গগুলোর ‘লেয়ার’ বা স্তর বোঝাতে জুম লেন্স সেরা।
২. হোয়াইট ব্যালেন্স (White Balance):
- অটো হোয়াইট ব্যালেন্স অনেক সময় বরফের রংকে নীলচে করে দেয়। তাই ‘ডে লাইট’ (Daylight) বা ‘ক্লাউডি’ (Cloudy) মোডে শুট করলে বরফের আসল সাদা ভাব এবং সূর্যোদয়ের সোনালি আভা ভালো আসে।
৩. এক্সপোজার (Exposure):
- বরফের ওপর আলো পড়লে ক্যামেরা অনেক সময় কনফিউজড হয়ে যায় এবং ছবি কালো (Underexposed) করে দেয়। তাই এক্সপোজার কম্পেনসেশন (Exposure Compensation) +১ বা +২ স্টপ বাড়িয়ে রাখুন।
৪. গোল্ডেন আওয়ার ও ব্লু আওয়ার:
- সূর্য ওঠার ৩০ মিনিট আগে (Blue Hour) আকাশ গাঢ় নীল থাকে এবং পাহাড় আবছা সাদা। এই সময় মুড খুব ড্রামাটিক হয়।
- সূর্য ওঠার ঠিক মুহূর্ত (Golden Hour) যখন পাহাড় কমলা হয়। এই দুটো সময় মিস করবেন না। সকাল ৯টার পর সাধারণত ছবি ফ্ল্যাট হয়ে যায়।

৮. সান্দাকফু ও ফালুট (Sandakphu & Phalut), পশ্চিমবঙ্গ: স্লিপিং বুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ রূপ
পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ (৩৬৩৬ মিটার) থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা আর অন্য যেকোনো জায়গা থেকে দেখার মধ্যে একটা মৌলিক তফাত আছে। এখান থেকেই ‘স্লিপিং বুদ্ধ’ (Sleeping Buddha)-র সবথেকে নিখুঁত এবং পূর্ণাঙ্গ অবয়বটি ধরা দেয়।
কেন এটি আইকনিক? (The Sleeping Buddha View): সান্দাকফুতে দাঁড়ালে আপনার সামনে কোনো বাধা নেই। আপনি মেঘের ওপরে ভাসছেন। আর সামনে ১৮০ ডিগ্রি প্যানোরমায় দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের চারটি সর্বোচ্চ শৃঙ্গ—মাউন্ট এভারেস্ট, লোহৎসে, মাকালু এবং অবশ্যই, কাঞ্চনজঙ্ঘা। তবে এখানকার প্রধান আকর্ষণ হলো কাঞ্চনজঙ্ঘা রেঞ্জের আকৃতি। কুম্ভকর্ণ থেকে শুরু করে পান্ডিম পর্যন্ত পুরো রেঞ্জটাকে দেখলে মনে হয়, মহামানব গৌতম বুদ্ধ আকাশের দিকে মুখ করে শান্তিতে শুয়ে আছেন। সান্দাকফু থেকে ফালুটের দিকে যত এগোবেন, এই বুদ্ধের আকৃতি আরও স্পষ্ট, আরও বিশাল হতে থাকে। ফালুট থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা এতটাই কাছে যে মনে হয় হাত বাড়ালেই তার তুষারশুভ্র কপাল ছোঁয়া যাবে।
ফটোগ্রাফারদের টিপস:
- প্যানোরমা শট: এখানে সাধারণ লেন্সে কাজ হবে না। পুরো রেঞ্জটা ধরার জন্য ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্সে প্যানোরমা মোড ব্যবহার করুন। এভারেস্ট ফ্যামিলি (বাঁদিকে) এবং কাঞ্চনজঙ্ঘা ফ্যামিলি (ডানদিকে)—এক ফ্রেমে ধরার চ্যালেঞ্জটা নিন।
- ফোরগ্রাউন্ড: বসন্তকালে (এপ্রিল-মে) গেলে লাল রডোডেনড্রনের ঝোপগুলোকে ফোরগ্রাউন্ডে রাখুন। লাল ফুল আর সাদা পাহাড়—এই কন্ট্রাস্ট ছবিকে জীবন্ত করে তোলে।
কীভাবে যাবেন: মানেভঞ্জন থেকে ট্রেকিং করে বা ল্যান্ড রোভারে (Land Rover) সান্দাকফু যাওয়া যায়। ফালুট যেতে হলে আরও ২১ কিমি ট্রেকিং বা গাড়িতে যেতে হয়।

৯. লুংথুং ও জুলুক (Lungthung & Zuluk), সিল্ক রুট: জিগজ্যাগ পথের বাঁকে বরফের দেওয়াল
পূর্ব সিকিমের ওল্ড সিল্ক রুট বা রেশম পথ শুধু ইতিহাসের জন্য নয়, কাঞ্চনজঙ্ঘার এক রুক্ষ এবং রাজকীয় রূপ দেখার জন্যও বিখ্যাত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১১-১২ হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই জায়গাগুলো।
কেন এটি আইকনিক? (The Zigzag & The Snow): লুংথুং বা থাম্বি ভিউ পয়েন্ট (Thambi View Point) থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে দেখলে মনে হয় আপনি পৃথিবীর ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন। এখানকার ল্যান্ডস্কেপ দার্জিলিং বা পশ্চিম সিকিমের মতো সবুজ নয়, বরং কিছুটা রুক্ষ এবং বন্য। এখানকার সিগনেচার শট হলো—নিচে জুলুকের বিখ্যাত ৯৬টি বাঁক বা ‘Zigzag Road’ এবং তার ঠিক ব্যাকগ্রাউন্ডে বিশাল কাঞ্চনজঙ্ঘা। বিশেষ করে শীতকালে যখন রাস্তা এবং পাহাড় দুইই বরফে ঢাকা থাকে, তখন এই দৃশ্য দেখলে মনে হয় সুইজারল্যান্ডে আছেন। এখান থেকে মাউন্ট সিনিওলচু (Mt. Siniolchu)-র দৃশ্যও অসাধারণ, যাকে বিশ্বের অন্যতম সুন্দর শৃঙ্গ বলা হয়।
ফটোগ্রাফারদের টিপস:
- কম্পোজিশন: এখানে আপনার ছবির কম্পোজিশনে ‘রাস্তা’ খুব গুরুত্বপূর্ণ। জিগজ্যাগ রাস্তাটিকে ‘লিডিং লাইন’ (Leading Line) হিসেবে ব্যবহার করুন যা দর্শকের চোখকে সোজা পাহাড়ের দিকে টেনে নিয়ে যাবে।
- গোল্ডেন লাইট: সূর্যোদয়ের সময় থাম্বি ভিউ পয়েন্টে প্রচণ্ড হাওয়া থাকে। ট্রাইপড শক্ত করে ধরে রাখুন। সূর্যের প্রথম আলো যখন সিনিওলচু এবং কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায় পড়ে, সেই মুহূর্তটি লেন্সবন্দি করার জন্য প্রস্তুত থাকুন।
কীভাবে যাবেন: শিলিগুড়ি থেকে রংপো হয়ে লিংতাম, তারপর পারমিট করে সিল্ক রুটে ঢোকা যায়। লুংথুং বা নাথাং ভ্যালিতে থাকা যায়।
কাঞ্চনজঙ্ঘা কোনো টুরিস্ট স্পট নয়, এটি প্রকৃতির এক বিস্ময়। গোচে লা-র হাড়হিম করা ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে বা ছায়াতালের শান্ত পাড়ে বসে যখন আপনি এই পাহাড়কে দেখবেন, তখন ক্যামেরার শাটার টেপার আগেও এক মুহূর্তের জন্য থমকে যাবেন। মনে হবে, এই দৃশ্য লেন্সের চেয়েও বেশি মনের মণিকোঠায় যত্ন করে রাখার মতো।
তাই এবারের ছুটিতে টাইগার হিলের ভিড় এড়িয়ে ব্যাগ গুছিয়ে নিন এই 9টি ঠিকানার উদ্দেশ্যে। কে জানে, হয়তো রাচেলা পাসের নির্জন ভোরে বা জোংরির চূড়ায় দাঁড়িয়ে আপনি খুঁজে পাবেন আপনার জীবনের সেরা ফ্রেমটি! পাহাড় ডাকছে, আপনি তৈরি তো?
(আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাশিফল আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল WhatsApp চ্যানেলে যোগ দিন! সবচেয়ে আগে পান জ্যোতিষ, অফবিট নিউজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনধারা ও অফবিট এক্সক্লুসিভ আপডেট —আমাদের WhatsApp Channel-এ যোগ দিন)
সাম্প্রতিক পোস্ট
- ভোটের বছরেও ‘বঞ্চিত’ বাংলা? হাইস্পিড রেল আর ফ্রেট করিডর ছাড়া ঝুলিতে শূন্য! বাজেটে বাড়ল ক্ষোভের পারদ
- ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বাজেট কি জনদরদী হতে চলেছে? জানুন, লাইভ বাজেট আপডেট ২০২৬
- পুরনো ধাতুর ওপর বিশ্বাস │ রাজপথে কীভাবে ভিন্টেজ গাড়ি হয়ে ওঠে চলমান ইতিহাস
- ঋতুস্রাব আর বাধা নয় শিক্ষায় │ যুগান্তকারী রায় দেশের শীর্ষ আদালতের
- বাজেট প্রত্যাশা ২০২৬ │ ভোটের আগে বাংলার জন্য কী চমক রাখছে কেন্দ্র? │ জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ

