Cancer Awareness: ক্যান্সার আজ আর হঠাৎ করে আসা কোনো রোগ নয়, এটি ধীরে ধীরে আমাদের জীবনযাপনের ভেতরেই তৈরি হচ্ছে। প্রতিদিনের খাবার, ঘুমের অভ্যাস, মানসিক চাপ, দূষিত বাতাস ও জল, প্লাস্টিকের ব্যবহার এবং অস্বাভাবিক কর্মঘণ্টা—সব মিলিয়ে শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধশক্তি ভেঙে পড়ছে। আমরা অনেক সময় ছোট ছোট উপসর্গকে অবহেলা করি, ভেবে নিই এগুলো সাধারণ সমস্যা। অথচ সেই অবহেলাই একদিন বড় বিপদের রূপ নিতে পারে। সচেতনতা, শরীরের সংকেত বোঝা এবং সময়মতো নিজের জীবনধারা বদলানোই পারে এই নীরব রোগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: সকালবেলার আলোটা তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছিল বাসি তেলের গন্ধ। ঘরের কোণে বসে থাকা মানুষটি বারবার পেটে হাত দিচ্ছিলেন। ভাবছিলেন, “আবার অম্বল। কিছুই না, দু’দিনেই সেরে যাবে।”
সেই ভাবনাই ছিল প্রথম ভুল। আজকের সমাজে কর্কটরোগ এমন এক শব্দ, যার নাম শুনলেই মানুষ থমকে যায়। মনে করা হয়, এ রোগ মানেই শেষ পরিণতি। অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, কর্কটরোগ কোনো হঠাৎ আঘাত নয়—এ এক দীর্ঘদিনের অবহেলার ফল।
বিখ্যাত ক্যান্সার সার্জন অংশুমান কুমার, যিনি প্রায় পঁচিশ বছর ধরে ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসা করছেন, খুব সহজ ভাষায় বিষয়টা ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ক্যানসার কোনো হঠাৎ হওয়া অসুখ নয়। এটি শরীরের ভেতরে ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া এক ধরনের বিশৃঙ্খলা। আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষের জন্ম, কাজ আর মৃত্যু নির্দিষ্ট নিয়মে চলে। কিন্তু যখন এই নিয়ম ভেঙে যায়, যখন কোষ নিজের মতো করে বাড়তে থাকে, তখনই শুরু হয় ক্যানসারের পথচলা। এই কারণেই কারও শরীরে দ্রুত ধরা পড়ে, আবার কারও ক্ষেত্রে বছর বছর সময় লাগে।
তামাক, মদ, ভেজাল খাবার—এসব যে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়, তা নতুন কিছু নয়। কিন্তু চিকিৎসকের কথায় উঠে আসে আরও গভীর এক সত্য। তিনি বলেন, সবাই একই জিনিস খায় বলে সবাই একসঙ্গে অসুস্থ হবে এমন নয়। কিন্তু ক্ষতি জমতে জমতে একদিন শরীর আর সামলাতে পারে না। তখনই রোগ প্রকাশ পায়। অর্থাৎ আজ নয়, কাল নয়—সময় নিয়ে হলেও ক্ষতি তার কাজ ঠিকই করে।
আলোচনায় উঠে আসে আমাদের খাদ্যাভ্যাসের কথাও। অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় খাবার শরীরে প্রদাহ বাড়ায়, যা ক্যানসার তৈরি করতে পারে—এমনটাই মত বিশেষজ্ঞের। তিনি বলেন, শিশুদের ছয় মাসের পর দুধের প্রয়োজন ধীরে ধীরে কমে যায়। প্রাকৃতিক খাবার, শাকসবজি, ফলমূলের দিকে ঝুঁকলে শরীর নিজেকে অনেকটাই রক্ষা করতে পারে। সমস্যাটা শুরু হয় তখনই, যখন আমরা সহজ আর মুখরোচক খাবারের ফাঁদে পড়ে যাই।
আরও একটি ভয়ের বিষয় উঠে আসে—খাবার মোড়ানোর কাগজ, ননস্টিক পাত্র। চিকিৎসক জানান, এইসব জিনিসে থাকা কিছু রাসায়নিক দীর্ঘদিন শরীরে জমতে থাকলে ক্যানসারের আশঙ্কা বেড়ে যায়। আমরা যেগুলোকে খুব স্বাভাবিক বলে ধরে নিই, সেগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে নীরব বিপদ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে সতর্কবার্তাটি তিনি দেন, তা হলো লক্ষণ নিয়ে। অম্বল, ব্যথা, ক্ষত—এই সবকিছুই আমরা প্রায়ই অবহেলা করি। কিন্তু যদি কোনো সমস্যা টানা তিন সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে থেকে যায়, তাহলে সেটাকে আর সাধারণ বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। শরীর তখন ইঙ্গিত দেয়, শুধু আমরা শুনতে চাই না।
এই কথোপকথনের শেষে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায়—ক্যানসার কোনো অভিশাপ নয়, আবার একদিনে হওয়া রোগও নয়। এটি আমাদের অভ্যাস, আমাদের খাবার, আমাদের অবহেলার ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া ফল। ভয় পাওয়ার চেয়ে প্রয়োজন সচেতন হওয়া। এখনই জীবনযাপনে সামান্য পরিবর্তন আনলে, শরীরের কথা শুনলে, অনেক বড় বিপদকেই হয়তো দূরে রাখা সম্ভব। ক্যানসার নিয়ে ভয়ের গল্প অনেক। কিন্তু জ্ঞানের আলো জ্বালাতে পারলে, সেই ভয়ই একদিন বদলে যেতে পারে সতর্কতায়। আর সতর্কতাই হতে পারে জীবনের সবচেয়ে বড় ওষুধ।
ক্যানসার আসলে কী?
এই প্রশ্নটা শুনলেই বেশিরভাগ মানুষের মনে ভয় ঢুকে যায়। এমন একটা ধারণা তৈরি হয়ে গেছে যে ক্যানসার মানেই শেষ, আর কিছু করার নেই। কিন্তু অভিজ্ঞ ক্যানসার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ভয়টাই সবচেয়ে বড় ভুল। একজন চিকিৎসক খুব সহজ একটা উদাহরণ দেন। যেমন একটা শহরে সবাই আইন মেনে শান্তিতে থাকে। কিন্তু হঠাৎ যদি কিছু মানুষ আইন ভেঙে অন্যদের ক্ষতি করতে শুরু করে এবং এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে, তখন যেমন অশান্তি হয়—শরীরের ভেতরে ক্যানসারও ঠিক তেমনই।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো—এই কোষগুলো একদিনে তৈরি হয় না। বছরের পর বছর ভুল জীবনযাপন, দূষণ, নেশা, ভেজাল খাবার, শরীরের ভেতরের দীর্ঘদিনের জ্বালা আর অবহেলা মিলেই এই অবস্থার জন্ম দেয়। ক্যানসার তাই হঠাৎ আসা কোনো অভিশাপ নয়, বরং শরীরের দীর্ঘদিনের সতর্ক সংকেত, যেটাকে আমরা অনেক সময় শুনতে চাই না।
উত্তর-পূর্ব ভারতের কিছু অঞ্চলে সুপারি খাওয়ার প্রবণতা খুব ছোট বয়স থেকেই দেখা যায়। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, এই অভ্যাসের ফলেই সেখানে অল্প বয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যেও মুখ ও গলার ক্যানসারের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
ক্যানসার মূলত দুই ধরনের। একদিকে আছে গাঁট বা কঠিন আকারে দেখা দেওয়া ক্যানসার, অন্যদিকে রয়েছে রক্তের ক্যানসার। রক্তের ক্যানসারে সাধারণত জ্বর, ত্বকের নিচে লাল বা নীল দাগ, অকারণে রক্তপাত, প্লেটলেট কমে যাওয়া কিংবা লসিকাগ্রন্থি ফুলে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা যায়। আবার মুখে ঘা সারতে না চাওয়া, স্তনে ব্যথাহীন গাঁট, অস্বাভাবিক রক্তপাত—এই সবই কঠিন ক্যানসারের সম্ভাব্য ইঙ্গিত। চিকিৎসকেরা বলছেন, সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো উপসর্গকে ‘সাধারণ’ ভেবে অবহেলা করা। নতুন কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে এবং তা তিন সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে, অবশ্যই ক্যানসার সংক্রান্ত পরীক্ষা করানো দরকার। কারণ শুরুর পর্যায়ে ধরা পড়লে এই রোগ অনেক ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যানসার চিকিৎসায় আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিই সবচেয়ে কার্যকর। তবে এর পাশাপাশি যোগ, প্রাকৃতিক চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। ভ্রান্ত প্রতিশ্রুতি বা অলৌকিক নিরাময়ের আশ্বাসে বিভ্রান্ত না হয়ে, সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসাই পারে জীবন বাঁচাতে। সবচেয়ে বড় কথা, নিজের শরীরকে নিয়মিত লক্ষ্য করা, সচেতন থাকা এবং সময়মতো চিকিৎসকের কাছে যাওয়াই ক্যানসারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।
ক্যানসার, দূষণ ও জীবনযাপন: যে সত্যগুলো আমরা এড়িয়ে যাচ্ছি
দূষণ শুধু বাতাসে নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে
বায়ু, জল ও মাটির দূষণের পাশাপাশি আমাদের জীবনে ঢুকে পড়েছে আরেকটি নীরব ঘাতক—প্লাস্টিক।
চুলে রং, সাবান, শ্যাম্পু, কসমেটিক ক্রিম—সবকিছুতেই রয়েছে ট্রাইক্লোসান, প্যারাবেন, থ্যালেটস, হেভি মেটাল—যেগুলো প্রমাণিতভাবে ক্যানসার সৃষ্টিকারী। নন-স্টিক বাসন, বাটার পেপার, প্লাস্টিক ফুড কনটেইনার—সবই তথাকথিত “ফরএভার কেমিক্যাল” বহন করে। একবার শরীরে ঢুকলে এগুলো বছরের পর বছর থেকে যায় এবং ধীরে ধীরে ক্ষতি করে।
রাতে দেরিতে অনলাইন খাবার অর্ডার, প্লাস্টিকের বাক্সে গরম খাবার, ফ্রিজে রেখে আবার মাইক্রোওয়েভে গরম—এই চক্রে খাবারের সঙ্গে শরীরে ঢুকে পড়ছে মাইক্রো ও ন্যানো-প্লাস্টিক। এর ফলে হরমোনাল ব্যালান্স নষ্ট হয়, সার্কাডিয়ান রিদম ভেঙে যায় এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
আমাদের অন্ত্রে ৪০–৭০ ট্রিলিয়ন উপকারী ব্যাকটেরিয়া বাস করে। তাদের খাবার হলো ফাইবার। ফাইবার না পেলে তারা অন্ত্রের দেয়াল ক্ষয় করে, টক্সিন রক্তে মিশে যায় এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি হয়—যা ক্যানসারের মূল পথ। ক্যানসার শুধু শরীরের নয়, মনের অসুখও বটে। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, দুঃখ, ক্ষোভ, অনিদ্রা—এই সবকিছু শরীরের ভেতরে ক্ষতিকর পরিবর্তন ঘটায়। মানসিক অশান্তি বাড়লে শরীরের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, যা রোগ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। তাই ধ্যান, নিয়মিত বিশ্রাম, প্রকৃতির সংস্পর্শ—এসব কোনো বিলাসিতা নয়, এগুলোই সুস্থ থাকার পথ।
এটি শরীরের দেওয়া এক সতর্ক সংকেত—যে আমরা ভুল পথে চলছি। সময়মতো শুনতে পারলে, জীবনযাপন বদলাতে পারলে, চিকিৎসার সঙ্গে সচেতনতা জুড়তে পারলে—এই রোগকে হারানো সম্ভব। ভয় নয়, দরকার বোঝাপড়া। অবহেলা নয়, দরকার সচেতনতা। কারণ ক্যানসার মানেই শেষ নয়—সঠিক সময়ে ধরা পড়লে, এ এক নতুন শুরুর সুযোগ।
#CancerAwareness#CancerPrevention, #HealthyLifestyle, #StopCancer
(আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাশিফল আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল WhatsApp চ্যানেলে যোগ দিন! সবচেয়ে আগে পান জ্যোতিষ, অফবিট নিউজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনধারা ও অফবিট এক্সক্লুসিভ আপডেট —আমাদের WhatsApp Channel-এ যোগ দিন)
সাম্প্রতিক পোস্ট
- ভোটের বছরেও ‘বঞ্চিত’ বাংলা? হাইস্পিড রেল আর ফ্রেট করিডর ছাড়া ঝুলিতে শূন্য! বাজেটে বাড়ল ক্ষোভের পারদ
- ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বাজেট কি জনদরদী হতে চলেছে? জানুন, লাইভ বাজেট আপডেট ২০২৬
- পুরনো ধাতুর ওপর বিশ্বাস │ রাজপথে কীভাবে ভিন্টেজ গাড়ি হয়ে ওঠে চলমান ইতিহাস
- ঋতুস্রাব আর বাধা নয় শিক্ষায় │ যুগান্তকারী রায় দেশের শীর্ষ আদালতের
- বাজেট প্রত্যাশা ২০২৬ │ ভোটের আগে বাংলার জন্য কী চমক রাখছে কেন্দ্র? │ জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ

