রক্তে হিমোগ্লোবিন ঠিক আছে, থাইরয়েড নর্মাল, তবুও শরীরে বল পান না? এর পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে ‘সাইলেন্ট’ কিছু কারণ। বিশ্বখ্যাত নিউরোসায়েন্টিস্টরা কী পরামর্শ দিচ্ছেন?শুধু ঘুমই বিশ্রাম নয় (Chronic Fatigue Causes and Solutions)। বিখ্যাত চিকিৎসক ডা. স্যান্ড্রা ডালটন-স্মিথ বলছেন, মানুষের দরকার ৭ ধরণের বিশ্রাম। আপনি কি ‘সোশ্যাল ফ্যাটিগ’ বা ‘সেন্সরি ওভারলোড’-এর শিকার? জানুন বিস্তারিত।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: সকাল ৭টায় অ্যালার্ম বাজল। আপনি সেটা বন্ধ করে ভাবলেন, “আর মাত্র ৫ মিনিট।” যখন শেষমেশ বিছানা ছাড়লেন, তখন মনে হলো যেন সারারাত আপনি ঘুমাননি, বরং যুদ্ধ করেছেন। অফিসে বসে কাজের ফাঁকে হাই উঠছে, দুপুরের লাঞ্চের পর মনে হচ্ছে শরীর আর চলছে না। সপ্তাহান্তে ভাবছেন সারাদিন ঘুমিয়ে ক্লান্তি কাটাবেন, কিন্তু রবিবার পার হয়ে সোমবার এলেও সেই একই ম্যাজম্যাজে ভাব।
আপনার মনে প্রশ্ন জাগে—”আমার তো কোনো বড় অসুখ নেই, রক্ত পরীক্ষা করিয়েছি সব নর্মাল, ভালোমন্দ খাচ্ছি, তবুও কেন আমার এনার্জি লেভেল তলানিতে?”
আপনি একা নন। ব্রিটেনের National Health Service (NHS)-এর পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি ৫ জন মানুষের মধ্যে ১ জন সব সময় অস্বাভাবিক ক্লান্ত বোধ করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় TATT (Tired All The Time) সিনড্রোম।
কিন্তু কেন এমন হয়? শরীর যখন ভালো, তখন ক্লান্তিটা আসছে কোথা থেকে? এর উত্তর খুঁজতে নিউজ অফবিট ঘেঁটে দেখল আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং বিশ্বসেরা বিশেষজ্ঞদের গবেষণাপত্র। উত্তরগুলো আপনাকে চমকে দিতে পারে।
আরও পড়ুন : থাইরয়েড নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই বীজের জল কেন সেরা ঘরোয়া উপায়
১. ঘুম বনাম বিশ্রাম: আমরা কি ভুল বুঝছি? (Sleep vs. Rest)
আমরা মনে করি, ক্লান্তি দূর করার একমাত্র ওষুধ হলো ‘ঘুম’। কিন্তু বিখ্যাত আমেরিকান ফিজিশিয়ান এবং গবেষক ডা. স্যান্ড্রা ডালটন-স্মিথ (Dr. Saundra Dalton-Smith) তাঁর বেস্টসেলার বই ‘Sacred Rest’-এ একটি যুগান্তকারী তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলছেন, “Sleep and rest are not the same thing.” (ঘুম আর বিশ্রাম এক জিনিস নয়)।
ডা. স্মিথের মতে, আমরা অনেকেই পর্যাপ্ত ঘুমাই, কিন্তু আমরা ‘বিশ্রাম’ পাই না। তাঁর গবেষণা অনুযায়ী, মানুষের শরীরের ব্যাটারি চার্জ করার জন্য ৭ ধরণের বিশ্রামের প্রয়োজন। আপনি যদি শুধু ঘুমান, কিন্তু বাকি বিশ্রামগুলো না নেন, তবে ক্লান্তি কাটবে না।
ডা. ডালটন-স্মিথের ‘৭ ধরণের বিশ্রাম’ তত্ত্ব:
- Physical Rest: ঘুমানো বা শরীর টানটান করে শুয়ে থাকা।
- Mental Rest: সারাদিন কাজের ফাঁকে ৫ মিনিট চোখ বন্ধ করে ব্রেনকে ব্রেক দেওয়া। যারা এটা করেন না, রাতে তাঁদের ব্রেন শাট ডাউন হয় না।
- Sensory Rest: মোবাইল, ল্যাপটপ, গাড়ির হর্ন, উজ্জ্বল আলো—এগুলো আমাদের স্নায়ুকে উত্তেজিত রাখে। দিনে কিছুক্ষণ সব গ্যাজেট বন্ধ রাখা হলো সেন্সরি রেস্ট।
- Creative Rest: সারাদিন শুধু সমস্যা সমাধান না করে, প্রকৃতির দিকে তাকানো বা গান শোনা।
- Emotional Rest: “আমি ভালো আছি”—এই মিথ্যা বলা বন্ধ করে, বিশ্বস্ত কারোর কাছে মনের কথা খুলে বলা।
- Social Rest: যেসব মানুষ আপনার এনার্জি চুষে নেয় (Energy Vampires), তাদের থেকে দূরে থাকা এবং যারা আপনাকে উৎসাহ দেয়, তাদের সঙ্গে সময় কাটানো।
- Spiritual Rest: প্রার্থনা, মেডিটেশন বা এমন কিছুর সঙ্গে যুক্ত হওয়া যা আপনাকে মানসিক শান্তি দেয়।
ডা. স্মিথ বলছেন, আপনার হয়তো ‘ফিজিক্যাল রেস্ট’ হয়েছে, কিন্তু আপনি ‘সেন্সরি ওভারলোড’ বা ‘সোশ্যাল ফ্যাটিগ’-এ ভুগছেন। তাই শরীর ভালো থাকলেও ক্লান্তি যাচ্ছে না।
২. ঘুমের গুণমান: ডা. ম্যাথু ওয়াকারের সতর্কতা (Quality Over Quantity)
ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে-র নিউরোসায়েন্স ও সাইকোলজি বিভাগের প্রফেসর এবং ‘Why We Sleep’ বইয়ের লেখক ডা. ম্যাথু ওয়াকার (Dr. Matthew Walker) একটি মারাত্মক বিষয়ের দিকে নজর দিয়েছেন।
তিনি বলছেন, আপনি হয়তো ৮ ঘণ্টা বিছানায় ছিলেন, কিন্তু আপনার ‘Deep Sleep’ বা গভীর ঘুম কতক্ষণ হয়েছে? অ্যালকোহল, ক্যাফেইন (কফি/চা) বা শোয়ার আগে মোবাইলের ব্লু-লাইট মেলাটোনিন হরমোন কমিয়ে দেয়। ফলে আপনি ঘুমালেও আপনার মস্তিষ্ক ‘Restorative Sleep’ বা মেরামতি করার সুযোগ পায় না। একে বলা হয় ‘Junk Sleep’। জাঙ্ক ফুড যেমন পেট ভরালেও পুষ্টি দেয় না, জাঙ্ক স্লিপ তেমনি সময় পার করলেও ক্লান্তি দূর করে না।
ডা. ওয়াকারের পরামর্শ—দুপুর ২টোর পর কফি খাবেন না এবং শোয়ার ১ ঘণ্টা আগে মোবাইল স্ক্রিন থেকে দূরে থাকুন।
৩. রিপোর্ট নর্মাল, কিন্তু লুকিয়ে আছে ‘সাইলেন্ট কিলার’ (The Hidden Medical Causes)
অনেক সময় সাধারণ ব্লাড টেস্টে (CBC) সব ধরা পড়ে না। কিছু গোপন শারীরিক সমস্যা ক্লান্তির মূল কারণ হতে পারে।
- স্লিপ অ্যাপনিয়া (Sleep Apnea): আপনি কি রাতে নাক ডাকেন? বা মাঝেমধ্যে শ্বাস আটকে ঘুম ভেঙে যায়? এটি স্লিপ অ্যাপনিয়ার লক্ষণ। এতে শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি হয় এবং সারাদিন প্রচণ্ড ক্লান্তি লাগে।
- গোপন ডায়াবেটিস ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স: সুগার লেভেল খুব বেশি না বাড়লেও, ব্লাড সুগারের ওঠানামা (Sugar Crash) আপনাকে ক্লান্ত করে দিতে পারে। বিশেষ করে দুপুরের খাওয়ার পর যদি প্রচণ্ড ঘুম পায়, তবে এটি ইনসুলিন স্পাইকের লক্ষণ হতে পারে।
- ভিটামিন ডি ও বি-১২ ঘাটতি: আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ, বিশেষ করে যারা এসি অফিসে কাজ করেন, তাঁরা ভিটামিন ডি-এর অভাবে ভোগেন। এটি এনার্জি লেভেল কমিয়ে দেয়।
- থাইরয়েড: বর্ডারলাইন হাইপোথাইরয়েডিজম অনেক সময় সাধারণ পরীক্ষায় ধরা পড়ে না, কিন্তু এটি মেটাবলিজম ধীর করে দেয়, ফলে ক্লান্তি আসে।
৪. ডিহাইড্রেশন: জলের অভাব নাকি শক্তির অভাব?
ক্লিনিক্যাল স্টাডি বলছে, শরীরে মাত্র ১.৫% জলের ঘাটতি হলে আমাদের এনার্জি লেভেল এবং মুড খারাপ হতে শুরু করে। আমাদের রক্ত ঘন হয়ে যায়, হৃদপিণ্ডকে রক্ত পাম্প করতে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। ফলে শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে। অনেক সময় আমরা ক্ষুধাকে তৃষ্ণা এবং ক্লান্তি বলে ভুল করি। তাই ক্লান্ত লাগলে আগে এক গ্লাস জল খেয়ে দেখুন।
৫. মানসিক ভার: স্ট্রেস হরমোনের খেলা
স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির নিউরোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. অ্যান্ড্রু হিউবারম্যান (Dr. Andrew Huberman) তাঁর পডকাস্টে বারবার কর্টিসল বা স্ট্রেস হরমোনের কথা উল্লেখ করেন। আমরা যখন ক্রনিক স্ট্রেসে থাকি (অফিস ডেডলাইন, ইএমআই, সম্পর্কের সমস্যা), তখন আমাদের শরীর সবসময় ‘Fight or Flight’ মোডে থাকে। এটি প্রচুর এনার্জি খরচ করে। ডা. হিউবারম্যান একে বলছেন ‘Adrenaline Fatigue’। সারাদিন টেনশন করার পর শরীর আর কিছু করার শক্তি পায় না, যদিও আপনি কায়িক পরিশ্রম কিছুই করেননি।
সমাধান কী? বিজ্ঞানীরা কী বলছেন? (Expert Solutions)
শুধু সমস্যা নয়, এই বিশ্বখ্যাত বিশেষজ্ঞরা সমাধানের পথও দেখিয়েছেন।
১. এনএসডিআর (NSDR – Non-Sleep Deep Rest): ডা. অ্যান্ড্রু হিউবারম্যান এই টেকনিকের কথা বলেন। এটি হলো এক ধরণের যোগনিদ্রা। দিনে মাত্র ১০-২০ মিনিট চোখ বন্ধ করে নির্দিষ্ট অডিও শুনে শরীরকে শিথিল করা। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০ মিনিটের NSDR ৩-৪ ঘণ্টা ঘুমের সমান এনার্জি ফিরিয়ে দিতে পারে। ইউটিউবে প্রচুর ফ্রি NSDR সেশন পাওয়া যায়।
২. রোদ পোহান (Morning Sunlight): ডা. ম্যাথু ওয়াকারের মতে, সকালে ঘুম থেকে ওঠার ৩০ মিনিটের মধ্যে চোখে রোদ লাগানো উচিত। এটি আমাদের ‘সার্কেডিয়ান রিদম’ বা দেহঘড়ি ঠিক করে এবং রাতে ভালো ঘুমে সাহায্য করে।
৩. ২০-২০-২০ রুল: চোখের ক্লান্তির জন্য ব্রেন ক্লান্ত হয়। তাই প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিনে তাকানোর পর, ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকুন।
৪. খাদ্যাভ্যাস বদল: চিনি এবং রিফাইনড কার্বোহাইড্রেট (ময়দা, পাউরুটি) রক্তে গ্লুকোজ স্পাইক ঘটায়, যা পরে ক্র্যাশ করে এবং ক্লান্তি আনে। এর বদলে প্রোটিন এবং ফাইবার যুক্ত খাবার খান যা দীর্ঘক্ষণ শক্তি যোগাবে।
শরীর ভালো থাকার পরেও ক্লান্তি আসলে শরীরের কোনো দোষ নয়, এটি শরীরের দেওয়া একটি সিগন্যাল বা বার্তা। শরীর আপনাকে বলছে—”কিছু একটা বদলানো দরকার।” হতে পারে সেটা ঘুমের রুটিন, হতে পারে খাদ্যাভ্যাস, অথবা মানসিক বিশ্রামের অভাব।
ডা. স্যান্ড্রা ডালটন-স্মিথের কথাটি মনে রাখবেন—”আমরা বিশ্রামকে বিলাসিতা ভাবি, কিন্তু এটি আসলে অক্সিজেনের মতোই প্রয়োজনীয়।” তাই আজ থেকেই নিজের ক্লান্তিটাকে অবহেলা না করে, তার উৎস খুঁজুন। প্রয়োজনে এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট বা স্লিপ স্পেশালিস্টের পরামর্শ নিন।
জীবনটা শুধু দৌড়ানোর জন্য নয়, মাঝে মাঝে থেমে রিচার্জ করার জন্যও।
(আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাশিফল আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল WhatsApp চ্যানেলে যোগ দিন! সবচেয়ে আগে পান জ্যোতিষ, অফবিট নিউজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনধারা ও অফবিট এক্সক্লুসিভ আপডেট —আমাদের WhatsApp Channel-এ যোগ দিন)
সাম্প্রতিক পোস্ট
- Gen Z-এর প্রেমের নতুন শব্দভান্ডার জানেন? ভালোবাসার নতুন ব্যাকরণ শিখুন | Gen Z Love Trends 2026
- ব্যস্ত সকালে এই ৫টি Tiffin Recipe রাখুন রোজের তালিকায় | Easy Tiffin Recipes
- ঠাকুর, দেবতা, ভগবান ও ঈশ্বর কি একই? গুলিয়ে ফেলার আগে জেনে নিন আসল তফাৎ | God vs Deity Meaning in Bengali
- জানুন, ব্যক্তি সুভাষের অনন্য প্রেমকাহিনী: সুভাষ ও এমিলি
- গান্ধী বনাম নেতাজি—মূল পার্থক্যটা কোথায়? | Gandhi vs Netaji

