নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গত কয়েক দিনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নামগুলির মধ্যে অন্যতম ঘাটালের সাংসদ তথা অভিনেতা দেব। একদিকে দিল্লিতে তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ সাংসদদের বৈঠকে তাঁর উপস্থিতি রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনার জন্ম দিয়েছিল। অন্যদিকে কোলাঘাটে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ডাকা প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দিয়ে তিনি আবার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেন, তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানে কোনও পরিবর্তন আসেনি।
দেবের বক্তব্য, “যতদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আছেন, ততদিন আমি তাঁর সঙ্গেই আছি।” এই এক বাক্যেই তিনি কার্যত সমস্ত জল্পনার জবাব দিতে চেয়েছেন বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ।
শুভেন্দুর ‘ব্রাদার’ সম্বোধন ও ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান
কোলাঘাটের প্রশাসনিক বৈঠকে শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি দেবকে ‘ব্রাদার’ বলে সম্বোধন করে জানান, ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেব যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা পূরণ করার দায়িত্ব তিনি নিজে নিচ্ছেন।
শুভেন্দুর কথায়, “ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের দায়িত্ব আমার। এটা আমার উপর ছেড়ে দাও।”
রাজনৈতিক সৌজন্যের বাইরে এই মন্তব্যে একটি স্পষ্ট বার্তা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান পশ্চিম মেদিনীপুরের মানুষের অন্যতম বড় দাবি। সেই প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রশ্নে দেব ও শুভেন্দুর এই প্রকাশ্য সমন্বয় উন্নয়নের রাজনীতিকেই সামনে আনছে।
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ভোটের সময় রাজনৈতিক লড়াই, বিতর্ক এবং মতপার্থক্য থাকবে। কিন্তু বছরের বাকি সময় উন্নয়নের কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়াই উচিত। এই বক্তব্যও রাজনৈতিক সংঘাতের বাইরে প্রশাসনিক সহযোগিতার ইঙ্গিত বহন করে।
দিল্লি সফর থেকে কোলাঘাট—দেব কী বার্তা দিলেন?
কয়েক দিন আগেই দিল্লিতে তৃণমূলের কিছু বিক্ষুব্ধ সাংসদদের সঙ্গে বৈঠকে দেখা গিয়েছিল দেবকে। সেই ঘটনার পর থেকেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল, দলের অন্দরে তাঁর অবস্থান কি বদলাচ্ছে?
কিন্তু কোলাঘাটে এসে দেব কার্যত সেই জল্পনায় জল ঢেলে দিয়েছেন। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দেওয়া আর রাজনৈতিক আনুগত্য—দুটি আলাদা বিষয়।
একদিকে তিনি উন্নয়নের স্বার্থে সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করতে প্রস্তুত, অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে তিনি এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বেই আস্থা রাখছেন। এই অবস্থান অনেকের কাছে ‘প্রশাসনিক বাস্তবতা’ এবং ‘রাজনৈতিক আনুগত্য’-এর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কৌশল হিসেবেই ধরা পড়ছে।
রাজনৈতিক ব্যালান্সিং নাকি পরিণত নেতৃত্ব?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেবের সাম্প্রতিক অবস্থানকে শুধুমাত্র দলীয় সমীকরণের চোখে দেখলে ভুল হবে। একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁর প্রথম দায়িত্ব নিজের এলাকার উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যদি সরকার সহযোগিতা করতে চায়, তাহলে সেই সুযোগকে কাজে লাগানোই একজন সাংসদের রাজনৈতিক দায়িত্ব। সেই কারণেই শুভেন্দুর সঙ্গে একই মঞ্চে থাকা বা প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দেওয়াকে অনেকেই বাস্তববাদী রাজনীতির অংশ হিসেবে দেখছেন।
একই সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি প্রকাশ্য আনুগত্যের বার্তা দিয়ে তিনি দলীয় কর্মী-সমর্থকদের কাছেও স্পষ্ট সংকেত দিয়েছেন যে, তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় এবং অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে।
কোন সমীকরণ উঠে আসছে?
দেবের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ থেকে আপাতত যে সমীকরণটি স্পষ্ট হচ্ছে, তা হল—উন্নয়নের প্রশ্নে সহযোগিতা, কিন্তু রাজনৈতিক অবস্থানে স্পষ্টতা।
তিনি একদিকে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে ঘাটালের উন্নয়নের পথ খুলতে চাইছেন, অন্যদিকে তৃণমূল এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি নিজের আনুগত্য নিয়েও কোনও দ্ব্যর্থতা রাখছেন না।
ফলে বর্তমানে যে বার্তাটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে উঠে আসছে, তা হল—দেব সংঘাতের রাজনীতির বদলে উন্নয়নের রাজনীতিকে অগ্রাধিকার দিতে চাইছেন। তবে এই কৌশল আগামী দিনে কতটা রাজনৈতিক সুবিধা এনে দেয়, তা অবশ্যই নির্ভর করবে রাজ্যের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর।

