নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য এবং রিপাবলিকানদের নির্বাচনী ধাক্কার মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইসরায়েল নিয়ে মন্তব্য। নির্বাচনের দিন মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানিয়েছেন, আমেরিকার মানুষ যদি কখনও তাঁকে আর না চান, তাহলে তিনি ইসরায়েলে গিয়ে সেখানকার প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। ইসরায়েলে নিজের বিপুল জনপ্রিয়তার দাবিও করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে আমেরিকার রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে আলোচনা।
কেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হতে চান ডোনাল্ড ট্রাম্প?
মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিন দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দাবি, ইসরায়েলে তাঁর জনপ্রিয়তার হার প্রায় ৯৯ শতাংশ। সেই প্রসঙ্গেই তিনি বলেন, “আমেরিকার মানুষ যদি কখনও আমাকে নিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তাহলে আমি ইসরায়েলে চলে গিয়ে সেখানকার প্রধানমন্ত্রী হয়ে যেতে পারি।”
তবে ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। সাক্ষাৎকারে নিজের জনপ্রিয়তার প্রসঙ্গ তুলেই এমন মন্তব্য করেন তিনি। ইরানের বিরুদ্ধে তাঁর প্রশাসনের সামরিক পদক্ষেপ এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তায় আমেরিকার ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ইসরায়েলকে বার্ষিক ৪০০ কোটি ডলার সাহায্য বন্ধের ঘোষণা
একই সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলকে দেওয়া মার্কিন আর্থিক সহায়তা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন ট্রাম্প। তিনি জানান, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ইসরায়েলকে দেওয়া বার্ষিক প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের সাহায্য বন্ধ করতে চান তিনি।
ট্রাম্পের দাবি, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে এই বিষয়ে তাঁর আগেই আলোচনা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, ইসরায়েল এখন অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে যথেষ্ট শক্তিশালী। ফলে আগের মতো মার্কিন আর্থিক সাহায্যের প্রয়োজন নেই।
তবে সাহায্য বন্ধের কথা বললেও ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা করেননি ট্রাম্প। প্রয়োজনে ইসরায়েলকে সহযোগিতা করা এবং অস্ত্র বিক্রি অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
উল্লেখ্য, আমেরিকা ও ইসরায়েলের মধ্যে বিদ্যমান সহায়তা চুক্তি ২০২৮ সাল পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা। ফলে ট্রাম্পের ঘোষণা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নতুন সিদ্ধান্ত ও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সেনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে, কোন কোন ক্ষেত্রে প্রভাব?
এদিকে, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রকাশিত নির্বাচনী ফলাফল অনুযায়ী, আমেরিকার কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সেনেটের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের কাছ থেকে পুনরুদ্ধার করেছে ডেমোক্র্যাটরা। প্রতিনিধি পরিষদেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে তারা।
সেনেটের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব পড়তে পারে।
প্রথমত, বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা আগের মতো থাকলেও মনোনীত ব্যক্তিদের অনুমোদনের জন্য সেনেটের সমর্থন প্রয়োজন। ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় ট্রাম্পের মনোনীত বিচারকদের নিয়োগ আটকে দেওয়া, প্রত্যাখ্যান করা অথবা অনুমোদন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
শুধু বিচারক নয়, আমেরিকার রাষ্ট্রদূত, প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী এবং বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রেও সেনেটের অনুমোদন প্রয়োজন। ফলে এসব পদে ট্রাম্পের মনোনীত ব্যক্তিদের নিয়োগের ক্ষেত্রেও বাধা তৈরি হতে পারে।
আন্তর্জাতিক চুক্তি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও প্রভাব
আমেরিকার সংবিধান অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুমোদনের ক্ষেত্রে সেনেটে উপস্থিত সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন হয়। ফলে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের কোনও আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুমোদন পাওয়া আরও কঠিন হতে পারে।
অন্যদিকে, সেনেটের গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলির নেতৃত্বও সংখ্যাগরিষ্ঠ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাবে। এর ফলে অভিবাসন নীতি, আমদানি শুল্ক, পররাষ্ট্রনীতি, সরকারি ব্যয় এবং প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে শুনানি ও তদন্তের উদ্যোগ নিতে পারবেন ডেমোক্র্যাট সদস্যরা। প্রয়োজনে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ডেকে প্রশ্ন করা এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র তলব করার ক্ষমতাও থাকবে তাঁদের।
এছাড়া আমেরিকায় সাধারণ কোনও বিল আইনে পরিণত করতে হলে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সেনেট—দুই কক্ষেই অনুমোদন প্রয়োজন। ফলে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে থাকায় ট্রাম্পের আইন প্রণয়নসংক্রান্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও নতুন বাধা তৈরি হতে পারে।
নির্বাচনের দিন কেন ইসরায়েল নিয়ে মন্তব্য ট্রাম্পের?
মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিন দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আমেরিকার অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং তাঁর প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের পক্ষে বক্তব্য রাখেন। ইসরায়েলকে দেওয়া আর্থিক সাহায্যের বিষয়টি ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
ট্রাম্প জানান, ইসরায়েলকে বার্ষিক বিপুল অর্থ সাহায্য দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা রিপাবলিকানদের সমালোচনা করছেন। সেই প্রেক্ষাপটেই তিনি সাহায্য বন্ধের সিদ্ধান্তের কথা তুলে ধরেন।
অন্যদিকে, ইসরায়েলে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মন্তব্যের মাধ্যমে নিজের আন্তর্জাতিক জনপ্রিয়তার কথাও তুলে ধরেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তবে আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলের সঙ্গে এই মন্তব্যের সরাসরি কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি না, সে বিষয়ে ট্রাম্প কোনও নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।

