Heart attack in young adults: বাইরে থেকে দেখলে একেবারে পারফেক্ট ফিটনেস। মেদহীন শরীর, নিয়ম করে জিম আর ম্যারাথন দৌড়। তবুও আচমকাই ট্রেডমিলে দৌড়াতে দৌড়াতে বা জিমে ওজন তুলতে গিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন বহু তরুণ-তরুণী। কেন এই আপাত-সুস্থ শরীরগুলো হঠাৎ করে বিকল হয়ে যাচ্ছে? চিকিৎসকরা বলছেন, ফিটনেস আর সুস্থতার মধ্যে যে বিরাট ফারাক রয়েছে, সেটাই বুঝতে ভুল করছি আমরা। জানুন বিস্তারিত।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: রোহন (নাম পরিবর্তিত), বয়স মাত্র ২৮ বছর। একটি বহুজাতিক কর্পোরেট সংস্থায় উচ্চপদে কর্মরত। রোহনের দিন শুরু হয় সকাল ৫টায়। প্রোটিন শেক খেয়ে সোজা জিম। সেখানে প্রায় দেড় ঘণ্টা ভারী ওয়ার্কআউট, তারপর অফিস। রাত ৯টা পর্যন্ত ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ। উইকেন্ডে আবার বন্ধুদের সঙ্গে ১০ কিলোমিটার ম্যারাথন দৌড়। সোশ্যাল মিডিয়ায় রোহনের সিক্স-প্যাক অ্যাবসের ছবিতে লাইকের বন্যা বয়ে যায়। রোহনের মতো ‘ফিটনেস ফ্রিক’ বা স্বাস্থ্যসচেতন ছেলে আজকের দিনে সত্যিই বিরল। কিন্তু গত সপ্তাহে জিমে ট্রেডমিলে দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎই বুকে হাত দিয়ে লুটিয়ে পড়ল রোহন। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই সব শেষ। কারণ? সাডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বা হার্ট অ্যাটাক।
গল্পটা শুধু রোহনের নয়। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমাদের চারপাশে এমন অজস্র ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে। বছরের পর বছর ধরে আমাদের শেখানো হয়েছে যে, হার্ট অ্যাটাক বা হৃদরোগ মানেই তা বয়স্কদের রোগ। যার ওজন বেশি, যিনি ধূমপান করেন, তেল-মশলাযুক্ত খাবার খান বা কায়িক পরিশ্রম একেবারেই করেন না—হার্ট অ্যাটাক শুধু তাঁরই হতে পারে। কিন্তু বাস্তব চিত্রটা এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং রীতিমতো উদ্বেগজনক। ক্রমশ এমন সব তরুণ-তরুণী হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন, যাঁরা দেখতে অত্যন্ত ফিট, যাঁরা নিয়মিত জিমে যান এবং যাঁদের জীবনযাত্রা আপাতদৃষ্টিতে একেবারে ‘স্বাস্থ্যকর’।
NewsOffBeat-এর আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা খুঁজব সেই নীরব ঘাতককে (Heart attack in young adults), যা আমাদের অজান্তেই বাসা বাঁধছে তরুণ প্রজন্মের শরীরে। কেন এই আপাত-সুস্থ শরীরের ভেতরে ধুঁকছে আমাদের হৃদপিণ্ড?
ফিটনেস বনাম অভ্যন্তরীণ সুস্থতা: মরীচিকার মায়াজাল
চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, ‘ফিট’ থাকা এবং ‘সুস্থ’ থাকা—এই দুটি বিষয়ের মধ্যে আকাশপাতাল তফাত রয়েছে। পেশিবহুল শরীর বা শরীরে মেদের পরিমাণ (Low Body Fat) কম থাকা মানেই যে আপনার হার্ট একশো শতাংশ সুস্থ, এমন কোনো গ্যারান্টি নেই।
এ বিষয়ে NewsOffBeat-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে কার্ডিওলজিস্ট ডা. সুরজিৎ সাঁতরা জানান, “আজকের তরুণ প্রজন্মের সবচেয়ে বড় ভুল হলো, তারা আয়নার সামনের শরীরটাকে সুস্থতার একমাত্র মাপকাঠি বলে মনে করছে। আপনি জিমে গিয়ে বাইসেপ বা ট্রাইসেপ তৈরি করছেন, কিন্তু আপনার শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পেশি, অর্থাৎ আপনার হৃদপিণ্ড (Heart Muscle) কেমন আছে, তার কোনো খবর রাখছেন না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম হৃদপিণ্ডের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে। অনেকের ক্ষেত্রেই বংশগত বা জেনেটিক কারণে কোলেস্টেরল বা ধমনীতে প্লাক (Plaque) জমার প্রবণতা থাকে, যা বাইরে থেকে বোঝা অসম্ভব। বাইরে থেকে দেখতে একজন মানুষকে অত্যন্ত ফিট মনে হলেও, হয়তো তাঁর রক্তনালীতে সাইলেন্ট হার্ট ডিজিজ বাসা বেঁধেছে। আর সেই না-জানা অবস্থায় যখনই তিনি জিমে গিয়ে নিজের ক্ষমতার অতিরিক্ত ওজন তুলছেন, তখনই হৃদপিণ্ড সেই চাপ নিতে না পেরে বিকল হয়ে যাচ্ছে।”
স্ট্রেস: একুশ শতকের সবচেয়ে বড় নীরব ঘাতক
তরুণদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হলো ‘স্ট্রেস’ বা মানসিক চাপ। আধুনিক জীবনযাত্রায় আমাদের ব্রেন এবং শরীর কখনো বিশ্রাম পায় না। অফিসে ১২ ঘণ্টা কাজ, ক্রমাগত স্ক্রিন টাইম, সোশ্যাল মিডিয়ার প্রবল মানসিক চাপ, অ্যাংজাইটি এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার লড়াই—সব মিলিয়ে একটা চরম ‘বার্নআউট’ (Burnout) অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে।
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ বা ক্রনিক স্ট্রেসের কারণে আমাদের শরীরে ক্রমাগত কর্টিসোল (Cortisol) এবং অ্যাড্রেনালিনের মতো হরমোন ক্ষরিত হয়। এর ফলে শরীর সবসময় একটি ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ (Fight or Flight) মোডে থাকে, যা ধমনীতে প্রদাহ বা ইনফ্ল্যামেশন তৈরি করে। রক্তচাপ বেড়ে যায় এবং ধীরে ধীরে কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেমে স্থায়ী ক্ষতি হয়। অনেক তরুণই হয়তো নিয়ম করে জিম করছেন, কিন্তু রাতে মাত্র চার ঘণ্টা ঘুমাচ্ছেন এবং ক্লান্তি কাটাতে মাত্রাতিরিক্ত ক্যাফেইন বা কফির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। এই মারাত্মক রুটিন হার্টের জন্য একপ্রকার টাইম বোমা!
‘উইকেন্ড ওয়ারিয়র‘ সিনড্রোম এবং অতিরিক্ত ওয়ার্কআউট
চিকিৎসকরা একটি নতুন শব্দবন্ধ ব্যবহার করছেন— ‘উইকেন্ড ওয়ারিয়র’ (Weekend Warrior)। এর মানে হলো, সারা সপ্তাহ ধরে ডেস্কে বসে কাজ করা এবং কোনো রকম শারীরিক পরিশ্রম না করা। এরপর শনি বা রবিবার হঠাৎ করে জিমে গিয়ে বা মাঠে নেমে শরীরের ওপর মাত্রাতিরিক্ত অত্যাচার করা।
সারা সপ্তাহ আপনার হার্ট একটি রিল্যাক্সড বা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় অভ্যস্ত থাকার পর, ছুটির দিনে যখন আপনি হঠাৎ করে তাকে প্রচণ্ড চাপে ফেলেন, তখন হার্ট সেই আকস্মিক লোড নিতে পারে না। সঠিক রিকভারি, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং হাইড্রেশন ছাড়া এই ধরনের চরম ওয়ার্কআউট হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
ডায়েট ট্রেন্ড ও সাপ্লিমেন্টের বিপজ্জনক প্রভাব
বর্তমান প্রজন্মের লাইফস্টাইল এবং খাদ্যাভ্যাস নিয়ে NewsOffBeat-এর প্রতিনিধি কথা বলেছিলেন বিশিষ্ট ডায়েট ও লাইফস্টাইল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. অনন্যা রায়ের সঙ্গে। তিনি এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকের ওপর আলোকপাত করেছেন।
ডা. রায় জানান, “সোশ্যাল মিডিয়া দেখে সিক্স-প্যাক বানানোর এক অদ্ভুত ইঁদুর দৌড়ে নেমেছে আজকের প্রজন্ম। এর জন্য মাত্রাতিরিক্ত হাই-প্রোটিন ডায়েট, ক্রিয়েটিন, প্রি-ওয়ার্কআউট সাপ্লিমেন্ট এবং এনার্জি ড্রিংকের ওপর যথেচ্ছভাবে নির্ভর করছে তারা। অনেকেই না বুঝে এমন সব সাপ্লিমেন্ট নিচ্ছেন, যা হার্ট রেট বা পালস রেটকে অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়। এর পাশাপাশি রয়েছে ডিহাইড্রেশন বা শরীরে জলের ঘাটতি। আবার অনেকে সামাজিকভাবে ‘কুল‘ সাজার জন্য ‘সোশ্যাল ভেপিং‘ (Social Vaping) বা ই-সিগারেট টানছেন। মনে রাখবেন, সাধারণ সিগারেটের মতোই ভেপিং রক্তনালীকে সংকুচিত করে এবং রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়ায়। বাইরে থেকে সুশৃঙ্খল দেখালেও, এই ধরনের খাদ্যাভ্যাস এবং নেশা হার্টের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করে চলেছে।”
সাম্প্রতিক গবেষণার চাঞ্চল্যকর তথ্য (২০২৫-২০২৬ প্রেক্ষিত)
এই বিষয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে একাধিক গবেষণা হয়েছে। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন (AHA) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক কার্ডিওলজি ফোরামের একটি সাম্প্রতিক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ৪০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে ‘সাডেন কার্ডিয়াক ডেথ’-এর (Sudden Cardiac Death) হার গত এক দশকে উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই গবেষণায় স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, তরুণদের মৃত্যুর মূল কারণ বয়সজনিত হৃদরোগ নয়, বরং ‘সাইলেন্ট আর্টারিয়াল ইনফ্ল্যামেশন’ (Silent Arterial Inflammation) এবং ‘অ্যারিথমিয়া’ (Arrhythmia) বা অনিয়মিত হৃদস্পন্দন। গবেষকরা দেখিয়েছেন, অত্যাধিক জিম এবং কম ঘুমের কারণে তরুণদের ধমনীতে এক ধরনের মাইক্রো-টিয়ার বা সূক্ষ্ম ক্ষত তৈরি হচ্ছে, যা থেকে হঠাৎ রক্ত জমাট (Blood Clot) বেঁধে এই ধরনের প্রাণঘাতী হার্ট অ্যাটাক ঘটছে।
বয়স কোনো রক্ষাকবচ নয়: অবহেলা করছেন যে লক্ষণগুলো
আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো— “আমার বয়স তো মাত্র ২৫ বা ৩০, আমার আবার হার্টের রোগ হবে কেন!” এই ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে তরুণরা কখনোই নিজেদের প্রিভেন্টিভ হেলথ চেকআপ বা প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান না।
অনেক ক্ষেত্রেই সাডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের আগে শরীর কিছু সূক্ষ্ম সংকেত দেয়, যা আমরা স্রেফ ‘ক্লান্তি’ বা ‘গ্যাসের ব্যথা’ বলে এড়িয়ে যাই। জিমে ওয়ার্কআউট করার সময় হঠাৎ করে প্রচণ্ড ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, বুকে হালকা চাপ অনুভব করা, শ্বাসকষ্ট, চোয়ালে বা বাঁ হাতে ব্যথা, এবং বুক ধড়ফড় করা—এই লক্ষণগুলো কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়।
কার্ডিওলজিস্টদের মতে, আপনার বয়স যদি ২০ বা ৩০-এর কোঠায় হয় এবং আপনার পরিবারে যদি হৃদরোগের ইতিহাস (Family History) থাকে, তবে বছরে অন্তত একবার রুটিন চেকআপ করানো বাধ্যতামূলক। রক্তচাপ মাপা, লিপিড প্রোফাইল (কোলেস্টেরল), ফাস্টিং ব্লাড সুগার, ইসিজি (ECG) এবং ইকোকার্ডিওগ্রাম (Echocardiogram)-এর মতো সাধারণ পরীক্ষাগুলো অনেক বড় বিপদ থেকে আপনাকে বাঁচাতে পারে।
সমাধানের পথ: চাই সঠিক ভারসাম্য
তরুণদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের এই ক্রমবর্ধমান হার দেখে ঘাবড়ে গিয়ে জিম বা ব্যায়াম ছেড়ে দেওয়াটা কিন্তু কোনো সমাধান নয়। চিকিৎসকরা বারবার বলছেন, শরীরচর্চা বা ব্যায়াম হার্টের জন্য পৃথিবীর অন্যতম সেরা ওষুধ। সমস্যা ব্যায়ামে নয়, সমস্যা হলো আমাদের ‘ব্যালান্স’ বা ভারসাম্যহীনতায়।
সুস্থতা মানে শুধু সিক্স-প্যাক অ্যাবস বা স্টেপ কাউন্ট নয়। সত্যিকারের সুস্থতার জন্য প্রয়োজন সঠিক বিশ্রাম, দিনে ৭-৮ ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, মানসিক শান্তি এবং নিজের শরীরের ভেতরের অবস্থা সম্পর্কে সচেতনতা। অন্যের শরীর দেখে অনুপ্রাণিত হওয়া ভালো, কিন্তু নিজের শরীরের সক্ষমতা না বুঝে অন্যের রুটিন অন্ধভাবে অনুকরণ করাটা বোকামি।
আপনার শরীর একটি যন্ত্রের মতো। তাকে যেমন চালাতে হবে, তেমনই তাকে বিশ্রামও দিতে হবে। মনে রাখবেন, যে মানুষটিকে বাইরে থেকে ঘরের সবচেয়ে স্বাস্থ্যবান ব্যক্তি বলে মনে হচ্ছে, হয়তো তিনিই নিজের শরীরের সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তাটি এড়িয়ে যাচ্ছেন। তাই শরীরের ভাষা বুঝতে শিখুন। সুস্থ থাকুন, সুন্দর থাকুন, কিন্তু অবশ্যই সচেতনভাবে।
আপনার প্রতিদিনের রুটিনে আপনি নিজের হার্টের যত্ন নিতে কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন? আপনার মতামত আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া পেজে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না। এই বিষয়ে আরও জানতে এবং স্বাস্থ্য সংক্রান্ত এমন গুরুত্বপূর্ণ অফবিট খবর পেতে চোখ রাখুন NewsOffBeat-এ। আমাদের লেখা ভালো লাগলে আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া পেজগুলো ফলো করুন।
Most Viewed Posts
- ‘মায়া ভরা রাতি’ আবার ফিরছে—অরিজিৎ সিং-এর কণ্ঠে নতুন করে জেগে উঠবে এক চিরন্তন গান
- ২০২৬-এ মেষ রাশির জন্য আসছে বড় মোড় │ Aries Horoscope 2026 Full Prediction
- পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে তরুণ তুর্কিদের ঝড়! ভোটের ময়দানে কতটা প্রভাব ফেলছে যুব মুখ?
- বাড়িতে রাখুন এই নয় গাছ, সৌভাগ্য ফিরবেই
- বিতর্ক পিছু ছাড়েনি, মামলা মাথায় নিয়েই ভোটের ময়দানে! তৃণমূল-বিজেপির হেভিওয়েটদের ভোটযুদ্ধ ঘিরে উত্তাপ

