এই প্রতিবেদনে যা যা রয়েছে
নিউজ অফবিট হেলথ ডেস্ক: শীতকাল মানেই বিয়ের মরশুম। সানাইয়ের সুর, নতুন সংসার আর রোমান্টিক হানিমুন। কিন্তু এই আনন্দের মুহূর্তেই অনেক নববধূর জীবনে নেমে আসে এক অনাকাঙ্ক্ষিত যন্ত্রণা—প্রস্রাবে তীব্র জ্বালা, তলপেটে ব্যথা এবং ঘন ঘন বাথরুমে যাওয়ার বেগ। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘হানিমুন সিসটাইটিস’ (Honeymoon Cystitis)।
অনেকেই লজ্জায় বিষয়টি লুকিয়ে রাখেন বা সাধারণ সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, নতুন বিয়ের পর প্রায় ৬০ শতাংশ মহিলাই এই সমস্যায় ভোগেন। বিশেষ করে UTI in Honeymoon বা হানিমুনের সময় ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন দাম্পত্যের শুরুতেই বড় শারীরিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু কেন হয় এই রোগ? নবদম্পতিরা অজান্তে এমন কোন ভুলটি করেন যার ফলে এই ইনফেকশন বাসা বাঁধে? আজকের প্রতিবেদনে রইল বিস্তারিত তথ্য ও বাঁচার উপায়।
হানিমুন সিসটাইটিস আসলে কী? (What is Honeymoon Cystitis?)
সহজ কথায়, এটি এক ধরনের ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (UTI) যা মূলত ঘন ঘন যৌন মিলন বা ইন্টারকোর্স-এর কারণে হয়। যেহেতু বিয়ের পর বা হানিমুনে থাকাকালীন দম্পতিদের মধ্যে শারীরিক মিলনের ফ্রিকোয়েন্সি বাড়ে, তাই এই সময়ের ইনফেকশনকে ডাক্তাররা প্রচলিত ভাষায় ‘হানিমুন সিসটাইটিস’ বলেন।
আমেরিকার বিখ্যাত Mayo Clinic-এর তথ্য অনুযায়ী, এটি কোনও ছোঁয়াচে রোগ বা যৌন রোগ (STD) নয়। এটি মূলত ব্যাকটেরিয়া ঘটিত সংক্রমণ যা মূত্রথলি বা ব্লাডারে প্রদাহ সৃষ্টি করে।
কেন হয় এই ইনফেকশন? বিজ্ঞান কী বলছে? (Scientific Causes of UTI in Honeymoon)
মহিলাদের শরীরবৃত্তীয় গঠন বা অ্যানাটমিই এর প্রধান কারণ। পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের মূত্রনালী (Urethra) অনেক ছোট হয় (মাত্র ৪ সেমি)। এবং এটি মলদ্বারের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে।
১. ঘর্ষণ বা ফ্রিকশন: নতুন বিয়ের পর ঘন ঘন মিলনের ফলে মূত্রনালীতে ঘর্ষণ লাগে। এর ফলে মলদ্বার বা যৌনাঙ্গ থেকে ‘ই. কোলাই’ (E. coli) নামক ব্যাকটেরিয়া খুব সহজেই মূত্রনালীতে প্রবেশ করে এবং সেখান থেকে ব্লাডারে পৌঁছে যায়। ২. নতুন পার্টনার: অনেক সময় নতুন পার্টনারের শরীরের ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে ইমিউন সিস্টেম পরিচিত হতে সময় নেয়, যা UTI in Honeymoon-এর ঝুঁকি বাড়ায়। ৩. জল কম খাওয়া: হানিমুনে ঘুরে বেড়ানোর নেশায় অনেকেই জল কম খান, যা ব্যাকটেরিয়াকে শরীরে বাসা বাঁধতে সাহায্য করে।
গবেষণা বলছে, “চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা (Scientific Research) বলছে, হানিমুন সিসটাইটিস বা মিলনের পর ইউটিআই-এর সঙ্গে যৌন সক্রিয়তার সরাসরি যোগ রয়েছে। বিখ্যাত New England Journal of Medicine (NEJM)-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, তরুণীদের মধ্যে ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশনের অন্যতম প্রধান কারণ হলো সাম্প্রতিক যৌন মিলন। ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির গবেষক ড. টমাস হুটন (Dr. Thomas Hooton) তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, মিলনের ফ্রিকোয়েন্সি বা সংখ্যা বাড়লে UTI in Honeymoon-এর ঝুঁকিও সমানুপাতিক হারে বাড়ে। মূলত ৭৮% থেকে ৮০% ক্ষেত্রে ‘ই. কোলাই’ (E. coli) ব্যাকটেরিয়াই এর জন্য দায়ী যা মিলনের সময় মূত্রনালীতে প্রবেশ করে।”
উপসর্গ: বুঝবেন কীভাবে আপনি আক্রান্ত? (Symptoms to Watch Out For)
হানিমুন বা নতুন সংসার শুরুর কয়েকদিনের মধ্যে যদি নিচের লক্ষণগুলো দেখা দেয়, তবে সতর্ক হন:
- প্রস্রাব করার সময় তীব্র জ্বালা বা ‘বার্নিং সেনসেশন’।
- প্রস্রাব করার পরেও মনে হওয়া যে ব্লাডার খালি হয়নি।
- ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ আসা কিন্তু পরিমাণে খুব কম হওয়া।
- তলপেটে (Pelvic area) এবং কোমরে ভোঁতা ব্যথা।
- প্রস্রাবের রঙ ঘোলাটে হওয়া বা দুর্গন্ধ থাকা।
- বেশি বাড়াবাড়ি হলে হালকা জ্বর বা প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত দেখা দেওয়া।
নবদম্পতিরা যে ভুলগুলো করবেন না: বাঁচার ৫টি উপায় (Prevention Tips)
গাইনোকোলজিস্ট এবং ইউরোলজিস্টদের মতে, সামান্য কিছু সতর্কতা মানলেই UTI in Honeymoon বা হানিমুন সিসটাইটিস আটকানো সম্ভব। আনন্দ মাটি যাতে না হয়, তার জন্য মেনে চলুন এই ৫টি গোল্ডেন রুল:
১. মিলনের পরেই ওয়াশরুমে যান (The Golden Rule): এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শারীরিক মিলনের ঠিক পরেই (১৫ মিনিটের মধ্যে) প্রস্রাব করার অভ্যাস করুন। এতে মূত্রনালীতে ঢুকে পড়া ব্যাকটেরিয়া প্রস্রাবের তোড়ে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। এটি UTI in Honeymoon আটকানোর এক নম্বর উপায়।
২. হাইড্রেটেড থাকুন: হানিমুনে ঘুরতে গিয়ে জল খাওয়া কমাবেন না। দিনে অন্তত ৩-৪ লিটার জল খান। যত বেশি প্রস্রাব হবে, শরীর থেকে টক্সিন এবং ব্যাকটেরিয়া তত দ্রুত বেরিয়ে যাবে। ক্র্যানবেরি জুস (Cranberry Juice) খাওয়াও ব্লাডার সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
৩. লুব্রিকেশন ব্যবহার করুন: নতুন বিয়ের পর অনেক সময় ভ্যাজাইনাল ড্রাইনেসের সমস্যা থাকে। সেক্ষেত্রে জোর করে মিলন করলে ক্ষত তৈরি হতে পারে যা ইনফেকশন ডেকে আনে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ওয়াটার বেসড লুব্রিকেন্ট ব্যবহার করুন।
৪. পরিচ্ছন্নতা বা হাইজিন: বাথরুম ব্যবহারের সময় সর্বদা সামনে থেকে পেছনে (Front to Back) মোছার অভ্যাস করুন। উল্টোটা করলে মলদ্বারের ব্যাকটেরিয়া সামনে চলে আসে।
৫. বার্থ কন্ট্রোল পিল সম্পর্কে সতর্ক হন: কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, স্পার্মিসাইডাল জেলি বা কন্ডোম ব্যবহারের ফলে অনেকের ইরিটেশন হয়। যা থেকে ইনফেকশন ছড়াতে পারে।
আরও পড়ুন : বেডরুমে ৫টি পরিবর্তন আপনার সম্পর্কে উষ্ণতা ফিরিয়ে আনবে
কখন ডাক্তার দেখাবেন? (When to see a Doctor?)
ঘরোয়া টোটকার ভরসায় থাকবেন না। যদি প্রচুর জল খাওয়ার পরেও ২৪ ঘণ্টায় জ্বালা না কমে, বা পিঠে ব্যথা ও জ্বর আসে, তবে অবিলম্বে ডাক্তারের পরামর্শ নিন। সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক কোর্সেই এই রোগ সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যায়।
(লজ্জা বা কুণ্ঠাবোধ করে রোগ পুষে রাখবেন না। Honeymoon Cystitis বা UTI in Honeymoon খুবই সাধারণ একটি সমস্যা, যা সঠিক সময়ে চিকিৎসা করলে দ্রুত সেরে যায়। আপনার সঙ্গীকে বিষয়টি জানান এবং হানিমুনে যাওয়ার আগে এই টিপসগুলো মাথায় রাখুন। সুস্থ থাকুন, দাম্পত্য সুখের হোক।)
১. হানিমুন সিসটাইটিস কি কোনো ছোঁয়াচে বা যৌন রোগ (STD)?
না, একদমই নয়। Honeymoon Cystitis কোনো ছোঁয়াচে রোগ বা Sexually Transmitted Disease (STD) নয়। এটি মূলত ব্যাকটেরিয়া ঘটিত সংক্রমণ, যা মিলনের সময় ঘর্ষণের ফলে মূত্রনালীতে প্রবেশ করে। তাই এটি নিয়ে অযথা আতঙ্কিত বা লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই।
২. এই ইনফেকশন হলে কি অ্যান্টিবায়োটিক খেতেই হবে?
প্রচুর জল খেলে অনেক সময় প্রাথমিক অবস্থায় এটি সেরে যায়। কিন্তু যদি প্রস্রাবে জ্বালা বা তলপেটে ব্যথা তীব্র হয়, তবে ডাক্তার দেখিয়ে Antibiotics নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। অবহেলা করলে ইনফেকশন কিডনি পর্যন্ত (Kidney Infection) ছড়িয়ে পড়তে পারে।
৩. হানিমুন সিসটাইটিস কি গর্ভধারণে কোনো সমস্যা তৈরি করে?
না। এটি ব্লাডারের ইনফেকশন, এর সাথে জরায়ু বা প্রজনন ক্ষমতার কোনো সম্পর্ক নেই। এটি আপনার Fertility বা গর্ভধারণের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না। তবে গর্ভাবস্থায় UTI হলে দ্রুত চিকিৎসা করানো জরুরি।
৪. স্ত্রীর থেকে কি স্বামীরও এই ইনফেকশন হতে পারে?
না। আগেই বলা হয়েছে, হানিমুন সিসটাইটিস কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয় (Not Contagious)। এটি স্ত্রীর নিজস্ব শারীরিক গঠনগত কারণে (ছোট মূত্রনালী) হয়। তাই স্ত্রীর থেকে স্বামীর শরীরে এই ব্যাকটেরিয়া বা ইনফেকশন ছড়ানোর কোনো ভয় নেই। তবে স্বামীকেও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বা হাইজিন মেনে চলতে হবে।
৫. এই সময় কন্ডোম ব্যবহার করা কি নিরাপদ?
ইনফেকশন বা ব্যথা থাকাকালীন যৌন মিলন (Sexual Intercourse) পুরোপুরি বন্ধ রাখা উচিত যতক্ষণ না এটি সারে। আর সুস্থ অবস্থায় প্রতিরোধের জন্য কন্ডোম ব্যবহার করতেই পারেন, তবে খেয়াল রাখবেন সেটি যেন লুব্রিকেটেড (Lubricated) হয়। শুকনো বা ‘স্পার্মিসাইডাল’ কন্ডোম (Spermicidal Condoms) অনেক সময় ঘর্ষণ ও ইরিটেশন বাড়িয়ে দেয়, যা উল্টে ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
Most Viewed Posts
- ২০২৬-এ মেষ রাশির জন্য আসছে বড় মোড় │ Aries Horoscope 2026 Full Prediction
- মোটা হবেন না, মিষ্টি খান নিশ্চিন্তে │ Guilt-Free Sweets for Diwali Delight
- Dharmendra death: ধর্মেন্দ্রর জীবনের এই ১১টি তথ্য অনেকেই জানেন না │ 11 Untold Facts About Dharmendra
- বাড়িতে রাখুন এই নয় গাছ, সৌভাগ্য ফিরবেই
- জানেন কি নবরাত্রির চতুর্থ দিনে মা কুষ্মাণ্ডা পূজা কেন বিশেষ? ︱Why Ma Kushmanda Puja on Navratri Day 4 is Special?

