How animals detect natural disasters early: প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসার আগেই প্রাণীরা অস্বাভাবিক আচরণ করে কেন? ইনফ্রাসাউন্ড, মাটির কম্পন, বায়ুচাপ ও সংবেদনশীল ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তারা কীভাবে আগাম বিপদের সংকেত পায়, তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: হঠাৎ করে আকাশ কালো হয়ে এলো, তারপর শুরু হলো প্রবল ঝড়-বৃষ্টি—বা কোনো এক অজানা মুহূর্তে মাটি কেঁপে উঠল ভূমিকম্পে। এমন পরিস্থিতিতে মা-ঠাকুমাদের মুখে আমরা অনেকেই ছোটবেলা থেকে একটি কথা শুনে বড় হয়েছি—“দুর্যোগ আসার আগে নাকি পশুপাখিরা টের পায়!” কুকুরের হঠাৎ অস্বাভাবিক চিৎকার, পাখিদের অস্থির ডানা ঝাপটানো বা কাকের অস্বাভাবিক ডাক—এসব কি শুধুই কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো গভীর সত্য?
এই বিশ্বাস শুধু লোককথা নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা অভিজ্ঞতার ফসল। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এগুলো কি নিছক কুসংস্কার, নাকি এর পেছনে রয়েছে বাস্তব বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা? সত্যিই কি প্রাণীরা মানুষের আগে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আভাস পায়, নাকি তাদের তীক্ষ্ণ ইন্দ্রিয় আমাদের চোখে “অলৌকিক” বলে মনে হয়?
আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা খুঁজে দেখব সেই চেনা ধারণার আসল সত্যতা—বিজ্ঞান কী বলছে, বাস্তব উদাহরণ কী প্রমাণ দিচ্ছে, আর আমাদের চারপাশের এই নীরব প্রাণীরা আদৌ কতটা আগাম বার্তা বহন করতে পারে।
আসল রহস্যটা কোথায়? (How animals detect natural disasters early)
আসলে এই কথাটার ভিতরে কিন্তু একেবারেই ভিত্তিহীন কিছু নেই। একথা অনেকাংশেই সত্য যে পশুপাখিরা প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম আভাস পেতে পারে। তবে এটি কোনো অলৌকিক “ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়”-এর কারণে নয়, বরং তাদের অত্যন্ত সংবেদনশীল ইন্দ্রিয়শক্তির ফল।
উদাহরণ হিসেবে যদি আমরা ইতিহাসে ফিরে দেখি, ২০০৪ সালের ভারত মহাসাগরের ভয়াবহ সুনামির আগে শ্রীলঙ্কার একটি ন্যাশনাল পার্কে দেখা গিয়েছিল, হাতি, ফ্লেমিঙ্গো এবং অন্যান্য প্রাণীরা দল বেঁধে হঠাৎ করেই উঁচু জায়গার দিকে চলে যাচ্ছে। সেই সময় মানুষ এই বিপদের আভাস বুঝতে পারেনি, যার ফলে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। আবার ২০১১ সালে চীনে বড় ভূমিকম্পের আগে হাজার হাজার ব্যাঙ হঠাৎ করে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছিল—যা সাধারণত তাদের স্বাভাবিক আচরণ নয়। তুরস্কের সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের আগেও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া কিছু ভিডিওতে দেখা গেছে, পাখিদের আচরণ ছিল অস্বাভাবিকভাবে অস্থির ও বিচলিত।
বিজ্ঞান বলছে, এখানে কোনো আলাদা “ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়” কাজ করে না। বরং আমাদের যে পাঁচটি ইন্দ্রিয়—শ্রবণ, ঘ্রাণ, স্পর্শ, দৃষ্টি এবং স্বাদ—প্রাণীদের ক্ষেত্রে সেই ইন্দ্রিয়গুলিই অনেক বেশি তীক্ষ্ণ ও সংবেদনশীল। লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তনের মাধ্যমে তারা পরিবেশের ক্ষুদ্রতম পরিবর্তনও অনুভব করার ক্ষমতা অর্জন করেছে।
উদাহরণস্বরূপ, ভূমিকম্পের আগে মাটির ভেতরে যে সূক্ষ্ম কম্পন বা শব্দ তৈরি হয়, তা মানুষের কানে ধরা পড়ে না, কিন্তু অনেক প্রাণী তা অনুভব করতে পারে। আবার বাতাসের চাপ, আর্দ্রতা বা বৈদ্যুতিক পরিবর্তনের মতো সূক্ষ্ম পার্থক্যও তারা দ্রুত টের পায়। কারণ তাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
অর্থাৎ, এই ক্ষমতা কোনো অলৌকিক শক্তি নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে দীর্ঘদিনের সহাবস্থানের ফল। প্রকৃতি যেন তাদের এই বাড়তি সংবেদনশীলতাকে একটি বিশেষ “উপহার” হিসেবে দিয়েছে—যার মাধ্যমে তারা নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে পারে।
তাই বলা যায়, মা-ঠাকুমাদের সেই বহু পুরনো কথার ভিতরে লুকিয়ে আছে বাস্তব বৈজ্ঞানিক সত্য—যা আজও আমাদের অবাক করে এবং ভাবায়।
প্রাণীদের ইন্দ্রিয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ কীভাবে অনুভব করে? (How animals detect natural disasters early)
মানুষ প্রযুক্তির সাহায্যে ভূমিকম্প, সাইক্লোন বা ঝড়ের পূর্বাভাস পাওয়ার চেষ্টা করে—কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, অনেক প্রাণী এই সংকেতগুলো অনেক আগেই অনুভব করতে পারে! ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগে পশুপাখির আচরণ অস্বাভাবিক হয়ে যায়—কুকুর হাউমাউ করে, পাখিরা হঠাৎ উড়ে যায়, হাতির দল উঁচু জায়গায় চলে যায়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর পেছনে আছে তাদের বিশেষ সংবেদন ক্ষমতা—যেমন ইনফ্রাসাউন্ড, ভূকম্পন তরঙ্গ (P-wave), বায়ুচাপ পরিবর্তন, চৌম্বক ক্ষেত্র ইত্যাদি।
হাতির পায়ের তলায় এবং শরীরের সংবেদনশীল অংশে এমন ক্ষমতা থাকে, যার মাধ্যমে তারা ইনফ্রাসাউন্ড (Infrasound) অনুভব করতে পারে। ইনফ্রাসাউন্ড হলো এমন এক ধরনের শব্দ তরঙ্গ যার ফ্রিকোয়েন্সি এত কম যে মানুষ তা শুনতে পারে না।
ঝড়, সুনামি বা বড় ভূমিকম্পের আগে পৃথিবীতে বিশাল শক্তির পরিবর্তন ঘটে, যা এই ইনফ্রাসাউন্ড তৈরি করে। এই তরঙ্গ মাটির মাধ্যমে বা বাতাসের মাধ্যমে অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। হাতিরা তাদের পায়ের তলা দিয়ে এই কম্পন অনুভব করে এবং তা স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়। ফলস্বরূপ, হাতিরা অনেক আগেই বুঝতে পারে—কিছু একটা অস্বাভাবিক ঘটতে চলেছে। তাই দেখা যায়, সুনামির আগে হাতির দল উঁচু জায়গায় উঠে যায় বা হঠাৎ স্থান পরিবর্তন করে।
ভূমিকম্পের আগে প্রথম যে তরঙ্গটি তৈরি হয়, সেটি হলো Primary wave বা P-wave। এই তরঙ্গ খুব দ্রুতগতিতে চলে এবং মূল কম্পনের আগেই পৌঁছে যায়। কুকুরদের শ্রবণশক্তি ও কম্পন অনুভব করার ক্ষমতা অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। তারা এই P-wave-এর সূক্ষ্ম কম্পন অনুভব করতে পারে, যা মানুষ সাধারণত বুঝতে পারে না। এই কারণে ভূমিকম্পের কয়েক সেকেন্ড বা মিনিট আগেই কুকুরদের অস্বাভাবিক আচরণ দেখা যায়—যেমন চিৎকার করা, অস্থির হয়ে ওঠা বা পালানোর চেষ্টা।
এটা শুধু কুকুর নয়, অনেক গৃহপালিত প্রাণীর মধ্যেই দেখা যায়—তারা হঠাৎ করে অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে। পাখিদের শরীরে এমন সংবেদনশীলতা রয়েছে, যা দিয়ে তারা বায়ুচাপের (Air Pressure) পরিবর্তন খুব দ্রুত বুঝতে পারে।
ঝড় বা ঘূর্ণিঝড় আসার আগে বায়ুমণ্ডলের চাপ হঠাৎ করে কমে যায়। এই পরিবর্তন পাখিরা সহজেই টের পায়। তাই ঝড়ের আগেই অনেক পাখি হঠাৎ করে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। এছাড়াও, তারা বাতাসের দিক ও গতি পরিবর্তনও দ্রুত বুঝতে পারে। এজন্যই আমরা প্রায়ই দেখি—ঝড়ের আগে আকাশ হঠাৎ ফাঁকা হয়ে যায়।
গরু ও ঘোড়ার ক্ষেত্রেও ইনফ্রাসাউন্ড অনুভব করার ক্ষমতা রয়েছে। তারা মাটির কম্পন এবং বাতাসের সূক্ষ্ম পরিবর্তন বুঝতে পারে। এর পাশাপাশি, বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে এদের শরীরে এক ধরনের ম্যাগনেটিক সেন্স (Magnetic Sense) বা চৌম্বক অনুভূতি থাকে। পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের পরিবর্তন হলে তারা অস্বাভাবিক আচরণ করে।
ভূমিকম্প বা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের আগে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে—এবং এই পরিবর্তন গরু ও ঘোড়া আগে থেকেই টের পায়। তারা হঠাৎ করে অস্থির হয়ে ওঠে, দৌড়াতে থাকে বা দল বেঁধে এক জায়গায় জড়ো হয়।
পিঁপড়েরা সবসময় মাটির সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত থাকে। তাই তারা মাটির চাপ, আর্দ্রতা এবং রাসায়নিক পরিবর্তন খুব দ্রুত বুঝতে পারে। ভূমিকম্পের আগে মাটির ভেতরে গ্যাসের চাপ বা আর্দ্রতার পরিবর্তন ঘটে। পিঁপড়েরা এই পরিবর্তন টের পেয়ে তাদের বাসা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে শুরু করে। অনেক সময় দেখা গেছে, দুর্যোগের আগে পিঁপড়েরা অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত চলাফেরা করতে থাকে বা দল বেঁধে স্থান পরিবর্তন করে।
সাপের শরীর অত্যন্ত সংবেদনশীল। তারা মাটির কম্পন এবং তাপমাত্রার সামান্য পরিবর্তনও বুঝতে পারে। ভূমিকম্পের আগে মাটির ভেতরে তাপমাত্রা ও চাপের পরিবর্তন ঘটে। সাপ এই পরিবর্তন দ্রুত অনুভব করে এবং অনেক সময় মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে আসে বা নিরাপদ জায়গায় চলে যায়। তাদের শরীরে থাকা বিশেষ সংবেদনশীল অঙ্গ (যেমন পিট অর্গান) তাপমাত্রার ক্ষুদ্র পরিবর্তনও শনাক্ত করতে পারে।
মানুষ সাধারণত ২০ হার্টজের নিচের শব্দ শুনতে পারে না—এই সীমার নিচেই পড়ে ইনফ্রাসাউন্ড। কিন্তু প্রাণীরা এই অদৃশ্য জগতের সংকেতগুলো ধরতে পারে। একইভাবে, P-wave এত দ্রুত এবং সূক্ষ্ম যে মানুষ তা অনুভব করতে পারে না, কিন্তু প্রাণীরা পারে। এই কারণেই তারা দুর্যোগের আগাম সংকেত পেয়ে যায়। অর্থাৎ, প্রকৃতির সঙ্গে তাদের সংযোগ অনেক গভীর—যা মানুষের ক্ষেত্রে অনেকটাই সীমাবদ্ধ।
গবেষণায় দেখা গেছে, হাতি তাদের বিশেষ ক্ষমতা ইনফ্রাসাউন্ড ব্যবহার করে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত যোগাযোগ করতে পারে। এই ইনফ্রাসাউন্ড এমন এক ধরনের নিম্ন-ফ্রিকোয়েন্সির শব্দ, যা মানুষ শুনতে পায় না, কিন্তু মাটির ভেতর এবং বাতাসের মাধ্যমে অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
এই কারণেই বড় কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা—যেমন ভূমিকম্প, সুনামি বা ঝড়—ঘটার আগেই যে কম্পন বা শব্দ তৈরি হয়, তা বহু দূর থেকে মাটির ভিতর দিয়ে পৌঁছে যায়। হাতি সেই সূক্ষ্ম কম্পন তাদের পায়ের তলার সংবেদনশীল অংশ দিয়ে অনুভব করে এবং দ্রুত পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পায়।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই ক্ষমতার পেছনে কোনো “ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়” (How animals detect natural disasters early) কাজ করে না। বরং প্রাণীদের অত্যন্ত উন্নত পাঁচটি ইন্দ্রিয় (শ্রবণ, স্পর্শ, দৃষ্টি, ঘ্রাণ ও স্বাদ)-ই তাদেরকে এতটা সংবেদনশীল করে তোলে। প্রাণীরা কোনো অলৌকিক ক্ষমতার মাধ্যমে নয়, বরং তাদের স্বাভাবিক ইন্দ্রিয়ের অসাধারণ দক্ষতার কারণেই প্রকৃতির আগাম সংকেত ধরতে পারে এবং বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের আভাস আগে থেকেই পেয়ে যায়।
সাম্প্রতিক পোস্ট
- বৃদ্ধ বয়সে ডিভোর্স চাইছেন পঙ্কজ-ডিম্পল! মাঝখানে ফেঁসে গেলেন অপরশক্তি খুরানা?
- ‘গুজারিশ’-এর ইথান মাসকারেনহাস আজ বাস্তব! ১৩ বছরের যন্ত্রণার অবসান, দেশে প্রথমবার ইউথেনেশিয়া (নিষ্কৃতিমৃত্যুর) অনুমতি সুপ্রিম কোর্টের
- স্বেচ্ছামৃত্যু কি ভারতে বৈধ? স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন কে করতে পারেন? ভারতে ইউথানেসিয়া নিয়ে কী বলছে আইন
- মাছ-মাংস না খেলেও শরীর থাকবে ফিট! জেনে নিন, ৩টি হেলদি সুস্বাদু নিরামিষ রেসিপি
- যোটক বিচার কি সত্যিই কাজ করে? বিয়ের আগে আসলে কোনটা জরুরি, কী বলছে আধুনিক বিজ্ঞান?

