How to apply for passive euthanasia: অসুস্থ রোগী কি স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন করতে পারেন, নাকি পরিবারের মাধ্যমে করতে হয়? ভারতে প্যাসিভ ইউথানেসিয়ার ক্ষেত্রে কী কী আইনি শর্ত রয়েছে, লিভিং উইল ও মেডিক্যাল বোর্ড কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়—এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলির উত্তর জানা জরুরি।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: ভারতে স্বেচ্ছামৃত্যু বা প্যাসিভ ইউথানেসিয়া নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে সম্প্রতি এক যুবকের ঘটনাকে ঘিরে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে এই বিষয়টি। নাম হরিশ রানা। দীর্ঘ তেরো বছর ধরে কোমায় থাকা এই যুবকের জীবনের শেষ সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশজুড়ে চলছে আলোচনা, বিতর্ক এবং আবেগের ঢেউ।
২০১৩ সালে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর থেকে কার্যত মৃত্যুর সঙ্গেই লড়াই করছেন তিনি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় তিনি কোমায়-এ আছেন—অর্থাৎ জীবিত হলেও কার্যত অচেতন অবস্থায়, সম্পূর্ণভাবে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। এত বছর ধরে চিকিৎসা, হাসপাতাল, যন্ত্রপাতি এবং মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যাওয়ার পর অবশেষে তার বাবা-মা দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন। তাদের আবেদন—ছেলেকে মুক্তি দেওয়া হোক এই দীর্ঘ যন্ত্রণার জীবন থেকে।
আরও পড়ুন : কেন চিকিৎসা পেশা ছেড়ে ইউপিএসসি দিচ্ছেন ডাক্তাররা? জানুন, অবাক করা কারণ
বুধবার সেই আবেদন বিবেচনা করে সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে ‘নিষ্ক্রিয় স্বেচ্ছামৃত্যু’ বা প্যাসিভ ইউথানেসিয়া অনুমোদন করেছে। কিন্তু কেন এই অনুমতি? ভারতে যেখানে স্বেচ্ছামৃত্যু এখনও আইনি ভাবে জটিল বিষয়, সেখানে কীভাবে আদালত এই সিদ্ধান্ত নিল? আর সাধারণ মানুষ কীভাবে এই ধরনের আবেদন করতে পারে? আজকের প্রতিবেদনে এই সব প্রশ্নের উত্তরই খুঁজে দেখব।
হরিশ রানার দুর্ঘটনা (How to apply for passive euthanasia)
হরিশ রানার জীবন বদলে যায় ২০১৩ সালের এক দুর্ঘটনায়। তখন তিনি ছাত্র, ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা স্বপ্ন। কিন্তু একদিন নিজের চারতলা বাড়ির ছাদ থেকে পড়ে যাওয়ার পর তার মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাত লাগে। চিকিৎসকরা জানান, এই আঘাত এতটাই মারাত্মক ছিল যে তিনি গভীর কোমায় চলে যান। প্রথমে পরিবার আশা করেছিল—সময় হয়তো সব ঠিক করে দেবে। হাসপাতালে দীর্ঘ চিকিৎসা, বিভিন্ন থেরাপি, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ—সবই করা হয়। কিন্তু বছর কেটে গেলেও অবস্থার কোনও উন্নতি হয়নি। ধীরে ধীরে চিকিৎসকেরা জানিয়ে দেন, তার সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।
এই অবস্থায় হরিশ রানার জীবন কার্যত সীমাবদ্ধ হয়ে যায় হাসপাতালের বিছানা, চিকিৎসা যন্ত্র এবং অন্যদের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতার মধ্যে। তার শরীর বেঁচে থাকলেও সচেতন জীবন প্রায় নেই বললেই চলে।
আরুণা শানবাগের নজির: কেন তখন স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি দেয়নি সুপ্রিম কোর্ট?
ভারতে স্বেচ্ছামৃত্যু বা Passive Euthanasia নিয়ে আলোচনা শুরু হয় মূলত আরেকটি ঐতিহাসিক মামলার মাধ্যমে—আরুণা শানবাগ কেস। এই ঘটনাটি বোঝা খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বর্তমান হরিশ রানার মামলার সঙ্গে সেটির একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি সম্পর্ক রয়েছে। আরুণা শানবাগ ছিলেন মুম্বাইয়ের পারেলের কিং এডওয়ার্ড মেমোরিয়াল (KEM) হাসপাতালে কর্মরত একজন নার্স। ১৯৭৩ সালে তিনি হাসপাতালের মধ্যেই এক ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের শিকার হন বলে অভিযোগ ওঠে। সেই ঘটনার পর তার মস্তিষ্কে মারাত্মক ক্ষতি হয় এবং তিনি দীর্ঘদিনের জন্য ভেজিটেটিভ স্টেট-এ (Vegetative State) চলে যান। বাংলায় যাকে বলা যায়—এক ধরনের অচেতন জীবন, যেখানে শরীর বেঁচে থাকে কিন্তু সচেতনতা প্রায় থাকে না।
এই অবস্থায় আরুণা শানবাগ প্রায় ৪২ বছর হাসপাতালে শয্যাশায়ী ছিলেন। তার জীবন কার্যত সীমাবদ্ধ ছিল চিকিৎসা, নার্সদের সেবা এবং লাইফ সাপোর্টের মধ্যে। ২০১১ সালে তার পক্ষে একটি জনস্বার্থ মামলা (PIL) দায়ের করা হয়, যেখানে আদালতের কাছে তার জন্য স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি চাওয়া হয়। সেই মামলাটি ভারতের আইনি ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে সেই সময় সুপ্রিম কোর্ট সরাসরি স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি দেয়নি। আদালত সেই আবেদন খারিজ করে দেয়।কোর্টের যুক্তি ছিল—আরুণা শানবাগের চিকিৎসা এবং যত্ন নিচ্ছেন হাসপাতালের নার্সরাই, এবং তারা তাকে বাঁচিয়ে রাখতে চান। ফলে আদালত মনে করেছিল তার জীবন শেষ করার অনুমতি দেওয়া ঠিক হবে না।
তবে এই মামলার একটি বড় প্রভাব ছিল। যদিও আদালত আবেদনটি খারিজ করেছিল, কিন্তু সেই রায়ের মধ্য দিয়েই প্রথমবার ভারতের আইনে Passive Euthanasia নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গাইডলাইন তৈরি হয়। সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে—বিশেষ করে Persistent Vegetative State বা টার্মিনাল রোগের ক্ষেত্রে—আদালতের অনুমতি নিয়ে লাইফ সাপোর্ট প্রত্যাহার করা যেতে পারে। এই রায় ভারতের আইনি কাঠামোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে।
এরপরও আরুণা শানবাগ দীর্ঘদিন সেই ভেজিটেটিভ স্টেটেই বেঁচে ছিলেন। অবশেষে ২০১৫ সালে তিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। অর্থাৎ প্রায় ৪২ বছর তিনি সেই অচেতন অবস্থাতেই জীবন কাটিয়েছিলেন।
হরিশ রানার ক্ষেত্রে কেন ভিন্ন সিদ্ধান্ত? (How to apply for passive euthanasia)
এই প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আরুণা শানবাগের ক্ষেত্রে যেখানে আদালত স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন খারিজ করেছিল, সেখানে হরিশ রানার ক্ষেত্রে কেন লাইফ সাপোর্ট প্রত্যাহারের অনুমতি দেওয়া হল? এর কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে।
আরুণা শানবাগ মামলার পরই সুপ্রিম কোর্ট যে গাইডলাইন তৈরি করেছিল, পরবর্তী বছরগুলোতে সেই আইনি কাঠামো আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে ২০১৮ সালের গুরুত্বপূর্ণ রায়ে আদালত Passive Euthanasia এবং Living Will-কে আইনি স্বীকৃতি দেয়। অর্থাৎ কোনও ব্যক্তি আগাম লিখে রাখতে পারেন, যদি তিনি অচেতন অবস্থায় চলে যান তবে তাকে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা হবে কি না।
হরিশ রানার ক্ষেত্রে আদালত একটি বিশেষ মেডিক্যাল বোর্ডের রিপোর্ট বিবেচনা করেছে। AIIMS-এর চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন—তার মস্তিষ্কের ক্ষতি স্থায়ী এবং সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা কার্যত নেই। এই মামলায় পরিবার নিজেই আদালতের কাছে আবেদন করেছে এবং তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে—এই দীর্ঘ যন্ত্রণার জীবন থেকে ছেলেকে মুক্তি দেওয়া উচিত।
এই সমস্ত দিক বিবেচনা করেই সুপ্রিম কোর্ট বিশেষ পরিস্থিতিতে লাইফ সাপোর্ট প্রত্যাহারের অনুমতি দিয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের সিদ্ধান্ত খুবই বিরল। সাধারণত হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টের অনুমতি ছাড়া এমন কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। তাই হরিশ রানার মামলাটি শুধু একটি ব্যক্তিগত ঘটনা নয়, বরং ভারতে স্বেচ্ছামৃত্যু সংক্রান্ত আইনি ও নৈতিক বিতর্কের ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে চলেছে।
ভারতে প্যাসিভ ইউথানেসিয়া: কীভাবে আবেদন করা যায়?
ভারতে প্যাসিভ ইউথানেসিয়া (Passive Euthanasia) বা নিষ্ক্রিয় স্বেচ্ছামৃত্যু খুব সীমিত এবং কঠোর আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনুমোদিত হয়। এটি কখনই সরাসরি কারও জীবন শেষ করার পদ্ধতি নয়। বরং এমন রোগীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যাদের টার্মিনাল অসুখ (Terminal Illness) রয়েছে বা যারা দীর্ঘদিন ধরে ভেজিটেটিভ স্টেট-এ (Vegetative State) আছেন এবং চিকিৎসকদের মতে যাদের সুস্থ হয়ে ওঠার কোনও বাস্তব সম্ভাবনা নেই।
এই ক্ষেত্রে রোগীকে কোনও ওষুধ দিয়ে মৃত্যু ঘটানো হয় না। বরং তাকে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ব্যবহৃত লাইফ সাপোর্ট—যেমন ভেন্টিলেটর, অক্সিজেন সাপোর্ট বা টিউব ফিডিং—ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করা হয়। এর ফলে রোগীর স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক মৃত্যু ঘটে। ভারতের আইনে এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত এবং একাধিক ধাপের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
লিভিং উইল: আগে থেকেই ইচ্ছাপত্র তৈরি করার সুযোগ: ভারতে প্যাসিভ ইউথানেসিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো লিভিং উইল (Living Will)। এটি মূলত একজন সুস্থ ব্যক্তির আগাম ইচ্ছাপত্র, যেখানে তিনি লিখে রাখতে পারেন—ভবিষ্যতে যদি তিনি এমন কোনও অবস্থায় চলে যান যেখানে চিকিৎসা দিয়ে আর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা নেই, তাহলে তাকে কৃত্রিমভাবে লাইফ সাপোর্টে বাঁচিয়ে রাখা হবে কি না।
এই লিভিং উইল তৈরির জন্য কিছু নিয়ম রয়েছে—
- ব্যক্তি সম্পূর্ণ সুস্থ ও সচেতন অবস্থায় এই ইচ্ছাপত্র লিখবেন
- অন্তত দুজন সাক্ষীর স্বাক্ষর থাকতে হবে
- নোটারি পাবলিক বা গেজেটেড অফিসারের প্রত্যয়ন থাকতে পারে
- অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন বা কর্পোরেশনের কাছে এটি সংরক্ষণ করা হয়
- বর্তমানে অনেক জায়গায় এটি ডিজিটাল রেকর্ড হিসেবেও রাখা হয়
এই লিভিং উইল ভবিষ্যতে চিকিৎসক এবং আদালতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি নথি হিসেবে কাজ করে।
মেডিক্যাল বোর্ডের ভূমিকা: যদি কোনও রোগী টার্মিনাল অবস্থায় পৌঁছান বা দীর্ঘদিন ধরে ভেজিটেটিভ স্টেট-এ থাকেন, তখন হাসপাতাল প্রথমে একটি প্রাইমারি মেডিক্যাল বোর্ড (Primary Medical Board) গঠন করে। এই বোর্ডে সাধারণত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা থাকেন। তারা রোগীর সম্পূর্ণ চিকিৎসা ইতিহাস, বর্তমান শারীরিক অবস্থা এবং সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখেন। আইন অনুযায়ী, এই প্রাইমারি মেডিক্যাল বোর্ড সাধারণত ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে একটি প্রাথমিক রিপোর্ট তৈরি করে। সেই রিপোর্টে তারা উল্লেখ করেন—রোগীর অবস্থায় চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার বাস্তব কোনও সম্ভাবনা আছে কি না। এরপর গঠিত হয় আরেকটি বোর্ড, যাকে বলা হয় সেকেন্ডারি মেডিক্যাল বোর্ড। এই বোর্ডের কাজ হলো প্রাইমারি মেডিক্যাল বোর্ডের রিপোর্ট যাচাই করা। তারা আবার রোগীর অবস্থা পরীক্ষা করে দেখেন এবং নিশ্চিত করেন যে প্রথম বোর্ডের সিদ্ধান্ত যথার্থ কি না। অর্থাৎ এই ধাপে একটি স্বাধীন চিকিৎসক দল পুরো বিষয়টি পুনরায় মূল্যায়ন করে।
ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমোদন: দুইটি মেডিক্যাল বোর্ডের রিপোর্টের পর বিষয়টি পাঠানো হয় জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফার্স্ট ক্লাস (JMFC)-এর কাছে।ম্যাজিস্ট্রেট রোগীর অবস্থা সম্পর্কে রিপোর্ট পর্যালোচনা করেন এবং প্রয়োজনে সরাসরি রোগীকে দেখতেও পারেন। এরপর তিনি সিদ্ধান্ত নেন—লাইফ সাপোর্ট প্রত্যাহারের অনুমতি দেওয়া হবে কি না। ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমোদন এই প্রক্রিয়ার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি ধাপ।
হাই কোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টে আপিল: যদি পরিবার বা সংশ্লিষ্ট পক্ষ ম্যাজিস্ট্রেটের সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট না হন, তাহলে বিষয়টি হাই কোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা যেতে পারে। সর্বোচ্চ আদালত তখন পুরো বিষয়টি নতুন করে বিচার করতে পারে এবং প্রয়োজনে নির্দেশ দিতে পারে।
হাসপাতালের চূড়ান্ত ভূমিকা: আদালত বা ম্যাজিস্ট্রেট অনুমোদন দিলে শেষ পর্যন্ত হাসপাতাল এবং চিকিৎসকরাই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করেন। তারা ধীরে ধীরে লাইফ সাপোর্ট—যেমন ভেন্টিলেটর, অক্সিজেন সাপোর্ট বা টিউব ফিডিং—প্রত্যাহার করেন। তবে এখানে কোনও ওষুধ দিয়ে মৃত্যু ঘটানো হয় না। এটি সম্পূর্ণভাবে প্রাকৃতিক মৃত্যুর প্রক্রিয়াকে অনুমতি দেওয়া—এই নীতির ওপর ভিত্তি করে করা হয়।
রেকর্ড সংরক্ষণ: এই ধরনের সংবেদনশীল সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সমস্ত মেডিক্যাল ও আইনি নথি সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত এই রেকর্ড প্রায় তিন বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করে রাখতে হয়, যাতে ভবিষ্যতে প্রয়োজনে তা পর্যালোচনা করা যায়।
ভারতে প্যাসিভ ইউথানেসিয়ার অনুমতি পাওয়া তাই খুবই বিরল এবং কঠোর আইনি নিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ। চিকিৎসা নীতি, মানবাধিকার এবং আইনের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্যই এই জটিল প্রক্রিয়া তৈরি করা হয়েছে। এই কারণেই প্রতিটি ঘটনা আদালত অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করে এবং শুধুমাত্র বিশেষ পরিস্থিতিতেই লাইফ সাপোর্ট প্রত্যাহারের অনুমতি দেয়।
প্যাসিভ ইউথানেসিয়া (লিভিং উইল) এর জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস সুপ্রিম কোর্টের গাইডলাইন অনুসারে নির্দিষ্ট- সুস্থ অবস্থায় লিখিত ঘোষণা (টার্মিনাল অবস্থায় লাইফ সাপোর্ট বন্ধের ইচ্ছা), Aadhaar/Voter ID/Passport-এর কপি, দুই সাক্ষীর স্বাক্ষরিত বিবরণ (যারা আপনার সিদ্ধান্ত যাচাই করবে), গেজেটেড অফিসার বা নোটারি পাবলিকের সীল।
কেন ভারতে অ্যাক্টিভ ইউথানেসিয়া নিষিদ্ধ, কিন্তু প্যাসিভ ইউথানেসিয়া শর্তসাপেক্ষে বৈধ?
ভারতে ইউথানেসিয়া বা স্বেচ্ছামৃত্যু নিয়ে আইন অত্যন্ত স্পষ্ট। এখানে অ্যাক্টিভ ইউথানেসিয়া (Active Euthanasia) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, কিন্তু নির্দিষ্ট শর্তে প্যাসিভ ইউথানেসিয়া (Passive Euthanasia) অনুমোদিত হতে পারে। অ্যাক্টিভ ইউথানেসিয়া বলতে বোঝায়—চিকিৎসকের সরাসরি হস্তক্ষেপে কোনও রোগীর মৃত্যু ঘটানো। যেমন ইচ্ছাকৃতভাবে ওষুধ বা ইনজেকশন প্রয়োগ করে রোগীর জীবন শেষ করে দেওয়া। ভারতে এই পদ্ধতি কঠোরভাবে বেআইনি।
এর প্রধান কারণ হলো ভারতীয় দণ্ডবিধি বা আইপিসি ধারা ৩০০ (IPC Section 300), ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS) অনুযায়ী ১০০ ও ১০১ ধারা। এই ধারায় হত্যার সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে। যদি কোনও ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে অন্য কারও মৃত্যু ঘটান, তবে সেটি আইন অনুযায়ী হত্যার শামিল হতে পারে। সেই কারণেই চিকিৎসকের দ্বারা সরাসরি মৃত্যু ঘটানো আইনের চোখে অপরাধ বলে বিবেচিত হয়। এর পাশাপাশি ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১ (Article 21)-এ প্রত্যেক নাগরিকের জীবনের অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আদালতের মতে, সক্রিয়ভাবে মৃত্যু ঘটানো এই মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী হতে পারে।
এই কারণেই সুপ্রিম কোর্ট ২০১১ সালের ঐতিহাসিক আরুণা শানবাগ মামলায় স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়—ভারতে অ্যাক্টিভ ইউথানেসিয়া বৈধ নয় এবং এটি কোনওভাবেই অনুমোদন করা যাবে না। আদালত আরও বলেছিল, ভারতের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের দৃষ্টিকোণ থেকেও জীবনকে অত্যন্ত পবিত্র হিসেবে দেখা হয়। তাই কোনও চিকিৎসকের সক্রিয় হস্তক্ষেপে মৃত্যুর ব্যবস্থা করা অনেকের কাছে অমানবিক বলে বিবেচিত হতে পারে।
তবে একই সঙ্গে আদালত এটাও স্বীকার করে যে কিছু ক্ষেত্রে রোগী এমন অবস্থায় পৌঁছান যেখানে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ে। সেই পরিস্থিতিতেই প্যাসিভ ইউথানেসিয়া প্রযোজ্য হতে পারে। প্যাসিভ ইউথানেসিয়ার ক্ষেত্রে কোনও ওষুধ বা ইনজেকশন দিয়ে মৃত্যু ঘটানো হয় না। বরং রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ব্যবহৃত লাইফ সাপোর্ট—যেমন ভেন্টিলেটর, অক্সিজেন সাপোর্ট, বা টিউব ফিডিং—ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করা হয়। এর ফলে রোগীর স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক মৃত্যু ঘটে। সুপ্রিম কোর্ট বারবার জোর দিয়ে বলেছে—প্যাসিভ ইউথানেসিয়া কখনোই হত্যা নয়। এটি মূলত এমন চিকিৎসা প্রত্যাহার করা, যা আর রোগীর কোনও উপকারে আসছে না। অন্যদিকে অ্যাক্টিভ ইউথানেসিয়া সরাসরি মৃত্যু ঘটানোর প্রক্রিয়া হওয়ায় তা আইনের চোখে অপরাধ হিসেবেই গণ্য হবে।
হরিশ রানার ক্ষেত্রে আদালতের সিদ্ধান্ত কেন গুরুত্বপূর্ণ?
হরিশ রানার মামলায় সুপ্রিম কোর্ট যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে (How to apply for passive euthanasia), তার পেছনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সংক্রান্ত রিপোর্ট।
এমস (AIIMS) এবং সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি মেডিক্যাল বোর্ডের পরীক্ষায় জানা যায়—হরিশ রানা প্রায় তেরো বছর ধরে পার্মানেন্ট ভেজিটেটিভ স্টেট (Permanent Vegetative State)-এ রয়েছেন।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে PVS বলা হয়। এই অবস্থায় রোগীর মস্তিষ্কে এমন ধরনের স্থায়ী ক্ষতি হয় যা আর উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।
চিকিৎসকদের রিপোর্টে বলা হয়—
- মস্তিষ্কে নন-প্রোগ্রেসিভ কিন্তু স্থায়ী ক্ষতি হয়েছে
- সচেতন প্রতিক্রিয়া প্রায় নেই
- খাওয়া, মলমূত্র নিয়ন্ত্রণ বা শ্বাসপ্রশ্বাসের মতো মৌলিক শারীরিক প্রক্রিয়াগুলো স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হয় না
- শরীরের অধিকাংশ কার্যক্রমই বাইরের যন্ত্রপাতি বা চিকিৎসা সহায়তার ওপর নির্ভরশীল
এই পরিস্থিতিতে চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে যে লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হচ্ছে তা বাস্তবে রোগীর উন্নতিতে কোনও ভূমিকা রাখছে না। এই মেডিক্যাল বোর্ডের রিপোর্টের ভিত্তিতেই সুপ্রিম কোর্ট মনে করে—এই চিকিৎসা অব্যাহত রাখা বাস্তবিক অর্থে অপ্রয়োজনীয় এবং রোগীর স্বার্থের বিরোধী হতে পারে। সেই কারণেই আদালত শর্তসাপেক্ষে লাইফ সাপোর্ট প্রত্যাহারের অনুমতি দেয়।
এই সিদ্ধান্ত আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে—ভারতে অ্যাক্টিভ ইউথানেসিয়া কখনও বৈধ নয়, কিন্তু নির্দিষ্ট কঠোর আইনি প্রক্রিয়া মেনে প্যাসিভ ইউথানেসিয়া কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে অনুমোদিত হতে পারে।
সাম্প্রতিক পোস্ট
- ঘরশত্রু বিভীষণ কি ইরানের সংকটের কারণ হল? আমেরিকা কোন বিশেষ বাহিনীকে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে?
- বই পড়লে কি মন শান্ত হয়? জানুন, স্ট্রেস কমাতে কীভাবে এই বিশেষ থেরাপি কাজ করে
- গোলাপি মণীশ মলহোত্রা শাড়িতে নজর কাড়লেন সারা তেন্ডুলকর! অর্জুন-সানিয়ার রাজকীয় বিয়েতে চাঁদের হাট, জানুন অন্দরমহলের অজানা গল্প
- কে এই নতুন রাজ্যপাল আর. এন. রবি? জানুন তাঁকে নিয়ে তামিলনাড়ুর সমস্ত বিতর্ক ও যাবতীয় তথ্য
- কেন পদত্যাগ রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোসের? কারণ জানলে চমকে উঠবেন!

