হাজারো সেনা সিয়াচেনে নিঃশব্দে বীরত্বের ইতিহাস লিখে গেছেন (Indian Army in minus degree)। এই সৈনিকরা হয়তো একদিন ফিরে আসেন না, কিন্তু তাঁদের গল্প বেঁচে থাকে পতাকার রঙে, আমাদের গর্বে। জানুন কেমন তাঁদের দিনরাতের সংগ্রাম, মানবতা ও অজানা বীরত্বের গল্প এই বিশেষ ফিচারে।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: সারা দেশ যখন বর্ষবরণের আনন্দ উপভোগ করছে, তখন ভারতীয় সেনার এক্স হ্যান্ডেল এ নতুন বছরের শুভেচ্ছা সহ একটি ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে। যে ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে তুষারাবৃত বরফের মাঝে দাঁড়িয়ে ভারতীয় সেনা দেশকে পাহারা দিচ্ছে। ভিডিওটি ভাইরাল হতেই নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়েছে দেশবাসীগণ। বরফঢাকা পাহাড়, হাড় কাঁপানো ঠান্ডা, আর নিস্তব্ধ রাত। চারপাশে শুধু হিম আর হাওয়া—যেখানে মানুষের নিঃশ্বাসও জমে যায় বরফে। তবু সেখানেই জেগে থাকে ভারতীয় সেনার একেকজন প্রহরী—যাদের চোখে ঘুম নেই, হৃদয়ে ভয় নেই, আছে শুধু দেশের প্রতি অবিচল ভালোবাসা। লাদাখ, সিয়াচেন, তাওয়াং বা কুপওয়াড়া—এই সব মাইনাস ডিগ্রির সীমান্ত পোস্টে প্রতিদিন ঘটে চলেছে এক একটি বীরত্বের গল্প।
আরও পড়ুন : বিতর্কে আরাবল্লী │ ইতিহাস বলছে ভয়ংকর সত্য │ Aravalli Controversy
মাইনাস ডিগ্রী উষ্ণতায় ভারতীয় সেনার যে বাহিনী পাহারা দিয়ে দেশের মানুষকে সুরক্ষিত রেখেছে নিউজ অফবিট এর পক্ষ থেকে তাদের জানাই কুর্নিশ। এই প্রতিবেদনে জানুন, ভারতীয় সেনাবাহিনীর সেই বিশেষ বাহিনী সম্পর্কে যারা সিয়াচেন এর মত এলাকায় পাহারা দিতে সক্ষম। সেই বাহিনী সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য, ট্রেনিং ও তাদের কঠিন পরিশ্রমের গল্প।
ভারতীয় সেনার বিশেষ বাহিনী কারা?
ভিডিওতে যে সেনাকে দেখা গেছে, তিনি কমব্যাট ফোর্সের। আপনারা কি জানেন, কমব্যাট ফোর্স বলতে কাদের বোঝায়? এই বিশেষ বাহিনী বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত নানা অপারেশনের জন্য। এই বিশেষ বাহিনীর মধ্যে রয়েছে কমান্ডো ইউনিট, রয়েছে নৌবাহিনীর মার্কোস, ভৈরব, বিমান বাহিনীর গাড়ুড়, কোবরা, ঘাতক। যাদের রয়েছে গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি, সন্ত্রাসবাদ দমনের ক্ষমতা, সামুদ্রিক অপারেশনে দক্ষতা, শত্রু অঞ্চলে বিশেষ অভিযানের প্রশিক্ষণ।
স্পেশাল বাহিনীর ইতিহাস (Indian Army in minus degree)
১৯৬২ সালের নভেম্বর মাসে স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার বাহিনীর জন্ম হয়। ভারতীয় সেনাবাহিনীর উন্নতি করতে তাদের মানসিক শক্তি, ফিটনেস এর দিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই বাহিনী এভাবেই কাজ করতে শুরু করে। প্রথম স্পেশাল বাহিনী হল প্যারা এসএফ। লেফটেন্যান্ট জেনারেল মেঘ সিং প্রস্তাব দিলেন এমন এক বাহিনীর যারা বিমান নিয়ে শত্রুপক্ষের ডেরায় প্রবেশ করতে পারবে এবং তাদের ধ্বংস করতে পারবে। তৈরি হলো মেঘদুত। ধীরে ধীরে নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, বিএসএফ এর ক্ষেত্রেও স্পেশাল বাহিনী তৈরি হলো। ২০০৪ সালে তৈরি হলো গড়ুড় বাহিনী সন্ত্রাসবাদ দমনের জন্য। এই বিশেষ বাহিনীর সব থেকে দক্ষ নৌবাহিনীর মার্কোস। তাদের প্রশিক্ষণ পর্ব কঠিন। চারটি পর্যায়ে বিভক্ত করে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যেখানে তাদের অ্যাপটিটিউড টেস্ট, শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষা, প্রতিকূল বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে গিয়ে ট্রেনিং, ক্লান্ত অবস্থায় একবারের দক্ষতায় ৮২ ফুট দূরত্বের কোন বস্তুকে শ্যুট করা।
সিয়াচেনের তাপমাত্রায় সেনারা কিভাবে থাকে?
খুব কম সেনা এই পর্যায়ের জন্য মনোনীত হন। ২৪ হাজার ফুট উঁচুতে সেনাদের থাকাটা মুশকিল হয়ে পড়ে। ঠান্ডা থাকে মাইনাস কুড়ি থেকে ত্রিশ ডিগ্রি। তুষার ঝড় হয়। ফলে এই এলাকার উষ্ণতা তখন মাইনাস ৫০ থেকে ৭০ ডিগ্রী হয়। এই অঞ্চলে অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে সেনাদের যেতে হয়। তারা স্নান করতে পারেনা। পোস্টিং থাকে তিন মাসের জন্য। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার দিক থেকে অনেক নিয়ম পালন করতে হয়, আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য। শুধুমাত্র শত্রু নয়, তাদের সম্মুখীন হতে হয় হিংস্র পশুদের। তাদের হত্যা না করে কিভাবে নিজেদের রক্ষা করবেন তার ট্রেনিং দেওয়া হয় সেনাদের। একাধিক প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিয়ে তারা দেশকে রক্ষা করে। এই পরিস্থিতিতে দেশকে রক্ষা করার উপায় শুধুমাত্র দেশের প্রতি ভালোবাসা নয়, শারীরিক ক্ষমতা নয়, আত্মবিশ্বাস, মানসিক দৃঢ়তার দ্বারাই ভারতীয় সেনা জয় করেছে চরম প্রতিকূল পরিস্থিতি।
ব্যক্তিগত জীবনের ত্যাগ, নিঃসঙ্গতা,কর্তব্যবোধের গল্প (Indian Army in minus degree)—যা ভারতীয় সেনাকে মানসিকভাবে অদম্য করে তোলে। এই মানসিক শক্তিই ভারতীয় সেনাকে বিশ্বের অন্যতম সাহসী বাহিনীতে পরিণত করেছে। আজকের ভারতীয় সেনা শুধু সাহসের প্রতীক নয়, প্রযুক্তির মিশ্রণে আরও শক্তিশালী এক বাহিনী। মাইনাস ডিগ্রির কঠিন ঠান্ডায় টিকে থাকতে তারা ব্যবহার করে সূর্যের আলোয় চলা তাঁবু, হালকা কিন্তু উষ্ণ পোশাক, আর তুষারের মধ্যে চলার জন্য বিশেষ মোটরযান।
প্রতিটি সেনা সদস্যের কাছে থাকে দিকনির্দেশক যন্ত্র ও উপগ্রহ যোগাযোগ ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে তারা একে অপরের সঙ্গে সংযোগ রাখে এবং সীমান্তের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে। ভারতীয় সেনারা সেই অতন্দ্র প্রহরী, যারা পাহাড়ে ঠান্ডাকে হারিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে শুধুই আমাদের জন্য। তাদের নিঃস্বার্থ কর্তব্যবোধ, অটুট সাহস আর মানবতার প্রতি শ্রদ্ধা আমাদের শেখায়—দেশপ্রেম মানে শুধু পতাকা তোলা নয়, বরং প্রতিদিন নিজের সীমা অতিক্রম করা।

