Kolkata Howrah Ward Delimitation ঘিরে বিধানসভায় উত্তেজনা চরমে। কলকাতা ও হাওড়ায় ওয়ার্ড সংখ্যা বাড়ানোর সংশোধনী বিল নিয়ে বিতর্কের মাঝেই ফিরহাদ হাকিমের তীব্র মন্তব্য, প্রাক্তন মেয়রকে পুরনো সম্পর্কের কথা মনে করিয়ে দেওয়া এবং ঠিকাদারি প্রসঙ্গে বাকযুদ্ধ নতুন মাত্রা পায়।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: কলকাতা ও হাওড়ায় ওয়ার্ড পুনর্গঠনের লক্ষ্যে রাজ্য সরকারের আনা সংশোধনী বিল ঘিরে বুধবার উত্তপ্ত হয়ে উঠল বিধানসভা। একদিকে কলকাতায় ওয়ার্ডের সংখ্যা ১৪৪ থেকে বাড়িয়ে ২০৯ করার প্রস্তাব, অন্যদিকে হাওড়ার পুরনো ওয়ার্ড কাঠামো পুনর্গঠন করে নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করার উদ্যোগ—এই দুই বিষয়কে কেন্দ্র করেই বসেছিল বিধানসভার এক দিনের বিশেষ অধিবেশন। কিন্তু বিল নিয়ে আলোচনা গড়াতেই তা শুধুমাত্র পুর প্রশাসনের কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্যে আটকে থাকেনি। প্রাক্তন মেয়র জিতেন্দ্র তিওয়ারি, বিধায়ক উমেশ রাই এবং প্রাক্তন পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমের বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্যে সরগরম হয়ে ওঠে অধিবেশন কক্ষ।
জিতেন্দ্র তিওয়ারির বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে ফিরহাদ সরাসরি মনে করিয়ে দেন তাঁর পুরনো রাজনৈতিক সম্পর্কের কথা। বলেন, “জিতেন, আমি তোমার থেকে সিনিয়র। আমাকে বলতে হবে না যে আমি কোনটা বলতে পারব আর কোনটা বলব না। ভুলে যেও না, তুমি আমার অধীনেই মেয়র ছিলে।” মুহূর্তেই বদলে যায় বিধানসভার পরিবেশ। ওয়ার্ড পুনর্গঠনের বিল নিয়ে শুরু হওয়া আলোচনা পৌঁছে যায় কলকাতা পুরসভার পুরনো রাজনৈতিক সমীকরণ এবং ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রসঙ্গে।
কলকাতায় ১৪৪ থেকে ২০৯, হাওড়াতেও বদলাবে ওয়ার্ডের কাঠামো
কলকাতা ও হাওড়ার পুর এলাকায় ওয়ার্ড পুনর্গঠনের লক্ষ্যে রাজ্য সরকার বুধবার বিধানসভায় পৃথক দুটি সংশোধনী বিল পেশ করে। এর পাশাপাশি আগের বিল প্রত্যাহারের প্রস্তাবও আনা হয়। মূল লক্ষ্য, আসন্ন পুরভোটের আগে দুই পুর এলাকার ওয়ার্ড বিন্যাস নতুন করে সাজানোর আইনি পথ তৈরি করা।
প্রস্তাব অনুযায়ী, কলকাতা পুরসভার ওয়ার্ডের সংখ্যা ১৪৪ থেকে বেড়ে ২০৯ হতে চলেছে। জনসংখ্যা, পুর পরিষেবা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে সামনে রেখে ওয়ার্ডের কাঠামো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেই আলোচনায় উঠে আসে। অন্যদিকে হাওড়ার ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা ওয়ার্ড পুনর্গঠন এবং পুর নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়।
বিধানসভায় বিলের পক্ষে বক্তব্য রাখতে গিয়ে উমেশ রাই হাওড়া পুরসভার নির্বাচন এবং বালিকে হাওড়ার সঙ্গে যুক্ত করার পরবর্তী পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে হাওড়া পুরসভার নির্বাচন হয়েছিল। পরে ২০১৫ সালে বালিকে হাওড়া পুরসভার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এরপর ২০১৮ সালে নির্বাচন না করে প্রশাসক বসানো হয়।
সেই সময় ছয় মাসের মধ্যে ওয়ার্ড পুনর্গঠন করে নির্বাচন করার কথা বলা হলেও, প্রশাসকের মেয়াদ বাড়তে বাড়তে প্রায় আট বছর কেটে গিয়েছে—এমন অভিযোগই বিধানসভায় তোলেন উমেশ রাই। তাঁর বক্তব্যে হাওড়ায় দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন না হওয়া এবং প্রশাসনিক কাঠামোর জটিলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে আসে।
বালিকে হাওড়ার সঙ্গে যুক্ত করা নিয়ে ফিরহাদের বক্তব্য
বালিকে হাওড়ার সঙ্গে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েও বিধানসভায় বিতর্ক তৈরি হয়। ফিরহাদ হাকিম তাঁর বক্তব্যে জানান, বালিকে হাওড়ার সঙ্গে যুক্ত করার পিছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল পরিষেবা ব্যবস্থার উন্নতি। বড় প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসে মানুষের কাছে পুর পরিষেবা আরও কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে তিনি জানান।
তবে একইসঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, সেই প্রক্রিয়ায় পদ্ধতিগত কিছু ত্রুটি ছিল। অর্থাৎ সিদ্ধান্তটির উদ্দেশ্য নিয়ে তাঁর বক্তব্যে ইতিবাচক দিক থাকলেও, বাস্তবায়নের পদ্ধতিতে সমস্যা ছিল বলেই ইঙ্গিত করেন তিনি।
এই বক্তব্যের সময়ই জিতেন্দ্র তিওয়ারি প্রশ্ন তোলেন। হাউসের সদস্যকে নিয়ে এই ধরনের বক্তব্য রাখার প্রসঙ্গ তুলে তিনি আপত্তি জানান। আর সেই আপত্তির জবাবেই ফিরহাদ হাকিমের বক্তব্য আরও কড়া হয়ে ওঠে।
জিতেন্দ্রকে উদ্দেশ্য করে ফিরহাদ বলেন, “জিতেন, আমি তোমার থেকে সিনিয়র। আমাকে বলতে হবে না যে আমি কোনটা বলতে পারব আর কোনটা বলব না।”
এরপরই আসে সেই বহুল আলোচিত মন্তব্য—“ভুলে যেও না, তুমি আমার অধীনেই মেয়র ছিলে।”
এই একটি বাক্যেই বিধানসভায় পুরনো রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ সামনে চলে আসে। কলকাতা পুরসভার প্রশাসনিক রাজনীতিতে ফিরহাদ হাকিম এবং জিতেন্দ্র তিওয়ারির দীর্ঘদিনের পরিচিতির বিষয়টিও আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। বিলের সাংগঠনিক বিষয় থেকে বিতর্ক তখন ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অতীতের দিকে মোড় নেয়।
‘ঠিকাদারি নিয়ে কথা বলছেন আপনারা?’—ফিরহাদের কটাক্ষ
বিতর্ক এখানেই থামেনি। পরে ঠিকাদারি নিয়েও বিধানসভায় মুখোমুখি হন ফিরহাদ হাকিম ও উমেশ রাই। ফিরহাদের বক্তব্য ছিল, “ঠিকাদারি নিয়ে কথা বলছেন আপনারা? উমেশবাবু, আপনি বলছেন?”
এরপরই তিনি একটি সাম্প্রতিক ঘটনার উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, উমেশ রাইকে ঠিকাদারের সঙ্গে বৈঠক করতে দেখা গিয়েছিল এবং সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর দলের কর্মীরাই বিক্ষোভ দেখিয়েছিলেন। ফিরহাদের কথায়, “আপনাকেই তো দেখা গেল ঠিকাদারের সঙ্গে বৈঠক করতে। তা নিয়ে আপনার দলের কর্মী বিক্ষোভ দেখাল, টিভিতে দেখলাম।”
এই মন্তব্যের পর অধিবেশন কক্ষে ফের উত্তেজনা তৈরি হয়। পুর পরিষেবা, ঠিকাদারি এবং ওয়ার্ড পুনর্গঠন নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
তবে ঠিকাদারি সংক্রান্ত এই মন্তব্যকে ঘিরে যে বক্তব্য ফিরহাদ হাকিম রেখেছিলেন, তার একটি অংশ পরে কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেন বিধানসভার অধ্যক্ষ। অর্থাৎ বিধানসভার নথিতে ওই মন্তব্য রাখার বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়।
হাওড়ার অনুন্নয়ন নিয়ে আগের সরকারকে নিশানা
অন্যদিকে, বিলের আলোচনায় হাওড়ার পুর পরিষেবা এবং অনুন্নয়নের প্রসঙ্গও উঠে আসে। নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল হাওড়ার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে পূর্ববর্তী সরকারকে আক্রমণ করেন। দীর্ঘদিন ধরে পুর নির্বাচন না হওয়া, প্রশাসক-নির্ভর ব্যবস্থা এবং ওয়ার্ড পুনর্গঠনের জটিলতার কারণে হাওড়ার উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলেই শাসক দলের বক্তব্যে উঠে আসে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, নতুন কাঠামোর মাধ্যমে পুর প্রশাসনকে আরও কার্যকর করা এবং ভবিষ্যতে নির্বাচনের পথ সুগম করাই এই সংশোধনীর অন্যতম উদ্দেশ্য।
উমেশ রাইও তাঁর বক্তব্যে দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ার বিষয়টি সামনে আনেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ছয় মাসের মধ্যে ওয়ার্ড পুনর্গঠন করে নির্বাচন করার যে পরিকল্পনা ছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি। প্রশাসকের মেয়াদ বারবার বাড়ানো হয়েছে এবং সেই পরিস্থিতি দীর্ঘ সময় ধরে চলেছে।
বিলের আড়ালে পুরনো রাজনৈতিক সম্পর্কের ছায়া
বুধবারের বিশেষ অধিবেশনের মূল বিষয় ছিল কলকাতা ও হাওড়ার ওয়ার্ড পুনর্গঠন। কিন্তু আলোচনা যত এগিয়েছে, ততই সামনে এসেছে পুরনো রাজনৈতিক হিসাব, পুর প্রশাসনের অতীত এবং বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য।
কলকাতার ক্ষেত্রে ১৪৪টি ওয়ার্ড থেকে ২০৯টি ওয়ার্ড করার প্রস্তাব যেমন বড় প্রশাসনিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, তেমনই হাওড়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা নির্বাচন এবং ওয়ার্ড পুনর্গঠনের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
আর সেই আলোচনার মধ্যেই জিতেন্দ্র তিওয়ারির সঙ্গে ফিরহাদ হাকিমের বাকযুদ্ধ বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। “আমি তোমার থেকে সিনিয়র” থেকে “ভুলে যেও না, তুমি আমার অধীনেই মেয়র ছিলে”—ফিরহাদের এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বিতর্কটি শুধু বিলের বিষয়বস্তুতে সীমাবদ্ধ ছিল না।
অন্যদিকে উমেশ রাইকে উদ্দেশ্য করে ঠিকাদারি নিয়ে তাঁর মন্তব্যও অধিবেশনের উত্তাপ বাড়িয়ে দেয়। যদিও অধ্যক্ষের নির্দেশে সেই মন্তব্যের অংশ কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
পুরভোটের আগে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত?
কলকাতা ও হাওড়ায় ওয়ার্ড পুনর্গঠনের এই উদ্যোগের রাজনৈতিক গুরুত্বও কম নয়। পুরভোটের আগে ওয়ার্ডের সংখ্যা ও সীমানা বদলালে স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক দলগুলির নির্বাচনী কৌশলেও তার প্রভাব পড়তে পারে। কলকাতায় ১৪৪ থেকে ২০৯টি ওয়ার্ড হওয়ার প্রস্তাব সেই অর্থে বড় পরিবর্তন।
হাওড়ার ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিনের প্রশাসক-নির্ভর পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে নির্বাচনের দিকে এগোনোর পথ তৈরি করার চেষ্টা চলছে। ফলে বিধানসভায় পেশ হওয়া সংশোধনী বিল আগামী দিনের পুর রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
তবে বুধবারের অধিবেশনের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হয়ে রইল বিলের প্রশাসনিক দিক নয়, বরং রাজনৈতিক বাকযুদ্ধ। জিতেন্দ্র তিওয়ারির প্রশ্নের জবাবে ফিরহাদ হাকিমের সরাসরি স্মরণ করিয়ে দেওয়া—“ভুলে যেও না, তুমি আমার অধীনেই মেয়র ছিলে”—মুহূর্তেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। আর ঠিকাদারি প্রসঙ্গে তাঁর কটাক্ষের পর অধ্যক্ষের হস্তক্ষেপে আরও এক দফা উত্তাপ তৈরি হয়।
#KolkataHowrahWardDelimitation #FirhadHakim #KolkataMunicipalCorporation #HowrahMunicipalCorporation #WestBengalAssembly #WardReorganisation #MunicipalElection #JitendraTiwari #UmeshRai #WestBengalPolitics
সাম্প্রতিক পোস্ট
‘সাথীরা, প্রশ্নফাঁস মাফিয়াদের রেয়াত নয়’– সংসদে বিল পাসের পর প্রথমবার কী বললেন প্রধানমন্ত্রী?
সিলেবাসে বড় পরিবর্তন কবে থেকে? শিক্ষক নিয়োগেও সুখবর? কী বললেন শিক্ষামন্ত্রী?
আবার কি বদলে যাবে নোট? দেশে আসছে প্লাস্টিকের নোট,জানুন, কী বদল আসছে?
১লা আগস্ট থেকে স্কুলের খাবারের দায়িত্ব ইস্কনের, ডিম বিতরণ, ও শিক্ষক নিয়োগে বড় ঘোষণা

