নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: লাস ভেগাস বললেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে বিলাসবহুল হোটেল, ক্যাসিনো আর রঙিন আলো। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই মরুস্বর্গ বা ‘ডেজার্ট প্যারাডাইস’-এর ঠিক সাত তলা নিচে বাস করে প্রায় ১,৫০০ মানুষ? ২০০ মাইল দীর্ঘ এক অন্ধকার সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্কই তাঁদের স্থায়ী ঠিকানা, যেখানে দিনের আলো পৌঁছায় না বললেই চলে। এদের বলা হয় ‘মোল পিপল’ বা সুড়ঙ্গ মানব।
অন্ধকারের বাসিন্দা ও বদলে যাওয়া মনস্তত্ত্ব
এই সুড়ঙ্গগুলোর অন্ধকার এতটাই গভীর যে এখানকার মানুষের আচরণ ও চিন্তাভাবনা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। বছরের পর বছর সূর্যালোক না পেয়ে অনেকের ত্বকের রঙ ধূসর হয়ে গেছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ এখানেই জন্মেছেন, যাঁদের কোনো বৈধ পরিচয়পত্র বা আইডি কার্ড নেই। পুলিশের রেডিও এখানে কাজ করে না বলে অপরাধ করে পালানোর জন্য এটি এক আদর্শ জায়গা। এখানে নেশার করাল গ্রাস এতটাই যে, প্রতি মুহূর্তে নারকান (Narcan) স্প্রে সাথে রাখতে হয় ওভারডোজ হওয়া মানুষকে বাঁচানোর জন্য।
সুড়ঙ্গের বিভীষিকা: যখন জলই হয়ে ওঠে ঘাতক
এই সুড়ঙ্গগুলো মূলত তৈরি হয়েছিল লাস ভেগাস শহরের বৃষ্টির জল নিষ্কাশনের জন্য। মরুভূমির মাটি শক্ত হওয়ায় বৃষ্টির জল মাটি শুষতে পারে না, ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই সুড়ঙ্গগুলোতে ৮ ফুট পর্যন্ত উঁচু জলের ঢেউ আছড়ে পড়ে। ১৫ মাইল দূরে পাহাড়ে বৃষ্টি হলেও মাত্র ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে সুড়ঙ্গবাসীরা কোনো সতর্কতা ছাড়াই বন্যার কবলে পড়েন। অনেক বাসিন্দা এই অতর্কিত বন্যায় ডুবে প্রাণ হারিয়েছেন।
আরও পড়ুন : -71 ডিগ্রিতেও কীভাবে চলে জীবন? বিশ্বের শীতলতম গ্রাম ওউমিয়াকন
টিকে থাকার লড়াই ও ব্যক্তিগত টেরিটরি
সুড়ঙ্গের অন্দরে জীবন কাটানো মানেই প্রতি মুহূর্তে বিপদের সাথে লড়াই। নাতে, টবি বা টনি—এঁদের প্রত্যেকের গল্পই শিউরে ওঠার মতো। কেউ মাথায় চব্বিশ ইঞ্চি রডের আঘাত পেয়েছেন, কেউ আক্রান্ত হয়েছেন ধারালো মাচেতে (Machete) দিয়ে। সুড়ঙ্গের ভেতরেও রয়েছে ‘টেরিটরি’ বা এলাকা দখলের লড়াই। টনি নামের এক বাসিন্দা গত ৬ বছর ধরে এখানে আছেন, যার একমাত্র সঙ্গী তার একটি বিড়াল। মলের ভেতর দিয়ে যাওয়া ড্রেনেজ সিস্টেমের জল ব্যবহার করেই কেউ কেউ স্নানের কাজ সারেন।
উপরিভাগের চাকচিক্য বনাম নিচের জীর্ণতা
সুড়ঙ্গের ভেন্টিলেশন বা লোহার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে তাকালে উপরে দেখা যায় সিজার প্যালেসের (Caesar’s Palace) মতো হোটেল। যেখানে ক্যাসিনোগুলো বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করে, সেখানে মাত্র কয়েক ফুট নিচেই মানুষ ট্র্যাশ ক্যানে ফেলে দেওয়া খাবার খেয়ে বা অ্যালুমিনিয়াম প্যানে হ্যান্ড স্যানিটাইজার জ্বালিয়ে রান্না করে দিন কাটাচ্ছে। পর্যটকদের ফেলে যাওয়া জিনিসের ওপর ভিত্তি করেই চলে অনেকের জীবিকা।
জে বা ফিল-এর মতো মানুষেরা এখানে বছরের পর বছর কাটিয়ে দিয়েছেন। কারো কাছে এই সুড়ঙ্গই বাড়ি, আবার কারো কাছে এটি এক চিরস্থায়ী জেলখানা। লাস ভেগাসের এই পাতালপুরী আমাদের মনে করিয়ে দেয়, চাকচিক্যের আড়ালে সভ্যতা কতটা অসহায় হতে পারে।

