Maya Bhora Rati song: একটি গানের ভেতর ধরা আছে তিন প্রজন্মের শিল্পযাত্রা—শ্যামল গুপ্তের শব্দের মায়া, রবিশঙ্করের সুরের গভীরতা, লক্ষ্মী শঙ্করের কণ্ঠের আবেশ আর অরিজিৎ সিং-এর আধুনিক স্পর্শে ‘মায়া ভরা রাতি’ আজ সময়ের সীমা পেরিয়ে জীবন্ত হয়ে ওঠা এক চিরকালীন অনুভব।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: আবেগঘন সন্ধ্যা। অরিজিৎ সিং এর কন্ঠে নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে ‘মায়া ভরা রাতি, সাথী হারা চলে যায়’। গানটি শুরু করবার পূর্বেই অরিজিৎ সিং জানাচ্ছেন, একটি প্রজেক্টে অনুষ্কা শংকরের সঙ্গে তার এই গানটি রাখার বিষয়ে। গানটি গাওয়া মাত্র অনুষ্ঠানটি হয়ে যায় ভাইরাল। এই মুহূর্তে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রত্যেকটি পেজে দেখা যাচ্ছে এই দৃশ্য। একাধিক সংগীতশিল্পী শর্টসের মাধ্যমেই ইউটিউবে গানটি গাইছেন। কিন্তু গানটির নেপথ্যে কারা ছিলেন জানেন? গানটির গীতিকার ছিলেন বিখ্যাত গীতিকার সুরকার শ্যামল গুপ্ত। সংগীত পরিচালনায় রবি শংকর। সংগীতশিল্পী ছিলেন লক্ষ্মী শংকর। নিউজ অফবিট আজ আপনাদের জানাবে, গানটির নেপথ্যের শিল্পীদের কথা।
আরও পড়ুন : বই পড়লে কি মন শান্ত হয়? জানুন, স্ট্রেস কমাতে কীভাবে এই বিশেষ থেরাপি কাজ করে
কে ছিলেন লক্ষ্মী শংকর? (Maya Bhora Rati song)
লেখিকা কবিতা দাসের Poignant Song : The Life and Music of Lakshmi Shankar বইটি থেকে জানা যায়, শিল্পীর জীবনের গভীর দর্শনের কথা। বইটিতে তার ব্যক্তিগত জীবনের কথা উঠে এসেছে। বইটি শিল্পী অনুষ্কা শংকর কে উৎসর্গ করা হয়েছে। শিল্পী লক্ষ্মী শঙ্করের জীবন যেন একটি দীর্ঘ, গভীর রাগের মতো—যেখানে আনন্দ, বেদনা, সংগ্রাম আর সৃজনশীলতার অসংখ্য স্বর একে একে ধরা দেয়। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে তিনি শুধু একজন কণ্ঠশিল্পী নন, তিনি এক চলমান অধ্যায়। বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও তাঁর কণ্ঠে, স্মৃতিতে ও জীবনের দর্শনে আজও অমলিন এক দীপ্তি।
লক্ষ্মী শঙ্করের জন্ম এমন এক পরিবারে, যেখানে শিল্প ছিল শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো স্বাভাবিক। তাঁর বড় ভাই উদয় শঙ্কর ভারতীয় নৃত্যজগতের এক বৈপ্লবিক নাম, আর আরেক ভাই রবি শঙ্কর সেতারের মাধ্যমে বিশ্বে ভারতীয় সঙ্গীতের দূত। এই পরিবেশেই লক্ষ্মীর শিল্পীসত্তার প্রথম বিকাশ। খুব অল্প বয়সেই তিনি উদয় শঙ্করের নৃত্যদলে যোগ দেন। কিশোরী লক্ষ্মী তখন শুধু নৃত্যশিল্পী নন, মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি ছিল মুগ্ধ করার মতো। ইউরোপ ও আমেরিকায় উদয় শঙ্করের দলের সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়ে তিনি প্রত্যক্ষ করেন, কীভাবে পাশ্চাত্যের দর্শক প্রথমবারের মতো ভারতীয় শিল্পের রূপ, ছন্দ ও আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে।
কিন্তু জীবন সব সময় পরিকল্পনা মেনে চলে না। এক গুরুতর অসুস্থতা হঠাৎ করেই লক্ষ্মীর নৃত্যজীবনে ছেদ টানে। নাচ, যা ছিল তাঁর প্রথম ভালোবাসা, তা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া তাঁকে ভেতর থেকে ভেঙে দিয়েছিল। দীর্ঘ সময় হতাশা ও শূন্যতার মধ্যে কেটেছে। অথচ এই ভাঙনই ভবিষ্যতে তাঁর নতুন জন্মের বীজ বুনে দেয়। নাচ আর সম্ভব নয়—এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে তিনি ধীরে ধীরে নিজেকে আবিষ্কার করতে শুরু করেন কণ্ঠসাধনার ভেতর দিয়ে। তিনি অভিনয় করেছেন তামিল সবাক চলচ্চিত্রে। সেই সময়ের দর্শক তাঁকে চিনেছেন রূপালি পর্দার এক আকর্ষণীয় মুখ হিসেবে। কিন্তু অভিনয় ছিল ক্ষণিকের অধ্যায়। শেষ পর্যন্ত সংগীতই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের মূল আশ্রয়, মূল সাধনা। তিনি কেবল রাগ পরিবেশন করেননি, বরং তাঁর কণ্ঠে ভজন, ঠুমরি ও লোকসুরে এনে দিয়েছেন এক গভীর আবেগ। এই আবেগই তাঁকে আলাদা করেছে অন্যদের থেকে। তাঁর গান শুনে প্রবাসী ভারতীয়রা যেন মুহূর্তে ফিরে যেতেন নিজের শেকড়ে—মায়ের মুখ, গ্রামের মন্দির, সন্ধ্যার আরতির ধ্বনি।
বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ সংগীতশিল্পী জর্জ হ্যারিসনের সঙ্গে তাঁর কাজ শুধু পেশাগত ছিল না, ছিল গভীর বন্ধুত্বেরও। মঞ্চের বাইরে তাঁরা ছিলেন পরস্পরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এই সহযোগিতার মাধ্যমে লক্ষ্মীর কণ্ঠ পৌঁছে যায় এমন সব শ্রোতার কাছে, যাঁরা আগে কখনও ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শোনেননি।
জীবনের শেষ প্রান্তেও লক্ষ্মী শঙ্করের পথ মসৃণ ছিল না। তাঁর একমাত্র কন্যা বিজির অকালপ্রয়াণ ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে গভীর ক্ষত। বিজি শুধু তাঁর সন্তানই ছিলেন না, ছিলেন মঞ্চের সহযাত্রী, গানের সঙ্গী। লক্ষ্মী শঙ্করের জীবন আমাদের শেখায়, শিল্প কখনও একরেখায় চলে না। কখনও তা ভেঙে যায়, আবার নতুন রূপে জন্ম নেয়। নিজের শিকড়ে দৃঢ় থেকে, অন্য সংস্কৃতির প্রতি খোলা মন রাখলে শিল্পী শুধু টিকে থাকেন না—তিনি সময়কে অতিক্রম করে যান।
তাই তো পিলু রাগের উপর এমন অনবদ্য সৃষ্টি মানুষের মনকে ভরিয়ে তোলে। নিয়ে যায় অজানা সুরের জগতে। পন্ডিত রবিশঙ্কর গানটিতে সুর দিয়েছিলেন। কিন্তু এবার বলব সেই শিল্পীর কথা যার হাতে সৃষ্টি হয়েছিল এমন গানের কথার। তিনি শ্যামল গুপ্ত।
আধুনিক বাংলা গানের নীরব কারিগর শ্যামল গুপ্ত
বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে শেষভাগ পর্যন্ত বাংলা আধুনিক গানের যে স্বর্ণযুগ, তার অন্যতম প্রধান রূপকার ছিলেন তিনি। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ৩ ডিসেম্বর কলকাতায় তাঁর জন্ম। যদিও তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল বিহারের জামালপুরে এবং আদি বাসস্থান বর্তমান উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার হালিশহর অঞ্চলে। পারিবারিক পরিবেশ ছিল শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনস্ক। তাঁর পিতামহ ও পিতা উভয়েই মুঙ্গের আদালতের আইনজীবী ছিলেন। শৈশব থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর নিবিড় পরিচয় ঘটে। কলকাতার স্কটিশ চার্চ বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে তিনি ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে রসায়নশাস্ত্রে অনার্সসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

সঙ্গীতজীবনের শুরুতে শ্যামল গুপ্ত গায়ক হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করেন। বিখ্যাত গ্রামোফোন সংস্থায় তিনি তিনটি গানের রেকর্ড করেন। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই উপলব্ধি করেন, তাঁর প্রকৃত শক্তি কণ্ঠে নয়—কলমে ও সুরের ভেতর।শুধু আধুনিক গান নয়, তিনি আকাশবাণীর জন্য রম্যগীতি, রাগাশ্রয়ী গান, লঘুসংগীত এবং বাংলা চলচ্চিত্রের জন্যও অসাধারণ সব গান রচনা করেছেন। পাশাপাশি চলচ্চিত্রে কাহিনি, চিত্রনাট্য ও সংলাপ লেখার কাজেও তাঁর দক্ষতার পরিচয় মেলে। ‘বধূবরণ’ ও ‘পুতুলঘর’ ছবির কাহিনিকার ও চিত্রনাট্যকার ছিলেন তিনি। সংগীত শিক্ষার ক্ষেত্রে তিনি তারাপদ চক্রবর্তীর শিষ্য মণি ঘোষের কাছে মার্গসঙ্গীতের প্রাথমিক পাঠ গ্রহণ করেন। তবে তাঁর গান লেখার মূল প্রেরণা ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষ সপ্তক’ কাব্যগ্রন্থ—যার প্রভাব তাঁর গানের ভাষা ও ভাবনায় স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
শ্যামল গুপ্ত কেবল গীতিকারই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সাহিত্যিক মননের মানুষ। ‘অরণি’, ‘অভ্যুদয়’ ও ‘একক’ পত্রিকায় তিনি কবিতা লিখেছেন। আবার ‘বসুমতী’ ও ‘সত্যযুগ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ছোটগল্প। তাঁর সৃষ্টিশীলতার ব্যাপ্তি ছিল বহুমুখী, কিন্তু সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল অনুভবের সূক্ষ্মতা।
তাঁর রচিত গানের সংখ্যা প্রায় দুই হাজারের কাছাকাছি, যার মধ্যে প্রায় তিনশো গান লেখা হয়েছিল চলচ্চিত্রের জন্য। ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় তাঁর গীতসংকলন ‘আধুনিক গান’, যা আজও বাংলা গানের অনুরাগীদের কাছে এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ব্যক্তিজীবনে ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে—যাঁর কণ্ঠে শ্যামল গুপ্তের বহু গান অমর হয়ে উঠেছে।
জগন্ময় মিত্র থেকে মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় থেকে লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসল থেকে আরতি মুখোপাধ্যায়—সেই সময়ের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠে তাঁর গান নতুন নতুন মাত্রা পেয়েছে। এই শিল্পীদের কণ্ঠে তাঁর গান শুধু জনপ্রিয়ই হয়নি, হয়ে উঠেছে কালজয়ী।
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর জীবনের প্রথম দুটি গান সুর দিয়ে গেয়েছিলেন জগন্ময় মিত্র—‘প্রণাম তোমায় হে নির্ভয়’ এবং ‘অন্তবিহীন নয় তো অন্ধকার’। এরপর একের পর এক সৃষ্টি বাংলা গানের ভুবনকে সমৃদ্ধ করেছে। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘চন্দন পালঙ্কে শুয়ে একা একা কী হবে’ বা ‘ঝরা পাতা ঝড়কে ডাকে’, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘আমি এত যে তোমায় ভালোবেসেছি’ কিংবা ‘ওই মৌসুমী মন শুধু রং বদলায়’—এই গানগুলো আজও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শ্রোতার হৃদয়ে অনুরণিত হয়।
২০১০ খ্রিস্টাব্দের ২৮ জুলাই শ্যামল গুপ্তের জীবনাবসান ঘটে। তবে তাঁর প্রস্থান মানে নীরবতা নয়। বাংলা গানের প্রতিটি সংবেদনশীল মুহূর্তে, প্রেমের প্রতিটি গোপন উচ্চারণে, একাকিত্বের প্রতিটি সন্ধ্যায় তাঁর লেখা গান আজও বেঁচে আছে।
‘মায়া ভরা রাতি’ গানটি যেন লক্ষ্মী শঙ্কর ও শ্যামল গুপ্ত—এই দুই শিল্পীর সৃষ্টিসত্তার এক অপূর্ব মিলনবিন্দু। একদিকে শ্যামল গুপ্তের লেখা গভীর অনুভবময় কথা, যেখানে রাত, নিঃশব্দতা আর প্রেম এক অদ্ভুত মায়ায় জড়িয়ে থাকে; অন্যদিকে লক্ষ্মী শঙ্করের কণ্ঠ, যা সেই কথাগুলিকে শুধু সুর দেয় না, বরং আত্মা দেয়। এই গানটিতে শ্যামল গুপ্তের শব্দ আর লক্ষ্মী শঙ্করের স্বর মিলিয়ে যে আবহ তৈরি হয়েছিল, তা ছিল সময়ের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো—নরম, সংযত, অথচ গভীরভাবে আবিষ্ট করা।
পন্ডিত রবিশঙ্করের সুরের যাত্রা
পণ্ডিত রবি শংকর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে এক অনন্য নাম। ১৯২০ সালে উত্তরপ্রদেশের বারাণসীতে জন্মগ্রহণ করেন এই অসাধারণ প্রতিভাধর সঙ্গীতশিল্পী। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে শিল্পচেতনা ও সঙ্গীতের প্রতি গভীর আকর্ষণ দেখা যায়। তবে তাঁর শিল্পজীবনের শুরুটা কিন্তু সেতার দিয়ে নয়, নৃত্যের মাধ্যমে।
যুবক বয়সে তিনি তাঁর বড় ভাই উদয় শংকরের বিখ্যাত নৃত্যদলের অন্যতম সদস্য হিসেবে ইউরোপসহ বিশ্বের নানা দেশে অনুষ্ঠান করতে শুরু করেন। সেই সময় উদয় শংকরের ডান্স ট্রুপ ভারতীয় নৃত্য ও সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরছিল। রবি শংকরও সেই দলের সঙ্গে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সফর করে বহু দর্শকের সামনে পারফর্ম করেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি অনুভব করতে শুরু করেন যে, শুধুমাত্র একজন নৃত্যশিল্পী হয়ে জীবন কাটানোই তাঁর প্রকৃত লক্ষ্য নয়। তাঁর মন টানছিল সঙ্গীতের গভীর জগতে। এই উপলব্ধির পর তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৩৮ সালে তিনি নাচ ছেড়ে সম্পূর্ণ মনোযোগ দেন সেতার শিক্ষায়। তিনি সেতার শেখা শুরু করেন ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অন্যতম মহান গুরু ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান সাহেবের কাছে। আলাউদ্দিন খানের কঠোর শাস্ত্রীয় শিক্ষার পরিবেশে তিনি বহু বছরের কঠোর সাধনা করেন। ১৯৩৮ সাল থেকে প্রায় ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত তিনি গুরুজির কাছে তালিম নেন। এই সময়টিই তাঁর সঙ্গীতজীবনের ভিত্তি গড়ে দেয়। গুরু-শিষ্য পরম্পরায় কঠোর অনুশীলনের মধ্য দিয়ে তিনি সেতারের গভীরতা ও সূক্ষ্মতা আয়ত্ত করেন।
এই শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার পর আর তাঁকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। খুব দ্রুতই তিনি ভারতীয় সঙ্গীতজগতে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেন। সমগ্র ভারতবর্ষে তাঁর সেতারের সুর ছড়িয়ে পড়ে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চেও তিনি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন। পণ্ডিত রবি শংকর শুধু একজন সেতারবাদকই ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন সঙ্গীত পরিচালক ও সুরকারও। তিনি বিভিন্ন চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রের সঙ্গীত। তাঁর সুরারোপ ভারতীয় চলচ্চিত্রসঙ্গীতেও একটি বিশেষ মাত্রা যোগ করেছিল।
এছাড়াও তিনি ১৯৪৯ সাল থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত অল ইন্ডিয়া রেডিও, নিউ দিল্লি-তে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেন। সেখানে তিনি “ন্যাশনাল অর্কেস্ট্রা” গঠনের মাধ্যমে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে নতুনভাবে উপস্থাপন করার উদ্যোগ নেন। এই সময় তাঁর কাজ ভারতীয় সঙ্গীতের আধুনিক উপস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৫৭ সালে এশিয়া সোসাইটি-র উদ্যোগে পণ্ডিত রবি শংকর প্রথমবার আমেরিকায় কনসার্ট করার সুযোগ পান। সেই সফরই ছিল তাঁর প্রথম আমেরিকা সফর, যা পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক সঙ্গীতজগতে তাঁর উত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হয়ে দাঁড়ায়। এরপর তিনি ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে অসংখ্য কনসার্ট করেন এবং ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেন।
পণ্ডিত রবি শংকরকে প্রায়ই বলা হয় ভারতীয় সঙ্গীতের “সাংস্কৃতিক দূত”। কারণ তিনি শুধু নিজের সঙ্গীত পরিবেশনই করেননি, বরং বিশ্বের মানুষের কাছে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের গভীরতা ও সৌন্দর্য তুলে ধরেছেন। তাঁর শিক্ষা, কর্মশালা এবং সহযোগিতার মাধ্যমে বহু বিদেশি শিল্পী ভারতীয় সঙ্গীতের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন।
বিশেষ করে তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সঙ্গীতধারার মধ্যে এক অসাধারণ মেলবন্ধন সৃষ্টি করেছিলেন। পাশ্চাত্য সঙ্গীতশিল্পীদের সঙ্গে তাঁর সহযোগিতা এবং বিভিন্ন পরীক্ষামূলক সুরসৃষ্টি ভারতীয় সঙ্গীতকে নতুন মাত্রা দেয়। এর ফলে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শুধু একটি আঞ্চলিক শিল্পরূপ হিসেবে নয়, বরং একটি বিশ্বজনীন সঙ্গীতধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। এইভাবেই পণ্ডিত রবি শংকর তাঁর সেতারের মাধ্যমে ভারতীয় সঙ্গীতকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সঙ্গীতের মধ্যে এক অনন্য সেতুবন্ধন গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর অবদান আজও সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। ধ্রুপদী ঘরানার ‘মায়া ভরা রাতি’ পন্ডিত রবিশংকরের সুরের জাদুতে এক নতুন মাত্রা লাভ করল।
বহু বছর পরে যখন একই গানের নতুন রূপে অরিজিৎ সিং-এর কণ্ঠে ‘মায়া ভরা রাতি’ নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছয়, তখন আসলে সেই পুরনো সৃষ্টির শক্তিই আবার প্রমাণিত হয়। অরিজিৎ সিং গানটিকে সমসাময়িক অনুভবে গেয়ে তুলেছেন, কিন্তু তার মূল আবেগ, শব্দের মায়া ও সুরের অন্তর্লীন বিষণ্নতা আজও বহন করে শ্যামল গুপ্তের কলম আর লক্ষ্মী শঙ্করের কণ্ঠের স্মৃতি। এই ধারাবাহিকতাই দেখায়, সত্যিকারের গান কখনও পুরনো হয় না—সে শুধু নতুন কণ্ঠে, নতুন সময়ে ফিরে আসে।
গানটির কথা (Maya Bhora Rati Lyrics)
মায়াভরা রাতি, সাথী হারা চলে যায়
কেন এলেনা, ওগো
নিশীথ বাতাসে, বনযূথি দোলে
বাতায়নে দ্বীপ নিভে গেল জ্বলে
ছলছল চোখে চাঁদ কি যে বলে যায়
চলে গেলে না।
কিছু অভিমানে, কিছু অনুরাগে
মন বলে যেন কত ব্যথা লাগে।
মনে মনে যেন কত ব্যথা লাগে
মনবীণা শুধু কেঁদে কেঁদে বেজে যায়
সাড়া পেলে না। হায়!
মায়াভরা রাতি, সাথী হারা চলে যায়
#music #anushkashankar #arijitsingh #bikramghosh #mayabhorarati #mayabhoraratilyrics #bengalisong
সাম্প্রতিক পোস্ট
- আর কিছুক্ষণের অপেক্ষা! তিন ধাপে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ, কীভাবে জানবেন আপনার নাম আছে কি না?
- ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বাজেট কি জনদরদী হতে চলেছে? জানুন, লাইভ বাজেট আপডেট ২০২৬
- পুরনো ধাতুর ওপর বিশ্বাস │ রাজপথে কীভাবে ভিন্টেজ গাড়ি হয়ে ওঠে চলমান ইতিহাস
- ঘরশত্রু বিভীষণ কি ইরানের সংকটের কারণ হল? আমেরিকা কোন বিশেষ বাহিনীকে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে?
- ২০০ বছরের পুরনো রাজকীয় ‘নাচঘর’ আজ অত্যাধুনিক আইসিইউ!

