মাইক্রোওয়েভ ওভেন কি শুধুই খাবার গরম করার জন্য? এই ধারণা আজই বদলে ফেলুন। গ্যাসের আঁচ ছাড়াই মাত্র ৩০ মিনিটে তৈরি করুন জিরা রাইস, মুগের ডাল এবং পনির বাটার মাসালা। ব্যস্ত ব্যাচেলর বা কর্মব্যস্ত গৃহিণীদের জন্য রইল সম্পূর্ণ থালি তৈরির Microwave Lunch Recipes।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: রান্নাঘরে ঢুকলেই গরম ভাপ, মশলা কষানোর ধোঁয়া আর ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে খুন্তি নাড়া—বাঙালি রান্নার এই চিরাচরিত ছবিটা আমাদের সবার চেনা। কিন্তু ভাবুন তো, যদি এমন কোনো জাদুর যন্ত্র থাকে যেখানে আগুনের আঁচ ছাড়াই, ঘাম না ঝরিয়েই তৈরি হয়ে যাবে আপনার দুপুরের সম্পূর্ণ মেনু?
না, আমি কোনো সায়েন্স ফিকশন সিনেমার কথা বলছি না। বলছি আপনার রান্নাঘরের কোণে অবহেলায় পড়ে থাকা ওই ‘মাইক্রোওয়েভ ওভেন’টির কথা। বেশিরভাগ বাড়িতেই এই যন্ত্রটির কাজ খুব সীমিত—হয় ফ্রিজ থেকে বের করা বাসি তরকারি গরম করা, আর না হয় মাঝেমধ্যে একটু পপকর্ন ফাটানো। কিন্তু জানেন কি, এই বক্সটি আসলে একটি ‘মিনি কিচেন’?
বিশেষ করে যারা মেসে থাকেন, বা যেসব কর্মব্যস্ত দম্পতি সকালে রান্নার জন্য সময় পান না—তাদের জন্য মাইক্রোওয়েভ কুকিং হতে পারে লাইফ সেভার। গ্যাসের চেয়ে অনেক কম সময়ে, অনেক কম তেলে এবং পুষ্টিগুণ বজায় রেখে এতে রান্না করা সম্ভব। আজ ‘ভোজ-ON’ আপনাদের শেখাবে কীভাবে মাইক্রোওয়েভ ব্যবহার করে ডাল-ভাত-তরকারির একটি সম্পূর্ণ লাঞ্চ থালি তৈরি করবেন।
ভয় পাবেন না, এতে ইলেকট্রিক শক লাগার বা খাবার বিস্বাদ হওয়ার কোনো ভয় নেই। শুধু কয়েকটা ট্রিকস জানলেই আপনি হয়ে উঠবেন মাইক্রো শেফ। আসুন, শুরু করা যাক আমাদের ‘ফ্লেমলেস কুকিং’ বা আগুনহীন রান্নার অভিযান।

১. মাইক্রোওয়েভ জিরা রাইস (Microwave Jeera Rice)
গ্যাসে ভাত বসলে ফ্যান গালার ঝামেলা থাকে, পুড়ে যাওয়ার ভয় থাকে। কিন্তু মাইক্রোওয়েভে ভাত হয় একদম ঝরঝরে, একে অপরের গায়ে লাগে না।
বানাতে যা যা লাগবে:
- বাসমতি চাল – ১ কাপ (ভালো করে ধুয়ে ৩০ মিনিট ভিজিয়ে রাখা)
- জল – ২ কাপ (চালের দ্বিগুণ)
- ঘি – ১ চামচ
- গোটা জিরে – ১ চামচ
- গোটা গরম মশলা (এলাচ, লবঙ্গ, দারুচিনি) – ১ টুকরো করে
- তেজপাতা – ১টি
- লবণ – স্বাদমতো
বানাবেন যে ভাবে: ১. পাত্র নির্বাচন: রান্নার জন্য অবশ্যই একটি বড় মাইক্রোওয়েভ সেফ কাঁচের বাটি (Borosilicate Glass Bowl) নিন। বাটিটি যেন গভীর হয়, কারণ ভাত ফুটলে জল উপচে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
২. ফোড়ন প্রস্তুতি: কাঁচের বাটিতে ঘি, গোটা জিরে, গরম মশলা এবং তেজপাতা নিন। এটি মাইক্রোওয়েভে ‘High Power’-এ ১ মিনিট গরম করুন। এতে ঘি গরম হয়ে মশলার গন্ধ বেরিয়ে আসবে।
৩. চাল ও জল: এবার ওই গরম মশলার বাটিতে ভিজিয়ে রাখা চাল (জল ঝরিয়ে) দিন। চালের সঙ্গে ২ কাপ জল এবং স্বাদমতো লবণ মেশান। ভালো করে নেড়ে দিন।
৪. কুকিং টাইম: বাটিটি ঢাকনা ছাড়া (Uncovered) মাইক্রোওয়েভে ঢোকান। ‘High Power’-এ ১২ মিনিট টাইম সেট করুন।
৫. স্ট্যান্ডিং টাইম: ১২ মিনিট পর বের করে দেখবেন না। মাইক্রোওয়েভের দরজা বন্ধ রেখেই আরও ৫ মিনিট রেখে দিন। একে বলা হয় ‘স্ট্যান্ডিং টাইম’। এই সময়ে ভাপের মধ্যেই চাল বাকিটুকু সেদ্ধ হয়ে একদম নরম ও ঝরঝরে হয়ে যাবে।
৬. ৫ মিনিট পর বের করে কাঁটা চামচ দিয়ে আলতো করে নেড়ে দিন। তৈরি আপনার পারফেক্ট জিরা রাইস।

২. ভাজা মুগের ডাল (Roasted Moong Dal)
কড়াইতে ডাল ভাজতে গেলে হাত ব্যথা হয়ে যায়, পুড়ে যাওয়ার ভয় থাকে। মাইক্রোওয়েভে ডাল ভাজা এবং রান্না—দুটোই খুব সহজ।
বানাতে যা যা লাগবে:
- সোনা মুগের ডাল – আধা কাপ
- জল – ২ কাপ
- হলুদ গুঁড়ো – আধা চামচ
- কাঁচা লঙ্কা – ২টো
- টমেটো কুচি – ১টি ছোট
- সরষের তেল – ১ চামচ
- ফোড়নের জন্য: শুকনো লঙ্কা, জিরে ও তেজপাতা
- লবণ ও মিষ্টি – স্বাদমতো
বানাবেন যে ভাবে: ১. ডাল ভাজা: একটি শুকনো কাঁচের বাটিতে কাঁচা মুগের ডাল নিন। মাইক্রোওয়েভে ‘High Power’-এ ২ মিনিট ঘুরিয়ে নিন। ১ মিনিট পর একবার বের করে নেড়ে দেবেন যাতে সব দিক সমান ভাজা হয়। সুন্দর গন্ধ বেরোলে বুঝবেন ডাল ভাজা হয়ে গেছে।
২. সেদ্ধ করা: ভাজা ডাল ধুয়ে নিন। এবার বাটিতে ডাল, ২ কাপ জল, হলুদ, কাঁচা লঙ্কা চেরা এবং টমেটো কুচি দিন। মাইক্রোওয়েভে ‘High Power’-এ ১৫ মিনিট টাইম দিন। (খেয়াল রাখবেন বাটি যেন বড় হয়, নাহলে ডাল উথলে পড়তে পারে)।
৩. ফোড়ন তৈরি: ডাল সেদ্ধ হয়ে গেলে বের করে নিন। একটি ছোট মাইক্রোওয়েভ সেফ বাটিতে তেল, জিরে, শুকনো লঙ্কা ও তেজপাতা নিয়ে ১ মিনিট ‘High Power’-এ গরম করুন।
৪. ফাইনাল স্টেপ: এই গরম ফোড়নটা সেদ্ধ ডালের মধ্যে ঢেলে দিন। স্বাদমতো লবণ ও চিনি মেশান। আবার ডালের বাটিটা মাইক্রোওয়েভে ২ মিনিটের জন্য দিয়ে দিন। এতে ফোড়নের গন্ধ ডালের সঙ্গে মিশে যাবে। তৈরি আপনার সুস্বাদু মুগের ডাল।

৩. রিচ পনির বাটার মাসালা (Microwave Paneer Butter Masala)
পনির রান্না করতে গেলে মশলা কষাতে অনেকটা তেল লাগে। কিন্তু মাইক্রোওয়েভে নামমাত্র মাখনেই তৈরি হবে জিভে জল আনা পনির।
বানাতে যা যা লাগবে:
- পনির – ২০০ গ্রাম (কিউব করে কাটা)
- পেঁয়াজ বাটা – ১টি বড়
- টমেটো পিউরি – ২ চামচ
- আদা-রসুন বাটা – ১ চামচ
- মাখন – ২ চামচ
- কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো – ১ চামচ
- গরম মশলা গুঁড়ো – আধা চামচ
- কসৌরি মেথি – ১ চামচ
- ফ্রেশ ক্রিম বা দুধ – ২ চামচ
- লবণ ও চিনি
বানাবেন যে ভাবে: ১. মশলা কষানো: একটি মাইক্রোওয়েভ সেফ বাটিতে মাখন, পেঁয়াজ বাটা, আদা-রসুন বাটা দিন। ভালো করে মিশিয়ে মাইক্রোওয়েভে ‘High Power’-এ ৩ মিনিট রান্না করুন। মাঝখানে একবার বের করে নেড়ে দেবেন।
২. গ্রেভি তৈরি: পেঁয়াজ ভাজা হয়ে গেলে তাতে টমেটো পিউরি, কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো, লবণ ও চিনি দিন। ভালো করে মিশিয়ে আবার ২ মিনিট মাইক্রোওয়েভ করুন। দেখবেন মশলা থেকে তেল (মাখন) ছেড়ে দিয়েছে।
৩. পনির যোগ: এবার মশলার বাটিতে পনিরের টুকরোগুলো দিন। আধা কাপ জল দিন। ভালো করে মিশিয়ে ঢাকনা দিয়ে (মাইক্রোওয়েভ সেফ লিড বা প্লেট দিয়ে আলগা করে ঢেকে) ৪ মিনিট রান্না করুন।
৪. ফাইনাল টাচ: ৪ মিনিট পর বের করে গরম মশলা গুঁড়ো, কসৌরি মেথি (হাতে ঘষে) এবং ফ্রেশ ক্রিম মেশান। আবার ১ মিনিটের জন্য মাইক্রোওয়েভে দিন। ব্যাস! রেস্তোরাঁ স্টাইল পনির বাটার মাসালা রেডি।

৪. বোনাস: ভাপা আলু (Spicy Bhapa Aloo)
ডাল আর পনিরের সঙ্গে একটা শুকনো তরকারি না থাকলে লাঞ্চ জমে না। ৫ মিনিটে বানিয়ে ফেলুন এই ভাপা আলু।
বানাতে যা যা লাগবে:
- ছোট আলু (Baby Potatoes) – ১০-১২টি (খোসা সহ বা ছাড়ানো)
- সরষের তেল – ১ চামচ
- কালো জিরে – সামান্য
- পোস্ত বাটা বা সরষে বাটা – ১ চামচ
- কাঁচা লঙ্কা বাটা ও লবণ
বানাবেন যে ভাবে: ১. ছোট আলুগুলো ভালো করে ধুয়ে একটি ফর্ক বা কাঁটা চামচ দিয়ে গায়ে ফুটো করে নিন (Prick করুন)।
২. একটি বাটিতে আলু, তেল, মশলা বাটা, লবণ এবং কাঁচা লঙ্কা বাটা একসঙ্গে ভালো করে মাখিয়ে নিন। সামান্য (২ চামচ) জল দিন।
৩. বাটিটি ঢাকনা দিয়ে মাইক্রোওয়েভে ‘High Power’-এ ৫-৭ মিনিট রান্না করুন। ৫ মিনিট পর চেক করুন আলু সেদ্ধ হয়েছে কি না। না হলে আরও ২ মিনিট দিন। তেল ঝাঁঝালো ভাপা আলু তৈরি!
মাইক্রোওয়েভ রান্নার কিছু জরুরি টিপস ও সতর্কতা
১. পাত্র নির্বাচন (Utensils): ভুলেও স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম বা ধাতব কোনো পাত্র মাইক্রোওয়েভে দেবেন না। এতে স্পার্কিং হয়ে আগুন লাগতে পারে। সবসময় ‘Microwave Safe’ লেখা কাঁচ (Glass), সিরামিক বা ভালো মানের প্লাস্টিক ব্যবহার করুন। তবে রান্নার জন্য কাঁচই সেরা।
২. স্ট্যান্ডিং টাইম (Standing Time): মাইক্রোওয়েভ রান্নার একটি গোল্ডেন রুল হলো ‘স্ট্যান্ডিং টাইম’। ওভেন বন্ধ হওয়ার পরেও খাবারের ভেতরের অণুগুলো কাঁপতে থাকে এবং রান্না হতে থাকে। তাই রান্না শেষ হওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে বের না করে ২-৩ মিনিট ভেতরেই রেখে দিন। এতে স্বাদ বাড়ে।
৩. নাড়াচাড়া (Stirring): মাইক্রোওয়েভে তাপ সবদিকে সমানভাবে নাও লাগতে পারে। তাই রান্নার মাঝপথে একবার বের করে হাতা দিয়ে খাবার নেড়ে দেওয়া খুব জরুরি। একে বলা হয় ‘Stirring’।
৪. জলের মাপ: গ্যাসে রান্না করলে জল বাষ্প হয়ে উড়ে যায়, তাই জল বেশি লাগে। মাইক্রোওয়েভে জল খুব কম নষ্ট হয়। তাই সাধারণ রান্নার চেয়ে এখানে কম জল ব্যবহার করবেন।
৫. ঢাকনা: খাবার ঢেকে রান্না করলে তাড়াতাড়ি হয়। তবে ঢাকনা পুরোপুরি টাইট দেবেন না, একটু ফাঁক রাখবেন যাতে বাষ্প বেরোতে পারে। অথবা ঢাকনায় ছিদ্র (Vent) থাকতে হবে।
দেখলেন তো? মাইক্রোওয়েভ মানেই শুধু বাসি খাবার গরম করা নয়। একটু বুদ্ধি খাটালে এই যন্ত্রটি আপনার রান্নার সময় অর্ধেক করে দিতে পারে। বিশেষ করে গরমকালে যখন রান্নাঘরে দাঁড়াতে ইচ্ছে করে না, তখন এই রেসিপিগুলো ট্রাই করুন। ভাত ঝরঝরে হবে, ডাল সুসিদ্ধ হবে আর পনির হবে মাখনের মতো নরম—আর সবটাই হবে আপনার রান্নাঘরকে ঠান্ডা রেখে। আজই ট্রাই করুন এই Microwave Lunch Recipes আর চমকে দিন বাড়ির সবাইকে!
(আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাশিফল আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল WhatsApp চ্যানেলে যোগ দিন! সবচেয়ে আগে পান জ্যোতিষ, অফবিট নিউজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনধারা ও অফবিট এক্সক্লুসিভ আপডেট —আমাদের WhatsApp Channel-এ যোগ দিন)
সাম্প্রতিক পোস্ট
- Gen Z-এর প্রেমের নতুন শব্দভান্ডার জানেন? ভালোবাসার নতুন ব্যাকরণ শিখুন | Gen Z Love Trends 2026
- ব্যস্ত সকালে এই ৫টি Tiffin Recipe রাখুন রোজের তালিকায় | Easy Tiffin Recipes
- ঠাকুর, দেবতা, ভগবান ও ঈশ্বর কি একই? গুলিয়ে ফেলার আগে জেনে নিন আসল তফাৎ | God vs Deity Meaning in Bengali
- জানুন, ব্যক্তি সুভাষের অনন্য প্রেমকাহিনী: সুভাষ ও এমিলি
- গান্ধী বনাম নেতাজি—মূল পার্থক্যটা কোথায়? | Gandhi vs Netaji

