বিয়ে কি শুধুই সামাজিক প্রথা, নাকি বিশ্বাসের এক গভীর বুনন? আধুনিকতার স্রোতে আজ সেই বুনন আলগা হচ্ছে, বাড়ছে বিচ্ছেদ। কিন্তু কেন এই অবিশ্বাস? বর্তমান সময়ের সম্পর্কের এই ভাঙাগড়া আর তার নেপথ্য কাহিনি নিয়েই লিখছেন মৌ চৌধুরী।
অনেকেই মনে করেন, সামাজিক কারণে বা গোষ্ঠীবদ্ধতার প্রয়োজনে বিবাহ প্রথার সৃষ্টি। তখন রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক যা কারণেই বিবাহের উদ্ভব হোক না কেন, মানুষের ধ্যান-ধারণা ছিল অন্যরকম। সামাজিক বন্ধন ছিল আরও দৃঢ়। নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার সুযোগ বা প্রচেষ্টাও তখন এতটা ছিল না। নারী-পুরুষের পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা বা নিজের পছন্দে বিয়ে করার বিষয়টি তখন বিশেষ গুরুত্ব পেত না। বিয়ের পর সামাজিক ও পারিবারিক নিয়ম-শৃঙ্খলার ভেতরেই জীবন কাটত। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় এই শৃঙ্খলা যেন দাসত্বের নিগড় হয়ে দাঁড়াত। কেবল সন্তানের জন্ম দেওয়া, তাদের বড় করা এবং সংসার সামলানোই ছিল প্রধান দায়িত্ব বা কাজ। পরিবারের জ্যেষ্ঠদের হুকুমই ছিল শেষ কথা।
সময় বদলেছে। শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে এখন নারী-পুরুষ সবাই একসঙ্গে পা মিলিয়ে চলছে। আর বিভিন্ন কারণে আছে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার অফুরন্ত সুযোগ। পাশাপাশি আছে প্রেম-ভালোবাসার উত্থান-পতন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জীবনসাথী তারা নিজেরাই নির্বাচন করছে। বিষয়টা সবটাই মন্দ বা সমাজের অবক্ষয়—এমনটা কখনই নয়। তবে বিষয়টি ভাবনার। অনেক ক্ষেত্রেই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে বিয়ে পর্যন্ত সম্পর্কটাকে নিয়ে যাওয়ার পর অনেকের কাছেই হাজারো সমস্যা এসে যাচ্ছে। প্রধানত, পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা হারিয়ে যাচ্ছে। কেউ যেন কাউকে একচুল জমি ছাড়তে রাজি নয়। ফলে বাড়ছে গরলসম বিষাদময় বৈবাহিক সম্পর্ক। এখন থেকে মাত্র পঞ্চাশ বছর আগে যখন প্রগতিশীল ভাবনার ছবি ‘গুগাবাবা’, ‘সীমাবদ্ধ’ অথবা ‘স্ত্রীর পত্র’ তৈরি হচ্ছে, তখনও আকছার বিয়ে ভাঙা বা ডিভোর্স দেখা যেত না। এখন ব্যক্তি সংঘাত, নৈতিকতা, ‘একসঙ্গে চলা অসম্ভব’ এবং অবশ্যই মূলত মহিলাদের প্রতি শ্বশুরবাড়ির অবিচার-অত্যাচারের জন্য বিচ্ছেদের সংখ্যার ব্যাপকতা এসেছে। প্রায় প্রতিদিনই সমঝোতার মাধ্যমে অথবা অন্য কোনও কারণ দেখিয়ে স্বামী বা স্ত্রী, অথবা দুজনেই একসঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা রুজু করছে। এখনই হয়তো এইগুলিকে ‘সামাজিক অবক্ষয়’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না, তবে সার্বিকভাবে ভাবনার সময় এসেছে।
এখন মূলত অর্থনৈতিক কারণে নিউক্লিয়ার পরিবারে মা-বাবা দুজনেই জীবিকার প্রয়োজনে ঘরের বাইরে বেশি সময় দেন। ফলে বাড়িতে থাকা তাঁদের সন্তান ছোট থেকেই একা জীবন কাটাতে বাধ্য হয়। একটি দম্পতিকে জানি, তারা বিয়ের আগে প্রায় বারো বছর সম্পর্কে যুক্ত ছিল। বিয়ের ঠিক দু’মাসের মধ্যে তারা বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা করেছে। কারণ—‘একসঙ্গে থাকা যায় না’। অনেকেই মনে করেন, বর্তমান প্রজন্মের কাছে ভালোবাসা, বিশ্বাস ও পরস্পরের প্রতি আস্থা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। প্রায় সবাই যথাযথ শিক্ষিত এবং রোজগার করে বলে প্রতিনিয়ত ইগোর লড়াই চলছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, এই প্রজন্মের দম্পতিরা সংসারে কারও জন্য দায়িত্ব নিতে রাজি নয়। একটা যেন বেপরোয়া মনোভাব। ব্যতিক্রম ছাড়া বিবাহিত-অবিবাহিত সকলের ভেতর অবিরাম নতুন নতুন সম্পর্কের ভাঙাগড়া চলছে। এই কারণেই বাড়ছে লিভ-ইন প্রথা। মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, লিভ-ইন হলো অস্থির মনের এক দায়িত্বজ্ঞানহীন, স্বপ্নকালীন আবেগবর্জিত দৈহিক সম্পর্ক। যা কিনা এক সময়ে হতাশার জন্ম দেয়। তাৎক্ষণিক প্রয়োজন ভিত্তিক কারণে অথবা সাময়িক সুখের জন্য লিভ-ইন সম্পর্ক সারা জীবন বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে। শরীর-মন থেকে শুরু করে তাদের পরিবার ও কর্মস্থল—সর্বত্র এর প্রভাব বিস্তার করে। অবসাদ হয়ে ওঠে তাদের জীবনের অঙ্গ। এর ফল ভোগ করতে হচ্ছে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও। একই সঙ্গে সামাজিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে বলে অনেকের ধারণা।
একটা বাস্তব ঘটনার কথা বলা যাক। নাম পরিবর্তন করে ধরছি অতনু ও সোমা। দুজনের বিয়ের দিন-তারিখ স্থির হয়েছে। দুজনের ভেতর পরিচয় অল্পদিনের, তারা নিজেরাই পছন্দ করে বিয়ে করছে। বিয়েটা খুবই ধুমধাম করে সামাজিক ভাবেই হবে। এখন সিনেমা-সিরিয়াল বা অন্য প্রদেশের বিয়ের নিয়ম নকল করে নতুন হাজারো সামাজিক অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। সঙ্গীত, ব্যাচেলার পার্টি, লং ড্রাইভ, মেহেন্দি—অনেক কিছু। সোমা নিজেকে সংস্কারমুক্ত আধুনিকা বলে দাবি করে, তার ওপর ভালো চাকরি করে বলে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল। অতনুও ভালো চাকরি করে কিন্তু সে তথাকথিত অতি-আধুনিক নয়। কিন্তু বিয়ের ঠিক আগে বন্ধুদের সঙ্গে গোয়া ট্রিপে গিয়েই ছন্দপতন। সেখানে অতনুর দুই বন্ধুর সঙ্গে সোমার অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা ও শারীরিক সম্পর্ক। মেনে নিতে পারেনি অতনু। সোমার কাছে যা ‘আধুনিকতা’, অতনুর কাছে তা বিশ্বাসভঙ্গ। উল্টে অতনুকেই শুনতে হয় যে সে ‘প্রাচীনপন্থী’। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, সোমা বা তার বন্ধুদের এই জীবনযাপন হয়তো ব্যক্তিগত পছন্দ হতে পারে, কিন্তু বৃহত্তর সমাজের কাছে বা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এটি কী বার্তা দিচ্ছে—তা ভাবার সময় এসেছে। সার্বিকভাবে এই সামাজিক অবক্ষয় নিয়ে এখন নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন।

