মাউন্ট এভারেস্ট জয় করা গেলেও ৬,৬৩৮ মিটারের কৈলাস আজও অপরাজিত। নখ-চুল দ্রুত বড় হয়ে যাওয়া, দিকভ্রম নাকি অদৃশ্য শক্তি? জানুন Mount Kailash Unsolved Mystery, রাশিয়ান বিজ্ঞানীদের পিরামিড তত্ত্ব এবং শিবের বাসভূমির অলৌকিক উপাখ্যান।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক : পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা ৮,৮৪৮ মিটার। আজ পর্যন্ত চার হাজারেরও বেশি মানুষ এভারেস্ট জয় করেছেন। অথচ, এভারেস্টের চেয়ে ২,২০০ মিটার নিচু একটি পর্বত আজও মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে। তার উচ্চতা মাত্র ৬,৬৩৮ মিটার। নাম—কৈলাস পর্বত।
হিমালয়ের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই পর্বতটি যেন এক জীবন্ত প্রহেলিকা। আধুনিক পর্বতারোহীরা, যারা অক্সিজেন সিলিন্ডার ছাড়া এভারেস্ট জয় করেছেন, তাঁরাও কৈলাসের পাদদেশে এসে হার মেনেছেন। কেউ পথ হারিয়েছেন, কেউবা মুখোমুখি হয়েছেন এমন সব অলৌকিক ঘটনার, যা বিজ্ঞানের যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব।
কেন আজও কেউ কৈলাসের চূড়ায় পা রাখতে পারল না? কী এমন শক্তি আছে সেখানে, যা মানুষের সময় বা আয়ুকে দ্রুত ফুরিয়ে দেয়? এটা কি শুধুই দেবাদিদেব মহাদেবের বাসভূমি, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো ভিনগ্রহের প্রযুক্তি বা ‘পিরামিড সায়েন্স’?
আজ আমরা উন্মোচন করব পৃথিবীর সবথেকে রহস্যময় পর্বতশৃঙ্গের অজানা ইতিহাস। গল্প, পুরাণ এবং বিজ্ঞানের আতশকাঁচে দেখব সেই নিষিদ্ধ জগতকে, যেখানে সময় সত্যিই থমকে যায়।
আরও পড়ুন : ঠাকুর, দেবতা, ভগবান ও ঈশ্বর কি একই? গুলিয়ে ফেলার আগে জেনে নিন আসল তফাৎ
পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দু: অ্যাক্সিস মুন্ডি (The Axis Mundi)
ভূগোল বইতে আমরা পড়েছি উত্তর মেরু আর দক্ষিণ মেরুর কথা। কিন্তু প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ এবং আধুনিক কিছু তত্ত্ব বলছে, পৃথিবীর একটি আধ্যাত্মিক কেন্দ্রবিন্দু বা নাভি আছে। সেটিই হলো কৈলাস। হিন্দু পুরাণ, বৌদ্ধ ধর্ম, জৈন ধর্ম এবং তিব্বতের বন (Bon) ধর্ম—এই চারটি ধর্মের মানুষের কাছেই কৈলাস হলো পবিত্রতম স্থান। একে বলা হয় ‘অ্যাক্সিস মুন্ডি’ (Axis Mundi) বা মহাবিশ্বের স্তম্ভ। বিশ্বাস করা হয়, এখান থেকেই স্বর্গের সঙ্গে মর্ত্যের সংযোগ ঘটেছে।
গুগল ম্যাপ বা স্যাটেলাইট ইমেজ দেখলে আপনি অবাক হবেন। কৈলাস পর্বত থেকে পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ মনুমেন্টগুলোর (যেমন স্টোনহেঞ্জ বা নর্থ পোল) দূরত্ব এক অদ্ভুত গাণিতিক ছকে বাঁধা। যেন কেউ কম্পাস দিয়ে মেপে এই পর্বতটিকে পৃথিবীর ঠিক মাঝখানে বসিয়ে দিয়েছে।
অভিযাত্রীদের হাড়হিম করা অভিজ্ঞতা (Tales of Failed Expeditions)
কৈলাস জয়ের চেষ্টা যে কেউ করেনি, তা নয়। উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীতে বহু নামী পর্বতারোহী এই চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের অভিজ্ঞতা ছিল শিউরে ওঠার মতো।
কর্নেল আর. সি. উইলসনের অভিজ্ঞতা: বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ব্রিটিশ পর্বতারোহী কর্নেল আর. সি. উইলসন কৈলাস জয়ের চেষ্টা করেন। তিনি তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন, “আমি যখনই চূড়ার দিকে যাওয়ার জন্য একটি সহজ পথ খুঁজে পেলাম, ঠিক তখনই আকাশ কালো করে তুষারঝড় শুরু হলো। অথচ পর্বতের বাকি অংশ ছিল রৌদ্রোজ্জ্বল। মনে হচ্ছিল, পর্বতটি নিজেই আমাকে আটকাচ্ছে।” বারবার চেষ্টা করেও তিনি এক পা এগোতে পারেননি।
রাশিয়ান অভিযাত্রী ও দ্রুত বার্ধক্য (The Siberian Climbers Incident): এটি কৈলাসের সবথেকে ভয়ংকর ও আলোচিত ঘটনা। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে একদল সাইবেরিয়ান পর্বতারোহী কৈলাসের একটি নিষিদ্ধ সীমানা পার করার চেষ্টা করেন। তাঁরা কিছুটা ওপরে ওঠার পরই বুঝতে পারেন, তাঁদের শরীরে অদ্ভুত পরিবর্তন হচ্ছে। তাঁদের নখ এবং চুল অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে বড় হতে শুরু করে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাঁদের মনে হচ্ছিল যেন দুই সপ্তাহ কেটে গেছে! ভয় পেয়ে তাঁরা দ্রুত নিচে নেমে আসেন। কিন্তু রহস্যের শেষ এখানেই নয়। শোনা যায়, ওই অভিযানের এক বছরের মধ্যেই ওই দলের প্রত্যেকেই বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যান। তাঁদের বয়স দ্রুত বেড়ে গিয়েছিল। চিকিৎসকরাও এর কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
সময়ের খেলা: যেখানে আয়ু ফুরিয়ে যায় (Time Dilation Mystery)
আইনস্টাইনের ‘থিওরি অফ রিলেটিভিটি’তে আমরা ‘টাইম ডাইলেশন’ বা সময়ের প্রসারণের কথা শুনেছি। কৈলাস পর্বত কি তবে এমন কোনো স্থান যেখানে সময়ের গতি আলাদা? সাধারণ পর্যটকরাও দাবি করেন, কৈলাসের পরিক্রমা করার সময় তাঁদের নখ ও দাড়ি খুব দ্রুত বাড়ে। সমতলে যে নখ বড় হতে দুই সপ্তাহ লাগে, কৈলাসের আশেপাশে থাকলে তা মাত্র ১২ ঘণ্টায় বেড়ে যায়। রাশিয়ান বিজ্ঞানী আর্নস্ট মুলদাশেভ (Ernst Muldashev) দীর্ঘদিন কৈলাস নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁর মতে, কৈলাসের চারপাশে এমন এক ‘এনার্জি ভর্টেক্স’ (Energy Vortex) বা শক্তির ঘূর্ণন কাজ করে, যা সময়ের গতিকে প্রভাবিত করে। এটি কি কোনো ‘টাইম মেশিন’-এর প্রাকৃতিক সংস্করণ? উত্তর আজও অজানা।
মানবসৃষ্ট পিরামিড? (The Pyramid Theory)
আমরা মিশরের পিরামিড নিয়ে অনেক কথা বলি, কিন্তু ড. আর্নস্ট মুলদাশেভের দাবি, কৈলাস পর্বত আসলে কোনো প্রাকৃতিক পাহাড় নয়। এটি একটি অতিকায় মানবসৃষ্ট (বা ভিনগ্রহীদের তৈরি) পিরামিড। ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখবেন, কৈলাসের চারটি দিক (Face) কম্পাসের চারটি দিক—উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব এবং পশ্চিম—নির্দেশ করে। এর জ্যামিতিক গঠন এতটাই নিখুঁত যে, প্রাকৃতিকভাবে এমনটা হওয়া প্রায় অসম্ভব। বিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, এটি একটি প্রাচীন ‘নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টর’ বা মহাজাগতিক টাওয়ার হতে পারে, যা মহাকাশের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য তৈরি হয়েছিল। এর ঢালগুলো এমনভাবে তৈরি, যা বড় বড় আয়নার (Mirrors) কাজ করে এবং শক্তিকে কেন্দ্রীভূত করে।
দুই সরোবর: দেবতা ও দানবের সহাবস্থান
কৈলাসের পায়ের কাছে রয়েছে দুটি হ্রদ—’মানস সরোবর’ এবং ‘রাক্ষস তাল’। এই দুটি হ্রদ যেন প্রকৃতির দ্বৈত সত্তার প্রতীক।
- মানস সরোবর: এর জল মিষ্টি ও পবিত্র। এখানে রাজহাঁস দেখা যায়। এই হ্রদটি গোল, যা সূর্যের প্রতীক। এর জল সবসময় শান্ত থাকে, যেন ধ্যানের প্রশান্তি।
- রাক্ষস তাল: ঠিক এর পাশেই অবস্থিত রাক্ষস তাল। এর জল নোনা এবং এখানে কোনো জলজ প্রাণী বা উদ্ভিদ বাঁচে না। এর আকৃতি অর্ধচক্রাকার বা চাঁদের মতো। এবং সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয় হলো, মানস সরোবর যখন শান্ত থাকে, তখন ঠিক একই সময়ে রাক্ষস তালে সবসময় উত্তাল ঢেউ ও ঝড়ো হাওয়া বইতে থাকে। বিজ্ঞানীরা আজও এই ভৌগোলিক রহস্যের কিনারা করতে পারেননি।
ওম ধ্বনি ও আলোর খেলা
কৈলাসের দক্ষিণ দিকে সন্ধ্যার সময় যখন সূর্য অস্ত যায়, তখন পাহাড়ের ছায়া পড়ে একটি অদ্ভুত আকৃতি তৈরি হয়। সেই ছায়া দেখে মনে হয় স্বয়ং মহাদেব ধ্যানে বসে আছেন। আবার বরফের খাঁজে জমে থাকা তুষার এমনভাবে সাজানো থাকে যে, দূর থেকে দেখলে মনে হয় পাহাড়ের গায়ে প্রাকৃতিকভাবে ‘স্বস্তিক’ চিহ্ন (Swastika) আঁকা আছে। অনেক তীর্থযাত্রী দাবি করেন, গভীর রাতে বা ভোরের নিস্তব্ধতায় তাঁরা কৈলাসের দিক থেকে বিমানের ইঞ্জিনের মতো বা মৃদঙ্গ বাজানোর মতো এক গম্ভীর শব্দ শুনেছেন। কান পাতলে মনে হয়, পাহাড়ের ভেতর থেকে ‘ওম’ ধ্বনি ভেসে আসছে। বিজ্ঞানীরা বলেন, এটি হয়তো বরফ গলে পড়ার শব্দ বা বাতাসের শব্দ, কিন্তু বিশ্বাসীরা জানেন এটি মহাদেবের ডমরুর আওয়াজ।
মিলারেপার গল্প: একমাত্র সফল অভিযাত্রী
বলা হয়, গত কয়েক হাজার বছরে মাত্র একজনই কৈলাসের চূড়ায় পৌঁছাতে পেরেছিলেন। তিনি হলেন একাদশ শতাব্দীর তিব্বতি বৌদ্ধ সাধক মিলারেপা (Milarepa)। লোককথা অনুযায়ী, মিলারেপা কোনো দড়ি বা কুড়ুল দিয়ে পাহাড় চড়েননি। তিনি তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তি বা মন্ত্রবলে উড়ে গিয়ে কৈলাসের চূড়ায় বসেছিলেন। ফিরে এসে তিনি বলেছিলেন, “এই পর্বতের চূড়ায় কোনো পাথর নেই, সেখানে আছেন কেবল বুদ্ধ (বা শিব)। যাঁদের মনে বিন্দুমাত্র অহংকার আছে, তাঁরা কখনোই এই উচ্চতায় পৌঁছাতে পারবে না।” তাঁর এই বাণীর পর থেকেই বৌদ্ধ ধর্মে কৈলাস আরোহণ নিষিদ্ধ করা হয়।
কেন নিষিদ্ধ কৈলাস জয়? (Why is it Banned?)
আধুনিক যুগে, Reinhold Messner-এর মতো কিংবদন্তি পর্বতারোহীকে চীন সরকার কৈলাস জয়ের অনুমতি দিয়েছিল। কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। তিনি বলেছিলেন, “আমরা যদি এই পাহাড় জয় করি, তবে আমরা এর পবিত্রতাকে হত্যা করব। মানুষের মনের মধ্যে অন্তত এমন কিছু থাকা উচিত, যা সে জয় করতে পারেনি।” ২০০১ সালে চীন সরকার ভারত ও তিব্বতের মানুষের ধর্মীয় ভাবাবেগকে সম্মান জানিয়ে কৈলাস পর্বতে আরোহণ সরকারিভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
যেখানে বিজ্ঞান শেষ, সেখান থেকেই কি বিশ্বাসের শুরু?
কৈলাস পর্বত আমাদের অহংকারের মুখে এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন। আমরা চাঁদ জয় করেছি, মঙ্গলে রোভার পাঠিয়েছি, কিন্তু পৃথিবীর বুকেই এমন এক রহস্য রেখে দিয়েছি যার সমাধান আমাদের লজিক দিয়ে হয় না। কৈলাস হয়তো কেবল পাথর আর বরফের স্তূপ নয়। এটি এমন এক শক্তি যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতির সব রহস্য ভেদ করার অধিকার মানুষের নেই। কিছু দরজা বন্ধ থাকাই ভালো। মহাদেব হয়তো ওভাবেই ধ্যানে মগ্ন থাকতে চান, আর তাঁর সেই প্রশান্তিকে সম্মান জানিয়েই আমাদের দূর থেকে মাথা নত করা উচিত।
সময় যেখানে থমকে যায়, যুক্তি যেখানে হার মানে—সেটাই কৈলাস। Mount Kailash Unsolved Mystery হয়তো চিরকাল রহস্যই থেকে যাবে, আর সেটাই তার সৌন্দর্য।
(আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাশিফল আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল WhatsApp চ্যানেলে যোগ দিন! সবচেয়ে আগে পান জ্যোতিষ, অফবিট নিউজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনধারা ও অফবিট এক্সক্লুসিভ আপডেট —আমাদের WhatsApp Channel-এ যোগ দিন)
সাম্প্রতিক পোস্ট
- Gen Z-এর প্রেমের নতুন শব্দভান্ডার জানেন? ভালোবাসার নতুন ব্যাকরণ শিখুন | Gen Z Love Trends 2026
- ব্যস্ত সকালে এই ৫টি Tiffin Recipe রাখুন রোজের তালিকায় | Easy Tiffin Recipes
- ঠাকুর, দেবতা, ভগবান ও ঈশ্বর কি একই? গুলিয়ে ফেলার আগে জেনে নিন আসল তফাৎ | God vs Deity Meaning in Bengali
- জানুন, ব্যক্তি সুভাষের অনন্য প্রেমকাহিনী: সুভাষ ও এমিলি
- গান্ধী বনাম নেতাজি—মূল পার্থক্যটা কোথায়? | Gandhi vs Netaji

