Nepal Flood Rescue: নেপালের ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যেও কীভাবে নিরাপদে ফিরলেন তামিলনাড়ুর ২১ জন তীর্থযাত্রী, তাঁদের ফেরার পথে কী পরিস্থিতি ছিল এবং কীভাবে উদ্ধার ও নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করা হল, সেই ঘটনাই উঠে এসেছে এই প্রতিবেদনে।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: নেপালের ভয়াবহ হড়পা বানের মধ্যে প্রাণ বাঁচানোর লড়াইয়ে এক শাড়িই হয়ে উঠেছিল ২১ জন তীর্থযাত্রীর ভরসা। তামিলনাড়ুর কুম্বাকোনামের একটি পর্যটন সংস্থার সঙ্গে কৈলাস যাত্রায় যাওয়া ৫৭ জনের দলের মধ্যে ২১ জন নিরাপদে দেশে ফিরেছেন। তাঁদের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে পাহাড় থেকে আচমকা নেমে আসা কাদামাটির স্রোত, ভেসে যাওয়া বাস এবং কয়েক মুহূর্তের মধ্যে প্রাণ বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা। বাসের চাকা কাদায় আটকে যাওয়ায় যে কয়েক মিনিট দেরি হয়েছিল, পরে সেই দেরিকেই তাঁরা আশীর্বাদ বলে মনে করেছেন। নেপালি চালকের সতর্কবার্তা শুনে তাঁরা একটি উঁচু টিলায় ওঠার চেষ্টা করেন। সেখানে দলের এক মহিলা নিজের শাড়ি খুলে নিচে ঝুলিয়ে দেন। সেই শাড়ি ধরে একে একে টিলার উপরে ওঠেন অন্যরা। পরে হেঁটে হেলিপ্যাডে পৌঁছে হেলিকপ্টারে কাঠমান্ডু, সেখান থেকে দিল্লি হয়ে শুক্রবার চেন্নাই ফেরেন তাঁরা।
কাদায় আটকে গিয়েছিল বাস, কয়েক মিনিটের দেরিই বাঁচিয়ে দিল প্রাণ
তামিলনাড়ুর কুম্বাকোনামের একটি পর্যটন সংস্থার সঙ্গে মোট ৫৭ জন কৈলাস যাত্রায় গিয়েছিলেন। প্রত্যেকের বয়সই ৫০ বছরের বেশি। তাঁদের পাশাপাশি চেন্নাই থেকেও আরও ৪৯ জনের একটি আলাদা দল নেপালে গিয়েছিল। কুম্বাকোনামের ৫৭ জনের দলের মধ্যে ২১ জন নিরাপদে দেশে ফিরেছেন। বাকি ৩৬ জনের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ করা যায়নি বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
ফিরে আসা ২১ জনের মধ্যে ভেলাচেরির বাসিন্দা নবু কবীরদাস এবং তাঁর স্ত্রী বিজয়া ভুবনেশ্বরী তাঁদের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। বুধবার সকালে ৫৭ জনের দলটি তিনটি বাসে করে রসুয়া দিয়ে যাচ্ছিল। তাঁদের গন্তব্য ছিল চিনের অভিবাসন দফতর। কবীরদাস এবং তাঁর স্ত্রী ছিলেন বাসের দ্বিতীয়টিতে। আচমকাই বাসের চাকা কাদার মধ্যে আটকে যায়। বাসের খালাসিরা সেই চাকা তোলার চেষ্টা শুরু করেন। তখন ওই দেরিতে বিরক্ত হয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু পরে তাঁরা বুঝতে পারেন, ওই কয়েক মিনিটের দেরিই হয়তো তাঁদের প্রাণ বাঁচিয়েছিল।
পাহাড় থেকে নেমে এল কাদামাটির স্রোত, সামনে ভেসে গেল বাস
বাসের চাকা তোলার চেষ্টা চলার মধ্যেই আচমকা একটি বিকট শব্দ শুনতে পান তাঁরা। প্রথমে কবীরদাসের মনে হয়েছিল, হয়তো বিস্ফোরণ হয়েছে। কিন্তু পরক্ষণেই দেখা যায়, পাহাড়ের দিক থেকে প্রবল কাদামাটির স্রোত নেমে আসছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে তাঁদের বাসের নেপালি চালক সবাইকে সতর্ক করেন। তিনি দ্রুত কোনও উঁচু জায়গায় উঠে যেতে বলেন। কিন্তু দলের অধিকাংশ সদস্যের বয়স ৫০ বছরের বেশি হওয়ায় সেই মুহূর্তে দ্রুত দৌড়ে নিরাপদ জায়গায় পৌঁছনো সম্ভব ছিল না।
কাছেই ছিল একটি মাটির টিলা। উচ্চতায় সেটি প্রায় একতলা বাড়ির সমান। কোনও রকমে ২১ জন সেই টিলায় ওঠার চেষ্টা করেন। কিন্তু কাদা এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে বার বার পিছলে পড়ছিলেন তাঁরা। ঠিক সেই সময় সামনে আসে বাঁচার সেই অসাধারণ উপায়।
নিজের শাড়ি খুলে দিলেন মহিলা, সেই শাড়ি ধরেই টিলায় উঠলেন বাকিরা
দলের মধ্যে পুনগোড়ি নামে এক মহিলা সবার আগে কোনও রকমে টিলার মাথায় উঠে যেতে সক্ষম হন। সেখানে পৌঁছেই তিনি আর সময় নষ্ট করেননি। নিজের পরনের শাড়ি খুলে সেটি নিচের দিকে ঝুলিয়ে দেন।
টিলার নিচে থাকা অন্যরা সেই শাড়ি ধরে একে একে উপরে উঠতে শুরু করেন। তাঁদের মধ্যে এক মহিলা শাড়ি ধরে ওঠার চেষ্টা করেও বার বার পিছলে পড়ছিলেন। তখন তাঁকে শাড়িটি কোমরে পেঁচিয়ে নিতে বলা হয়। তিনি শাড়ি কোমরে জড়িয়ে নেওয়ার পর বাকিরা তাঁকে টেনে উপরে তুলে আনেন।
এইভাবেই শাড়িটিকে অবলম্বন করে একে একে ২১ জন নিরাপদে টিলার মাথায় পৌঁছন। তাঁদের চোখের সামনে তখন কাদামাটির স্রোতে ভেসে যাচ্ছিল একের পর এক বাস।
চোখের সামনে ভেসে গেল বাস, তারপর আশ্রয় সশস্ত্র পুলিশ শিবিরে
টিলায় ওঠার সময়ই ২১ জন দেখতে পান তাঁদের বাস কাদামাটির প্রবল স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। পিছনে থাকা বাসগুলিও একে একে সেই স্রোতে চলে যেতে থাকে। সেই ভয়াবহ দৃশ্যের পর আর পিছনে তাকানোর সাহস করেননি তাঁরা।
দলের কাঞ্চিপুরমের এক স্কুলের প্রধানশিক্ষিকা সত্যা জানান, সেই দৃশ্য তাঁর কাছে কোনও সিনেমার দৃশ্যের মতো মনে হয়েছিল। তাঁর কথায়, কাদামাটির স্রোতের উচ্চতা প্রায় ৭০ ফুট বলে মনে হয়েছিল।
এরপর কোনও রকমে তাঁরা সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর একটি শিবিরে পৌঁছন। সেখানে জওয়ানেরা তাঁদের জল এবং বিস্কুট দেন। এত বড় বিপদের মধ্যে প্রাণে বেঁচে যাওয়ার পরও তখন তাঁদের কাছে পুরো ঘটনাটি যেন অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল।
তিন ঘণ্টা হেঁটে হেলিপ্যাড, তারপর হেলিকপ্টারে কাঠমান্ডু
পরের দিন বৃহস্পতিবার ২১ জনকে আরও একটি কঠিন পথ পেরোতে হয়। প্রায় তিন ঘণ্টা পায়ে হেঁটে তাঁরা একটি হেলিপ্যাডে পৌঁছন। সেই পথও ছিল অত্যন্ত দুর্গম। কাঁটাঝোপ, চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এগোতে হয় তাঁদের।
পথের এক দিকে ছিল গভীর খাদ। কবীরদাস জানিয়েছেন, সরু পথ দিয়ে যাওয়ার সময় সামান্য এদিক-ওদিক হলেই প্রায় ৫০ ফুট গভীর খাদে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।
এই কঠিন পথ পেরোনোর সময় এক নেপালি ব্যক্তি তাঁদের পথ দেখিয়ে হেলিপ্যাড পর্যন্ত নিয়ে যান। সেখান থেকে হেলিকপ্টারে করে তাঁদের কাঠমান্ডু নিয়ে যাওয়া হয়। কাঠমান্ডু থেকে পরে দিল্লি এবং সেখান থেকে শুক্রবার চেন্নাইয়ে পৌঁছন তাঁরা। দেশে ফিরে ২১ জনই তাঁদের অভিজ্ঞতাকে কার্যত নতুন জীবন পাওয়ার ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
৫৭ জনের দলের বাকি ৩৬ জনের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ নেই
যে ৫৭ জনের দলটি কুম্বাকোনাম থেকে কৈলাস যাত্রায় গিয়েছিল, তাঁদের মধ্যে ২১ জন নিরাপদে ফিরে এলেও বাকি ৩৬ জনের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
তামিলনাড়ুর মন্ত্রী এ রাজমোহন জানিয়েছেন, সে রাজ্য থেকে মোট ৪০০ জন নেপালে গিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৯০ জনের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ করা যায়নি বলে তিনি জানিয়েছেন। পরিস্থিতির খোঁজ নিতে এবং নেপালে থাকা তামিলনাড়ুর বাসিন্দাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে মুখ্যমন্ত্রী সি জোসেফ বিজয়ের নির্দেশে দু’জন মন্ত্রী দিল্লি গিয়েছেন।
নেপালের ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে নিরাপদে ফিরে আসা ২১ জনের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে কয়েকটি মুহূর্তের লড়াই—বাসের চাকা কাদায় আটকে যাওয়া, পাহাড় থেকে আচমকা কাদামাটির স্রোত নেমে আসা, বাসগুলি চোখের সামনে ভেসে যাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত একটি শাড়িকে অবলম্বন করে উঁচু টিলায় উঠে প্রাণ বাঁচানো। তাঁদের যাত্রা শেষ হয়েছে চেন্নাইয়ে, কিন্তু সেই কয়েক ঘণ্টার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তাঁদের জীবনের স্মৃতিতে থেকে যাবে।
#nepalflood #nepalrescue #nepaldisaster #nepalfloodupdate #nepaltourism #newsoffbeat
সাম্প্রতিক পোস্ট
স্কুলের শৌচাগারে সাপ! নামী বেসরকারি স্কুলের নিরাপত্তা নিয়ে উঠল প্রশ্ন, কী বলছে কর্তৃপক্ষ
নিউ মার্কেটের অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্যে আসল কারণ কী? ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য
অভিজিৎ দীপকে কি তবে এবার বিজেপিতে? রাজনৈতিক প্রস্তাব ঘিরে তুঙ্গে জল্পনা
ঋতব্রতই বিরোধী দলনেতা, হাইকোর্টের বড় পর্যবেক্ষণ, কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের পদক্ষেপ কী?

