Om Namah Shivaya Mantra Science এবং মানবদেহের স্নায়ুতন্ত্রের ওপর তার গভীর প্রভাবের এক অজানা উপাখ্যান
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: আজ ১৫ ফেব্রুয়ারি। দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে মহাশিবরাত্রি। চারদিকে ধূপ-ধুনোর গন্ধ, ঘণ্টা আর কাঁসরের আওয়াজ। শিবমন্দিরের বাইরে উপচে পড়া ভিড়। হাজারো মানুষের কোলাহল, ঠেলাঠেলি, আর হয়তো তারই মাঝে মন্দিরের এক কোণায় চোখ বন্ধ করে বসে আছেন এক বয়স্ক মানুষ। চারপাশের এত শব্দ, এত ব্যস্ততা—কিছুই যেন তাঁকে স্পর্শ করতে পারছে না। তাঁর ঠোঁট দুটি শুধু মৃদু কাঁপছে, আর সেখান থেকে একটা টানা, গভীর গুঞ্জন ভেসে আসছে— “ওঁ নমঃ শিবায়”। এই দৃশ্যটি আমাদের খুব চেনা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতবর্ষের প্রতিটি কোণায় এই মন্ত্র ধ্বনিত হয়ে আসছে। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, কেন এই মন্ত্রটি জপ করার সময় মানুষের মন এত শান্ত হয়ে যায়? এটি কি শুধুই অন্ধ ভক্তি, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো গভীর বিজ্ঞান?
আধুনিক বিজ্ঞান এবং প্রাচীন ভারতীয় দর্শন—এই দুইয়ের মেলবন্ধনে ঘটালে আমরা এক বিস্ময়কর সত্যের মুখোমুখি হই। আজকের এই দ্রুতগতির জীবনে, যেখানে মানসিক চাপ (Stress), উদ্বেগ (Anxiety) এবং অবসাদ (Depression) আমাদের নিত্যসঙ্গী, সেখানে ধ্যান এবং মন্ত্রজপ কেবল আর আধ্যাত্মিকতার গণ্ডিতে আটকে নেই। বিশ্বের তাবড় স্নায়ুবিজ্ঞানী (Neuroscientists) এবং চিকিৎসকরা আজ গবেষণাগারে বসে প্রমাণ করছেন কীভাবে নির্দিষ্ট কিছু শব্দতরঙ্গ আমাদের মস্তিষ্কের গঠন পর্যন্ত বদলে দিতে পারে। আজ মহাশিবরাত্রির এই পুণ্যলগ্নে, আসুন ভক্তির আবরণ সরিয়ে আমরা জেনে নিই, ‘ওঁ নমঃ শিবায়’ মন্ত্র জপের সময় আমাদের শরীরের ভেতরে ঠিক কী কী বৈজ্ঞানিক ম্যাজিক ঘটে।
Om Namah Shivaya Mantra Science এবং মস্তিষ্কের তরঙ্গ: স্নায়ুবিজ্ঞান কী বলছে?
স্নায়ুবিজ্ঞান বা নিউরোসায়েন্স (Neuroscience) অনুযায়ী, আমাদের মস্তিষ্ক সারাদিন ধরে অসংখ্য চিন্তার জটলায় আটকে থাকে। যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক’ (Default Mode Network বা DMN)। এই ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক বেশি সক্রিয় থাকলে মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে অকারণে দুশ্চিন্তা করে বা অতীতের স্মৃতি হাতড়ে কষ্ট পায়। যখন কোনো ব্যক্তি একটানা গভীর মনোযোগের সাথে “ওঁ নমঃ শিবায়” জপ করতে শুরু করেন, তখন মস্তিষ্কের এই অতিসক্রিয় ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক শান্ত হতে শুরু করে। এর ফলে মস্তিষ্কে আলফা (Alpha) এবং থিটা (Theta) তরঙ্গের সৃষ্টি হয়, যা গভীর শিথিলতা এবং ধ্যানের অবস্থার ইঙ্গিত দেয়।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ (National Institutes of Health বা NIH)-এর একাধিক গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ধ্বনিভিত্তিক ধ্যান বা মন্ত্রজপ মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স (Prefrontal Cortex) অংশে রক্ত চলাচল বাড়িয়ে দেয়। এই অংশটি আমাদের মনোযোগ, যৌক্তিক চিন্তাভাবনা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের জন্য দায়ী। অন্যদিকে, মস্তিষ্কের যে অংশটি ভয় এবং উদ্বেগের জন্ম দেয়, যাকে অ্যামিগডালা (Amygdala) বলা হয়, মন্ত্রজপের ফলে তার সক্রিয়তা তাৎপর্যপূর্ণভাবে কমে যায়। অর্থাৎ, আপনি যখন মন থেকে এই পঞ্চাক্ষরী মন্ত্র জপ করছেন, তখন আপনার মস্তিষ্ক আক্ষরিক অর্থেই ভীতিহীন এবং শান্ত এক অবস্থায় প্রবেশ করছে। বিজ্ঞান বলছে, প্রতিদিন মাত্র পনেরো মিনিট এই মন্ত্রের সঠিক উচ্চারণ মস্তিষ্কের পরিবর্তনক্ষমতা (Neuroplasticity) বৃদ্ধি করে, যা মানুষকে আরও বেশি স্থির ও বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।
ভেগাস স্নায়ুর উদ্দীপনা এবং ‘ওঁ’-এর ধ্বনিবিজ্ঞান
“ওঁ নমঃ শিবায়” মন্ত্রের প্রথম শব্দটি হলো ‘ওঁ’ (Om)। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, এই ‘ওঁ’ ধ্বনি উচ্চারণ করার সময় আমাদের ভোকার কর্ড (Vocal Cords) এবং শ্বাসযন্ত্রে যে কম্পন বা ভাইব্রেশন (Vibration) তৈরি হয়, তা সরাসরি আমাদের ভেগাস স্নায়ুকে (Vagus Nerve) উদ্দীপ্ত করে। মানবদেহের স্নায়ুতন্ত্রের এটি একটি অন্যতম দীর্ঘ এবং গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ু, যা মস্তিষ্ক থেকে শুরু করে হৃদযন্ত্র, ফুসফুস এবং পরিপাকতন্ত্র পর্যন্ত বিস্তৃত। একে আমাদের শরীরের ‘প্যারাসিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম’ (Parasympathetic Nervous System)-এর হাইওয়ে বলা যেতে পারে।
যখন ‘ওঁ’ উচ্চারণের ফলে ভেগাস স্নায়ু উদ্দীপিত হয়, তখন তা আমাদের শরীরকে একটি স্পষ্ট বার্তা পাঠায়— “তুমি এখন নিরাপদ, শান্ত হও”। এই বার্তার ফলে হৃদস্পন্দনের হার (Heart Rate) স্বাভাবিক হয়ে আসে, রক্তচাপ (Blood Pressure) কমে যায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের ছন্দ একটি জ্যামিতিক স্থিরতা পায়। ২০২০ সালের পরবর্তী বেশ কিছু আন্তর্জাতিক কার্ডিওলজি ও সাইকিয়াট্রি জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, গভীর শ্বাস নিয়ে মন্ত্রজপ করলে শরীরের স্ট্রেস হরমোন বা কর্টিসল (Cortisol)-এর মাত্রা লক্ষণীয়ভাবে হ্রাস পায়। পরিবর্তে মস্তিষ্কে এন্ডোরফিন (Endorphins) এবং ডোপামিন (Dopamine)-এর মতো ‘ফিল গুড’ হরমোনের ক্ষরণ বেড়ে যায়। অর্থাৎ, কোনো ওষুধ ছাড়াই শরীর প্রাকৃতিকভাবে তার নিজস্ব নিরাময় প্রক্রিয়া শুরু করে দেয়। শিবরাত্রির রাতে উপবাস থেকে যখন ভক্তরা একটানা এই মন্ত্র জপ করেন, তখন তাঁদের শরীরের ক্লান্তি দূর হয়ে এক অদ্ভুত প্রাণশক্তির সঞ্চার হয়, যার মূলে রয়েছে এই হরমোনাল ব্যালেন্স (Hormonal Balance)।
পঞ্চাক্ষরী মন্ত্রের কম্পন এবং সাইমেটিক্স-এর রহস্য
ভারতীয় পুরাণে “ন-ম-শি-বা-য়”—এই পাঁচটি অক্ষরকে প্রকৃতির পাঁচটি মূল উপাদানের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। ‘ন’ হলো মাটি, ‘ম’ হলো জল, ‘শি’ হলো আগুন, ‘বা’ হলো বাতাস এবং ‘য়’ হলো আকাশ বা শূন্যতা। আধ্যাত্মিক গুরুরা বলেন, এই মন্ত্র আমাদের শরীরকে প্রকৃতির এই পঞ্চভূতের সঙ্গে একাত্ম করে। এবার এই প্রাচীন তত্ত্বটিকে যদি আমরা শব্দবিজ্ঞানের (Acoustics) আয়নায় ফেলি, তবে সাইমেটিক্স (Cymatics)-এর প্রসঙ্গ চলে আসে। সাইমেটিক্স হলো শব্দতরঙ্গের দৃশ্যমান রূপ নিয়ে গবেষণার বিজ্ঞান। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে, নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের (Frequency) শব্দ মানুষের শরীরের জলীয় অংশে এবং কোষে কোষে এক বিশেষ জ্যামিতিক প্যাটার্ন বা সুশৃঙ্খল বিন্যাস তৈরি করে।
যেহেতু মানবদেহের প্রায় সত্তর শতাংশই জল (Water), তাই “নমঃ শিবায়” মন্ত্রের সুস্পষ্ট উচ্চারণ আমাদের শরীরের ভেতরে এক সুশৃঙ্খল এবং ইতিবাচক কম্পনের সৃষ্টি করে। এই কম্পন আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে জমে থাকা আড়ষ্টতা এবং মানসিক ট্রমা মুক্ত করতে সাহায্য করে। এই মন্ত্রটি যখন সঠিক ছন্দে জপ করা হয়, তখন আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি প্রতি মিনিটে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় বারে নেমে আসে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, এটিই হলো আমাদের কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেমের (Cardiovascular System) জন্য সবচেয়ে আদর্শ বা অপ্টিমাল রেজোন্যান্স (Optimal Resonance)। এই নির্দিষ্ট ছন্দে শ্বাস নিলে শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immune System) শক্তিশালী হয় এবং কোষের পুনর্জন্ম বা সেলুলার রিজেনারেশন (Cellular Regeneration) ত্বরান্বিত হয়।
আরও পড়ুনঃ কেন শিবলিঙ্গের উপর অবিরাম জল ঢালা হয়? এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা?
আধুনিক জীবনে সুস্থ জীবনযাপন ও মন্ত্রের প্রায়োগিক দিক
একুশ শতকের এই প্রবল প্রতিযোগিতার যুগে সবাই যেন এক অদৃশ্য ইঁদুর দৌড়ে শামিল। কাজের ডেডলাইন, ইএমআই-এর চাপ, সম্পর্কের জটিলতা—সব মিলিয়ে আমাদের মন সবসময় একটা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে (Fight or Flight Mode) থাকে। শিবরাত্রির এই তাৎপর্য কেবল মন্দির দর্শন বা উপবাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দেবাদিদেব মহাদেব হলেন ধ্যানের প্রতীক, স্থিরতার প্রতীক। আর তাঁর এই আদি মন্ত্রটি হলো সেই স্থিরতায় পৌঁছানোর সবচেয়ে সহজ চাবিকাঠি। আধুনিক জীবনে সুস্থ জীবনযাপন (Healthy Lifestyle) বজায় রাখার জন্য জিম বা ডায়েটের পাশাপাশি মানসিক ফিটনেস অভ্যাস (Fitness Habits) সমান জরুরি।
আপনাকে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে জপ করতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। দিনের শেষে, অফিস থেকে ফিরে বা সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর, মোবাইল ফোনটি দূরে সরিয়ে রাখুন। মেরুদণ্ড সোজা করে বসুন। চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিন এবং প্রতিটি শ্বাসের সাথে অনুভব করুন “ওঁ নমঃ শিবায়” মন্ত্রের স্পন্দন। আপনি চাইলে শব্দ করেও উচ্চারণ করতে পারেন, আবার মনে মনেও জপ করতে পারেন। বিজ্ঞানীরা বলেন, নিয়মিত এই অভ্যাসের ফলে মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ (Self-regulation) ক্ষমতা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি হয়। এটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের বিষয় নয়, এটি শব্দ এবং শ্বাসের এক নিখুঁত বৈজ্ঞানিক মেলবন্ধন, যা যেকোনো বয়সের বা বিশ্বাসের মানুষকে মানসিক শান্তি দিতে পারে।
আজ মহাশিবরাত্রির এই পবিত্র তিথিতে, আসুন আমরা বাইরের কোলাহল থামিয়ে একটু নিজেদের ভেতরের শব্দের দিকে কান পাতি। যে মন্ত্র হাজার বছর ধরে হিমালয়ের গুহা থেকে শুরু করে আধুনিক গবেষণাগার পর্যন্ত নিজের শক্তিমত্তার প্রমাণ দিয়ে এসেছে, তাকে আমাদের রোজকার জীবনের অঙ্গ করে তুলি।
#MahaShivaratri2026 #OmNamahShivaya #MantraScience #Neuroscience #MeditationBenefits #AstroTalk #NewsOffBeat #HealthyMind
সাম্প্রতিক পোস্ট
- টি-২০ বিশ্বকাপে ভারতের জয় অব্যাহত │ লণ্ডভণ্ড চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান
- মঞ্চে উঠলেই ভয়? │ পাবলিক স্পিকিং ভীতি কাটানোর ৫টি কৌশল জানুন এখনই
- গায়ে হঠাৎ র্যাশ? মিথ ভেঙে জানুন, চিকেন পক্সের এই লক্ষণগুলো
- স্ট্রেস আর অ্যাংজাইটির মহৌষধ! জানুন মাত্র ৫ অক্ষরের ‘ওঁ নমঃ শিবায়’ মন্ত্র কীভাবে বদলে দেয় স্নায়ুতন্ত্রের গঠন
- মহাশিবরাত্রির রাতে কেন জেগে থাকতে হয়? জানুন, ধর্মীয় প্রথার আড়ালে রয়েছে কোন রহস্য?

