সৃষ্টির শুরুতে কী ছিল? বিগ ব্যাং নাকি ওমকার ধ্বনি? জানুন উপনিষদ থেকে নাসার গবেষণা—কীভাবে Power of Om Chanting মহাজাগতিক কম্পনের সাথে মিলিয়ে দেয় মানুষের আত্মাকে।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক : চোখ বন্ধ করুন। কল্পনা করুন এমন এক সময়ের কথা, যখন এই পৃথিবী ছিল না। ছিল না সূর্য, চাঁদ, নক্ষত্র বা কোনো ছায়াপথ। সময় বা ‘কাল’-এরও জন্ম হয়নি তখন। চারিদিকে কেবল অন্তহীন শূন্যতা আর নিকষ কালো অন্ধকার।
সেই নিস্তব্ধ মহাশূন্যে হঠাৎ এক কম্পন জাগল। এক অনাদি, অনন্ত ধ্বনি সেই নীরবতা ভেঙে ছড়িয়ে পড়ল মহাবিশ্বের প্রতিটি কণায়। সেই ধ্বনিটি হলো—’ওম’ (Om)।
আমরা অনেকেই সকালে উঠে বা যোগব্যায়ামের শুরুতে অভ্যাসবশত ‘ওম’ উচ্চারণ করি। কিন্তু কখনও কি ভেবেছেন, কেন হাজার হাজার বছর ধরে ঋষিরা এই একটি মাত্র শব্দের ওপর এত জোর দিয়ে আসছেন? কেন একে বলা হয় ‘প্রণব মন্ত্র’ বা সমস্ত মন্ত্রের উৎস?
আজ আমরা যাত্রা করব সেই আদি উৎসের সন্ধানে। পুরাণের ধুলোমাখা পথ বেয়ে আমরা পৌঁছাব আধুনিক বিজ্ঞানের দরজায়। শুনব এমন এক গল্প, যা আপনার শরীর ও মনের চেতনাকে জাগিয়ে তুলবে।
আরও পড়ুন : শাঁখ বাজালে কি সত্যিই জীবাণু মরে? পূজার উপকরণের বৈজ্ঞানিক দিক
উপনিষদের গল্প: তিন অক্ষরের মহাজাগতিক খেলা (The Tale of A-U-M)
মাণ্ডুক্য উপনিষদ (Mandukya Upanishad)—বেদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই অংশে ‘ওম’-এর এক বিস্ময়কর ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। ঋষিরা বলছেন, ওম কোনো সাধারণ শব্দ নয়, এটি তিনটি অক্ষরের সমষ্টি— অ (A), উ (U), এবং ম (M)। এই তিনটি অক্ষর আসলে জীবনের তিনটি অবস্থার গল্প বলে।
গল্পটা অনেকটা এরকম— যখন আপনি মুখ খুলে ‘অ’ (A) উচ্চারণ করেন, তখন শব্দ নাভি থেকে উঠে আসে। এটি হলো ‘সৃষ্টি’ বা ‘জাগরণ’। পুরাণ মতে, এটিই ব্রহ্মা—যিনি সৃষ্টি করছেন। আমাদের জীবনের জাগ্রত অবস্থা বা ‘Waking State’-এর প্রতীক এটি।
এরপর যখন ঠোঁট গোল করে ‘উ’ (U) উচ্চারণ করেন, তখন সেই ধ্বনি গড়িয়ে যায় কণ্ঠের দিকে। এটি হলো ‘স্থিতি’ বা ‘পালন’। পুরাণ অনুযায়ী, ইনিই বিষ্ণু—যিনি সৃষ্টিকে রক্ষা করছেন। এটি আমাদের স্বপ্নের জগত বা ‘Dream State’।
সবশেষে যখন ঠোঁট বন্ধ করে ‘ম’ (M) উচ্চারণ করেন, তখন সেই ধ্বনি গুঞ্জনের মতো মস্তিষ্কে গিয়ে শেষ হয়। এটি হলো ‘লয়’ বা ‘ধ্বংস’। ইনিই দেবাদিদেব মহেশ্বর বা শিব। এটি আমাদের গভীর নিদ্রা বা সুষুপ্তি অবস্থার (Deep Sleep) প্রতীক।
অর্থাৎ, একটি মাত্র নিঃশ্বাসে আপনি ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরকে স্মরণ করছেন। সৃষ্টি, স্থিতি এবং লয়ের চক্র সম্পূর্ণ হচ্ছে আপনারই কণ্ঠস্বরে।
সেই অলৌকিক নীরবতা (The Sound of Silence)
কিন্তু গল্পের এখানেই শেষ নয়। ‘ওম’ উচ্চারণের পর যে মুহূর্তের জন্য আমরা থামি—সেই নীরবতা বা নৈঃশব্দ্যেরও এক গভীর অর্থ আছে। উপনিষদে একে বলা হয়েছে ‘তূরীয়’ (Turiya) বা চতুর্থ অবস্থা। এটি এমন এক অবস্থা যখন মানুষ জাগতিক সুখ-দুঃখের ঊর্ধ্বে উঠে যায়। ওম চিহ্নের ওপর যে বিন্দুটি থাকে, সেটি এই পরম চেতনার প্রতীক। ঋষিরা বলেন, আসল সাধনা শব্দে নয়, শব্দের শেষে যে নীরবতা নেমে আসে, তাকে অনুভব করাতেই লুকিয়ে আছে।
বিজ্ঞান যখন পুরাণের কথা বলে (Science Meets Spirituality)
এতক্ষণ তো পুরাণের গল্প শুনলেন। এবার আসি আধুনিক বিজ্ঞানের ল্যাবরেটরিতে। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে মহাবিশ্বের নিজস্ব কোনো শব্দ আছে কি না, তা নিয়ে গবেষণা করছিলেন।
অবাক করা বিষয় হলো, নাসার (NASA) বিজ্ঞানীরা যখন সূর্যের বায়ুমণ্ডলের শব্দ রেকর্ড করলেন এবং সেটিকে মানুষের শ্রবণযোগ্য তরঙ্গে নামিয়ে আনলেন, তখন তাঁরা চমকে উঠলেন। সেই শব্দ কোনো বিস্ফোরণের নয়, বরং এক গভীর ও ধীর গতির গুঞ্জন। ঠিক যেন কোটি কোটি মানুষ একসঙ্গে ‘ওম’ উচ্চারণ করছেন! বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন ‘The Sound of the Sun’ বা মহাজাগতিক গুঞ্জন।
শুধু তাই নয়, ‘বিগ ব্যাং থিওরি’ বা মহাবিস্ফোরণ তত্ত্বের সঙ্গেও এর অদ্ভুত মিল পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মহাবিশ্ব সৃষ্টির সময় যে বিশাল বিস্ফোরণ হয়েছিল, তার ফলে যে কম্পন বা ‘Vibration’ তৈরি হয়েছিল, তা আজও মহাকাশে ‘Cosmic Microwave Background Radiation’ হিসেবে ছড়িয়ে আছে। ঋষিরা হাজার বছর আগে ধ্যানে বসে এই আদি কম্পনকেই ‘নাদব্রহ্ম’ (Nada Brahman) বা ‘শব্দব্রহ্ম’ বলে অভিহিত করেছিলেন। ভাবলে গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায় না? ঋষিরা যা ধ্যানে দেখেছিলেন, আধুনিক টেলিস্কোপ আজ তাই প্রমাণ করছে!
মস্তিষ্কের ওপর প্রভাব: নিউরোসায়েন্স কী বলছে?
এবার আসা যাক আপনার শরীরে এর প্রভাব নিয়ে। আমরা ফোকাস কিওয়ার্ড হিসেবে রেখেছি Power of Om Chanting। আধুনিক ‘নিউরোসায়েন্স’ বা স্নায়ুবিজ্ঞান বলছে, এটি কোনো কুসংস্কার নয়।
যখন আমরা ‘ওম’ উচ্চারণ করি, তখন আমাদের শরীরে ৪৩২ হার্টজ (432 Hz) কম্পাঙ্কের সৃষ্টি হয়। এই বিশেষ ফ্রিকোয়েন্সিটি প্রকৃতির সঙ্গে মিলে যায়।
- ভেগাস নার্ভের জাদু: আমাদের গলার স্বরযন্ত্র বা লarynx-এর পাশ দিয়েই চলে গেছে ‘ভেগাস নার্ভ’। ওম উচ্চারণের সময় যে কম্পন বা ‘Vibration’ তৈরি হয়, তা এই নার্ভকে উদ্দীপিত করে। ফলে আমাদের মস্তিষ্ক শান্ত হয় এবং শরীর ‘Rest and Digest’ মোডে চলে যায়।
- স্ট্রেস হরমোনের বিনাশ: এমআরআই (MRI) স্ক্যানে দেখা গেছে, নিয়মিত ওম জপ করলে মস্তিষ্কের যে অংশটি ভয় ও দুশ্চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করে (Amygdala), সেটি শান্ত হয়ে যায়। কর্টিসল বা স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা ম্যাজিকের মতো কমে যায়।
সায়মেটিক্স: শব্দের জ্যামিতি (The Geometry of Sound)
আরেকটি আধুনিক গবেষণার কথা না বললেই নয়, যার নাম ‘সায়মেটিক্স’ (Cymatics)। বিজ্ঞানীরা একটি পরীক্ষার মাধ্যমে দেখিয়েছিলেন, বালির ওপর সাউন্ড ভাইব্রেশন প্রয়োগ করলে কী ঘটে। যখনই সেখানে ‘ওম’ ধ্বনির কম্পন দেওয়া হয়, বালির দানাগুলো আপনা-আপনি সরে গিয়ে এক নিখুঁত জ্যামিতিক নকশা বা ‘শ্রী যন্ত্র’-এর (Sri Yantra) আকার ধারণ করে। অর্থাৎ, ওম কেবল একটি শব্দ নয়, এটি একটি জ্যামিতিক গঠন। আমাদের শরীর ৭০ শতাংশ জল দিয়ে তৈরি। তাই ওম জপ করলে আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষ এবং জলকণাও সুশৃঙ্খল জ্যামিতিক ছন্দে নেচে ওঠে, যা শরীরকে ভেতর থেকে হিলিং বা নিরাময় করে।
শুরুতে যে অন্ধকারের কথা বলেছিলাম, সেই অন্ধকার আমাদের মনের ভেতরেও থাকে—অজ্ঞানতা, ভয় আর হতাশার অন্ধকার। ‘ওম’ হলো সেই আলো, যা সেই অন্ধকারকে চিরে দেয়। এটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের মন্ত্র নয়, এটি মহাবিশ্বের হৃৎস্পন্দন। তাই পরের বার যখন চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিয়ে ‘ওম’ বলবেন, তখন মনে করবেন না যে আপনি শুধু একটি শব্দ উচ্চারণ করছেন। মনে করবেন, আপনি সেই আদি মহাজাগতিক কম্পনের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে দিচ্ছেন, যেখান থেকে এই সুন্দর সৃষ্টির শুরু। মহাবিশ্বের সেই প্রথম সুর আপনার আত্মার সাথে একাকার হয়ে যাক।
(আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাশিফল আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল WhatsApp চ্যানেলে যোগ দিন! সবচেয়ে আগে পান জ্যোতিষ, অফবিট নিউজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনধারা ও অফবিট এক্সক্লুসিভ আপডেট —আমাদের WhatsApp Channel-এ যোগ দিন)
সাম্প্রতিক পোস্ট
- Gen Z-এর প্রেমের নতুন শব্দভান্ডার জানেন? ভালোবাসার নতুন ব্যাকরণ শিখুন | Gen Z Love Trends 2026
- ব্যস্ত সকালে এই ৫টি Tiffin Recipe রাখুন রোজের তালিকায় | Easy Tiffin Recipes
- ঠাকুর, দেবতা, ভগবান ও ঈশ্বর কি একই? গুলিয়ে ফেলার আগে জেনে নিন আসল তফাৎ | God vs Deity Meaning in Bengali
- জানুন, ব্যক্তি সুভাষের অনন্য প্রেমকাহিনী: সুভাষ ও এমিলি
- গান্ধী বনাম নেতাজি—মূল পার্থক্যটা কোথায়? | Gandhi vs Netaji

