Prasun Bandyopadhyay Sahitya Akademi Award 2025: সত্তরের দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা, উত্তর কলকাতার ঘিঞ্জি জীবন, ফুটবলের রূপক আর প্রান্তিক মানুষের সংগ্রাম—সব মিলিয়ে প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা হয়ে উঠেছে এক অনন্য বাস্তবতার দলিল, যা আজ সাহিত্য অ্যাকাডেমি সম্মানে স্বীকৃত।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: বাংলা কবিতার জগতে আবারও বড় সম্মানের মুহূর্ত। ২০২৫ সালের সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার জিতে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এলেন কবি প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়। দেজ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত তাঁর ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ কাব্যগ্রন্থের জন্য এই সম্মান প্রাপ্তি শুধু একজন কবির ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং সমগ্র বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জগতের গর্বের বিষয়। প্রতি বছর ভারতের ২৪টি আঞ্চলিক ভাষায় সাহিত্যচর্চার সেরা কাজগুলিকে স্বীকৃতি দিতে এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার প্রদান করা হয়, আর সেই তালিকায় এ বছর বাংলা ভাষায় কবিতার জন্য প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম ঘোষিত হওয়া বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
এই বছরের পুরস্কার তালিকায় কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও আত্মজীবনী—বিভিন্ন সাহিত্য ধারার একাধিক বই স্থান পেয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কবিতার জন্যই সর্বাধিক বইকে সম্মানিত করা হয়েছে, যা বর্তমান সময়ে কবিতার শক্তিশালী উপস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতায় দীর্ঘদিন ধরেই যে প্রতিবাদী সুর, মানবিক আবেগ এবং সময়সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে উঠেছে, তা পাঠকের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। তাঁর (Prasun Bandyopadhyay Sahitya Akademi Award 2025) ‘বালি ও তরমুজ’ কিংবা ‘বঙ্গীয় চতুর্দশপদী’ ও অন্যান্য কাব্যসংগ্রহ বাংলা কবিতাকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে। উত্তর কলকাতার মাটি থেকে উঠে আসা এই কবির লেখায় যে তীব্রতা ও সংবেদনশীলতা রয়েছে, তা পাঠকদের মনে এক অনন্য শিহরণ সৃষ্টি করে—আর সেই কারণেই এই পুরস্কার যেন একেবারেই প্রাপ্য সম্মান।
আরও পড়ুন : চৌরঙ্গীর স্রষ্টা আর নেই │ শংকরের চোখে কলকাতা শহর, মানুষের শ্রেণি ও সময়ের দলিল
কবি প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৫৬ সালে। সত্তরের দশকের উত্তাল সময়েই তাঁর কবিতা জীবনের সূচনা, আর সেই সময়ের সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা তাঁর লেখার ভেতরে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি নিজের স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর গড়ে তুলতে সক্ষম হন—যা তাঁকে সমকালীন কবিদের থেকে আলাদা করে চিহ্নিত করে। তাঁর অন্যতম জনপ্রিয় কাব্যগ্রন্থ ‘বালি ও তরমুজ’ প্রকাশের পর পাঠকমহলে তুমুল সাড়া ফেলে, এবং সেই থেকেই তিনি বাংলা কবিতার জগতে একটি শক্তিশালী উপস্থিতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতায় শুরু থেকেই একটি আলাদা স্বর ও দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ করা যায়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কবিতাগুলির মধ্যে ‘আনন্দ ভিখিরী’, ‘উন্মেষ গোধূলি’, এবং ‘অভিসময়: কালী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর কবিতায় অনেকাংশেই কবি জীবনানন্দ দাসের প্রভাব অনুভূত হয়—বিশেষত রূপকধর্মিতা, চিত্রকল্পের ব্যবহার এবং গভীর অন্তর্মুখী আবহে। তবে এই প্রভাবের মধ্যেও তিনি নিজের স্বতন্ত্রতা অটুট রেখেছেন, যা তাঁর কবিতাকে আলাদা মাত্রা দেয়।
উত্তর কলকাতা তাঁর কবিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি, কিন্তু তা কোনো রোমান্টিক বা সৌন্দর্যনির্ভর শহরের ছবি নয়। বরং সেখানে ফুটে ওঠে এক কঠোর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি—অন্ধকার সরু গলি, বাবুদের লাল রক, আড্ডা, সন্ধ্যার তাস খেলা, আর বাংলা মদের আসর—এই সমস্ত উপাদান তাঁর কবিতায় জীবন্ত হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতার মধ্যেই তিনি খুঁজে পান সমাজের গভীর সত্য। তাঁর কবিতায় প্রান্তিক মানুষ, দরিদ্র জীবন, তাদের আনন্দ-বেদনা এবং সংগ্রামের চিত্র স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
এই সবকিছু মিলিয়েই প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতায় এক অনন্য কাব্যদর্শন গড়ে ওঠে, যেখানে ব্যক্তিগত অনুভব, সামাজিক বাস্তবতা এবং রাজনৈতিক চেতনা একাকার হয়ে যায়। উত্তর কলকাতার আলো-আঁধারিতে জন্ম নেওয়া সেই কবিতাগুলো আজও পাঠকের মনে এক গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে, এবং নতুন এক পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখায়।
কবি প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে পেশাদার ফুটবলার প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও যোগ নেই—তবে তাঁর কবিতার ভেতরে ফুটবল এক অনন্য রূপক হিসেবে বারবার ফিরে আসে। তিনি যেভাবে ফুটবলকে কাব্যের ভাষায় টেনে আনেন, তা বাংলা কবিতায় একেবারেই স্বতন্ত্র। বিশেষ করে হাবিবের থ্রু পাসের মতো একটি ফুটবল মুহূর্তকে তিনি রাজনৈতিক প্রতিরোধের রূপকে রূপান্তরিত করেন—যেখানে খেলার কৌশল আর সমাজ-রাজনীতির টানাপোড়েন একাকার হয়ে যায়। এই মিশ্রণই তাঁর কবিতাকে আলাদা মাত্রা দেয়।
প্রসূনের কবিতায় বাস্তব জীবনের বিশ্বাসঘাতকতা, স্বজনের দূরত্ব, এবং সমাজের কঠিন সত্যগুলি গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়। উত্তর কলকাতার পাড়ার রাজনীতি, বিশেষত নকশাল আন্দোলনের সময় বেলেঘাটা, বাগবাজার, হাতিবাগানের মতো এলাকায় বামপন্থী আদর্শের উত্থান—এই সবকিছুর প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন তিনি। সেই রাজনৈতিক উত্তাপ তাঁর কবিতায় খুব স্বাভাবিকভাবেই জায়গা করে নিয়েছে। তবে তাঁর কবিতা কখনও স্রেফ স্লোগান হয়ে ওঠে না; বরং সেখানে থাকে বাস্তব জীবনের স্পর্শ, মানবিক অনুভূতির গভীরতা।
উত্তর কলকাতার সঙ্গে ফুটবলের সম্পর্ক বহুদিনের, আর সেই ঐতিহ্যও তাঁর কবিতায় জায়গা পেয়েছে। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থের ‘খেলা’ কবিতায় ফুটবল শুধুমাত্র একটি খেলা নয়, বরং জীবনের বৃহত্তর রূপক—যেখানে মাঠের লড়াই যেন জীবনের সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। ফুটবলের এই দার্শনিক ব্যবহার তাঁকে বাংলা কবিতায় আলাদা করে চিহ্নিত করে।
এছাড়াও বাংলা ভাষায় ফুটবল বিষয়ক অন্যতম সেরা গ্রন্থের লেখক হিসেবেও তিনি পরিচিত। তাঁর কবিতায় উত্তর কলকাতার মানবিক অনুভূতি, পাড়ার জীবন, সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ এক গভীর আন্তরিকতায় ধরা পড়েছে। ‘আনন্দ ভিখিরী’ কাব্যগ্রন্থে যেমন একদিকে মিস্টিক আবহ তৈরি হয়, তেমনি ‘মধ্যকণ্ঠা’ কবিতায় বেলঘরিয়ার প্রসঙ্গ উঠে এসে শুধুমাত্র একটি ভৌগোলিক স্থানকে ছাড়িয়ে যায়। সেখানে নকশাল আন্দোলনের সময় বাম-ডানের দ্বন্দ্ব, সামাজিক অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েন এক জটিল চিত্রকল্পে ধরা দেয়।
এইভাবেই প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে একসূত্রে গেঁথে এক অনন্য কাব্যভাষা নির্মাণ করেছেন—যা পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলে। বাংলা কবিতার জগতে প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় এক অনন্য স্বর—আর তাঁর সৃষ্টিকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন কবি ও সাহিত্যপ্রেমী সার্থক রায়চৌধুরী। তাঁদের মধ্যে এক দীর্ঘ আলাপচারিতা হয়েছিল, যেখানে উঠে আসে কবির সৃষ্টির নেপথ্য গল্প, সময়ের প্রভাব এবং তাঁর কবিতার অন্তর্লীন দর্শন।
প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৮৩ সালে, যদিও তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল আরও আগে, ১৯৭৪ সালে। অর্থাৎ, প্রথম লেখা থেকে প্রথম বই প্রকাশের মধ্যে প্রায় এক দশকের ব্যবধান। আবার প্রথম বইয়ের পর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পেতে সময় লাগে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত। এই দীর্ঘ বিরতি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে কবি নিজেই জানিয়েছিলেন, লেখার সঙ্গে জীবনের বাস্তব সংগ্রাম, সময়ের চাপ এবং ব্যক্তিগত পরিপক্বতার একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর কাছে কবিতা শুধুই প্রকাশ নয়, বরং এক ধরণের অন্তর্গত প্রস্তুতি—যা সময় নিয়ে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণতা পায়।
তাঁর কবিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল রাজনৈতিক চেতনা। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন—তাঁর প্রতিটি কবিতায় কেন যেন একটি রাজনৈতিক সুর বা বার্তা থেকে যায়? এর উত্তরে প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট করে বলেছেন, রাজনীতি জীবনের বাইরে নয়; বরং আমাদের প্রতিদিনের অস্তিত্বের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাই তাঁর কবিতায় রাজনীতি আসা কোনো ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং বাস্তব জীবনেরই প্রতিফলন। তাঁর কবিতা কখনও স্লোগানধর্মী হয়ে ওঠে না, বরং জীবনের গভীর অনুভূতি, অভিজ্ঞতা এবং সময়ের সত্যকে ধারণ করে।
‘উত্তর কলকাতার কবিতা’ কাব্যগ্রন্থে তিনি এক অনন্য ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন শহরের সেই ঘিঞ্জি অঞ্চল, তার মানুষ, তার সংস্কৃতি এবং তার অন্তর্লীন টানাপোড়েন। সত্তরের দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক বৈষম্য, এবং উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতার সাংস্কৃতিক ব্যবধান—সবকিছুই তাঁর কবিতায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে উত্তর কলকাতার অলিগলি, তার নস্টালজিয়া, তার সংগ্রাম—এসবই তাঁর কাব্যে এক গভীর আবেগের জন্ম দেয়।
এইসব কারণেই প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা কবিতায় এক নতুন দিশা দেখিয়েছেন। তিনি সত্তরের দশকের সেই ধারার কবি, যিনি ব্যক্তিগত অনুভূতি, সামাজিক বাস্তবতা এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে একসূত্রে গেঁথে এক স্বতন্ত্র কাব্যভাষা নির্মাণ করেছেন। তাঁর কবিতায় যেমন আছে নস্টালজিয়া, তেমনই আছে প্রতিবাদ; যেমন আছে বাস্তবতা, তেমনই আছে স্বপ্ন।
এই পরিপ্রেক্ষিতেই তাঁকে (Prasun Bandyopadhyay Sahitya Akademi Award 2025) অনেকেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সার্থক উত্তরসূরি বলে মনে করেন। তাঁদের কবিতার ধারাকে আত্মস্থ করে, নিজের স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর তৈরি করে প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যে নিজের একটি স্থায়ী স্থান গড়ে তুলেছেন। আর এই সবকিছুর সম্মিলিত স্বীকৃতিই হল সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার—যা নিঃসন্দেহে তাঁর প্রাপ্য সম্মান।
সাম্প্রতিক পোস্ট
- বৃদ্ধ বয়সে ডিভোর্স চাইছেন পঙ্কজ-ডিম্পল! মাঝখানে ফেঁসে গেলেন অপরশক্তি খুরানা?
- ‘গুজারিশ’-এর ইথান মাসকারেনহাস আজ বাস্তব! ১৩ বছরের যন্ত্রণার অবসান, দেশে প্রথমবার ইউথেনেশিয়া (নিষ্কৃতিমৃত্যুর) অনুমতি সুপ্রিম কোর্টের
- স্বেচ্ছামৃত্যু কি ভারতে বৈধ? স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন কে করতে পারেন? ভারতে ইউথানেসিয়া নিয়ে কী বলছে আইন
- মাছ-মাংস না খেলেও শরীর থাকবে ফিট! জেনে নিন, ৩টি হেলদি সুস্বাদু নিরামিষ রেসিপি
- যোটক বিচার কি সত্যিই কাজ করে? বিয়ের আগে আসলে কোনটা জরুরি, কী বলছে আধুনিক বিজ্ঞান?

