শুধুই মাঙ্গলিক চিহ্ন নাকি ফুসফুসের মহৌষধ? জানুন সমুদ্র মন্থন থেকে উঠে আসা এই রত্নটির পৌরাণিক ইতিকথা এবং Shankh Blowing Science-এর আড়ালে লুকিয়ে থাকা স্বাস্থ্য ও পরিবেশ রক্ষার গোপন রহস্য।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক : গোধূলি বেলা। সূর্যের শেষ আলোটুকু মিলিয়ে যাচ্ছে দিগন্তে। ঠিক সেই সময় বাংলার ঘরে ঘরে জ্বলে ওঠে সন্ধ্যাপ্রদীপ আর বেজে ওঠে শাঁখ। সেই গভীর ও উদাত্ত ধ্বনি—”পোঁ…ও…ও…”। এই আওয়াজ শুনলেই মনটা কেমন শান্ত হয়ে যায়, তাই না?
ছোটবেলা থেকে আমরা শুনে আসছি, শাঁখ বাজালে ভূত-প্রেত পালায়, ঘর পবিত্র হয়। কিন্তু কখনও কি ভেবেছেন, আমাদের ঋষি-মুনিরা কি শুধুই ভূত তাড়াতে এই প্রথা চালু করেছিলেন? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো গভীর বিজ্ঞান? আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন আমরা সামান্য শ্বাসকষ্টে ইনহেলার খুঁজি বা এয়ার পিউরিফায়ার কিনি, তখন এই প্রাচীন শাঁখই হতে পারে আমাদের জীবনদায়ী বন্ধু।
আজ আমরা যাত্রা করব সমুদ্রের অতল থেকে বিজ্ঞানের ল্যাবরেটরিতে। জানবো শাঁখের পৌরাণিক গল্প এবং আধুনিক বিজ্ঞানের চোখে এর বিস্ময়কর উপকারিতা।
সমুদ্র মন্থন ও পাঞ্চজন্যের জন্ম (The Mythological Origin)
শাঁখ বা শঙ্খের জন্মকথা জড়িয়ে আছে সেই বিখ্যাত ‘সমুদ্র মন্থন’-এর কাহিনীর সঙ্গে। বিষ্ণু পুরাণ এবং মহাভারত অনুসারে, দেবতা ও অসুররা যখন ক্ষীরসাগর মন্থন করছিলেন, তখন সেখান থেকে একে একে উঠে এসেছিল ১৪টি রত্ন। তার মধ্যে ষষ্ঠ রত্নটি ছিল ‘শঙ্খ’।
ভগবান বিষ্ণু এই শঙ্খকে নিজের হাতে ধারণ করলেন। তাঁর শঙ্খের নাম ‘পাঞ্চজন্য’। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে শ্রীকৃষ্ণ যখন অর্জুনের রথ চালনা করছিলেন, তখন যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল এই পাঞ্চজন্যের নিনাদেই। পুরাণ বলছে, শাঁখের ধ্বনি হলো ‘ওম’ বা ‘প্রণব’ ধ্বনিরই রূপান্তর। এটি অসুরের বিনাশ এবং সত্যের জয়ের প্রতীক। তাই আজও যেকোনো মাঙ্গলিক কাজে—বিয়ে হোক বা পূজা—শাঁখ ছাড়া হিন্দু ধর্মে কোনো অনুষ্ঠান অসম্পূর্ণ।
শব্দতরঙ্গ ও জীবাণু বিনাশ: বিজ্ঞান কী বলছে? (The Science of Sound)
এবার আসি আসল প্রশ্নে—শাঁখ বাজালে কি সত্যিই জীবাণু মরে? নাকি এটি শুধুই কুসংস্কার? আধুনিক শব্দবিজ্ঞান বা ‘Acoustics’ বলছে, শব্দ আসলে এক প্রকার শক্তি বা এনার্জি, যা তরঙ্গের আকারে ছড়িয়ে পড়ে।
- বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা: ১৯২৮ সালে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছিল যে, শাঁখ থেকে নির্গত শব্দতরঙ্গ বা সাউন্ড ভাইব্রেশন এতটাই শক্তিশালী যে এটি বাতাসের ভাসমান ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া এবং অনেক ভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করতে পারে।
- কম্পাঙ্কের খেলা: শাঁখের আওয়াজ একটি নির্দিষ্ট এবং তীক্ষ্ণ কম্পাঙ্ক (High Frequency Vibration) তৈরি করে। এই কম্পন যখন বাতাসের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন মশা বা ছোট পোকামাকড়দের স্নায়ুতন্ত্রে আঘাত করে, ফলে তারা ওই স্থান ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। প্রাচীনকালে যখন মশা তাড়ানোর ধূপ ছিল না, তখন শাঁখের আওয়াজই ছিল পরিবেশকে কীটমুক্ত রাখার উপায়।
ফুসফুসের মহৌষধ: প্রাকৃতিক ইনহেলার (The Ultimate Lung Exercise)
করোনার পর থেকে আমরা ফুসফুস নিয়ে খুব সচেতন হয়েছি। স্পাইরোমিটার দিয়ে ফুঁ দেওয়া বা বেলুন ফোলানোর ব্যায়াম করছি। কিন্তু জানলে অবাক হবেন, শাঁখ বাজানো হলো পৃথিবীর অন্যতম সেরা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম।
১. প্রাণায়ামের বিকল্প: শাঁখ বাজাতে গেলে আপনাকে প্রথমে বুক ভরে শ্বাস নিতে হয় (Inhale) এবং তারপর পেটের পেশী সংকুচিত করে ধীরে ধীরে সেই শ্বাস ছাড়তে হয় (Exhale)। এটি হুবহু ‘অনুলোম-বিলোম’ বা প্রাণায়ামের মতো কাজ করে। ২. ডায়াফ্রাম ও পেশীর ব্যায়াম: নিয়মিত শাঁখ বাজালে আমাদের ডায়াফ্রাম, বুকের পেশী এবং গলার পেশী শক্তিশালী হয়। ৩. মূত্রনালীর সমস্যা ও হার্নিয়া: আয়ুর্বেদ শাস্ত্র বলছে, শাঁখ বাজানোর সময় তলপেটে যে চাপ পড়ে, তা প্রোস্টেট এবং মূত্রনালীর সমস্যা কমাতে সাহায্য করে। এমনকি হার্নিয়া প্রতিরোধেও এর ভূমিকা আছে।
থাইরয়েড এবং সৌন্দর্য (Thyroid and Vocal Cords)
আপনি কি খেয়াল করেছেন, যারা নিয়মিত শাঁখ বাজান, তাদের গলার স্বর খুব স্পষ্ট এবং ভারী হয়? শাঁখ বাজানোর সময় আমাদের গলায় বা ভোকাল কর্ডে এবং থাইরয়েড গ্ল্যান্ডে এক বিশেষ কম্পন সৃষ্টি হয়। এই কম্পন থাইরয়েড হরমোনের ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া মুখের পেশীর ব্যায়াম হওয়ার ফলে চামড়ায় সহজে বলিরেখা পড়ে না, যা ন্যাচারাল অ্যান্টি-এজিং বা ফেস যোগা (Face Yoga)-র কাজ করে।
শাঁখের জল: ক্যালসিয়ামের খনি
শুধু আওয়াজ নয়, শাঁখের খোলসটিও উপকারী। শাঁখ আসলে ক্যালসিয়াম কার্বনেট দিয়ে তৈরি। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ-এ বলা হয়েছে, শাঁখে সারা রাত জল রেখে সকালে সেই জল পান করলে পেটের সমস্যা এবং ত্বকের রোগ ভালো হয়। আধুনিক বিজ্ঞানেও দেখা গেছে, শাঁখে রাখা জলে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস এবং সালফারের গুণাগুণ মিশে যায়, যা হাড়ের জন্য ভালো।
মানসিক প্রশান্তি (Mental Stress Buster)
গবেষণায় দেখা গেছে, শাঁখের ধ্বনি মানুষের মস্তিষ্কের আলফা ওয়েভ (Alpha Wave) সক্রিয় করে। অফিসে সারাদিনের কাজের চাপ বা স্ট্রেস নিয়ে বাড়ি ফেরার পর, সন্ধ্যায় শাঁখের আওয়াজ শুনলে মস্তিষ্ক শান্ত হয়। এটি আমাদের ‘প্যারা-সিম্প্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম’কে উদ্দীপ্ত করে, যা শরীরকে শিথিল বা রিলাক্স করতে সাহায্য করে।
আমাদের পূর্বপুরুষরা হয়তো মাইক্রোস্কোপ দিয়ে জীবাণু দেখেননি, কিন্তু তাঁরা জানতেন কীভাবে শব্দ ও শ্বাসবায়ুকে কাজে লাগিয়ে শরীর ও পরিবেশ সুস্থ রাখা যায়। শাঁখ কেবল পূজার উপকরণ নয়, এটি আমাদের ‘সনাতন বিজ্ঞান’-এর এক উজ্জ্বল নিদর্শন। তাই আজ থেকে শাঁখ বাজানোর সময় ভাববেন না যে আপনি শুধু সংস্কার মানছেন; মনে রাখবেন, আপনি নিজের ফুসফুসকে শক্তিশালী করছেন এবং বাতাসকে করছেন নির্মল। গোধূলি বেলার ওই পবিত্র ধ্বনি আপনার জীবনে সুস্থতার বার্তা নিয়ে আসুক।
(আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাশিফল আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল WhatsApp চ্যানেলে যোগ দিন! সবচেয়ে আগে পান জ্যোতিষ, অফবিট নিউজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনধারা ও অফবিট এক্সক্লুসিভ আপডেট —আমাদের WhatsApp Channel-এ যোগ দিন)
সাম্প্রতিক পোস্ট
- Gen Z-এর প্রেমের নতুন শব্দভান্ডার জানেন? ভালোবাসার নতুন ব্যাকরণ শিখুন | Gen Z Love Trends 2026
- ব্যস্ত সকালে এই ৫টি Tiffin Recipe রাখুন রোজের তালিকায় | Easy Tiffin Recipes
- ঠাকুর, দেবতা, ভগবান ও ঈশ্বর কি একই? গুলিয়ে ফেলার আগে জেনে নিন আসল তফাৎ | God vs Deity Meaning in Bengali
- জানুন, ব্যক্তি সুভাষের অনন্য প্রেমকাহিনী: সুভাষ ও এমিলি
- গান্ধী বনাম নেতাজি—মূল পার্থক্যটা কোথায়? | Gandhi vs Netaji

