Shapoorji Water Crisis: নিউটাউনের সাপুরজি সুখবৃষ্টি আবাসনের ই-ব্লকে পানীয় জলে ভয়াবহ দূষণ। কল খুললেই বেরোচ্ছে কাদা-জল, ঘরে ঘরে ছড়াচ্ছে ডায়রিয়া। ক্ষুব্ধ বাসিন্দাদের বিক্ষোভে ঘটনাস্থলে পুলিশ। স্মার্ট সিটির আড়ালে চরম নাগরিক দুর্ভোগের এক্সক্লুসিভ রিপোর্ট পড়ুন নিউজ অফবিটে।
নিউজ অফবিট বিশেষ প্রতিবেদন: নিউটাউন—কলকাতার আধুনিকতার এক জ্বলন্ত প্রতীক। নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে চকচকে কাঁচের বহুতল, সিলিকন ভ্যালির ধাঁচে তৈরি আইটি হাব, মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা একাধিক নামিদামি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আর ইউরোপীয় শহরের মতো ঝকঝকে চওড়া রাস্তা। এখানে দেশের সেরা মস্তিষ্কগুলো কাজ করে, নামী বহুজাতিক সংস্থাগুলো কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করে। কিন্তু এই তথাকথিত ‘স্মার্ট সিটি’-র চাকচিক্যের ঠিক নিচেই যে কতটা অন্ধকার আর পচন লুকিয়ে আছে, তা হয়তো বাইরে থেকে দেখে বোঝা সম্ভব নয়।
কোটি কোটি টাকা খরচ করে, জীবনের সমস্ত সঞ্চয় ঢেলে এই নিউটাউনের বুকে মাথা গোঁজার ঠাঁই কিনেছিলেন অসংখ্য সাধারণ, মধ্যবিত্ত মানুষ। তাঁদের স্বপ্ন ছিল একটি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের। কিন্তু সাপুরজি সুখবৃষ্টি আবাসনের ই-ব্লকের (E Block) বাসিন্দারা আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন, স্মার্ট সিটির এই রূপকথার আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে চরম বঞ্চনা আর প্রতারণার এক নগ্ন বাস্তব। যেখানে আধুনিকতার চরম উৎকর্ষের কথা বলা হয়, সেখানে সামান্য এক ফোঁটা বিশুদ্ধ পানীয় জলের জন্য হাহাকার করতে হচ্ছে এখানকার বাসিন্দাদের। আধুনিকতার এই মিথ্যে অহংকারের মুখে সপাটে চড় কষিয়ে দিচ্ছে ই-ব্লকের কল থেকে বেরিয়ে আসা গাঢ় বাদামী রঙের কাদা-জল।
আরও পড়ুন : নতুন ‘যুব সাথী’ প্রকল্পের ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী
‘সুখবৃষ্টি’ নয়, এ যেন এক অভিশপ্ত ‘দুঃখবৃষ্টি’
আবাসনের নাম ‘সুখবৃষ্টি’, কিন্তু ই-ব্লকের বাসিন্দাদের জীবনে এখন রোজকার সঙ্গী শুধু ভয় আর দুর্ভোগ। আমাদের হাতে আসা ভিডিও ফুটেজ যে কোনো সুস্থ মানুষকে শিউরে উঠতে বাধ্য করবে। বেসিনের কল খুললেই অনর্গল বেরিয়ে আসছে কাদাগোলা, ঘোলাটে, দুর্গন্ধযুক্ত জল। ভেবে দেখুন তো, একটি শহরের সবচেয়ে অভিজাত এবং সুপরিকল্পিত উপনগরীতে সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে প্রাতরাশ বানানোর জন্য বা স্নান করার জন্য এমন জলের মুখোমুখি হতে কেমন লাগে? নিউটাউনের মতো জায়গায়, যেখানে প্রভূত দামে ফ্ল্যাট বিক্রি হয়, সেখানে দিনের পর দিন এমন নিম্নমানের, দূষিত জল সরবরাহ কীভাবে চলতে পারে? এই জল পান করা তো দূরের কথা, বাসন মাজা বা জামাকাপড় কাচার কাজে ব্যবহার করলেও মারাত্মক সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে যায়। এই ভয়াবহ বাস্তব প্রমাণ করে দেয় যে, রিয়েল এস্টেটের বিজ্ঞাপনে দেখানো ঝাঁ চকচকে জীবনের প্রতিশ্রুতি আসলে কতটা ফাঁপা।
ঘরে ঘরে ডায়রিয়ার প্রকোপ: মেইনটেন্যান্স কর্তৃপক্ষের চরম প্রহসন
এই দূষিত জলের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যের ওপর। প্রায় প্রতিটি পরিবারে এখন কেউ না কেউ পেটের সমস্যায় ভুগছেন। ডায়রিয়া, বমি এবং মারাত্মক সংক্রমণে কাবু শিশু থেকে বৃদ্ধ। বাসিন্দারা যখন এই চরম সঙ্কটের কথা মেইনটেন্যান্স কর্তৃপক্ষকে জানান, তখন সমাধানের নামে যে প্রহসনটি করা হয়, তা এককথায় অবিশ্বাস্য।
দীর্ঘদিন ধরে জলের ট্যাঙ্ক পরিষ্কার না করার দায় এড়াতে কর্তৃপক্ষ জলের মধ্যে ‘জিওলিন’ (Zeoline) ব্যবহার করার নিদান দেয়। কিন্তু বাসিন্দারা যখন সেই জিওলিনের বোতলটি খতিয়ে দেখেন, তখন তাদের চক্ষু চড়কগাছ। বোতলের গায়ে স্পষ্ট লাল কালিতে সতর্কবার্তা দেওয়া: “Caution: Don’t use in any aluminium pot” (সতর্কতা: কোনো অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে ব্যবহার করবেন না)।
হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে এই নিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন আবাসিকরা
সৌরভ (রিকি) নামের এক বাসিন্দা লেখেন, “এটা হয়তো মজুত থাকা জলটাকে পরিষ্কার করবে, কিন্তু শুধুমাত্র এটা দিয়ে ট্যাঙ্ক কীভাবে পরিষ্কার হচ্ছে? ট্যাঙ্কগুলো তো একটা নির্দিষ্ট সময় অন্তর পরিষ্কার করা উচিত”। সুভ্রদীপ গাঙ্গুলী নামের আরেক আবাসিক কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত উদাসীনতায় হতবাক হয়ে প্রশ্ন তোলেন, “এত বড় ঘটনার পরেও ওনারা এত স্বাভাবিকভাবে কীভাবে কথা বলছেন? ওনারা আমাদের টাকায় বেতন পান, অথচ এমন আচরণ করছেন যেন আমরা ওনাদের এলাকায় অনুপ্রবেশকারী!”। এই মন্তব্যগুলো প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের জীবনের কোনো মূল্যই নেই এই বড় বড় কর্পোরেট ম্যানেজমেন্টের কাছে।

দেওয়ালে পিঠ, অবশেষে রাজপথে ক্ষুব্ধ নাগরিক
সহ্যশক্তির বাঁধ ভাঙলে সাধারণ মানুষ যে কতটা মরিয়া হয়ে উঠতে পারে, তার সাক্ষী থাকল নিউটাউন। ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে ই-ব্লকের বাসিন্দারা একজোট হয়ে একটি কড়া অভিযোগপত্র জমা দেন ‘সাপুরজি সুখবৃষ্টি ই-ব্লক মেইনটেন্যান্স অফিস’-এ। এই চিঠিতে আশুতোষ কুমার, দীপশিখা ঘোষ, সৌরভ ব্যানার্জী সহ অসংখ্য বাসিন্দা গণস্বাক্ষর করেন।
চিঠিতে স্পষ্ট জানতে চাওয়া হয়, কেন এই বিপদের সময় বিকল্প পানীয় জলের ব্যবস্থা করা হলো না? জলের ল্যাবরেটরি টেস্ট কেন করা হয়নি?। ৪৮ ঘণ্টার চরমসীমা বেঁধে দেওয়া হয় চিঠিতে।
ক্ষোভ শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আবাসনের নিচে, মাঠে এবং ছাদে রীতিমতো বিক্ষোভে ফেটে পড়েন আবাসিকরা। আমাদের পাওয়া ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, মেইনটেন্যান্স কর্মীদের ঘিরে ধরে তীব্র বাদানুবাদ চলছে। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে শেষমেশ আসরে নামতে হয় টেকনো সিটি থানার পুলিশকে। পুলিশের গাড়ি এবং সাদা উর্দির আধিকারিকদের সামনে দাঁড়িয়ে ক্ষুব্ধ নাগরিকরা নিজেদের মৌলিক অধিকারের দাবি জানাতে থাকেন।
ঐক্যের ডাক: নিজেদের অধিকার ছিনিয়ে নিতে হবে
সাপুরজির এই ঘটনা আবাসিকদের একটা বড় শিক্ষা দিয়েছে—একতা ছাড়া এই কর্পোরেট দানবদের বিরুদ্ধে লড়াই করা অসম্ভব। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলোতে এখন নিজেদের অ্যাসোসিয়েশন গড়ার ডাক। অভিরূপ নামের এক বাসিন্দা প্রস্তাব দিয়েছেন, “এ ব্লকের (A Block) মতো আমাদেরও ই-ব্লক অ্যাসোসিয়েশন তৈরি করার পরিকল্পনা করা উচিত”।
শুভাশিস ঘোষ নামের আরেক আবাসিক পুরনো অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেছেন, “প্রায় দু’বছর আগে যখন জল এবং পার্কিং নিয়ে সমস্যা হয়েছিল, তখন পুলিশের সামনে সবাই ফ্যামিলিওয়ালা সেজে গিয়েছিল, কোনো একতা ছিল না… ই ব্লকে যতদিন না আমাদের নিজেদের অ্যাসোসিয়েশন তৈরি হচ্ছে, ততদিন কিচ্ছু হবে না”।
এমনকী, কর্তৃপক্ষের ওপর ভরসা হারিয়ে বাসিন্দারা নিজেদের উদ্যোগেই জলের নমুনা ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার জন্য পাঠাচ্ছেন। জানা গেছে, IS:10500, 2012 নিয়ম অনুযায়ী টেস্টের জন্য ৪০০০ টাকা (প্লাস জিএসটি) খরচ করতেও তাঁরা পিছপা হচ্ছেন না। কারণ, জীবনের চেয়ে বড় কিছু হতে পারে না।
স্মার্ট সিটির আসল রূপ
সাপুরজি সুখবৃষ্টির এই জলসঙ্কট নিছক কোনো পাইপ ফেটে যাওয়ার ঘটনা নয়। এটি আমাদের তথাকথিত ‘উন্নয়ন’-এর গালে একটি বিরাট বড় চড়। যে শহরে বিশ্বের নামীদামি আইটি কোম্পানিগুলো ডেটা সায়েন্স আর আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে প্রোজেক্ট করছে, সেই শহরেরই একটি নামী আবাসনের বাসিন্দাদের জলের জন্য পুলিশের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে—এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে?
এই ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, পরিকাঠামোর উন্নয়ন মানে শুধু কাঁচের ইমারত আর মসৃণ রাস্তা নয়। যতক্ষণ না সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের মৌলিক অধিকার—একটু পরিষ্কার বাতাস আর এক ফোঁটা বিশুদ্ধ জল নিশ্চিত করা যাচ্ছে, ততক্ষণ ‘স্মার্ট সিটি’ শব্দটা কেবলই একটা রাজনৈতিক এবং কর্পোরেট জুমলা হয়েই থেকে যাবে। সাপুরজির ই-ব্লকের বাসিন্দাদের এই প্রতিবাদ শুধু নিজেদের জলের জন্য নয়, এই প্রতিবাদ এক পচে যাওয়া ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। নিউজ অফবিট এই খবরের প্রতিটি আপডেটের দিকে কড়া নজর রাখছে।
#ShapoorjiSukhobrishti #NewTownKolkata #WaterCrisis #KolkataNews #SmartCityReality #NewsOffbeat #সাপুরজি_আবাসন #নিউটাউন #কলকাতা

