ভার্চুয়াল ভাষণে Sheikh Hasina Virtual Address ঘিরে ফের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশে ফেরার বার্তা, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভাবনা এবং আওয়ামী লীগের নেতাদের উপস্থিতিতে এই অনুষ্ঠান ঘিরে বাড়ছে রাজনৈতিক জল্পনা।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ২০২৪ সালের কোটা আন্দোলন, পরবর্তী সহিংসতা, আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি এবং নিজের দেশে ফেরার ইচ্ছা নিয়ে দীর্ঘ বক্তব্য রাখলেন। বক্তব্যে তিনি একাধিক গুরুতর অভিযোগ, রাজনৈতিক দাবি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। একইসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, ক্ষমতার জন্য নয়, দেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতেই তিনি বাংলাদেশে ফিরতে চান।
দেশে ফিরতে চান কেন? আবেগঘন ব্যাখ্যা শেখ হাসিনার
বক্তব্যের শেষ অংশে শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনও উদ্বেগ নেই। বরং বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং দেশের মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়েই তিনি বেশি চিন্তিত।
তিনি জানান, টানা ছয় বছর নির্বাসনে থাকার পর দেশে ফিরে সামরিক শাসন, একনায়কতন্ত্র এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। তাঁর দাবি, রাজনৈতিক জীবনে ১৯ বার তাঁকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। এমনকি ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাও তাঁকে থামাতে পারেনি।
শেখ হাসিনা বলেন,
“আমি আমার নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত নই। আমি চিন্তিত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে।”
তিনি আরও বলেন,
“আমি বাংলাদেশে ফিরতে চাই একটাই উদ্দেশ্যে—মানুষের পাশে দাঁড়াতে এবং তাদের জীবন আরও উন্নত করতে।”
তাঁর দাবি, দেশের মানুষ নিরাপত্তা, উন্নয়ন, শান্তি, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং গণতান্ত্রিক অধিকার পাওয়ার যোগ্য। আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ফিরে আসাও ক্ষমতা দখলের জন্য নয়, বরং বাংলাদেশকে আবার উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের পথে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যেই।
২০২৪ সালের আন্দোলনের ‘মূল পরিকল্পনাকারী’ সম্পর্কে কী বললেন?
২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা দাবি করেন, এটি কোনও স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন ছিল না।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী,
- ২০১৮ সালে ছাত্রদের দাবির ভিত্তিতেই কোটা ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল।
- ২০২৪ সালে হাইকোর্ট সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করলে সরকার নিজেই সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছিল।
- তিনি ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষার্থীদের গণভবনে ডেকে আলোচনা করেছিলেন।
- তিনজন মন্ত্রীও ছাত্রদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন।
তাঁর অভিযোগ, পরে এই আন্দোলনকে পরিকল্পিতভাবে এক দফা সরকার পতনের আন্দোলনে পরিণত করা হয়।
‘মূল পরিকল্পনাকারী’ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনার দাবি
শেখ হাসিনা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই একসময় এই আন্দোলনকে “অত্যন্ত সুপরিকল্পিত” এবং “একজন মূল পরিকল্পনাকারীর নেতৃত্বে পরিচালিত” বলে উল্লেখ করেছিলেন।
এই বক্তব্যের উল্লেখ করে শেখ হাসিনার দাবি,
- আন্দোলনের দৃশ্যমান কোনও নেতৃত্ব ছিল না।
- আড়াল থেকে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছিল।
- সংগঠিতভাবে পুরো আন্দোলন পরিচালিত হয়েছে।
- নির্বাচন ছাড়াই ক্ষমতার পথ তৈরি করাই ছিল উদ্দেশ্য।
তবে তিনি তাঁর বক্তব্যে সেই কথিত “মূল পরিকল্পনাকারী”র নাম উল্লেখ করেননি।
১৫ জুলাইয়ের পর আন্দোলনের চরিত্র বদলে যায়: শেখ হাসিনার দাবি
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ১৫ জুলাইয়ের পর থেকেই আন্দোলন সহিংস হয়ে ওঠে।
তিনি দাবি করেন—
- হত্যা শুরু হয়।
- অগ্নিসংযোগ হয়।
- সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তিতে হামলা হয়।
- ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চলে।
যে সব সরকারি স্থাপনায় হামলার অভিযোগ তুললেন
শেখ হাসিনার দাবি অনুযায়ী হামলা হয়—
- বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবন
- সাতভবন
- স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
- ইপিআই ভবন
- ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশন
- উড়ালপুল
- মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে
- বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান
- দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর
- জাতীয় তথ্যভান্ডার কেন্দ্র
- কোভিড বিশেষায়িত হাসপাতাল
- বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
- বিভিন্ন আবাসিক হোটেল
- শিল্পপ্রতিষ্ঠান
- ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান
কারাগারে হামলা ও অস্ত্র লুটের অভিযোগ
শেখ হাসিনা দাবি করেন,
- নরসিংদী-সহ বিভিন্ন জেলার কারাগারে হামলা চালানো হয়।
- ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
- সেখান থেকে অপরাধী ও সন্ত্রাসীদের মুক্ত করে দেওয়া হয়।
আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ
তাঁর দাবি—
- আওয়ামী লীগের কার্যালয় ভাঙচুর করা হয়েছে।
- নেতা-কর্মীদের হত্যা করা হয়েছে।
- বহুজনকে গুম করা হয়েছে।
- বাড়িঘরে আগুন লাগানো হয়েছে।
- মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।
শেখ হাসিনার দাবি অনুযায়ী—
- ১০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত বা নিখোঁজ।
- ৬ লক্ষ ৫০ হাজার মানুষ গ্রেফতার।
- ৩,৫০০টি মামলা হয়েছে।
- ৪ লক্ষ ৫০ হাজার নেতা-কর্মীর নাম রয়েছে মামলায়।
- ১০ লক্ষের বেশি অজ্ঞাতনামা অভিযুক্ত।
- তাঁর নিজের বিরুদ্ধেই ৬০০টির বেশি মামলা হয়েছে।
গণমাধ্যম ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে অভিযোগ
তিনি দাবি করেন—
- প্রায় ৫০টি সংবাদমাধ্যমে হামলা হয়েছে।
- টেলিভিশন চ্যানেল ও সংবাদপত্রের কার্যালয়ে আগুন লাগানো হয়েছে।
- সাংবাদিক নিহত হয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রসঙ্গে তাঁর অভিযোগ—
- ৪৬০টি থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা হয়েছে।
- বহু পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন।
- কোথাও কোথাও জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে।
- অস্ত্র লুট হয়েছে।
- পুলিশ সদস্যদের মরদেহ উড়ালপুলে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তাঁর দাবি, অন্তত ৩ হাজার পুলিশ সদস্য নিহত, আক্রান্ত বা নির্যাতনের শিকার হন।
বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশনের কথা
শেখ হাসিনা জানান, ১৮ জুলাই ২০২৪ বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছিল।
তাঁর দাবি, কমিশনের উদ্দেশ্য ছিল—
- প্রতিটি মৃত্যুর তদন্ত।
- প্রতিটি সহিংসতার তদন্ত।
- প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
তিনি জানান, আহতদের দেখতে তিনি হাসপাতালে গিয়েছিলেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির সঙ্গেও দেখা করেছিলেন।
অর্থনীতি নিয়ে একাধিক দাবি
শেখ হাসিনার অভিযোগ—
- জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬.৮ শতাংশ থেকে ২.২ শতাংশে নেমেছে।
- শিল্প উৎপাদনে বড় ধস নেমেছে।
- খেলাপি ঋণ ১৩ শতাংশ থেকে ৪৭ শতাংশে পৌঁছেছে।
- দারিদ্র্যের হার ১৮.৬ শতাংশ থেকে ৪৬.৮ শতাংশে বেড়েছে।
- ২ কোটির বেশি মানুষ নতুন করে বেকার।
- ৫০০-র বেশি শিল্প কারখানা বন্ধ।
- সরকার প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৯০০ কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে।
নিজের সরকারের উন্নয়নের খতিয়ানও তুলে ধরলেন
তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাস্তবায়িত হয়েছে—
- পদ্মা সেতু
- মেট্রোরেল
- রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
- মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর
- কর্ণফুলী টানেল
- বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট
তাঁর মতে, এগুলি শুধু অবকাঠামো নয়, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি।
শেষে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে আবেদন
শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করা উচিত।
তিনি কয়েকটি দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন—
- আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।
- রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি।
- রাজনৈতিক মামলার প্রত্যাহার।
- মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
- সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
- বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বজায় রাখা।
- আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া।
বক্তব্যের শেষে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি ক্ষমতার জন্য নয়, বাংলাদেশের মানুষের নিরাপত্তা, উন্নয়ন, শান্তি ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই দেশে ফিরতে চান। এরপর তিনি “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু” স্লোগান দিয়ে তাঁর ভাষণ শেষ করেন।

