বাগদেবীর পূজার পরদিন কেন রান্নাঘরে শিলনোড়াকে পুজো করা হয়? জানুন দক্ষিণবঙ্গের ঘরে ঘরে পালিত ‘সিজনে ষষ্ঠী’ (Sijne Sosthi Ritual), অরন্ধনের এক অপূর্ব লৌকিক উপাখ্যান।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক : সরস্বতী পূজার সকাল। পাড়ার মণ্ডপে বাজছে মাইক। কচিকাঁচারা বাসন্তী শাড়ি আর পাঞ্জাবি পরে অঞ্জলি দিতে ব্যস্ত। স্কুল-কলেজের গেটে বন্ধুদের জটলা। বাইরে যখন উৎসবের এমন রঙিন মেজাজ, তখন দক্ষিণবঙ্গের (হাওড়া, হুগলি, দুই বর্ধমান, বাঁকুড়া ও দুই মেদিনীপুরের একাংশ) গৃহস্থ বাড়ির অন্দরমহলের ছবিটা কিন্তু একদম অন্যরকম।
বাইরের হইহুল্লোড় ছাপিয়ে রান্নাঘরে এক অদ্ভুত ব্যস্ততা। সরস্বতী পূজার দিন সকাল থেকেই সেখানে রান্নার ধুম পড়ে যায়। না, এই রান্না আজকের দুপুরের ভোজের জন্য নয়, এ হলো আগামীকালের প্রস্তুতি। কারণ, নিয়ম হলো—সরস্বতী পূজার পরদিন উনুনে আঁচ দেওয়া মানা!
সরস্বতী পূজার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলার ঘরে ঘরে শুরু হয় এক লৌকিক ব্রত—যার নাম ‘সিজনে ষষ্ঠী’ বা ‘শীতল ষষ্ঠী’। এটি হলো মায়েদের পুজো। সন্তানের মঙ্গলকামনায়, তাদের আয়ু বৃদ্ধির জন্য এবং ঋতু পরিবর্তনের সময় রোগবালাই থেকে পরিবারকে রক্ষা করতে পালিত হয় এই আচার।
শহরের ফ্ল্যাট কালচারে এই প্রথা হয়তো এখন বিস্মৃতপ্রায়। কিন্তু আজও দক্ষিণ দামোদর এলাকার মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষজন এই দিনটিকে সরস্বতী পূজার চেয়েও বেশি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেন। শিলনোড়া পুজো, পান্তা ভাত, গোটা সেদ্ধ —সব মিলিয়ে এ এক অনন্য উৎসব। আজ আমরা ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে এবং লোককথার ঝাঁপি খুলে জানব এই উৎসবের না-বলা গল্প।
রান্নাঘরের ঈশ্বরী এবং শিলনোড়া পূজার উপাখ্যান
সাধারণত আমরা জানি, ঠাকুর থাকেন মন্দিরে বা ঠাকুরঘরে। কিন্তু সিজনে ষষ্ঠীর দিন দেবতা নেমে আসেন রান্নাঘরের মেঝেতে। এদিন রান্নাঘরই হয়ে ওঠে গর্ভগৃহ। এই পুজোর প্রধান দেবী হলেন মা ষষ্ঠী, যিনি সন্তানদের রক্ষাকর্ত্রী। কিন্তু মজার বিষয় হলো, এখানে ষষ্ঠীর কোনো মাটির মূর্তি থাকে না। তাহলে পুজো হয় কার?
পুজো হয় সংসারের সবথেকে প্রয়োজনীয় অথচ অবহেলিত বস্তুটির—‘শিলনোড়া’। গ্রামবাংলার মা-ঠাকুমারা বিশ্বাস করেন, শিলনোড়া হলো সংসারের লক্ষ্মীশ্রী এবং উর্বরতার প্রতীক। সারা বছর যে পাথরের ওপর মশলা পেষা হয়, সংসারের চাকা সচল থাকে, তাকেই এই একটি দিন বিশ্রাম দেওয়া হয়।
সরস্বতী পূজার দিন দুপুরের মধ্যে রান্নাবান্না শেষ করে রান্নাঘর ধুয়ে পরিষ্কার করা হয়। এরপর শিলনোড়াটিকে ভালো করে ধুয়ে, তাতে তেল-সিঁদুর মাখিয়ে দেবীর রূপ দেওয়া হয়। শিলের গায়ে পিটুলি বা সিঁদুর দিয়ে আঁকা হয় ষষ্ঠী পুতুল। পাশে রাখা হয় নতুন কুলের ডাল, সজনে ফুল এবং দূর্বা ঘাস। পরদিন সকালে অর্থাৎ ষষ্ঠীর দিন, পুরোহিত কোথাও বা বাড়ির মা-কাকিমারা স্নান সেরে ভিজে কাপড়ে এই শিলনোড়ার সামনেই পুজোয় বসেন। নৈবেদ্য হিসেবে দেওয়া হয় আগের দিন সাজিয়ে রাখা খই মুড়কি, গোটা কলাই ভাজা, গুড়ের পাটালি এবং সেই বিশেষ অমৃত—‘গোটা সেদ্ধ’। এই উপাচারে আছে মনেপ্রাণে মা ষষ্ঠীকে ডাকার আকুতি—”আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে, আর রোগমুক্ত শরীরে।”
অরন্ধন: উনুন যখন ছুটিতে
‘সিজনে ষষ্ঠী’ বা ‘শীতল ষষ্ঠী’ নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এই উৎসবের আসল মাহাত্ম্য। ‘শীতল’ মানে ঠান্ডা। এদিন বাড়ির উনুন বা গ্যাস ওভেন জ্বালানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। একেই বলা হয় ‘অরন্ধন’।
বিশ্বাস করা হয়, সরস্বতী পূজার পর থেকেই প্রকৃতিতে বসন্তের বাতাস বইতে শুরু করে। আর এই ঋতু পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণেই আগমন ঘটে ‘বসন্ত রোগ’ বা পক্স এবং হামের। লৌকিক মতে, মা শীতলা বা ষষ্ঠী হলেন এই রোগের দেবী। উনুনের আগুন বা তাপ যাতে দেবীকে রুষ্ট না করে, তাই এদিন রান্নাঘর ঠান্ডা রাখা হয়। উনুনকে বিশ্রাম দেওয়া হয়, যাতে সারা বছর অন্নের অভাব না ঘটে।
এই প্রথাটি মূলত পশ্চিমবঙ্গীয় বা ‘ঘটি’ (Ghoti) পরিবারগুলোতে দেখা যায়। সরস্বতী পূজার দিন সকাল থেকেই মায়েরা বিশাল হাঁড়িতে চাপিয়ে দেন ভাত, ডাল, পাঁচরকম ভাজা, এবং পাঁচরকম তরকারি। দুপুরের মধ্যেই রান্না শেষ করে উনুন লেপে বা পরিষ্কার করে রাখা হয়। কারণ, পরের দিন বাড়ির সবাই—সে শিশু হোক বা বৃদ্ধ—সবাইকে খেতে হবে ওই বাসি খাবার। আধুনিক বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে আমরা ‘ফারমেন্টেড ফুড’ বা প্রোবায়োটিক বলি, আমাদের পূর্বপুরুষরা তাকেই ‘দই-পান্তা’ বা ‘শীতল ভোগ’ হিসেবে ধর্মীয় মোড়কে মুড়িয়ে দিয়েছেন। এই বাসি খাবার শরীরকে ভেতর থেকে ঠান্ডা রাখে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
অখণ্ড আয়ুর প্রতীক ‘গোটা সেদ্ধ’
সিজনে ষষ্ঠীর প্রধান আকর্ষণ হলো ‘গোটা সেদ্ধ’। নামের অর্থই হলো—কিছুই কাটা যাবে না, সব গোটা বা অখণ্ড রাখতে হবে। মায়েদের বিশ্বাস, সন্তানের পাতে যদি কাটা বা খণ্ড করা সবজি দেওয়া হয়, তবে তা অশুভ। তাই তাঁরা সবজি না কেটে, গোটা অবস্থায় রান্না করেন। এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর মনস্তত্ত্ব—‘গোটা’ খাওয়া মানে সন্তানের আয়ু ‘গোটা’ বা অটুট থাকা। বংশপরম্পরায় কোনো ফাটল না ধরা।
সরস্বতী পূজার দিন ভোরবেলাতেই বাবারা বাজার থেকে ব্যাগ ভর্তি করে নিয়ে আসেন ছোট ছোট গোল আলু, কচি বেগুন, সিম, মটরশুঁটি, রাঙা আলু, পালং শাক এবং অবশ্যই কলাই ডাল। এই রান্নায় সাধারণত ৫, ৭ বা ৯ রকমের সবজি ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে সজনে ফুল ও কুলের ব্যবহার আবশ্যিক। কারণ আয়ুর্বেদ মতে, এই সময়ে সজনে ফুল খেলে পক্স হওয়ার সম্ভাবনা কমে।
(এই ঐতিহ্যবাহী এবং স্বাস্থ্যকর ‘গোটা সেদ্ধ’ রান্নার সঠিক পদ্ধতি ও উপকরণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন— ৫ রকমের কলাই ও সবজি দিয়ে ‘গোটা সেদ্ধ’ রান্নার সেরা রেসিপি)
‘গোটা সেদ্ধ’র সঙ্গী যখন ‘নিরামিষ মাছ’ (Fish in Vegetarian Style)
সিজনে ষষ্ঠীর বাসি খাবারের মেনু শুনলে অনেকেই অবাক হন। একদিকে পান্তা ভাত আর গোটা সেদ্ধ, আর তার সঙ্গেই থাকে মাছের ঝাল! হ্যাঁ, শুনতে স্ববিরোধী লাগলেও, দক্ষিণবঙ্গের ঘটি পরিবারগুলোতে এটাই রীতি। তবে এই মাছ রান্নার পদ্ধতি সাধারণ দিনের মতো নয়।
সরস্বতী পূজার দিন সকালেই বাড়ির কর্তা বাজার থেকে বড় রুই বা কাতলা মাছ কিনে আনেন (গ্রাম বাংলায় নিজেদের পুকুরের মাছ খাওয়া হয়)। এরপর সেই মাছ রান্না হয় সম্পূর্ণ ‘নিরামিষ’ পদ্ধতিতে। অর্থাৎ, পেঁয়াজ-রসুনের প্রবেশ নিষেধ। সরষে বাটা, জিরে বাটা, কাঁচা লঙ্কা দিয়ে তৈরি হয় মাছের ঝাল। কোনো কোনো বাড়িতে আবার মাছের টকও রান্না করা হয়। ঘটিদের বিশ্বাস, সরস্বতী পূজার পরের দিন অর্থাৎ ষষ্ঠীর দিন মাছ খাওয়া শুভ, কারণ মাছ হলো ‘জলপুষ্প’। তাই ব্রত থাকলেও মাছ বাদ যায় না। তবে মনে রাখবেন, এই ‘গোটা সেদ্ধ’ উৎসবটি একান্তই ঘটিদের।
অন্যদিকে, আমাদের বাঙাল (পূর্ববঙ্গীয়) প্রতিবেশী পরিবারগুলোতে সরস্বতী পূজার দিন ‘জোড়া ইলিশ’ খাওয়ার জাঁকজমকপূর্ণ প্রথা রয়েছে, যা ঘটিদের এই গোটা সেদ্ধর আচার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বাঙাল বাড়িতে জোড়া ইলিশের বরণ হলেও, সেখানে সাধারণত গোটা সেদ্ধ রাঁধার নিয়ম নেই। এই দুই ভিন্ন ধারার সংস্কৃতিই বাংলার উৎসবকে এত বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে।
গ্রামবাংলার সামাজিক বন্ধন ও উৎসবের রেশ
শহরের ফ্ল্যাটে হয়তো এই উৎসবের জৌলুস কিছুটা ফিকে, কিন্তু গ্রামে আজও এটি এক সামাজিক উৎসব। সরস্বতী পূজার পরের দিন সকালে পাড়ার মহিলারা একে অপরের বাড়ি যান। হাতে থাকে বাটি ভর্তি ‘গোটা সেদ্ধ’। “ও দিদি, তোমার বাড়ির গোটা কেমন হলো?”—এই প্রশ্ন দিয়েই শুরু হয় গল্প। একে অপরের বাড়িতে বাসি তরকারি আর কুল-চাটনি আদান-প্রদান চলে। যে বাড়িতে ষষ্ঠী পুজো হয় না, তাদের বাড়িতেও নিয়ম করে পৌঁছে দেওয়া হয় প্রসাদ।
বিশেষ করে, যেসব বাড়িতে নতুন বিয়ে হয়েছে বা নতুন শিশু জন্মেছে, সেখানে ‘তত্ত্ব’ হিসেবে পাঠানো হয় গোটা সেদ্ধ আর মাছ। শাশুড়িরা বৌমাদের শেখান কীভাবে শিলনোড়া পুজো করতে হয়, কীভাবে সংসারের মঙ্গলকামনা করতে হয়। এভাবেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাহিত হয়ে চলেছে এই সংস্কৃতি।
শেকড়ের টানে ফেরা
আধুনিকতার ইঁদুর দৌড়ে আমরা হয়তো অনেক কিছুই হারিয়ে ফেলছি। পিজ্জা-বার্গারের যুগে পান্তা ভাত আর গোটা সেদ্ধকে হয়তো ‘ব্যাকডেটেড’ মনে হতে পারে। কিন্তু ভেবে দেখুন তো, বছরের এই একটা দিন যখন মা দুপুরের মধ্যে তাড়াহুড়ো করে রান্না শেষ করে উনুন নেভানোর আগে শেষবারের মতো হাতা নাড়েন, তখন তিনি শুধু রান্না করেন না—তিনি আসলে তাঁর সন্তানের দীর্ঘায়ু কামনা করেন। ওই বাসি তরকারির প্রতিটি কামড়ে মিশে থাকে মায়ের ভালোবাসা আর আশীর্বাদ।
সরস্বতী পূজা মানে যেমন বিদ্যার আরাধনা, তেমনই সিজনে ষষ্ঠী হলো সংসারের মঙ্গলের আরাধনা। তাই আসুন, এই যান্ত্রিক জীবনেও আমরা আমাদের শেকড়কে ভুলে না যাই। আজ না হয় মায়ের হাতের বাসি ‘গোটা সেদ্ধ’ আর পান্তা দিয়েই হোক দিনের শুরু। মা ষষ্ঠীর কৃপায় সবার সংসার ভরে উঠুক শান্তিতে, শীতল থাকুক প্রতিটি গৃহকোণ।
(আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাশিফল আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল WhatsApp চ্যানেলে যোগ দিন! সবচেয়ে আগে পান জ্যোতিষ, অফবিট নিউজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনধারা ও অফবিট এক্সক্লুসিভ আপডেট আমাদের WhatsApp Channel-এ যোগ দিন)

