নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীনের পুজোমণ্ডপে ভিড়ের চাপে ১৯ জনের মৃত্যুর খবর ঘিরে এখনও আতঙ্ক কাটেনি। উৎসবের আনন্দের মধ্যেই এমন মর্মান্তিক ঘটনার পর শহরের অন্য পুজোমণ্ডপগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। দর্শনার্থীদের ভিড় সামলানো থেকে শুরু করে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত আলো, বাতাস চলাচলের সুযোগ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত বেরিয়ে আসার পথ—সব কিছুই খতিয়ে দেখছে প্রশাসনের বিশেষ পরিদর্শনকারী দল। আর সেই পরিদর্শনের ভিত্তিতেই এবার দক্ষিণ কলকাতার তিনটি বড় পুজো কমিটিকে নোটিশ পাঠানোর খবর সামনে এসেছে।
এই তিনটি পুজো হল ত্রিধারা সম্মিলনী, বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন এবং চেতলা অগ্রণী ক্লাব। তিনটি মণ্ডপেই নিরাপত্তার কিছু ঘাটতি নজরে এসেছে বলে জানানো হয়েছে। কোথাও অগ্নিসুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ, কোথাও পর্যাপ্ত আলোর অভাব, আবার কোথাও ভিড়ের মধ্যে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা যথেষ্ট কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
চোরবাগানের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতেই প্রশাসনের এই তৎপরতা বলে জানা যাচ্ছে। তবে নোটিশ পাওয়া মানেই কোনও দুর্ঘটনা ঘটেছে কিংবা সংশ্লিষ্ট পুজো কমিটির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে, এমন নয়। মূল লক্ষ্য, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় চিহ্নিত ঘাটতিগুলি দ্রুত দূর করা।
চোরবাগানের ঘটনার পর শহরজুড়ে মণ্ডপ পরিদর্শন, নজরে তিন বড় পুজো
চোরবাগান সর্বজনীনের মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর খবর সামনে আসার পর থেকেই কলকাতার পুজোমণ্ডপগুলির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশাসনিক তৎপরতা বেড়েছে বলে জানা যাচ্ছে। বিপুল সংখ্যক মানুষ একসঙ্গে মণ্ডপে প্রবেশ করলে কীভাবে ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা হবে, জরুরি পরিস্থিতিতে দর্শনার্থীরা কোন পথ দিয়ে বেরোবেন এবং অগ্নিকাণ্ডের মতো বিপদ এড়াতে কী ব্যবস্থা রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাজ্য সরকারের গঠিত বিশেষ দল শহরের বিভিন্ন পুজোমণ্ডপ পরিদর্শন করছে। মণ্ডপের ভিতর ও বাইরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হচ্ছে।
এই পরিদর্শনের ভিত্তিতেই দক্ষিণ কলকাতার তিনটি পরিচিত পুজো কমিটির কাছে দমকলের নোটিশ পাঠানোর খবর পাওয়া গিয়েছে।
চোরবাগানের বিপর্যয়ের পর মুখ্যমন্ত্রী নিজেও শহরের মণ্ডপগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখতে গিয়েছিলেন বলে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি পুজোর ভিড় নিয়ন্ত্রণে অভিজ্ঞ পুলিশ আধিকারিকদের দায়িত্ব দেওয়ার কথাও সামনে এসেছে।
শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় দর্শনার্থীদের যাতায়াত, যান চলাচল এবং মণ্ডপে প্রবেশের ব্যবস্থা যাতে নিয়ন্ত্রণে থাকে, সে দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে।
প্রশাসনের এই তৎপরতার মধ্যেই রবিবার দক্ষিণ কলকাতার ত্রিধারা সম্মিলনী, বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন এবং চেতলা অগ্রণী ক্লাবকে ঘিরে নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের খবর সামনে আসে।
ত্রিধারা সম্মিলনীতে অগ্নিসুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ
দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম পরিচিত পুজো ত্রিধারা সম্মিলনী। এ বছর এই পুজো ৮০তম বর্ষে পদার্পণ করেছে। মণ্ডপের অন্যতম আকর্ষণ, প্রায় ১৩ হাজার কলম দিয়ে তৈরি দুর্গাপ্রতিমা। অভিনব এই আয়োজন দেখতে বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীর ভিড় হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে। কিন্তু সেই ভিড়ের মধ্যেই মণ্ডপের অগ্নিসুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিদর্শনকারী আধিকারিকেরা।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রবিবার দমকলের পক্ষ থেকে ত্রিধারা সম্মিলনীকে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। পরিদর্শনকারী দলের পর্যবেক্ষণে মণ্ডপসজ্জায় ব্যবহৃত কিছু সামগ্রীর অগ্নিসুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মণ্ডপের সাজসজ্জায় এমন উপকরণ ব্যবহারের বিষয়টি নজরে এসেছে, যা আগুন লাগার পরিস্থিতিতে বিপদ বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে বিপুল দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে কোনও অঘটন ঘটলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
এই কারণেই পুজো উদ্যোক্তাদের দ্রুত পর্যাপ্ত অগ্নিসুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
শুধু ব্যবস্থা নিলেই হবে না, কী কী পদক্ষেপ করা হয়েছে, সেই সংক্রান্ত প্রতিবেদনও রবিবার রাতের মধ্যে স্থানীয় দমকল কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে বলে প্রাপ্ত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
ত্রিধারা সম্মিলনীর ক্ষেত্রে মূল উদ্বেগ তাই অগ্নিকাণ্ডের সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং বড় ভিড়ের মধ্যে দ্রুত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
তবে মণ্ডপে ব্যবহৃত কোন কোন সামগ্রী নিয়ে দমকলের আপত্তি রয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা পাওয়া যায়নি। সেই কারণে নির্দিষ্ট কোনও উপকরণকে বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে না।
বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনে অগ্নিসুরক্ষা ও আলোর ঘাটতির অভিযোগ
দক্ষিণ কলকাতার আর একটি জনপ্রিয় পুজো বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন। এ বছর এই পুজো ৭৬তম বর্ষে পদার্পণ করেছে। এবারের বিষয়ভাবনার নাম ‘যোজন’। এই পুজোমণ্ডপেও নিরাপত্তার কয়েকটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে জানা যাচ্ছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পরিদর্শনকারী দল মণ্ডপের অগ্নিসুরক্ষা ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয় বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি মণ্ডপের ভিতরে যথেষ্ট আলোর ব্যবস্থা নেই বলেও অভিযোগ উঠেছে।
বড় পুজোমণ্ডপে পর্যাপ্ত আলো থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দর্শনার্থীদের ভিড় বেশি হলে প্রবেশ ও প্রস্থানপথ স্পষ্টভাবে চেনা এবং নিরাপদে চলাচলের জন্য যথেষ্ট আলোর প্রয়োজন হয়।
জরুরি পরিস্থিতিতে আলো কম থাকলে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। কোথা দিয়ে বেরোতে হবে, কোন পথে এগোলে নিরাপদে মণ্ডপের বাইরে পৌঁছনো যাবে, তা বুঝতে সমস্যা হতে পারে।
এই কারণেই বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনকে দ্রুত পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
একই সঙ্গে মণ্ডপের প্রবেশ ও প্রস্থানপথ বাধামুক্ত রাখার বিষয়েও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই পথগুলিতে কোনও ধরনের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড চালানো যাবে না বলে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ দর্শনার্থীদের চলাচলের জন্য নির্ধারিত জায়গায় এমন কোনও ব্যবস্থা রাখা যাবে না, যাতে মানুষের যাতায়াতে বাধা তৈরি হয়।
অগ্নিসুরক্ষা, পর্যাপ্ত আলো এবং প্রবেশ ও প্রস্থানপথের নিরাপত্তা—এই তিনটি বিষয়ই বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট পুজো কমিটি ইতিমধ্যে কী কী সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
চেতলা অগ্রণীতে পর্যাপ্ত আলো ও বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ
দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম আকর্ষণীয় পুজো চেতলা অগ্রণী ক্লাব। এ বছর তাদের পুজোর বিষয়ভাবনা ‘বিশ্বরূপে বিশ্বরূপিণী’।
প্রতিবছরই এই পুজো দেখতে বিপুল সংখ্যক মানুষ ভিড় করেন। এবারের আয়োজন ঘিরেও দর্শনার্থীদের আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু সরকারি বিশেষ পরিদর্শনকারী দলের পর্যবেক্ষণে চেতলা অগ্রণীর মণ্ডপেও কয়েকটি ঘাটতির কথা উঠে এসেছে বলে জানা যাচ্ছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মণ্ডপের ভিতরে পর্যাপ্ত আলোর অভাব নজরে এসেছে। পাশাপাশি যথেষ্ট পাখা এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থার অভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
বড় মণ্ডপে একসঙ্গে বহু দর্শনার্থী প্রবেশ করলে ভিতরের পরিবেশ দ্রুত গরম হয়ে উঠতে পারে। বাতাস চলাচলের সুযোগ কম থাকলে অস্বস্তি বাড়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি সমস্যার কারণ হতে পারে।
এই কারণেই চেতলা অগ্রণী কর্তৃপক্ষকে পর্যাপ্ত আলো এবং বাতাস চলাচলের উপযুক্ত ব্যবস্থা দ্রুত নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে এর আগেও চেতলা অগ্রণীর মণ্ডপে সাময়িকভাবে দর্শনার্থীদের প্রবেশ বন্ধ রাখতে হয়েছিল।
সেই অভিজ্ঞতার পর মণ্ডপের ভিতরের পরিবেশ এবং দর্শনার্থীদের চলাচলের নিরাপত্তা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে পাখা বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা ঠিক কতটা বাড়াতে বলা হয়েছে, কিংবা কী সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, তার বিস্তারিত সরকারি নির্দেশের প্রতিলিপি পাওয়া যায়নি।
তিন পুজোয় তিন ধরনের উদ্বেগ, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় এখন কী জরুরি?
দক্ষিণ কলকাতার এই তিনটি পুজোকে ঘিরে সামনে আসা অভিযোগগুলির ধরন এক নয়।
ত্রিধারা সম্মিলনীর ক্ষেত্রে মূলত অগ্নিসুরক্ষা এবং মণ্ডপসজ্জায় ব্যবহৃত উপকরণ নিয়ে উদ্বেগের কথা জানা যাচ্ছে।
বালিগঞ্জ কালচারাল অ্যাসোসিয়েশনের ক্ষেত্রে অগ্নিসুরক্ষার পাশাপাশি পর্যাপ্ত আলো এবং প্রবেশ ও প্রস্থানপথ বাধামুক্ত রাখার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
অন্যদিকে চেতলা অগ্রণীর ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত আলো, পাখা এবং বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অর্থাৎ তিনটি মণ্ডপেই দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আলাদা আলাদা বিষয়ের উপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
চোরবাগানের মর্মান্তিক ঘটনার পর প্রশাসনের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ, বিপুল ভিড়ের মধ্যেও প্রতিটি পুজোমণ্ডপে নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখা।
শুধু মণ্ডপের সাজসজ্জা বা প্রতিমার অভিনবত্ব নয়, দর্শনার্থীরা কত সহজে প্রবেশ করতে পারছেন, ভিড় বেড়ে গেলে কীভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে এবং বিপদের সময় কত দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসা সম্ভব—সেই প্রশ্নগুলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তবে নোটিশের পর সংশ্লিষ্ট তিনটি পুজো কমিটি কী পদক্ষেপ করেছে, দমকল কর্তৃপক্ষ সেই ব্যবস্থা সন্তোষজনক বলে মনে করেছে কি না এবং পরবর্তী পরিদর্শনে কী উঠে এসেছে, তা এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
সাম্প্রতিক পোস্ট
নিয়োগ দুর্নীতি কি আগামী দিনে কমবে? জানুন, চাকরির নিয়মে এই পরিবর্তনে আসবে কি স্বচ্ছতা?
এক্সপোজড! ককরোচ জনতা পার্টির নেপথ্যে কোন চক্রান্তের গন্ধ? সত্যিটা জানলে চমকে উঠবেন
মহিলাদের বাসে টিকিট কাটতে হবে না! জানুন, এই কার্ড থাকলেই দিঘা থেকে দার্জিলিং সফর ফ্রী তে

