Stock Market Strategy During War: মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং বিশ্বজুড়ে শেয়ার বাজারের চরম অস্থিরতায় আপনার পোর্টফোলিও কি লালে লাল? লোকসানের ভয়ে সব শেয়ার বিক্রি করে দেওয়ার কথা ভাবছেন? একটু দাঁড়ান! আন্তর্জাতিক অর্থনীতিক এবং বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন চরম সংকটের সময় বিনিয়োগকারীদের জন্য সেরা ‘প্লেবুক’ বা স্ট্র্যাটেজি হলো—’কিছুই না করা’! কীভাবে এই ‘ডু নাথিং’ (Do nothing) ফর্মুলা আপনার জমানো টাকাকে বাঁচাবে? জানুন দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদদের বিস্তারিত বিশ্লেষণ।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ট্রেডিং অ্যাপটা খুলতেই বুকটা ছ্যাঁত করে উঠছে? নিফটি (Nifty) বা সেনসেক্সের (Sensex) পতন দেখে মনে হচ্ছে, কষ্ট করে জমানো লাখ লাখ টাকা চোখের সামনে কর্পূরের মতো উবে যাচ্ছে! এই অনুভূতি এখন শুধু আপনার একার নয়, গোটা বিশ্বের কোটি কোটি সাধারণ বিনিয়োগকারীর।
বর্তমানে পশ্চিম এশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যে চরম বিশৃঙ্খলা চলছে এবং বিশ্বজুড়ে শেয়ার বাজারগুলো বন্য বা চরম অস্থিরতার (oscillating wildly) মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলি বাহিনীর লাগাতার আক্রমণ, ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যা এবং পাল্টা ইরানের প্রতিশোধের আগুন—সব মিলিয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক ভয়ংকর ছায়া গ্রাস করেছে বিশ্ব অর্থনীতিকে। এই ডামাডোলের মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনও পূর্ববর্তী সমস্ত নিয়মকানুন বা প্রথা উপেক্ষা করে এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যার অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি (unintended consequences) ভোগ করতে হতে পারে খোদ আমেরিকাকেই।
এমন একটি যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মাথায় প্রথমেই যে চিন্তাটি আসে, তা হলো ‘প্যানিক সেলিং’ (Panic Selling)। অর্থাৎ, যা লোকসান হওয়ার হয়েছে, এখন সব বিক্রি করে টাকা পকেটে নিয়ে নিই। কিন্তু ইতিহাস এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন সম্পূর্ণ অন্য কথা! আজ NewsOffBeat-এর এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ সুমন দে এবং বাজার বিশেষজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ হাজরার মতামত নিয়ে বিশ্লেষণ করব যে, কেন এই চরম সংকটের সময় ‘কিছুই না করা’ বা চুপচাপ বসে থাকাই (Wait and Wait) একজন বুদ্ধিমান বিনিয়োগকারীর আসল হাতিয়ার।
সংকটের সময় বিনিয়োগের প্লেবুক: (Stock Market Strategy During War)
শুনতে খুব অদ্ভুত লাগলেও, নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, ক্রাইসিস বা সংকটের সময় দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের আদর্শ প্লেবুক (standard long-term investing playbook) হলো—আতঙ্কিত হওয়ার বদলে পুরো বিষয়টা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করা। এই সাইকোলজি বা মনস্তত্ত্বটি একটু বিস্তারিত বোঝা যাক। যখন যুদ্ধ বাঁধে, তখন আপনি চাইলেও বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না। এই বিষয়ে NewsOffBeat-কে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ সুমন দে জানান, “অ্যাকাডেমিক জ্ঞান বা পুঁথিগত বিদ্যা আমাদের শেখায় যে, দীর্ঘমেয়াদে বাজারের গড় রিটার্নের (average market return over the long haul) দিকে লক্ষ্য রাখাই হলো সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। আপনার যদি ইতিমধ্যেই একটি ভালোভাবে তৈরি করা, সস্তা এবং ডাইভার্সিফায়েড (diversified) ইনডেক্স ফান্ড এবং বন্ডের পোর্টফোলিও থাকে, তবে এই চরম মুহূর্তে হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার বা পোর্টফোলিওতে বড় কোনো পরিবর্তন করার (abrupt changes) কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। সংকটের সময় সবচেয়ে উত্তেজনাহীন এবং শান্ত স্ট্র্যাটেজি হলো—বাই অ্যান্ড হোল্ড (Buy and hold)। অর্থাৎ কিনে ফেলে রাখুন।”
সুমনবাবু আরও বলেন, “ঐতিহাসিক তথ্য ঘাঁটলে দেখা যায়, যখনই বাজার চরম অস্থির আচরণ করে, তখন ‘কিছুই না করা’র স্ট্র্যাটেজিটাই সাধারণত সবচেয়ে ভালো ফল দেয়। তা সে কোনো সামরিক যুদ্ধ (military conflicts) হোক, প্রাকৃতিক বিপর্যয় (natural disasters) হোক, বা কোনো পরমাণু কেন্দ্রের দুর্ঘটনা (nuclear power plant accidents)—দীর্ঘমেয়াদে উন্নত মানের শেয়ার বাজার ঠিক ঘুরে দাঁড়ায়। এই দুর্যোগের সময় মাঝপথে পোর্টফোলিওতে রদবদল করা বা অ্যাডজাস্টমেন্ট এড়িয়ে চলাই হলো সেরা পলিসি। সহজ কথায়, ওয়েট অ্যান্ড ওয়েট (WAIT AND WAIT)।” কিন্তু এই যুক্তি কি পুরোপুরি নিশ্ছিদ্র? মেঘের আড়ালে মন্দার ভয়? সুমন দে-র এই ‘ডু নাথিং’ বা কিছুই না করার যুক্তিটি শুনতে খুব ভালো এবং লজিক্যাল লাগলেও, বিশেষজ্ঞরা মানছেন যে এটি কোনো ফুলপ্রুফ (foolproof) বা শতভাগ নিশ্ছিদ্র গ্যারান্টি নয়। কারণ, যুদ্ধের পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিতে এখন আরও বেশ কিছু বড় বিপদ ঘাপটি মেরে বসে আছে।
এই বিষয়ে আমাদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন দেশের আরেক স্বনামধন্য বাজার বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদ রবীন্দ্রনাথ হাজরা। তিনি এই ‘বাই অ্যান্ড হোল্ড’ স্ট্র্যাটেজির ভেতরের কিছু ভয়ের দিক বা ‘অ্যান্ড ইয়েট’ (And yet) ফ্যাক্টরগুলো তুলে ধরেন।
রবীন্দ্রনাথবাবু জানাচ্ছেন, “আর্থিক মন্দা বা ইকোনমিক রিসেশন (Economic recessions) প্রায় সবার জন্যই, এবং বিশেষ করে শেয়ার বাজারের জন্য অত্যন্ত খারাপ খবর। পারস্য উপসাগরের (Persian Gulf) এই বর্তমান সংকট যদি কোনোভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি দীর্ঘমেয়াদী মন্দা ডেকে আনে, তবে বাজারকে পুরোপুরি রিকভার করতে বা পুরোনো জায়গায় ফিরতে একটি লম্বা সময় লেগে যেতে পারে। যারা ‘বাই অ্যান্ড হোল্ড’ বা ‘কিছু না করা’র নীতিতে বিশ্বাস করছেন, তাঁরা আসলে একটি বড় অনুমানের (assumption) ওপর ভরসা করে বসে আছেন। তাঁরা ধরে নিচ্ছেন যে, পারস্য উপসাগরে বর্তমানে যা ঘটছে তা অতীতের মতোই কোনো একসময় মিটে যাবে এবং এই যুদ্ধ গোটা অঞ্চল ও বিশ্বের জন্য কোনো পুনরুদ্ধার অযোগ্য বা ধ্বংসাত্মক বিপর্যয়ে (irrecoverable disaster) পরিণত হবে না। অর্থাৎ, আমরা ধরে নিচ্ছি পৃথিবী ধ্বংস হবে না!”
মার্কিন বাজারের এআই (AI) বুদবুদ এবং ট্রাম্পের খামখেয়ালিপনা
রবীন্দ্রনাথ হাজরা আরও একটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়ের দিকে আলোকপাত করেন, যা ভারতীয় বাজারের ওপরও পরোক্ষভাবে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। সেটি হলো আমেরিকার শেয়ার বাজারের নিজস্ব দুর্বলতা।
তিনি বিশ্লেষণ করে বলেন, “আমেরিকার স্টক মার্কেট এই মুহূর্তে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এর মূল কারণ হলো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই (artificial intelligence) নিয়ে বিনিয়োগকারীদের অত্যধিক উৎসাহ। এই বিপুল উৎসাহের কারণে মার্কিন বাজার এখন অত্যন্ত মহার্ঘ (highly priced) এবং গুটিকয়েক বড় টেক কোম্পানির ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীল বা কেন্দ্রীভূত (highly concentrated) হয়ে পড়েছে। যদি এই এআই বুদবুদ কোনো কারণে ফাটে, বা ট্রাম্প প্রশাসনের খামখেয়ালি সিদ্ধান্তের জেরে মার্কিন অর্থনীতিতে বড় কোনো ধাক্কা (setbacks) লাগে, তবে তার সুনামি থেকে ভারতের বাজারও রক্ষা পাবে না।”
ভারতীয় রিটেইল বিনিয়োগকারীদের জন্য রোডম্যাপ: এখন আপনার কী করণীয়? (Stock Market Strategy During War)
উভয় বিশেষজ্ঞের বিস্তারিত আলোচনার পর, একজন সাধারণ ভারতীয় বিনিয়োগকারী হিসেবে আপনার এখন ঠিক কী করা উচিত? মিউচুয়াল ফান্ড বা ডাইরেক্ট ইক্যুইটিতে আপনার জমানো টাকার ভবিষ্যৎ কী? নিচে একটি সহজ গাইডলাইন দেওয়া হলো:
১. সিপ (SIP) কোনোভাবেই বন্ধ করবেন না:
যুদ্ধ বা মন্দার ভয় দেখিয়ে অনেকেই আপনাকে আপনার মিউচুয়াল ফান্ডের সিস্টেম্যাটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান বা সিপ (SIP) বন্ধ করে দিতে বলতে পারে। কিন্তু এটাই হলো সবচেয়ে বড় ভুল। বাজার যখন নিচে পড়ে, তখন একই টাকায় আপনি ফান্ডের বেশি ‘ইউনিট’ (Units) কিনতে পারেন। একে বলা হয় ‘রুপি কস্ট অ্যাভারেজিং’ (Rupee Cost Averaging)। যখন যুদ্ধ থামবে এবং বাজার আবার ওপরে উঠবে, তখন এই কেনা ইউনিটগুলোই আপনাকে সবচেয়ে বেশি লাভ দেবে। তাই সিপ কন্টিনিউ করুন।
২. নিউজ চ্যানেল এবং পোর্টফোলিও দেখা কমান:
অর্থনীতিবিদ সুমন দে যেটা বলছিলেন—’Forget about all of it’ বা সব ভুলে যান। সারাদিন টিভির পর্দায় বোমাবর্ষণের খবর দেখলে বা ঘণ্টায় ঘণ্টায় পোর্টফোলিওর লাল রং দেখলে আপনার মনের ওপর চরম চাপ (Psychological stress) পড়বে। এই চাপ আপনাকে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বা লসে শেয়ার বিক্রি করে দিতে বাধ্য করবে। তাই এই সময়টায় মার্কেট ট্র্যাকিং একটু কমিয়ে দিন।
৩. হাতে ক্যাশ থাকলে ‘বাই অন ডিপস’ (Buy on Dips):
যদি আপনার হাতে অতিরিক্ত এবং উদ্বৃত্ত কিছু নগদ টাকা (Cash reserve) থাকে, তবে বাজারের এই পতন আপনার জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ হতে পারে। এই সময় দেশের ভালো এবং ফান্ডামেন্টালি স্ট্রং ব্লু-চিপ (Blue-chip) কোম্পানির শেয়ারগুলো বেশ সস্তায় পাওয়া যায়। তবে একবারে সব টাকা না ঢেলে, বাজার যত নিচে নামবে, অল্প অল্প করে বিনিয়োগ করা বা ‘স্ট্যাগার্ড ইনভেস্টমেন্ট’ (Staggered Investment) করাটা বুদ্ধিমানের কাজ।
শেয়ার বাজারের একটি নিজস্ব চরিত্র আছে। সে ভয় পেতে ভালোবাসে, কিন্তু সে কখনোই চিরকাল ভয়ে কুঁকড়ে থাকে না। কোভিড-১৯ (COVID-19) মহামারীর সময় বিশ্ব অর্থনীতি যখন আক্ষরিক অর্থেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তখন বাজার একদিনে হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু তারপরের এক-দু’বছরে বাজার যে ঐতিহাসিক রিকভারি করেছে, তা আজ বিনিয়োগকারীদের কাছে এক দারুণ উদাহরণ।
পারস্য উপসাগরের এই যুদ্ধ, আমেরিকার নির্বাচন, বা তেলের দাম বৃদ্ধি—এগুলো সবই সাময়িক মেঘ। ইতিহাস বলছে, পৃথিবীর কোনো যুদ্ধই চিরকাল স্থায়ী হয় না। তাই রবীন্দ্রনাথ হাজরার সেই ‘অ্যান্ড ইয়েট’ বা ভয়ের কথাগুলো মাথায় রেখেও, সুমন দে-র ‘ডু নাথিং’ বা ধৈর্য ধরার নীতিটিকেই আপাতত আঁকড়ে ধরতে হবে (Stock Market Strategy During War)। আপনার বিনিয়োগের লক্ষ্য যদি দীর্ঘমেয়াদী হয় (Long-term horizon), তবে আজকের এই পতন আগামী কয়েক বছর পর চার্টের একটি ছোট্ট দাগ ছাড়া আর কিছুই মনে হবে না। তাই প্যানিক নয়, ধৈর্য ধরুন এবং ভারতের অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ শক্তির ওপর বিশ্বাস রাখুন।
#newsoffbeat #StockMarketCrash #InvestmentStrategy #SmartMoney #MiddleEastCrisis #Nifty50 #Sensex #MutualFunds #SIP #FinancialEducation

