ভালোবাসার রঙে চিরনতুন সুভাষ ও এমিলির সম্পর্ক
সুভাষচন্দ্র বসু ও এমিলি শেঙ্কলের প্রেমের গল্প (Subhas Chandra Bose Emilie Schenkl Love Story) আজও ইতিহাসে অমর। ভিয়েনায় তাদের প্রথম দেখা থেকে শুরু করে চিঠির আবেগে ভরা সম্পর্ক, ত্যাগ— জানুন দেশপ্রেমিক নেতাজির অজানা দিক এই লেখায়।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক : দেশপ্রেমিক সুভাষচন্দ্র সারাজীবন মানুষের মনে থাকবে। ভারতবর্ষ তার সাফল্যের পথে এগিয়ে যাবে সুভাষচন্দ্র বসুর দেখানো পথ ধরে। কিন্তু আজ বলবো এক অন্য গল্প। ব্যক্তি সুভাষচন্দ্র কেমন মানুষ ছিলেন? কেমন ছিল তার দাম্পত্য জীবন? এমিলির সাথে তার কিভাবে আলাপ হয়েছিল? এইসব গল্পই জানবেন এই লেখাটি পড়ে।
আরও পড়ুন : “তোমরা আমাকে রক্ত দাও…”— জানুন এই উক্তির পেছনের আসল গল্প
কে এই এমিলি শেঙ্কল? (Subhas’s Love Story)
এমিলির সাথে সুভাষচন্দ্রের সম্পর্কের বয়স ছিল খুব স্বল্প দিনের। তখন ছিল না আজকের মত সোশ্যাল মিডিয়ায় আলাপচারিতা।ছিলনা ফোনালাপ। চলুন জেনে নেওয়া যাক, সুভাষচন্দ্র বসুর মতো এমন ব্যক্তিত্বের পুরুষ কিভাবে আকৃষ্ট হলেন এমিলির প্রতি? সালটা ১৯৩৪। প্রথমেই বলে রাখি, এমিলি কিন্তু ভারতীয় ছিলেন না। তিনি ছিলেন ভিয়েনার মানুষ। অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা শহরে তাদের প্রথম দেখা হয়। জুন মাস। এমিলির পুরো নাম ছিল এমিলি শেঙ্কল। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো যে এইসব তথ্যই পাওয়া যায় নেতাজির লেখা এমিলিকে চিঠি মারফত। মোট ১৬২টি চিঠি তিনি লিখেছিলেন এমিলিকে।
সুভাষচন্দ্রের প্রথম চিঠিতে গভীর প্রেমের অনুভব
শুনুন তবে, প্রেমিক সুভাষচন্দ্রের লেখা প্রথম চিঠি কেমন ছিল? রোম থেকে লেখা প্রথম দিকের একটি চিঠিতে সুভাষ লিখছেন, তিনি হয়তো যোগাযোগ করার ক্ষেত্রে খুব একটা ভালো মানুষ নন, কিন্তু মানুষ হিসাবে বোধ হয় ততটাও খারাপ মানুষ নন। নিজেকে যোগাযোগ করার ক্ষেত্রে খারাপ বললেও প্রতিনিয়ত তিনি যোগাযোগ রেখেছিলেন এমিলির সাথে, বিশ্বের যে কোন প্রান্ত থেকে। এমনকি জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার সময়ও ১৯৩৮-৩৯ সালেও তিনি চিঠি লিখতেন নিয়ম করে। এমনকি জেলে থাকা কালীন তিনি বেশ কয়েকটি চিঠি লিখেছিলেন। এ প্রসঙ্গে বলে রাখি, সুভাষের সাথে এমিলির সম্পর্ক ১৯৩৪ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত। ১৯৪৩ সালের প্রথমের দিকে যখন তিনি ইউরোপ ছাড়লেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যুদ্ধে যোগদানের সময় তিনি বার্তা পাঠাতেন রেডিওর মাধ্যমে।
এবার আসি এমিলির চিঠির কথায়। এটা তো ঠিক যে, এক হাতে তালি বাজে না। কিন্তু কি এমন ঘটনা ঘটলো যাতে এমিলিকেও চিঠি লিখতে হয়েছিল সুভাষচন্দ্র বসুকে? এমিলি সুভাষচন্দ্রের প্রত্যেকটি চিঠি সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন যত্ন সহকারে। যদিও ব্রিটিশ অফিসারেরা যখন ভিয়েনা দখল করে, তখন কিছু চিঠি তারা বাজেয়াপ্ত করেছিল। তবে মূল চিঠির অনেকটা অংশই রক্ষা করা সম্ভব হয়েছিল। শরৎচন্দ্র বসুর সিগারেটের বাক্স থেকে এমিলির সুভাষকে লেখা ১৮ টি চিঠি পাওয়া যায়। প্রসঙ্গত বলে রাখি, শরৎচন্দ্র বসু হলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মেজদাদা। আর চিঠি গুলি উদ্ধার করেছিলেন শিশির কুমার বসু। শরৎচন্দ্র বসুর পুত্র। ১৯৩৬ সালে সুভাষচন্দ্রের চিঠি থেকে এটা পরিষ্কার যে, শারীরিকভাবে তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হলেও দুজনের প্রতি দুজনের মনের দিক থেকে গভীর অনুভূতি তৈরি হয়েছিল। তার প্রায় দুই দশক পরে একটি ঘরোয়া অনুষ্ঠানে এমিলি শেঙ্কল জানিয়েছিলেন, কোন এক সময় সুভাষচন্দ্র তাকে বলেছিলেন, তাঁর প্রথম এবং একমাত্র ভালোবাসা নিজের দেশ ভারতবর্ষ। তাই এমিলিকে দেওয়ার মতো তার কাছে কিছুই নেই। সুভাষচন্দ্র বসু জানিয়েছিলেন তাঁর জীবনে মাত্র চারটি নারীকেই তিনি লিখেছিলেন। প্রথমজন তার মা প্রভাবতী দেবী। দ্বিতীয় জন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্ত্রী বাসন্তী দেবী। তৃতীয় জন যাকে তিনি দ্বিতীয় মা হিসাবে স্থান দিয়েছিলেন, সুভাষচন্দ্রের মেজ বউঠান (শরৎচন্দ্র বসুর স্ত্রী) বিভাবতী দেবী। চতুর্থ জন অবশ্যই সুভাষচন্দ্রের জীবনে সেই বিশেষ নারী তার স্ত্রী এমিলি শেঙ্কল।
সুভাষ এমিলির প্রথম পরিচয় থেকে দাম্পত্যের সূচনা (Subhas’s Love Story)
সুভাষ এবং এমিলি পরস্পর পরস্পরকে চিনতেন ১৯৩৪ সাল থেকে। তাদের বিবাহ হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বার্লিনে। ১৯৪১ সালে তিনি বার্লিনে আসেন। সেখান থেকেই তিনি এমিলিকে জানান বার্লিনে আসতে। কারণ এই সময় সুভাষচন্দ্র ছদ্মবেশে ছিলেন। নিজের পরিচয় গোপন করে তার পক্ষে ভিয়েনা যাওয়া সম্ভব ছিল না। আর এই সময় থেকেই দুজনে একসঙ্গে থাকা শুরু করেন বার্লিনে। তবে পরবর্তীতে এমিলি নিজে জানিয়েছিলেন ১৯৩৭ সালে ২৬ শে ডিসেম্বর ভিয়েনা একটি ছোট্ট গ্রামে তারা বিবাহ করেছিলেন।
এ তো গেল অনেক গুরুগম্ভীর কথা। এবার আসল কথায় আসা যাক, কিভাবে আলাপ হয়েছিল দুজনের। ১৯৩৪ সাল। সুভাষচন্দ্র তখন ভিয়েনাতে লিখছেন তার নিজের লেখা বই দ্য ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল। তিনি একজন সেক্রেটারি খুঁজছিলেন, ইংরাজিতে তার লেখাগুলি টাইপ করে দেবার জন্য। তার পরিচিত এক বন্ধু, ড. মাথুরকে সে কথা জানালেন। মাথুর দুজনের বিষয়ে জানিয়েছিলেন সুভাষচন্দ্রকে। দুজনের সাক্ষাৎকার নিলেন সুভাষ। কিন্তু তাদের মধ্যে থেকে একজনকে বাছলেন। আর তিনি হলেন, অস্ট্রিয়ার যুবতী ২৩ বছরের এমিলি। যদিও এমিলির বাবা চাননি, সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে তিনি কাজ করেন। পরবর্তীতে এমিলিকে লেখা সুভাষচন্দ্রের প্রায় প্রত্যেকটি চিঠিতে এমিলির বাবা-মার প্রতি সুভাষের ছিল গভীর শ্রদ্ধা।
মাঝখানে অবশ্য বেশ কিছুদিন তাদের মধ্যে তেমন যোগাযোগ ছিল না। তারপর ১৯৩৫ এ গলব্লাডার স্টোন নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন সুভাষচন্দ্র, ভিয়েনায়। তার অপারেশন হয়। সেসময় এমিলি প্রত্যেকদিন তাকে দেখতে যেতেন। সুভাষচন্দ্র যতবার চিঠি লিখেছেন, ততবারই তিনি ভালোবাসার ডাকে সম্বোধন করেছেন, তাঁর প্রিয়তমাকে। তবে সেই প্রেমের মধ্যে বারবার আশঙ্কা ছিল, আর বুঝি তাদের দেখা হবে না। চিঠিতে সেই প্রমাণ মেলে। এমিলিকে তিনি জানাচ্ছেন, তাদের জন্য কোন ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে তা তারা জানেন না। সুভাষচন্দ্র বলেছিলেন, আর হয়তো এমিলির সঙ্গে তার দেখা হবে না। কিন্তু এমিলি তার হৃদয়ে, মননে, স্বপ্নে, ভাবনায় সারা জীবন থেকে যাবে। তিনি এমিলিকে জানিয়েছিলেন, অদৃষ্টের পরিহাসে এই জীবনে তারা আলাদা হলেও পরজন্মে তারা একসঙ্গেই থাকবেন। এরপর দীর্ঘ সময় তাদের মধ্যে দেখা সাক্ষাৎ হয়নি। কথা হয়েছে চিঠির মাধ্যমে। অস্ট্রিয়ার সমস্ত খবর জানাতেন এমিলি সুভাষকে।
১৯৩৭ সালে বিডগ্যাস্টেইন শহরে তাদের সাক্ষাৎ তাদের জীবনে নতুন মোড় আনে। দীর্ঘদিনের দূরত্বের পর আবার কাছাকাছি আসেন সুভাষ-এমিলি। ১৯৩৮ সালে তাদের মধ্যে দ্বিতীয় বারের জন্য ছাড়াছাড়ি হয়। সেই সময় সুভাষচন্দ্র দেশে ফিরে আসেন। কংগ্রেসের সভাপতি হন। ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তাল সেই সময়। ওই দুই বছর ছিল ব্যস্ততার। দীর্ঘদিন তিনি চিঠি লিখতে পারেন নি। ১৯৩৯ সালের ফেব্রুয়ারীর পর চিঠি লেখেন ১৯৩৯ এর এপ্রিল মাসে। এ সময় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু। কংগ্রেসে ইস্তফা দেওয়ার কথা তিনি জানিয়েছিলেন এমিলিকে চিঠিতে। ১৯৪১ এ তিনি দেশ ছাড়েন। বার্লিন পৌছলেন। দেখা হলো আবার দুজনের।
সুভাষ-এমিলির জীবনের নতুন আলো (Subhas’s Love Story)
এমিলি সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে ১৯৪১ সালে বার্লিনে যোগ দিলেন দেশকেবার কাজে। এই সময়েই তাদের জীবনে এল এক সুখের মুহূর্ত। এমিলি জানলেন, তিনি মা হতে চলেছেন। ১৯৪২ সাল ২৯ শে নভেম্বর। এক শুভদিনে দুজনের কোল আলো করে এলো অনিতা, সুভাষচন্দ্রের-এমিলির একমাত্র কন্যা। কন্যাকে দেখে তিনি ভীষণ খুশি হয়েছিলেন। সে কথা জানিয়েছিলেন এমিলি। সেই প্রথমবার তিনি তার দাদা শরৎচন্দ্র বসুকে চিঠিতে লেখেন স্ত্রী এবং কন্যার কথা। স্মৃতি অবশ্য শরৎচন্দ্র বসু পেয়েছিলেন ১৯৪৫ সালে। এই চিঠি আজও নেতাজির এলগিন রোডের বাড়িতে সংগ্রহশালায় আছে। যে চিঠিতে নেতাজি জানিয়েছিলেন, তার অসমাপ্ত কাজ তার কন্যা এবং স্ত্রী সম্পূর্ণ করবে। পরবর্তীতে এমিলি এবং অনিতার সঙ্গে নেতাজির পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের বহুবার দেখা হয়। অনিতা কলকাতায় আসেন। শিশির চন্দ্র বসু ছিলেন অনিতার প্রিয় দাদা। ১৯৪২ এর পর সাক্ষাৎ হয়নি এমিলি-সুভাষের। তাদের প্রেম কাহিনী চিরকাল অসমাপ্ত থেকে যাবে। ১৯৯৬ সালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর স্ত্রী এমিলি শেঙ্কলের মৃত্যু হয় জার্মানিতে। আর এভাবে সমাপ্ত হয় সুভাষ-এমিলির চিরস্মরণীয় ভালোবাসার গল্প।
তথ্যসূত্র :
Emilie and Subhas (A True Love Story) by Krishna Bose
Letters to Emilie Schenkl (1934-1942) by Sisir Kumar Bose, edited by sugata Bose
Netaji Research Bureau, Kolkata
SubhasChandraBose, #Netaji,#IndianHistory ,#SubhasChandraBose EmilLove Story, #trending
(আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাশিফল আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল WhatsApp চ্যানেলে যোগ দিন! সবচেয়ে আগে পান জ্যোতিষ, অফবিট নিউজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনধারা ও অফবিট এক্সক্লুসিভ আপডেট —আমাদের WhatsApp Channel-এ যোগ দিন)
Most Viewed Posts
- ‘মায়া ভরা রাতি’ আবার ফিরছে—অরিজিৎ সিং-এর কণ্ঠে নতুন করে জেগে উঠবে এক চিরন্তন গান
- ২০২৬-এ মেষ রাশির জন্য আসছে বড় মোড় │ Aries Horoscope 2026 Full Prediction
- মোটা হবেন না, মিষ্টি খান নিশ্চিন্তে │ Guilt-Free Sweets for Diwali Delight
- বাড়িতে রাখুন এই নয় গাছ, সৌভাগ্য ফিরবেই
- Dharmendra death: ধর্মেন্দ্রর জীবনের এই ১১টি তথ্য অনেকেই জানেন না │ 11 Untold Facts About Dharmendra

