Tarique Rahman: ১৭ বছরের নির্বাসন, বিতর্ক আর উত্তরাধিকারের ভার—সবকিছুকে পেছনে ফেলে ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরছেন তারেক রহমান। ২০২৬-এর নির্বাচনে সম্ভাব্য নেতৃত্ব ঘিরে আশাবাদ ও সংশয়ের দ্বৈত সুরে মুখর বাংলাদেশ।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। শেরপুর-৩ আসনে এক প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ভোট স্থগিত থাকলেও বাকি আসনগুলির গণনা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে—একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নেতৃত্বাধীন জোট। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১৫১টি আসন, আর প্রাথমিক গণনায় দেখা যাচ্ছে, সেই সংখ্যা অনায়াসেই ছুঁয়ে ফেলতে চলেছে প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান-এর দল। দীর্ঘদিন দেশছাড়া থাকার পর দেশে ফিরে দুটি আসন—ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬—থেকে জয়ী হয়ে তিনি এখন প্রধানমন্ত্রীর পদে শপথ নেওয়ার অপেক্ষায়।
১৭ বছর নির্বাসনে কাটানোর পর দেশে ফিরে এসে কণ্ঠস্বর হারিয়েছেন—এমন মন্তব্য নিজেই করেছেন তারেক রহমান। বিদ্রূপের বিষয়, যাঁর বক্তব্য এক দশক ধরে দেশীয় গণমাধ্যমে নিষিদ্ধ ছিল, তিনিই এখন বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী। ১৭ কোটি মানুষের দক্ষিণ এশীয় এই রাষ্ট্রে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের ১৮ মাস পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি স্পষ্ট ফ্রন্টরানার। ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরার সময় ঢাকার বিমানবন্দরে লাখো মানুষের উপস্থিতি যেমন তাঁর জনপ্রিয়তার ইঙ্গিত দেয়, তেমনই পাঁচ দিন পর মাতা ও দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া-র মৃত্যু সেই আবেগকে আরও তীব্র করে তোলে। প্রত্যাবর্তন কি কেবল পারিবারিক উত্তরাধিকার, নাকি নতুন রাজনৈতিক দর্শনের সূচনা?
তারেক নিজেই বলেছেন, দায়িত্ব এলে তা পালন করতে হয়—এই শিক্ষাই তিনি মায়ের কাছ থেকে পেয়েছেন। এই আবেগঘন মুহূর্তে তিনি নিজেকে কেবল উত্তরাধিকারী হিসেবে নয়, দায়িত্বশীল নেতা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।
তারেক রহমানের জন্মসাল নিয়ে কিছু মতভেদ রয়েছে। নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী তাঁর জন্ম ১৯৬৮ সালে, যদিও অনেকের মতে ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর ঢাকায় তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা ছিলেন বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, যিনি মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং পরে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তাঁর হাত ধরেই প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। মাতা বেগম খালেদা জিয়া প্রথম জীবনে ছিলেন গৃহবধূ। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে আসেন এবং পরে বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হন। এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনে তাঁর দৃঢ় অবস্থান তাঁকে জাতীয় নেত্রীতে পরিণত করে। এই রাজনৈতিক অগ্নিপরীক্ষার মধ্যেই বড় হয়েছেন তারেক, যা তাঁর রাজনৈতিক চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
তারেক রহমান ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন। পরে বিষয় পরিবর্তন করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন বলে জানা যায়। তবে স্নাতক শেষ করার আগেই তিনি পড়াশোনা থেকে সরে আসেন।
শিক্ষাজীবন শেষ করার পর তিনি বস্ত্রশিল্প ও নৌপরিবহণ সংক্রান্ত ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। এই সময়েই তাঁর মধ্যে সাংগঠনিক দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা তৈরি হয়, যা পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে কাজে লাগে বলে তাঁর ঘনিষ্ঠরা দাবি করেন।
তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবন শুরু ১৯৮৮ সালে, বগুড়ার গাবতলী উপজেলা শাখার প্রাথমিক সদস্য হিসেবে। ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি সক্রিয়ভাবে মায়ের পক্ষে প্রচারে অংশ নেন। সে নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে এবং খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৯১-পরবর্তী সময়ে বগুড়া অঞ্চলে দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হন তারেক। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে তিনি নিজে প্রার্থী না হলেও নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ ও সাংগঠনিক সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ধীরে ধীরে তিনি দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন এবং পরবর্তীতে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও পরে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান।
২০০৭ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয়। চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বিদেশে যাওয়ার পর তিনি দীর্ঘদিন দেশে ফেরেননি। এই সময় তিনি যুক্তরাজ্যে অবস্থান করেন। সমর্থকদের মতে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই তাঁকে দেশে ফিরতে বাধা দেওয়া হয়েছিল; রাজনৈতিক সমালোচকদের মতে, আইনি জটিলতা এড়াতেই তিনি বাইরে ছিলেন।
দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক প্রবাসজীবনের পর দেশে ফিরে সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণ তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এক বড় মোড়। ২০২৬ সালের নির্বাচনে দুটি আসনে জয় তাঁর জনপ্রিয়তার পুনঃপ্রতিষ্ঠা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে মায়ের মৃত্যুর পর এই বিজয় দলীয় কর্মীদের কাছে আবেগঘন তাৎপর্য বহন করছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল মুদ্রা, কমে যাওয়া বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও তরুণ বেকারত্বের চাপে রয়েছে। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে, অথচ যুব বেকারত্বের হার প্রায় ১৩.৫ শতাংশ। তারেক রহমান একাধিক নীতিগত প্রস্তাব সামনে এনেছেন—১২ হাজার মাইল খাল পুনঃখনন, বছরে ৫ কোটি গাছ রোপণ, ঢাকায় ৫০টি নতুন সবুজ পরিসর সৃষ্টি, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, কারিগরি শিক্ষার আধুনিকীকরণ, বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে অংশীদারিত্ব ইত্যাদি। তাঁর দাবি, পরিকল্পনার ৩০ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পারলেও জনগণ উপকৃত হবে।
ছাত্র আন্দোলনের পরবর্তী বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিসর উন্মুক্ত হলেও আইনশৃঙ্খলার অবনতি, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও উগ্রপন্থার উত্থান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। জামায়াতে ইসলামী-সহ বিভিন্ন ইসলামপন্থী শক্তির পুনরুত্থান নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি দক্ষিণ এশিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে—শান্তিরক্ষী মিশনে অবদান, তৈরি পোশাক রপ্তানি, প্রযুক্তিখাতে অগ্রগতি। যুক্তরাষ্ট্র বৃহত্তম বিনিয়োগকারী, আবার চীনও কৌশলগতভাবে আগ্রহী। এই ভারসাম্য রক্ষা হবে নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। ভারতের সঙ্গে ২৫০০ মাইল সীমান্ত, আমদানি-রপ্তানি নির্ভরতা এবং আঞ্চলিক রাজনীতির বাস্তবতা নতুন নেতৃত্বকে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে বাধ্য করবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক, রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ—সবই অগ্রাধিকার পাবে। তারেক রহমান বলেছেন, তিনি নিজের দেশের স্বার্থ দেখবেন, তবে পারস্পরিক সহযোগিতার পথ খোলা রাখবেন। তাঁর বক্তব্যে আপাতদৃষ্টিতে বাস্তববাদী সুর শোনা যাচ্ছে।
বাংলাদেশের ভোটাররা পরিবর্তন চেয়েছেন। কিন্তু পরিবর্তন মানে কি কেবল শাসক পরিবর্তন, নাকি শাসনব্যবস্থার রূপান্তর? সাংবিধানিক সংস্কার, ক্ষমতার ভারসাম্য, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা—এসবই হবে পরীক্ষার মাপকাঠি। তারেক রহমানের সামনে সুযোগ আছে নিজেকে কেবল পারিবারিক উত্তরাধিকার নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার। একইসঙ্গে ঝুঁকিও আছে—অতীতের ছায়া যদি আবার ফিরে আসে। বাংলাদেশ আজ এক সন্ধিক্ষণে। আর সেই সন্ধিক্ষণের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন তারেক রহমান—প্রত্যাবর্তনের নায়ক, না কি বিতর্কের পুনরাবৃত্তি—উত্তর দেবে সময়।
#TariqueRahman #BangladeshElection2026 #BNP #BangladeshPolitics #KhaledaZia #Politics #NewBangladesh #SouthAsiaPolitics
(আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাশিফল আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল WhatsApp চ্যানেলে যোগ দিন! সবচেয়ে আগে পান জ্যোতিষ, অফবিট নিউজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনধারা ও অফবিট এক্সক্লুসিভ আপডেট —আমাদের WhatsApp Channel-এ যোগ দিন)
সাম্প্রতিক পোস্ট
- ভোটের বছরেও ‘বঞ্চিত’ বাংলা? হাইস্পিড রেল আর ফ্রেট করিডর ছাড়া ঝুলিতে শূন্য! বাজেটে বাড়ল ক্ষোভের পারদ
- ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বাজেট কি জনদরদী হতে চলেছে? জানুন, লাইভ বাজেট আপডেট ২০২৬
- পুরনো ধাতুর ওপর বিশ্বাস │ রাজপথে কীভাবে ভিন্টেজ গাড়ি হয়ে ওঠে চলমান ইতিহাস
- ঋতুস্রাব আর বাধা নয় শিক্ষায় │ যুগান্তকারী রায় দেশের শীর্ষ আদালতের
- বাজেট প্রত্যাশা ২০২৬ │ ভোটের আগে বাংলার জন্য কী চমক রাখছে কেন্দ্র? │ জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ

