নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: ফ্রান্সের রাস্তায় পোড়া গাড়ি, ভাঙা দোকানের কাচ, লুটপাটের অভিযোগ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের খবরের মধ্যেই নতুন বিতর্ক তৈরি করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দেশজুড়ে চলা বিক্ষোভের জন্য সরাসরি অভিবাসনকে দায়ী করেছেন তিনি। এনডিটিভির প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নিজের সমাজমাধ্যমে ট্রাম্প লিখেছেন, সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশ থেকে আসা, মনে ঘৃণা পুষে রাখা মানুষের অভিবাসন একসময়ের মহান ফ্রান্সকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ করে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
কিন্তু এই বক্তব্যের সঙ্গে ফ্রান্সের চলমান আন্দোলনের মূল দাবিগুলির গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতির দাবিতে। পরে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি এবং সরকারি পরিষেবার মান নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষও আন্দোলনে যুক্ত হয়। ফলে ফ্রান্সের অশান্তির জন্য অভিবাসীদের দায়ী করার ট্রাম্পের মন্তব্য নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—আন্দোলনের প্রকৃত কারণ কী এবং হিংসার ঘটনাগুলির জন্য কারা দায়ী, তা কীভাবে নির্ধারণ করা হবে?
শিক্ষকদের সংখ্যা বাড়ানোর দাবি থেকে দেশজুড়ে বিক্ষোভ
এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্সের সাম্প্রতিক আন্দোলনের শুরুটা হয়েছিল শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ থেকে। তাঁদের দাবি ছিল, বিদ্যালয়ে আরও শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে এবং পড়াশোনার পরিবেশ উন্নত করতে হবে। শিক্ষার মান, বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো এবং শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সুযোগসুবিধা নিয়ে এই অসন্তোষ ধীরে ধীরে বৃহত্তর আন্দোলনের রূপ নেয়। পরে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচ নিয়ে উদ্বিগ্ন মানুষও প্রতিবাদে যোগ দেন। মূল্যবৃদ্ধি, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম এবং সরকারি পরিষেবার অবনতি আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। অর্থাৎ যে প্রতিবাদ শুরু হয়েছিল শিক্ষাব্যবস্থার দাবি নিয়ে, তা পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অসন্তোষেরও প্রকাশ হয়ে দাঁড়ায়।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের হিসাবে দেশজুড়ে প্রায় পাঁচ লক্ষ পঞ্চাশ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন। অন্যদিকে, ফরাসি শ্রমিক সংগঠন সিজিটির দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় আট লক্ষ। দুটি হিসাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থাকলেও উভয় পক্ষের তথ্যেই আন্দোলনের ব্যাপকতা স্পষ্ট। তবে বিক্ষোভের প্রধান দাবিগুলির মধ্যে অভিবাসনবিরোধী কোনও দাবি ছিল বলে এনডিটিভির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। সেখানে শিক্ষাব্যবস্থা, মূল্যবৃদ্ধি এবং সরকারি পরিষেবা নিয়েই আন্দোলনকারীদের অসন্তোষের কথা বলা হয়েছে। এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ট্রাম্প যে কারণকে সামনে এনেছেন, তা প্রতিবাদকারীদের প্রকাশিত মূল দাবিগুলির সঙ্গে সরাসরি মেলে না।
রাতভর সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের অভিযোগ
শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পাশাপাশি ফ্রান্সের একাধিক শহরে হিংসাত্মক ঘটনার খবরও সামনে এসেছে। এনডিটিভির প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, রবিবার সকালে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পোড়া ব্যারিকেড, ভাঙা দোকানের কাচ এবং আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ির দৃশ্য দেখা যায়। প্যারিসসহ একাধিক শহরে মুখ ঢাকা কয়েকজন যুবকের বিরুদ্ধে দোকানপাটে হামলা ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি ভবনেও হামলার খবর পাওয়া গিয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, একটি ঐতিহাসিক নগরভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। এই সব ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয়।
এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ রবিবার জানিয়েছেন, প্রায় এক হাজার আটশো জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত চলছে এবং অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনার চেষ্টা হচ্ছে। শুধু প্যারিসেই আটশো পঞ্চান্ন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়। প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশকর্মী, দমকলকর্মী এবং জরুরি চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত মিলিয়ে প্রায় পাঁচশো জন আহত হয়েছেন। তবে গ্রেফতার হওয়া প্রত্যেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে একই অভিযোগ রয়েছে, এমন তথ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি। একইভাবে, হিংসার ঘটনায় জড়িতদের অভিবাসনসংক্রান্ত পরিচয়ও সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
‘ফ্রান্স জ্বলছে’, অভিবাসন নিয়ে কী বললেন ট্রাম্প?
ফ্রান্সের এই পরিস্থিতি নিয়ে নিজের সমাজমাধ্যমে সরব হন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এনডিটিভির প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ট্রাম্প তাঁর বার্তায় ফ্রান্সের অশান্তির সঙ্গে অভিবাসনের সরাসরি সম্পর্ক টেনেছেন। ফ্রান্স এখন জ্বলছে এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন জগৎ থেকে আসা, মনে ঘৃণা পুষে রাখা মানুষের অভিবাসন দেশটির ক্ষতি করেছে। তিনি ফ্রান্সকে সীমান্ত বন্ধ করে দেরি হওয়ার আগেই পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আহ্বান জানান। এই মন্তব্যে ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের কঠোর অভিবাসননীতির অবস্থানই প্রতিফলিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এটাই প্রথম নয়, ফ্রান্সের অশান্তি নিয়ে এর আগেও মন্তব্য করেছিলেন ট্রাম্প। এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের একটি বক্তব্যে তিনি ফ্রান্সের বিপ্লব ও বিক্ষোভের ইতিহাস নিয়ে বিদ্রূপ করেন। ফ্রান্সকে সুন্দর দেশ হিসেবে উল্লেখ করে সেখানে বারবার বিপ্লবের প্রসঙ্গ তোলেন তিনি। সেই মন্তব্যের পর এবার অভিবাসনকে কেন্দ্র করে তাঁর নতুন বক্তব্য আন্তর্জাতিক আলোচনায় এসেছে।
ট্রাম্পের পাশে উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স, পাল্টা কড়া বার্তা মাক্রোঁর
ফ্রান্সের পরিস্থিতি নিয়ে শুধু ট্রাম্প নন, মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্সও মন্তব্য করেছেন। এনডিটিভির প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ভ্যান্স তাঁর সমাজমাধ্যমের বার্তায় পশ্চিমি উদারপন্থীদের অভিবাসননীতি নিয়ে সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, বৈচিত্র্য ও সহমর্মিতার নামে পশ্চিমি দেশগুলিতে ভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পটভূমির মানুষকে আনা হয়েছে, অথচ তাঁদের সমাজের সঙ্গে একীভূত হওয়ার বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। ভ্যান্সের বক্তব্য অনুযায়ী, এর সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে আগে সতর্ক করা হলেও সেই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা হয়েছিল।
ভ্যান্স আরও বলেন, তিনি চান ফ্রান্সের মানুষ এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসুন এবং দেশের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলির আরও ক্ষতি হওয়ার আগেই অশান্তি বন্ধ হোক। একই সঙ্গে তিনি আমেরিকার নাগরিকদেরও ফ্রান্সের পরিস্থিতির দিকে নজর দিতে বলেন। তাঁর মন্তব্যে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রসঙ্গও উঠে আসে।
অন্যদিকে, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ সরকারি ভবন, প্রশাসনিক দফতর এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। এনডিটিভির প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, যাঁরা ভাঙচুর, লুটপাট কিংবা সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তিতে হামলা চালিয়েছেন, তাঁদের বিচারের মুখোমুখি হতে হবে এবং আইন অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া হবে।
নির্বাচনের আগে চাপ, অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেই নতুন বিতর্ক
ফ্রান্সের এই বিক্ষোভ এমন একটি সময়ে ঘটছে, যখন দেশটির অর্থনীতি একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে বলে এনডিটিভির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউরো ব্যবহারকারী দেশগুলির মধ্যে ফ্রান্সের অর্থনীতি দ্বিতীয় বৃহত্তম। কিন্তু ঋণের চাপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ ও সরকারি পরিষেবা নিয়ে অসন্তোষ যুক্ত হওয়ায় সরকারের উপর চাপ বেড়েছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রায় ছয় মাস আগে এই আন্দোলন রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের অভিবাসনসংক্রান্ত অবস্থান নতুন নয়। এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি আগেও আমেরিকা এবং অন্যান্য দেশের সামাজিক সমস্যার সঙ্গে অভিবাসনের সম্পর্ক টেনেছেন। অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের অন্যতম প্রধান বিষয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর অবৈধ অভিবাসন নিয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা করেছিলেন তিনি। ফ্রান্সের বর্তমান অশান্তিকে কেন্দ্র করে তাঁর মন্তব্য সেই অবস্থানেরই ধারাবাহিকতা। কিন্তু ফ্রান্সের বিক্ষোভের ক্ষেত্রে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের মূল কারণ ছিল শিক্ষাব্যবস্থা, জীবনযাত্রার খরচ এবং সরকারি পরিষেবা নিয়ে অসন্তোষ।
সাম্প্রতিক পোস্ট
নিয়োগ দুর্নীতি কি আগামী দিনে কমবে? জানুন, চাকরির নিয়মে এই পরিবর্তনে আসবে কি স্বচ্ছতা?
এক্সপোজড! ককরোচ জনতা পার্টির নেপথ্যে কোন চক্রান্তের গন্ধ? সত্যিটা জানলে চমকে উঠবেন
মহিলাদের বাসে টিকিট কাটতে হবে না! জানুন, এই কার্ড থাকলেই দিঘা থেকে দার্জিলিং সফর ফ্রী তে

