US Using Kurdish Rebels Against Iran: ইরানের বিরুদ্ধে কুর্দিদের ব্যবহার করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র? কুর্দি গোষ্ঠীর উত্থান, তাদের শতবর্ষের ইতিহাস এবং অতীতে আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক—মধ্যপ্রাচ্যের এই জটিল সমীকরণে কী লুকিয়ে রয়েছে?
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি ক্রমশ আরও সংকটজনক হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত এখন আর শুধু তিন দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই—তার প্রভাব ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে, এমনকি এর ঢেউ পৌঁছে যাচ্ছে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও। সাম্প্রতিক সময়ে শ্রীলঙ্কার উপকূলের কাছে ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজ মার্কিন হামলায় ডুবে যাওয়ার ঘটনাও সেই বৃহত্তর সংঘাতেরই একটি ইঙ্গিত। ফলে বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক মাত্রা নিতে শুরু করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসছে—ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক কৌশল কি শুধুই সরাসরি যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ? নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর রাজনৈতিক পরিকল্পনা? অনেক বিশ্লেষকের মতে, ওয়াশিংটন কেবল বাইরের সামরিক চাপ নয়, বরং ইরানের ভেতরেও অস্থিরতা তৈরি করার কৌশল নিয়েছে। বিশেষ করে ইরানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সক্রিয় কুর্দি বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলিকে ব্যবহার করে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ উসকে দেওয়ার সম্ভাবনার কথাও সামনে আসছে।
ইরানের পশ্চিম সীমান্তবর্তী অঞ্চল—যেখানে বহু বছর ধরে কুর্দি জাতিগোষ্ঠীর স্বায়ত্তশাসনের দাবি জোরালো—সেই এলাকাগুলিতেই সক্রিয় রয়েছে একাধিক সশস্ত্র কুর্দি সংগঠন। অভিযোগ উঠছে, এই গোষ্ঠীগুলির কিছু অংশকে পরোক্ষভাবে উৎসাহ ও সমর্থন দিয়ে ইরানের ভেতরে এক ধরনের গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে বর্তমান সংঘাত শুধু আন্তর্জাতিক যুদ্ধ নয়, বরং ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নতুন অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই কুর্দি বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলি আসলে কারা? কেন তারা দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে? আর কেনই বা আজ তারা হঠাৎ আন্তর্জাতিক সংবাদ শিরোনামে উঠে এসেছে? আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা বিস্তারিতভাবে জানব—ইরানের বিরুদ্ধে সক্রিয় সেই কুর্দি সংগঠনগুলো কারা, তাদের ইতিহাস কী এবং চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তাদের ভূমিকা ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
কে এই বিশেষ কুর্দি বাহিনী? তাদের ইতিহাস কী?
ইরানে কুর্দি বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর ইতিহাস মোটেও নতুন নয়। আজকের সংঘাত বা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির ফল হিসেবে এই আন্দোলনের জন্ম হয়নি; বরং এর শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় বিশ শতকের শুরুর দিকেই। সেই সময় থেকেই ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বসবাসকারী কুর্দি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভিন্ন উপজাতীয় বিদ্রোহ এবং স্বায়ত্তশাসনের দাবি দেখা দিতে শুরু করে। ধীরে ধীরে এই ছোট ছোট বিদ্রোহই পরবর্তীকালে সংগঠিত কুর্দি রাজনৈতিক আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে।
এই আন্দোলনের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আসে ১৯৪৬ সালে। সেই সময় কুর্দি নেতা কাজী মোহাম্মদ ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে স্বল্প সময়ের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন, যা পরিচিত ছিল “রিপাবলিক অব কুর্দিস্তান” নামে। মূলত কুর্দিদের জনবসতিপূর্ণ একটি সীমিত অঞ্চল নিয়ে এই রাষ্ট্র ঘোষিত হয়েছিল। যদিও এই স্বাধীন রাষ্ট্র খুব বেশি দিন টিকতে পারেনি এবং অল্প সময়ের মধ্যেই তা ভেঙে পড়ে, তবুও কুর্দি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ইতিহাসে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে রয়েছে। এরপরও কুর্দি রাজনৈতিক দলগুলো তাদের আন্দোলন থামায়নি। তারা কখনও স্বায়ত্তশাসন, কখনও স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে। বিশেষ করে শাহ শাসিত ইরানের সময় কুর্দি ভাষার ব্যবহার সীমিত করা এবং পারস্য সংস্কৃতিকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার নীতির বিরুদ্ধে কুর্দিদের ক্ষোভ ক্রমশ বাড়তে থাকে। এই পরিস্থিতিতে ইরানের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে কুর্দি জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে ওঠে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর। বিপ্লবের পর নতুন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে কুর্দিদের স্বায়ত্তশাসনের দাবি নতুন করে সামনে আসে। কিন্তু তৎকালীন নেতা আয়াতোল্লাহ রুহোল্লাহ খোমেনি কুর্দি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন এবং তাদের বিরুদ্ধে কার্যত “জিহাদ” ঘোষণা করা হয়। এর ফলে কুর্দি অঞ্চলগুলোতে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করে এবং সেই সময় হাজার হাজার কুর্দি নিহত হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এই সময় থেকেই ইরানের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে কুর্দিদের সশস্ত্র প্রতিরোধ আরও সংগঠিত হয়ে ওঠে।
সাম্প্রতিক সময়েও উত্তেজনা নতুন করে বাড়তে দেখা গেছে। ২০১৮ এবং ২০২২ সালে ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে অবস্থানরত কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর ঘাঁটির ওপর ইরান হামলা চালায়। সেই অঞ্চলের কিছু কুর্দি গোষ্ঠী একসময় নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করেছিল, যা ইরানের দৃষ্টিতে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়।
পরবর্তীকালে ২০২৫ সালের শেষ দিক এবং ২০২৬ সালের শুরুতে ইরানের ভেতরে আবারও কুর্দি বিদ্রোহের খবর সামনে আসে। এই পরিস্থিতিকে অনেক কুর্দি সংগঠন নতুন সুযোগ হিসেবে দেখছে। বিশেষ করে কুর্দিস্তান ফ্রিডম পার্টি দাবি করেছে যে তাদের যোদ্ধারা ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-এর ওপর হামলা চালিয়েছে। এর ফলে আবারও সীমান্ত অঞ্চলে সশস্ত্র সংঘর্ষের ঘটনা সামনে এসেছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ইরানের কুর্দি আন্দোলন একদিনে তৈরি হয়নি। শতবর্ষেরও বেশি সময় ধরে জমে ওঠা রাজনৈতিক দাবি, সাংস্কৃতিক অধিকার এবং স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন থেকেই এই সংঘাতের জন্ম। আর বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি সেই পুরনো আন্দোলনকেই নতুন করে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
ইরানের বিরুদ্ধে কোন কোন কুর্দি গোষ্ঠীর দিকে ঝুঁকছে যুক্তরাষ্ট্র?
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইরানের বিরুদ্ধে চাপ বাড়ানোর কৌশল হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র যে কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর দিকে বিশেষভাবে নজর দিচ্ছে, এমন অভিযোগ একাধিক আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি ইরানের ভেতরেও অস্থিরতা তৈরি করার জন্য কুর্দি বিদ্রোহী সংগঠনগুলোকে ব্যবহার করার কৌশল নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ইরানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে সক্রিয় কয়েকটি কুর্দি সংগঠনের নাম এই প্রসঙ্গে বারবার উঠে আসছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন হলো ইরানীয় কুর্দিস্তানের কমলা পার্টি। এই সংগঠনটি আদর্শগতভাবে কিছুটা বামপন্থী ধাঁচের বলে পরিচিত। উত্তর ইরাকের কুর্দি অধ্যুষিত এলাকায় তাদের ঘাঁটি রয়েছে এবং দীর্ঘদিন ধরে তারা ইরানের কুর্দি জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে আন্দোলন করে আসছে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে এই গোষ্ঠীর নামও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যেখানে বলা হয়েছে যে ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য বিদ্রোহী কার্যকলাপে তাদের ভূমিকা থাকতে পারে। একদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে সামরিক ও রাজনৈতিক সংঘাতের মুখোমুখি হতে হচ্ছে ইরানকে, অন্যদিকে দেশের ভেতরেও বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সক্রিয়তা বাড়ছে। ফলে ইরানের জন্য পরিস্থিতি অনেকটাই জটিল হয়ে উঠেছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এই পরিস্থিতি কার্যত ইরানকে একই সঙ্গে বাইরের যুদ্ধ এবং ভেতরের অস্থিরতার মুখে ঠেলে দিচ্ছে—যা দীর্ঘমেয়াদে এক ধরনের গৃহযুদ্ধের পরিবেশ তৈরি করার কৌশল হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
কেন কুর্দি গোষ্ঠীগুলিকে সমর্থন করছে যুক্তরাষ্ট্র?
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরানের বিরুদ্ধে কৌশলগত চাপ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র যে কুর্দি বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলিকে সমর্থন করছে—এমন অভিযোগ বহু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মূলত ইরানের ভিতরেই অস্থিরতা তৈরি করা এবং ইরান সরকারের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী অভ্যুত্থানের পরিস্থিতি তৈরি করাই এই কৌশলের প্রধান উদ্দেশ্য বলে মনে করা হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ইরানের কুর্দি বিদ্রোহীদের অস্ত্র সরবরাহ এবং সংগঠিত করার কাজে সক্রিয়ভাবে ভূমিকা রাখছে। সেই অস্ত্র এবং সামরিক সহায়তা ইরানের ভেতরে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই কাজ করা হচ্ছে, যাতে ইরান সরকারের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণভাবে একটি শক্তিশালী বিদ্রোহ গড়ে ওঠে। এর ফলে ইরানকে শুধু বাইরের সামরিক সংঘাতেই নয়, দেশের ভেতরেও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হল ইরানের সামরিক বাহিনীর ওপর চাপ বাড়ানো। বিশেষ করে ইরানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে যদি বিদ্রোহী হামলা বাড়তে থাকে, তাহলে ইরানকে তার সামরিক শক্তির বড় অংশ সেই এলাকাগুলোতে ব্যস্ত রাখতে হবে। এতে করে আন্তর্জাতিক সংঘাতে ইরানের সামরিক সক্ষমতা কিছুটা হলেও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এছাড়া এই কৌশলের মাধ্যমে ইরানকে তার নিজের ভূখণ্ডের মধ্যেই ক্রমাগত অস্থিরতার মুখে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। অর্থাৎ ইরান যাতে নিজের ঘরেই নিরাপত্তা সংকটে ভোগে এবং দেশের ভেতরেই প্রতিনিয়ত সংঘাত ও অশান্তির মোকাবিলা করতে বাধ্য হয়—এই লক্ষ্য থেকেই কুর্দি গোষ্ঠীগুলিকে সমর্থন করার অভিযোগ উঠছে।
এই প্রেক্ষাপটে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, কুর্দি বিদ্রোহী বাহিনী আজ কার্যত বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের একটি পরোক্ষ অংশ হয়ে উঠেছে। সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নিলেও, ইরানের ভেতরে তাদের তৎপরতা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মাত্রা যোগ করেছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে কুর্দি গোষ্ঠীগুলির ভূমিকা শুধু আঞ্চলিক রাজনীতিতেই নয়, বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সংঘাতের ক্ষেত্রেও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কুর্দি বিদ্রোহীদের সক্রিয়তা বাড়ার পর ইরানও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান প্রথমত ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে নতুন করে সেনা মোতায়েন করতে পারে, যাতে সেখান থেকে ইরানের বিরুদ্ধে কোনও বিদ্রোহী হামলা সংগঠিত হতে না পারে। ইরান বহুদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে উত্তর ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলকে ব্যবহার করে বিভিন্ন কুর্দি বিদ্রোহী গোষ্ঠী ইরানের সীমান্তে হামলা চালায়। সেই কারণেই সীমান্ত এলাকায় সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে ইরান এই হামলাগুলো প্রতিহত করার চেষ্টা করতে পারে।
এছাড়াও ইরান উত্তর ইরাকের ভেতরে থাকা কুর্দি বিদ্রোহীদের ঘাঁটি এবং তাদের নেতাদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা বা ড্রোন হামলা চালাতে পারে। অতীতেও একাধিকবার ইরান এই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশেষ করে ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে অবস্থিত কুর্দি বিদ্রোহী শিবিরগুলোর ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর নজির রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই একই ধরনের অভিযান আবারও শুরু হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শুধু আকাশপথেই নয়, প্রয়োজনে সীমান্তবর্তী এলাকায় স্থল অভিযানও শুরু করতে পারে ইরানের সেনাবাহিনী। এর মাধ্যমে কুর্দি বিদ্রোহীদের ঘাঁটি ধ্বংস করা এবং তাদের কার্যকলাপ সীমিত করার চেষ্টা করতে পারে তেহরান।
এর পাশাপাশি ইরান ইতিমধ্যেই কুর্দি বিদ্রোহী সংগঠনগুলোর নেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যারা দেশের ভেতরে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমনকি কুর্দি নেতাদের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক সামরিক হামলা বা হত্যার হুমকিও দিয়েছে ইরান।
কুর্দিদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস (US Using Kurdish Rebels Against Iran)
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে কুর্দি গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক সবসময়ই জটিল এবং বিতর্কিত। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, একদিকে বিভিন্ন সময়ে কুর্দি বিদ্রোহী বাহিনীকে সমর্থন দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, আবার অন্যদিকে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতেই বহুবার তাদেরকে মাঝপথে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এই দ্বৈত নীতির কারণে কুর্দি নেতৃত্বের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সংশয় তৈরি হয়েছে।
এই ধরনের একটি বড় উদাহরণ দেখা যায় ১৯৭৫ সালে। সে সময় ইরাক সরকারের বিরুদ্ধে কুর্দি বিদ্রোহীদের গোপনে অস্ত্র ও সমর্থন দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু পরে ইরানের সঙ্গে একটি কূটনৈতিক চুক্তির পর হঠাৎই সেই সমর্থন বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে কুর্দি বিদ্রোহীরা কার্যত একঘরে হয়ে পড়ে এবং তাদের আন্দোলন দ্রুত দুর্বল হয়ে যায়।
পরবর্তীকালে ১৯৯১ সালের গাল্ফ যুদ্ধের সময়ও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। সেই সময় কুর্দি ও শিয়া গোষ্ঠীগুলিকে সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আহ্বান জানানো হলেও, পরে প্রত্যাশিত সামরিক সহায়তা দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। বরং শেষ পর্যন্ত ইরাকের শাসক সাদ্দাম হোসেন বিদ্রোহ দমন করতে সক্ষম হন এবং সেই সংঘর্ষে বহু কুর্দি যোদ্ধা ও সাধারণ মানুষ প্রাণ হারান।
আরও সাম্প্রতিক উদাহরণ দেখা যায় ২০১৯ সালে সিরিয়ার ঘটনায়। ইসলামিক স্টেট বা আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেস নামে কুর্দি নেতৃত্বাধীন বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান মিত্র ছিল। কিন্তু পরে তুরস্কের সঙ্গে সমঝোতার অংশ হিসেবে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেন। এর ফলে কুর্দি বাহিনী হঠাৎই নিরাপত্তা সংকটে পড়ে এবং তুরস্কের সামরিক চাপের মুখে পড়ে যায়।
এই ধারাবাহিক ঘটনাগুলি দেখলে অনেক বিশ্লেষকের মতে বোঝা যায় যে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কুর্দিদের প্রায়শই কৌশলগতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে (US Using Kurdish Rebels Against Iran)। যখন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে কুর্দি গোষ্ঠীগুলির লক্ষ্য মিলে গেছে, তখন তাদের সমর্থন করা হয়েছে; কিন্তু রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাতেই সেই সমর্থন অনেক সময় সরে গেছে।
এই কারণেই বর্তমানে ইরানের পরিস্থিতিতে কুর্দি গোষ্ঠীগুলি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করলেও অনেক ক্ষেত্রেই তারা পুরোপুরি নির্ভর করতে কিছুটা সতর্কতা দেখাচ্ছে। কারণ অতীতের অভিজ্ঞতা তাদের শিখিয়েছে যে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলির সমর্থন অনেক সময় পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত বদলে যেতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, ইরানকে ঘিরে চলমান এই উত্তেজনার মধ্যে কুর্দি গোষ্ঠীগুলির ভূমিকা ভবিষ্যতে কোন দিকে মোড় নেয়। মধ্যপ্রাচ্যের এই জটিল সমীকরণে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে—তা সময়ই বলে দেবে।
এই ধরনের আরও আপডেট জানতে নজর রাখুন নিউজ অফবিটের পেজে।
#MiddleEastCrisis #Geopolitics #IranWar2026 #IranCrisis #GlobalPolitics #NewsAnalysis#InternationalNews
সাম্প্রতিক পোস্ট
- খামেনেইয়ের মৃত্যু ও ৪০ দিনের শোক! পহলভি রাজবংশের পতন থেকে কীভাবে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছলেন তিনি?
- খামেনেয়ের মৃত্যু! মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি কোন দিকে, ভারতের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
- রাতের শহরে মহিলাদের সুরক্ষায় বিশেষ বাহিনী রাজ্য সরকারের │ জানুন, কী সেই উদ্যোগ
- আর কিছুক্ষণের অপেক্ষা! তিন ধাপে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ, কীভাবে জানবেন আপনার নাম আছে কি না?
- লাদাখে বরফের ওপর ম্যারাথন! আফগান-পাক যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগেই চিনের সীমান্তে ভারতের এই পদক্ষেপ কেন মাস্টারস্ট্রোক?

