Uttam Kumar Centenary: শতবর্ষ পেরিয়েও বাঙালির হৃদয়ে অমলিন এক হাসি, এক ব্যক্তিত্ব, এক কিংবদন্তি—উত্তম কুমার। সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু তাঁর অভিনয়, উপস্থিতি ও সেই অনন্য হাসির আবেদন আজও সমানভাবে জীবন্ত। বিশেষ কলমে ড.সুস্মিতা প্রামাণিক
তেসরা সেপ্টেম্বর ১৯২৬ কলকাতার আহিরীটোলা থেকে যাত্রা শুরু করে আজ ও এক আশ্চর্য বিশ্বপথিক হয়ে বাঙালি মানসে উজ্জ্বল ধ্রুবতারা হয়ে জ্বলজ্বল করছেন অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায় ওরফে উত্তমকুমার ।
আমার সঙ্গে উত্তমকুমারের সম্পর্কটা শুরু থেকেই একটু অদ্ভুত।
আমি যখন পৃথিবীতে এলাম, সেই বছরই উত্তমকুমার চলে গেলেন।
আমার জন্মের দিন কেউ নিশ্চয়ই জানত না, বাংলা সিনেমার এক যুগও প্রায় একই সময়ে শেষ হয়ে গেছে। বাড়িতে তখন আমার জন্মের আনন্দ, আত্মীয়স্বজনের আসা-যাওয়া, নতুন শিশুকে নিয়ে ব্যস্ততা। আর কলকাতার অন্য কোথাও, বাংলা সিনেমার মানুষজন, অগণিত দর্শক—তাঁরা তখন শোক করছেন তাঁদের প্রিয় মহানায়ককে নিয়ে।
আমি তখন কিছুই জানি না।
জানি না উত্তমকুমার কে।
জানি না সপ্তপদী কী।
জানি না হারানো সুর, সাড়ে চুয়াত্তর, অগ্নিপরীক্ষা কিংবা নায়ক কী জিনিস।
জানি না একজন অভিনেতাকে হারিয়ে একটা শহর কীভাবে কাঁদতে পারে।
কিন্তু আজ পিছন ফিরে তাকালে মনে হয়, আমার পৃথিবীতে আসার বছরটিই যেন উত্তমকুমারের সঙ্গে আমার এক অদৃশ্য পরিচয়ের বছর।
কারণ তিনি শুধু সিনেমায় অভিনয় করেননি; তিনি একটা সময়কে অভিনয় করে গিয়েছেন।
আমার ছোটবেলার স্মৃতিতে উত্তমকুমারের প্রথম উপস্থিতি কোনো সিনেমা হলের নয়।
বাড়ির।
সেই পুরনো টেলিভিশনের সামনে বসে পরিবারের সঙ্গে বাংলা সিনেমা দেখা—এটাই ছিল আমাদের প্রজন্মের সিনেমা-দেখার অন্যতম বড় আনন্দ।
আজকের মতো মোবাইল খুলে সিনেমা চালিয়ে দেওয়া ছিল না। ইন্টারনেট ছিল না। ইউটিউব ছিল না। যখন যে সিনেমা টেলিভিশনে আসত, সেটাই দেখতে হতো। আর বাড়ির বড়রা যদি বলতেন, “আজ উত্তমকুমারের ছবি আছে”—তাহলে ব্যাপারটা একটু অন্যরকম হয়ে যেত।
আমি হয়তো গল্পটা পুরো বুঝতাম না।
কিন্তু বাড়ির অন্যদের মুখ দেখে বুঝতাম—আজকে উত্তমকুমার।
মা হয়তো রান্নাঘরের কাজ একটু তাড়াতাড়ি সেরে ফেলতেন।
বাবা হয়তো খবরের কাগজটা সরিয়ে টেলিভিশনের দিকে তাকাতেন।
বাড়ির অন্যরাও এসে বসতেন।
তারপর পর্দায় উত্তমকুমার।
সেই সময় বুঝিনি, এই মানুষটির সঙ্গে আমার পরিবারের আগের প্রজন্মের কতটা আবেগ জড়িয়ে আছে।
পরে বুঝেছি।
একজন নায়ককে শুধু সিনেমায় দেখা যায় না। তাঁকে মানুষ নিজের জীবনের স্মৃতির মধ্যেও রেখে দেয়।
উত্তমকুমার মানে প্রথম দেখা সিনেমা, কলেজজীবনের প্রেম, রবিবারের দুপুর।
আর কারও কাছে—পুরনো দিনের বাংলা সিনেমা ।
সিনেমা হলের সামনে পোস্টার।
বড় বড় অক্ষরে নায়ক-নায়িকার নাম।
গেটের সামনে ভিড়।
টিকিটের জন্য অপেক্ষা।
ভিতরে ঢুকলে অন্ধকার।
তারপর পর্দা জ্বলে উঠত।
ইন্টারভ্যালে বাইরে বেরিয়ে বাদাম, চানাচুর, ঠান্ডা পানীয়।
আমার নিজের প্রত্যক্ষ স্মৃতির চেয়ে এই পরিবেশের স্মৃতিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উত্তমকুমারকে আমি তাঁর জীবিত অবস্থায় দেখিনি। তাঁকে দেখেছি পরে—সিনেমায়, টেলিভিশনে, পরিবারের আলোচনায়।
এই দিক থেকে আমার উত্তমকুমার একটু অন্যরকম।
তিনি আমার সমসাময়িক নন।
তিনি আমার অনেক আগের প্রজন্মের মানুষ।
কিন্তু তাঁর সিনেমা আমারও।
উত্তমকুমারের প্রথম দিকের জনপ্রিয় ছবিগুলোর মধ্যে সাড়ে চুয়াত্তর দেখলে আজও হাসি পায়। তারপর অগ্নিপরীক্ষা।
এই ছবির পর উত্তম-সুচিত্রা জুটি যে বাঙালির প্রেমের কল্পনাকে কতটা বদলে দিয়েছিল, সেটা আজকের প্রজন্ম বুঝতে পারবে না।
সুচিত্রা সেনের সঙ্গে উত্তমকুমারকে দেখলে মনে হতো, প্রেম করার জন্য পৃথিবীতে আর কাউকে দরকার নেই।
একটু তাকানো।
একটু হাসি।
একটু অভিমান।
আর একটা গান।
ব্যস— আজকের ভাষায় হান্ড্রেড পারসেন্ট লাভ । আর চন্ডীদাসের ভাষায় ‘রজকিনী প্রেম নিকশিত হেম কাম গন্ধ নাহি তায়।’
এখন প্রেমে আছে হোয়াটস্যাপ, মেসেঞ্জার, ভিডিও কল, লাস্ট সিন্, ব্লু টিক, টাইপিং…
তখন ছিল চিঠি।
চিঠি আসতে সময় লাগত।
উত্তর আসতে আরও সময় লাগত।
আর সেই অপেক্ষার মধ্যে প্রেমটা বোধহয় একটু বেশি প্রেম ছিল।
হারানো সুর-এর অরিন্দমকে আমি যতবার দেখি, ততবার মনে হয়—উত্তমকুমারের আসল শক্তি শুধু তাঁর চেহারা ছিল না।
তিনি অনুভূতি প্রকাশ করতে পারতেন।
স্মৃতি হারানো মানুষটির অসহায়তা, সম্পর্কের টান, ভালোবাসার আকুলতা—সবকিছু তিনি কি সহজভাবে প্রকাশ করেছেন!
আর সপ্তপদী-র কৃষ্ণেন্দু?
সেটা তো বাঙালির আবেগের আলাদা অধ্যায়।
ধর্মের পার্থক্য, প্রেম, বিচ্ছেদ, ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা—সবকিছুর মধ্যে উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেন এমন একটা জগৎ তৈরি করেছিলেন, যেখানে আজও ঢুকে পড়া যায়।
সাগরিকা-য় তিনি অমিত।
শিল্পী-তে অন্য রকম মানুষ।
বিপাশা-য় সম্পর্কের জটিলতা।
দেয়া নেয়া-য় হাসি-ঠাট্টার উত্তম।
জতুগৃহ-তে সম্পর্কের ভাঙন ও নিঃসঙ্গতা।
থানা থেকে আসছি-তে রহস্য।
চিড়িয়াখানা-য় ব্যোমকেশ।
ঝিন্দের বন্দী-তে ময়ূরবাহন।
অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি-তে অ্যান্টনি।
নিশিপদ্ম-তে অন্য এক মানবিক উত্তম।
চৌরঙ্গী-তে শহুরে জীবনের অন্য ছবি।
আর তারপর নায়ক।
এতগুলো চরিত্রের মধ্য দিয়ে একজন মানুষ কীভাবে নিজের ভিতরের এতগুলো মানুষকে বের করে আনতে পারেন, সেটাই উত্তমকুমারের অভিনয়ের বিস্ময়।
তবে আমার কাছে উত্তমকুমারের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার নায়ক।
সত্যজিৎ রায়ের অরিন্দম মুখোপাধ্যায়।
বাইরে থেকে তিনি তারকা।
ভিতরে তিনি একা।
বাইরে থেকে আত্মবিশ্বাসী।
ভিতরে দ্বিধাগ্রস্ত।
বাইরে থেকে সফল।
ভিতরে অতীতের কিছু সিদ্ধান্ত তাঁকে তাড়া করে বেড়ায়।
এই অরিন্দমকে দেখতে দেখতে মনে হয়—উত্তমকুমার নিজের সঙ্গে কথা বলছেন।
নায়করাও মানুষ।
তাঁদেরও ভয় আছে।
তাঁদেরও অনুশোচনা আছে।
তাঁদেরও ঘুম আসে না।
এই ছবিতে উত্তমকুমার শুধু একজন চরিত্রে অভিনয় করেননি; তিনি নিজের তারকা-ইমেজকেও যেন অভিনয়ের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
এখানেই তিনি আমার কাছে সত্যিকারের বড় অভিনেতা হয়ে ওঠেন।
আমার কাছে উত্তমকুমারের একটা মজার দিকও আছে।
ছোটবেলায় তাঁকে দেখে মনে হতো—এই মানুষটি বোধহয় জীবনে কখনো সমস্যায় পড়েননি।
চুল ঠিক।
জামা ঠিক।
কথা ঠিক।
হাসি ঠিক।
প্রেম ঠিক।
সব ঠিক!
পরে নায়ক, জতুগৃহ, গৃহদাহ, অমানুষ ইত্যাদি ছবি দেখতে দেখতে বুঝলাম—না, মানুষটির অভিনয়ের জগৎ অনেক বড়।
তিনি শুধু স্বপ্ন দেখাতেন না।
প্রয়োজনে স্বপ্ন ভাঙতেও জানতেন।
বাড়ির আলমারিতে পুরনো ছবি যেমন থাকে, উত্তমকুমারও তেমন।
পুরনো।
কিন্তু অপ্রয়োজনীয় নন।
বরং যত পুরনো হন, তত মূল্য বাড়ে।
উত্তমকুমার ২৪ জুলাই ১৯৮০-তে চলে গিয়েছিলেন। তাঁর কর্মজীবন ছিল ১৯৪৮ থেকে ১৯৮০ পর্যন্ত, এবং তিনি প্রায় দুই শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেছিলেন।
কিন্তু আমার কাছে তাঁর জীবনের হিসাব অন্যরকম।
তিনি ১৯৮০ সালে চলে যাননি। আমি আর উত্তমকুমার একই বছরে পৃথিবীর দুই দিকে দাঁড়িয়েছিলাম।
তিনি যাচ্ছিলেন।
আমি আসছিলাম।
আজ এত বছর পরে ফিরে তাকালে সেই সমাপতনটা আমার কাছে আর কেবল একটি বছরের মিল মনে হয় না।
মনে হয়, এক প্রজন্মের হাতে তিনি তাঁর সিনেমাগুলো দিয়ে গিয়েছিলেন, আর সেই সিনেমাগুলোই পরে আর-এক প্রজন্মের হাতে এসে পৌঁছেছে।
সেই প্রজন্মের একজন আমি।
তাই উত্তমকুমার আমার কাছে শুধুই মহানায়ক নন।
তিনি আমার না-দেখা অথচ চেনা মানুষ।
এই জন্যই হয়তো উত্তমকুমারকে নিয়ে লিখতে বসলে শেষ পর্যন্ত তাঁর সিনেমার কথা নয়, নিজের কথাই বেশি মনে পড়ে।
একটা পুরনো ছবির পর্দা জ্বলে উঠলেই।
একটা পুরনো গান বাজলেই।
কোনো সন্ধ্যায় হঠাৎ সপ্তপদী চোখে পড়লেই।
কিংবা নায়ক-এর অরিন্দমকে দেখে নিজের জীবনের দিকে তাকালেই।
তখন মনে হয়—
মানুষটি কোথাও যাননি।
শুধু সময়ের ওপারে দাঁড়িয়ে আছেন।
আর আমরা এপারে বসে তাঁকে দেখছি।
চুপ করে।
মুগ্ধ হয়ে।
একটু হেসে।
একটু মনখারাপ করে।
কিন্তু আমার পৃথিবীটা তাঁকে ছাড়া সম্পূর্ণ হয়নি।
বরং তাঁর সিনেমা দিয়েই সেই পৃথিবীর অনেকটা তৈরি হয়েছে।
এই জন্যই তিনি আমার কাছে শুধু উত্তমকুমার নন—
আমার না-দেখা শৈশবের একজন মানুষ, আমার সিনেমা দেখার অভ্যাসের একজন মানুষ, আর শেষ পর্যন্ত—আমার নিজেরও একজন মানুষ।
মহানায়করা চলে যান।
কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া আলোয় পরের প্রজন্মও নিজের মুখ দেখতে পায়।
উত্তমকুমার সেই আলো।
বসন্তবিলাপ ছবিতে চিন্ময় রায়ের কণ্ঠে সেই অবিস্মরণীয় সংলাপ কে ভুলতে পারে , ‘একবার বলো উত্তমকুমার ‘ আমাদের সব প্রেমিকের চিরকালীন হয়ে উঠতে চাওয়া ।
আর সেই আলো এখনও নিভে যায়নি।
শতবর্ষেও যে হাসি অমলিন অদ্বিতীয় উত্তম ।।
#UttamKumar #UttamKumarCentenary #MahanayakUttamKumar #BengaliCinema #BengaliActor #IndianCinema #BengaliFilm #UttamKumarLegacy #LegendaryActor
[লেখকের বক্তব্য সম্পূর্ণ তার নিজস্ব]
সাম্প্রতিক পোস্ট
স্কুলের শৌচাগারে সাপ! নামী বেসরকারি স্কুলের নিরাপত্তা নিয়ে উঠল প্রশ্ন, কী বলছে কর্তৃপক্ষ
নিউ মার্কেটের অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্যে আসল কারণ কী? ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য
অভিজিৎ দীপকে কি তবে এবার বিজেপিতে? রাজনৈতিক প্রস্তাব ঘিরে তুঙ্গে জল্পনা
ঋতব্রতই বিরোধী দলনেতা, হাইকোর্টের বড় পর্যবেক্ষণ, কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের পদক্ষেপ কী?

