West Bengal Election Wall Writing: ভোটের মুখে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে দেওয়াল লিখন ঘিরে শুরু হয়েছে রঙিন রাজনৈতিক লড়াই। ছড়া, ব্যঙ্গচিত্র ও স্লোগানের মাধ্যমে শাসক-বিরোধী শিবির একে অপরকে আক্রমণ করছে, আর সেই লড়াইই প্রতিদিনের পথে মানুষের চোখে পড়ে, তৈরি করছে নতুন আলোচনা।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: “কুমোরপাড়ার গরুর গাড়ি বোঝাই করা লক্ষ্মীর হাঁড়ি, জেনে গেছে জনতা, আবার আসছে মমতা।” আবার কোথাও চোখে পড়ছে—“বাংলা বাঁচাও, লাল ফেরাও।” অন্য এক দেওয়ালে লেখা—“কথা দাও, ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তুমি তৃণমূলকে ভোট দেবে না।”
এই লাইনগুলো কি আপনার খুব চেনা লাগছে? একটু ভালো করে ভাবুন— সকালে বাজারে যাওয়ার পথে, অফিস থেকে ফেরার সময়, কিংবা পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিতে দিতে—ঠিক এমনই রঙিন দেওয়াল কি বারবার চোখে পড়ছে না ? এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গ যেন এক বিশাল খোলা ক্যানভাস, যেখানে প্রতিটি দেওয়ালই কথা বলছে—কখনও ছড়ায়, কখনও ব্যঙ্গে, কখনও সরাসরি রাজনৈতিক বার্তায়। লাল, নীল, গেরুয়া—বিভিন্ন রঙের তুলিতে আঁকা এই শব্দগুলো শুধু স্লোগান নয়, এগুলো একেকটা আবেগ, একেকটা মতাদর্শ, একেকটা ভোটের ডাক।
ভোট মানেই শুধু রাজনৈতিক লড়াই নয়, যেখানে আবেগ, মতাদর্শ আর মানুষের প্রত্যাশা মিলেমিশে তৈরি করে এক অনন্য পরিবেশ। এখনকার ডিজিটাল যুগে সোশ্যাল মিডিয়া, ডিজিটাল ক্যাম্পেইন, অনলাইন পোস্টার—সবকিছুই যেন ভোট প্রচারের মূল হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই আধুনিকতার ভিড়েও এক পুরনো মাধ্যম আজও তার জায়গা অটুট রেখেছে—দেওয়াল লেখা।
পাড়ার মোড়, বাজারের পাশে, বাসস্ট্যান্ড কিংবা বাড়ির ফাঁকা দেওয়াল—সবখানেই রঙ তুলির ছোঁয়ায় ফুটে ওঠে রাজনৈতিক বার্তা, স্লোগান আর সৃজনশীলতা। এই দেওয়াল লেখাগুলো শুধু প্রচারের মাধ্যম নয়, বরং মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরির এক সহজ ও কার্যকর উপায়। আশ্চর্যের বিষয়, আজও মানুষ চলার পথে থেমে পড়ে এই লেখাগুলো পড়তে, হাসতে, ভাবতে—কখনও বা আলোচনায় মেতে উঠতে। তাই ডিজিটাল ঝড়ের মধ্যেও দেওয়াল লেখা রয়ে গেছে ভোটযুদ্ধের এক অমলিন, প্রাসঙ্গিক এবং প্রাণবন্ত অংশ।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটের আবহ মানেই শুধু মাইক, মিছিল আর সোশ্যাল মিডিয়ার প্রচার নয়—এই রাজ্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে দেওয়াল লিখন। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে ফের একবার সেই পুরনো রঙতুলির লড়াই চোখে পড়ছে রাজ্যের সর্বত্র। শাসক হোক বা বিরোধী—তৃণমূল কংগ্রেস, ভারতীয় জনতা পার্টি এবং ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)—সব দলই দেওয়ালকে বানিয়ে ফেলেছে নিজেদের রাজনৈতিক ক্যানভাস।
পাড়ার গলি থেকে শুরু করে ব্যস্ত রাস্তার মোড়—সবখানেই ছড়া, স্লোগান, ব্যঙ্গচিত্র আর তীক্ষ্ণ কটাক্ষে ভরে উঠছে দেওয়াল। কখনও মজার ছলে, কখনও তীব্র আক্রমণে—প্রতিপক্ষকে টিটকারি দিয়ে ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা চলছে জোরকদমে। ডিজিটাল যুগে যেখানে ফেসবুক পোস্ট বা হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজে রাজনৈতিক প্রচার সীমাবদ্ধ থাকে, সেখানে এই দেওয়াল লিখন কিন্তু সরাসরি মানুষের চোখে পড়ে, তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল হোক বা শহরের অলিগলি—আজও বহু মানুষ সকালে বাজারে যাওয়ার পথে কিংবা সন্ধ্যেবেলা কাজ সেরে ফেরার সময় থেমে পড়েন এই দেওয়াল লেখার সামনে। কোনো ছড়া, ব্যঙ্গচিত্র বা কৌতুকপূর্ণ স্লোগান চোখে পড়লেই মুহূর্তের জন্য হলেও তা পড়ে দেখেন, আর অনেক সময়ই মুখে ফুটে ওঠে একচিলতে হাসি। এইভাবেই দেওয়াল লিখন শুধু রাজনৈতিক বার্তা বহন করে না, বরং মানুষের বিনোদনেরও একটি অদ্ভুত মাধ্যম হয়ে ওঠে।
তবে এই রঙতুলির লড়াই সবসময় নিরীহ থাকে না। অনেক ক্ষেত্রেই দেওয়াল দখলকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সংঘাতের ছবিও সামনে আসে। বিশেষ করে দক্ষিণ ২৪ পরগণা-র বিস্তীর্ণ এলাকা কিংবা পূর্ব বর্ধমান ও পশ্চিম বর্ধমান-এর বিভিন্ন অঞ্চলে দেওয়াল দখলকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা, অশান্তি এমনকি সংঘর্ষের ঘটনাও নতুন নয়। কোন দল আগে লিখবে, কার বার্তা বেশি দৃশ্যমান হবে—এই প্রতিযোগিতা অনেক সময় রাজনৈতিক রেষারেষিকে তীব্র করে তোলে।

অন্যদিকে কলকাতা-র অভিজাত এলাকাগুলিতেও দেওয়াল লিখন এক বিশেষ রূপ নিয়েছে। এখানে অনেক সময় দেওয়ালগুলো শুধুই প্রচারের জায়গা নয়, বরং হয়ে উঠেছে একপ্রকার রাজনৈতিক আর্ট ক্যানভাস—যেখানে সৃজনশীলতা, ব্যঙ্গ এবং বার্তার মিশেলে তৈরি হচ্ছে এক অনন্য ভিজ্যুয়াল ভাষা।
শুধু দক্ষিণবঙ্গ নয়, উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতেও একই ছবি। উত্তরবঙ্গ-এর গ্রাম থেকে শহর—সবখানেই দেওয়াল লিখন ঘিরে জমে উঠেছে ভোটের প্রচার। স্থানীয় ভাষা, সংস্কৃতি আর রাজনৈতিক বার্তার মিশেলে এই দেওয়ালগুলো হয়ে উঠছে ভোটের আগে জনমত গঠনের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক, সোশ্যাল মিডিয়া যতই জনপ্রিয় হোক না কেন—দেওয়াল লিখন এখনও পশ্চিমবঙ্গের ভোট সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি শুধু প্রচার নয়, এটি ঐতিহ্য, এটি মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংযোগের এক প্রাণবন্ত মাধ্যম—যেখানে রঙ, শব্দ আর রাজনীতি মিলেমিশে তৈরি করে এক অন্যরকম গল্প।
উন্নয়ন বনাম দুর্নীতি (West Bengal Election Wall Writing)
তৃণমূল কংগ্রেস তাদের দেওয়াল লিখনে জোর দিচ্ছে সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের উপর। ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’, ‘যুবসাথী’, ‘কন্যাশ্রী’—এই প্রকল্পগুলোর উল্লেখ করে তারা ভোটারদের মনে উন্নয়নের বার্তা পৌঁছে দিতে চাইছে। দেওয়ালে বড় বড় অক্ষরে লেখা হচ্ছে এই প্রকল্পগুলোর সুবিধা, যেন সাধারণ মানুষ চোখে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে রাখতে পারেন।
অন্যদিকে ভারতীয় জনতা পার্টি ও ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) সহ বিরোধী দলগুলো শাসক দলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরছে দেওয়াল লিখনের মাধ্যমেই। কোথাও তীব্র ভাষায় আক্রমণ, কোথাও আবার সরাসরি প্রশ্ন—সব মিলিয়ে দেওয়াল যেন হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক বিতর্কের খোলা মঞ্চ।
দেওয়ালেই ছড়া, ব্যঙ্গ আর স্লোগান যুদ্ধ
এই নির্বাচনে দেওয়াল লিখনের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে ছড়া ও ব্যঙ্গাত্মক স্লোগান। যেমন তৃণমূলের দেওয়ালে দেখা যাচ্ছে—“তোমাদের দলে অমিত শাহ, নরেন্দ্র মোদী / আমাদের দলে একা দুর্গা”—যেখানে বিজেপিকে কটাক্ষ করা হয়েছে। পাল্টা হিসেবে বিজেপির দেওয়ালে উঠে আসছে—“বাঁচতে চাই, বিজেপি তাই”—একটি সরল কিন্তু শক্তিশালী বার্তা।
আবার বাম শিবিরও পিছিয়ে নেই। তাদের দেওয়ালে লেখা—“বাংলা বাঁচাও, লাল ফেরাও”—যা একদিকে রাজনৈতিক আবেদন, অন্যদিকে পুরনো সমর্থন ফিরিয়ে আনার আহ্বান। এইসব ছড়া, স্লোগান আর ব্যঙ্গচিত্র সাধারণ মানুষের চোখে পড়ে, তাদের মনে প্রশ্ন তোলে, কখনও বা হাসায়—আর ঠিক সেখানেই সফল হয় এই প্রচার।
এছাড়াও অনেক সময় অভিযোগ ওঠে, বাড়ির মালিকের অনুমতি ছাড়াই দেওয়াল লেখা হচ্ছে, যা নিয়ে স্থানীয় স্তরে বিবাদ তৈরি হচ্ছে। যদিও ভারতের নির্বাচন কমিশন-এর পক্ষ থেকে নজরদারি থাকে, তবুও বাস্তবে নিয়ম ভাঙার ঘটনাও অস্বীকার করা যায় না।
দেওয়াল লিখনের ইতিহাস (West Bengal Election Wall Writing)
পশ্চিমবঙ্গে দেওয়াল লিখনের ইতিহাস কয়েক দশকের পুরোনো। বামফ্রন্ট আমলে লাল রঙে হাতুড়ি-কাস্তের প্রতীক আর সংগঠিত স্লোগান ছিল এই সংস্কৃতির মূল ভিত্তি। তখনকার দেওয়াল লিখন ছিল অনেক বেশি শৃঙ্খলাবদ্ধ, সরাসরি এবং মতাদর্শভিত্তিক—ব্যঙ্গ বা কটাক্ষের ব্যবহার তুলনামূলক কম ছিল।
পরবর্তীকালে তৃণমূল কংগ্রেস-এর উত্থানের সঙ্গে আসে নীল-সাদা রঙের আধিপত্য, ঘাসফুলের প্রতীক এবং আরও সৃজনশীল উপস্থাপনা। এরপর ভারতীয় জনতা পার্টি যুক্ত করে গেরুয়া রঙের উপস্থিতি, পদ্মফুলের প্রতীক এবং তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক বার্তা। ফলে দেওয়াল লিখন এখন শুধু স্লোগান নয়—এটি হয়ে উঠেছে এক বহুরঙা রাজনৈতিক শিল্প, যেখানে প্রতিটি দল নিজেদের পরিচয় তুলে ধরছে ভিজ্যুয়াল ভাষায়।
সোশ্যাল মিডিয়ার যুগেও দেওয়ালের টান (West Bengal Election Wall Writing)
আজকের দিনে Facebook, YouTube বা Instagram-এর মতো প্ল্যাটফর্ম রাজনৈতিক প্রচারের বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। সেখানে ডিজিটাল পোস্টার, ভিডিও, রিলস—সবই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
তবুও দেওয়াল লিখনের গুরুত্ব কমেনি। কারণ সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট তৈরি করা অনেক সময় খরচসাপেক্ষ, আবার সব মানুষই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেন না। গ্রামাঞ্চল বা শহরের বহু মানুষ এখনও দেওয়াল লেখার মাধ্যমেই রাজনৈতিক বার্তা গ্রহণ করেন। আইন অনুযায়ী সরকারি দেওয়ালে অনুমতি ছাড়া রাজনৈতিক লেখা নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে এই নিয়ম সবসময় মানা হয় না। ফলে দেওয়াল আজও রয়ে গেছে এক স্বাধীন, সহজলভ্য এবং সরাসরি প্রচারের মাধ্যম।
বাংলার রাজনীতিতে দেওয়াল শুধু ইট-পাথরের গাঁথুনি নয়—এটি এক জীবন্ত দলিল। এখানে লেখা থাকে প্রতিশ্রুতি, অভিযোগ, ব্যঙ্গ, আবার কখনও নীরব হুঁশিয়ারি। এটি যেন এক ধরনের ইস্তেহার, যা সরাসরি মানুষের চোখে পড়ে, মনে গেঁথে যায় এবং ভোটের আগে জনমত গঠনে বড় ভূমিকা পালন করে। ডিজিটাল ঝড়ের মধ্যেও তাই দেওয়াল লিখন আজও অমলিন—কারণ এটি শুধু প্রচার নয়, এটি মানুষের সঙ্গে সংযোগের এক সহজ, শক্তিশালী এবং চিরন্তন ভাষা।
সাম্প্রতিক পোস্ট
- দিনের ২৪ ঘণ্টা বদলে দিতে পারে আপনার জীবন! জানুন, সময় ব্যবহারের এই সহজ কৌশল
- পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে তরুণ তুর্কিদের ঝড়! ভোটের ময়দানে কতটা প্রভাব ফেলছে যুব মুখ?
- শালিমার বাগের ভবিষ্যৎ রহস্য: প্রেম, স্মৃতি আর সময়কে ছাপিয়ে ভবিষ্যৎ কি বদলে দেবে ইতিহাস?
- বিতর্ক পিছু ছাড়েনি, মামলা মাথায় নিয়েই ভোটের ময়দানে! তৃণমূল-বিজেপির হেভিওয়েটদের ভোটযুদ্ধ ঘিরে উত্তাপ
- গ্যাস সিলিন্ডার দ্রুত শেষ হয়ে যায়? এই ৬টি সহজ টিপস জানলে সিলিন্ডার চলবে বেশি দিন

