west bengal women safety: আরজিকর কাণ্ডের পর বাংলার নারী ও শিশু সুরক্ষায় বড় দায়িত্ব পেলেন অভিজ্ঞ আইপিএস অফিসার দময়ন্তী সেন। পার্ক স্ট্রিট কাণ্ডের সফল তদন্তকারী এই নির্ভীক অফিসারের প্রত্যাবর্তনে নতুন আশার আলো দেখছে রাজ্যবাসী।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: বাংলার প্রশাসনিক ইতিহাসে এমন কিছু নাম থাকে, যাঁরা প্রচারের আলোয় না থেকেও মানুষের মনে অদ্ভুত এক আস্থা তৈরি করেন। দময়ন্তী সেন ঠিক তেমনই এক নাম। কঠোর, নির্ভীক, মেধাবী এবং নীরব কাজের জন্য পরিচিত এই আইপিএস অফিসারকে ঘিরে ফের নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে রাজ্য জুড়ে। বহু বছর আগে কলকাতার বহুচর্চিত পার্ক স্ট্রিট ধর্ষণকাণ্ডের তদন্তে তাঁর ভূমিকা আজও অনেকের মনে স্পষ্ট। সেই সময় রাজনৈতিক চাপ, বিতর্ক এবং প্রশাসনিক টানাপোড়েনের মাঝেও তিনি তদন্তকে সত্যের পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। আর এবার, আরজিকর হাসপাতালের তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ, নির্যাতন ও খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তাল বাংলায় আবার সামনে উঠে এল সেই নাম—দময়ন্তী সেন।
নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ঘোষণার পর থেকেই প্রশাসনিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। নারী ও শিশু সুরক্ষার জন্য গঠিত বিশেষ কমিটির অন্যতম প্রধান দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দময়ন্তী সেনকে। অনেকেই মনে করছেন, এটা শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং বাংলার আইন-শৃঙ্খলা ও নারী সুরক্ষার প্রশ্নে এক বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক বার্তা।
অর্থনীতির ছাত্রী থেকে কঠোর আইপিএস অফিসার
দময়ন্তী সেনের জীবনপথ অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার। অর্থনীতির ছাত্রী হিসেবে পড়াশোনা শুরু করলেও পরবর্তীকালে তিনি যোগ দেন ভারতীয় পুলিশ সার্ভিসে। পশ্চিমবঙ্গ ক্যাডারের এই অফিসার খুব দ্রুতই নিজের দক্ষতা, বিচক্ষণতা এবং পেশাদারিত্বের জন্য পরিচিত হয়ে ওঠেন।
কলকাতা পুলিশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেছেন তিনি। গোয়েন্দা বিভাগের ডেপুটি কমিশনার অফ পুলিশ হিসেবে তাঁর কাজ আজও অনেকের কাছে উদাহরণ। পরে তিনি কলকাতা পুলিশের প্রথম মহিলা যুগ্ম কমিশনার অফ পুলিশ হিসেবেও ইতিহাস গড়েন।
তবে তাঁর সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় নিঃসন্দেহে দুই হাজার বারোর পার্ক স্ট্রিট ধর্ষণকাণ্ড। সেই সময় কলকাতার বুকে চলন্ত গাড়িতে এক অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান মহিলাকে ধর্ষণের অভিযোগ ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছিল। রাজনৈতিক মহলের একাংশ ঘটনাটিকে “সাজানো” বলেও দাবি করেছিল। কিন্তু দময়ন্তী সেনের নেতৃত্বে তদন্তকারী দল একের পর এক তথ্যপ্রমাণ সামনে আনে এবং অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হয়। তদন্তে স্পষ্ট হয়ে যায়, নির্যাতিতা সত্যিই ভয়ঙ্কর অত্যাচারের শিকার হয়েছিলেন।
সত্যের পথে হাঁটার মূল্যও দিতে হয়েছিল
পার্ক স্ট্রিট কাণ্ডের তদন্ত শেষ হওয়ার পরই আচমকা বদলি করা হয় দময়ন্তী সেনকে। লালবাজারের গুরুত্বপূর্ণ ক্রাইম শাখা থেকে সরিয়ে তাঁকে পাঠানো হয় ব্যারাকপুর পুলিশ ট্রেনিং কলেজে। প্রশাসনিক মহলের একাংশ তখন থেকেই মনে করেছিল, সত্যকে সামনে আনার মূল্য তাঁকে দিতে হয়েছে।
যে অফিসার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে বহুচর্চিত মামলার তদন্তে বড় সাফল্য এনে দিয়েছিলেন, তাঁকেই তুলনামূলকভাবে গুরুত্বহীন পদে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপর ধীরে ধীরে তিনি প্রচারের আড়ালে চলে যান।
দুই হাজার তেইশ সালে তাঁকে কলকাতা পুলিশ থেকেও পুরোপুরি সরিয়ে রাজ্য পুলিশের এডিজি পদে পাঠানো হয়। বর্তমানে তিনি রাজ্য পুলিশের এডিজি ও আইজিপি পদমর্যাদায় কাজ করছেন। কিন্তু বরাবরই নিজেকে প্রচারের আলো থেকে দূরে রেখেছেন। প্রশাসনের অন্দরে তাঁর পরিচয়—কঠোর কিন্তু সৎ অফিসার।
আরজিকর কাণ্ডের পর ফের ভরসার মুখ দময়ন্তী সেন
আরজিকর হাসপাতালের শিক্ষানবিশ তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ, নির্যাতন ও খুনের ঘটনায় যখন গোটা বাংলা উত্তাল, তখন সাধারণ মানুষের এক বড় অংশ প্রশাসনের উপর আস্থা হারাতে শুরু করেছিল। শুধু বাংলা নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত এবং বিদেশেও এই ঘটনার প্রতিবাদ দেখা যায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ ফেটে পড়ে।
ঠিক এই পরিস্থিতিতেই নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বড় সিদ্ধান্ত নেন। নারী ও শিশু সুরক্ষার জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। কলকাতা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সমাপ্তি চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে গঠিত সেই কমিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় দময়ন্তী সেনের হাতে। তাঁকে করা হয় মেম্বার সেক্রেটারি।
শুধু তাই নয়, রাজ্যে অতীতে ঘটে যাওয়া নারী নির্যাতনের একাধিক অভিযোগ এবং বিতর্কিত মামলার ফাইলও নতুন করে খতিয়ে দেখার ইঙ্গিত মিলেছে। প্রশাসনিক মহলের একাংশ মনে করছে, এই পদক্ষেপ কার্যত এক বড় বার্তা—এবার চাপা পড়ে যাওয়া বহু অভিযোগের তদন্ত নতুনভাবে শুরু হতে পারে।
প্রচারের আলো নয়, কাজই তাঁর পরিচয়
দময়ন্তী সেনকে যারা কাছ থেকে চেনেন, তারা বলেন তিনি কখনোই প্রচারমুখী নন। ব্যক্তিগত জীবন এবং পেশাগত জীবনকে সবসময় আলাদা রেখেছেন। সংবাদমাধ্যমে নিজেকে তুলে ধরার চেষ্টা তিনি কখনো করেননি। বরং নিঃশব্দে নিজের কাজ করে যাওয়াতেই বিশ্বাসী।
দুই সন্তানের মা হয়েও প্রশাসনিক জীবনের কঠোর দায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সামলেছেন তিনি। আবার অন্যদিকে তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি নরম দিকও রয়েছে। রবীন্দ্রসঙ্গীত তাঁর অত্যন্ত প্রিয়। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁকে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেও দেখা গিয়েছে।
কঠোর পুলিশ অফিসারের আড়ালে তাই এক সাংস্কৃতিক মননের মানুষকেও খুঁজে পান অনেকেই। হয়তো এই কারণেই সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা অন্যরকম।
বাংলার নারী সুরক্ষায় কি নতুন অধ্যায় শুরু হতে চলেছে?
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, দময়ন্তী সেনের হাতে দায়িত্ব যাওয়ার পর আদৌ কি বদল আসবে? বাংলার নারী ও শিশু সুরক্ষার পরিস্থিতি কি সত্যিই আরও শক্তিশালী হবে?
অনেকেই মনে করছেন, প্রশাসনের ভিতরে এমন একজন অফিসারের প্রয়োজন ছিল, যিনি রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে শুধুমাত্র তদন্ত এবং সত্যকে গুরুত্ব দেবেন। দময়ন্তী সেনের অতীত রেকর্ড অন্তত সেই আস্থাই তৈরি করছে।
পার্ক স্ট্রিট কাণ্ডে তিনি দেখিয়েছিলেন, চাপ যতই আসুক, সত্যকে অস্বীকার করা যায় না। আর এবার আরজিকর কাণ্ডের পর তাঁর প্রত্যাবর্তনকে অনেকেই দেখছেন বাংলার জন্য নতুন এক সম্ভাবনার সূচনা হিসেবে।
সময়ই বলবে তিনি কতটা সফল হবেন। কিন্তু একটা বিষয় স্পষ্ট—বাংলার মানুষ আবার একজন কঠোর, অভিজ্ঞ এবং নির্ভীক অফিসারের দিকে তাকিয়ে আশা করতে শুরু করেছেন। হয়তো সেই আশার নামই দময়ন্তী সেন। হয়তো তাঁর হাত ধরেই বাংলার অন্ধকার সময় পেরিয়ে নতুন কোনো সূর্যের আলো দেখা যেতে পারে।

