নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের ভোর। হাড়কাঁপানো ঠান্ডা উপেক্ষা করে লাখো মানুষ ডুব দিচ্ছেন সাগরের জলে। মুখে একটাই ধ্বনি—”কপিল মুনি কি জয়, গঙ্গা মাইয়া কি জয়!” মকর সংক্রান্তির এই পুণ্য তিথিতে গঙ্গাসাগর মেলা কেবল একটি মেলা নয়, এটি ভারতের সনাতন সংস্কৃতির এক জীবন্ত মহাকাব্য।
কিন্তু এই মহাতীর্থ নিয়ে ছোটবেলা থেকেই আমরা একটি প্রবাদ শুনে আসছি—”সব তীর্থ বার বার, গঙ্গাসাগর একবার।” ভারতের এত তীর্থক্ষেত্র থাকতে কেবল গঙ্গাসাগরের ক্ষেত্রেই কেন এমন চূড়ান্ত কথা বলা হয়? এটি কি শুধুই মুখের কথা, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর কোনো ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক সত্য?
NewsOffBeat-এর ডিজিটাল ডেস্ক আজ খুঁজে বের করল এই বিখ্যাত প্রবাদের পেছনের আসল রহস্য। মূলত দুটি প্রধান স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে এই প্রবাদের জন্ম—একটি পৌরাণিক বিশ্বাস বা ‘মোক্ষ’, এবং অন্যটি ঐতিহাসিক দুর্গমতা বা ‘বাস্তব বিপদ’।
১. পৌরাণিক প্রেক্ষাপট: এক ঋষির অভিশাপ ও মুক্তির আখ্যান
এই প্রবাদের মর্মার্থ বুঝতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ত্রেতা যুগে। সূর্যবংশের শক্তিশালী রাজা সগর (Sagara) অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন। যজ্ঞের ঘোড়া বিশ্বজুড়ে অবাধে বিচরণ করবে—এটাই ছিল নিয়ম। কিন্তু দেবরাজ ইন্দ্র সগর রাজার শক্তিতে ঈর্ষান্বিত হয়ে সেই ঘোড়া চুরি করে পাতালে কপিল মুনির আশ্রমে লুকিয়ে রাখেন।
ঘোড়া খুঁজতে খুঁজতে সগর রাজার ৬০ হাজার পুত্র কপিল মুনির আশ্রমে পৌঁছান এবং মুনিকে চোর ভেবে অপমান করেন। দীর্ঘ তপস্যায় মগ্ন ক্রুদ্ধ মুনি যখন চোখ মেলেন, তাঁর চোখের আগুনে মুহূর্তেই ভস্ম হয়ে যান ৬০ হাজার রাজপুত্র। তাঁদের আত্মা মুক্তি না পেয়ে প্রেতলোকে আটকে থাকে।
অবশেষে সগর রাজার বংশধর ভগীরথ কঠোর তপস্যা করে মা গঙ্গাকে স্বর্গ থেকে মর্ত্যে নিয়ে আসেন। গঙ্গা প্রবাহিত হয়ে কপিল মুনির আশ্রমের কাছে সাগরে মিলিত হন এবং তাঁর পবিত্র জল স্পর্শ করলেই ওই ৬০ হাজার ভস্মীভূত আত্মা মোক্ষ লাভ করে। যে তিথিতে এই ঘটনা ঘটেছিল, সেটি ছিল মকর সংক্রান্তি।
আরও পড়ুন : ফিরবে ভাগ্য! সংক্রান্তির সন্ধ্যায় চুপিসারে করুন এই ৩ কাজ
২. আধ্যাত্মিক কারণ: চূড়ান্ত মোক্ষলাভ (The Ultimate Salvation)
হিন্দু ধর্মে বিশ্বাস করা হয়, মানুষ তীর্থে যায় পাপ ধুয়ে পুণ্য অর্জন করতে। কিন্তু গঙ্গাসাগর এমন এক তীর্থ, যেখানে মানুষ শুধু পাপ ধুতে যায় না, যায় ‘মোক্ষ’ বা মুক্তি লাভ করতে।
বিশ্বাস করা হয়, মকর সংক্রান্তির দিনে গঙ্গা ও সাগরের এই সঙ্গমস্থলে স্নান করলে আত্মার জন্ম-মৃত্যুর চক্র শেষ হয়ে যায়। যেহেতু এখানে স্নান করলে সরাসরি মোক্ষ প্রাপ্তি হয় এবং আর পুনর্জন্ম নিতে হয় না, তাই একবার এই তীর্থ দর্শন করাই জীবনের চূড়ান্ত প্রাপ্তি বলে গণ্য করা হয়। যখন চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানো হয়ে যায়, তখন আর বারবার অন্য তীর্থে যাওয়ার প্রয়োজন থাকে না—এটাই হলো এই প্রবাদের আধ্যাত্মিক ভিত্তি।
৩. ঐতিহাসিক কারণ: দুর্গম পথের মারণফাঁদ (The Hard Reality)
তবে এই প্রবাদের পেছনে কেবল ভক্তি নয়, লুকিয়ে আছে এক কঠিন ঐতিহাসিক বাস্তবতাও। আজ যেভাবে স্টিমার, ভেসেল বা হেলিকপ্টারে চেপে সহজেই সাগরে পৌঁছানো যায়, ১০০-১৫০ বছর আগেও চিত্রটা এমন ছিল না।
সেই সময় গঙ্গাসাগর যাত্রা ছিল সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখে ঝাঁপ দেওয়ার শামিল। সুন্দরবনের ঘন জঙ্গল পেরিয়ে এখানে পৌঁছাতে হতো। জলপথে ছিল কুমির আর হাঙরের ভয়, স্থলপথে ছিল রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের আতঙ্ক। তার ওপর ছিল জলদস্যুদের উপদ্রব। রাস্তাঘাট ছিল না বললেই চলে।
কথিত আছে, আগেকার দিনে কেউ গঙ্গাসাগর যাত্রার সংকল্প করলে, তিনি বাড়ি থেকে একপ্রকার চিরবিদায় নিয়ে বেরোতেন। উইল বা সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারা করে তবেই এই তীর্থের উদ্দেশ্যে রওনা দিতেন মানুষ। কারণ, সেখান থেকে জীবিত ফিরে আসাটা ছিল এক প্রকার অলৌকিক ঘটনা বা পুনর্জন্মের মতো।
এত বিপদসংকুল পথ পেরিয়ে মানুষ জীবনে খুব বেশি হলে একবারই এই সাহস দেখাতে পারতেন। যিনি একবার এই দুর্গম তীর্থ দর্শন করে ফিরে আসতেন, তাঁর পক্ষে দ্বিতীয়বার সেই মারণফাঁদে পা দেওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। তাই বাস্তব অভিজ্ঞতার নিরিখেই মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত হয়ে গিয়েছিল—”সব তীর্থ বার বার, গঙ্গাসাগর একবার।”
আজ যুগের সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে। এখন আর বাঘের ভয় বা পথের সেই দুর্গমতা নেই। মানুষ এখন চাইলেই একাধিকবার গঙ্গাসাগরে যেতে পারেন। কিন্তু প্রবাদটি আজও রয়ে গেছে—কারণ এটি কেবল পথের দূরত্বের কথা বলে না, এটি মনে করিয়ে দেয় সেই অদম্য ভক্তি ও সাহসের কথা, যা যুগ যুগ ধরে মানুষকে সমস্ত বাধা পেরিয়ে ঈশ্বরের কাছে টেনে নিয়ে গেছে।
- তৎকাল ছাড়াই কনফার্ম সিট! শেষ মুহূর্তে ট্রেনে নিশ্চিত আসন পাওয়ার সহজ কৌশল জানুন
- চৌরঙ্গীর স্রষ্টা আর নেই │ শংকরের চোখে কলকাতা শহর, মানুষের শ্রেণি ও সময়ের দলিল
- পকেটেই প্রিমিয়াম ক্যামেরা! ভিভো ভি সিরিজের নতুন ফোন লঞ্চে টেক দুনিয়ায় ঝড়
- গালগোটিয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ে রোবট কুকুর ঘিরে বিতর্ক, ভাইরাল অধ্যাপক—কে এই নেহা সিং?
- আগামী ভারতের রূপরেখা কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার হাতেই? প্রধানমন্ত্রীর ইঙ্গিত ঘিরে জোর চর্চা

