Digital Impact on Bengali Language: ‘Amr mon kharap’ থেকে ইমোজির ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া শব্দ—ডিজিটাল যুগে আমরা কি ভাষাকে হারাচ্ছি, নাকি নতুন করে গড়ছি? এক গভীর অনুসন্ধান। একুশ শতকের স্ক্রিনে মাতৃভাষার অস্তিত্বের সংকট ও সম্ভাবনার এক গবেষণাভিত্তিক বিশ্লেষণ
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: দৃশ্যপট ১: কলেজ পড়ুয়া রিয়া তার মাকে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করছে— “Ma, aj ami late korbo. Akta friend er bday ache. Tumi kheye nio.” দৃশ্যপট ২: ফেসবুকে একটি গম্ভীর রাজনৈতিক আলোচনার কমেন্ট বক্সে একজন লিখলেন— “বিষয়টা খুব কনসার্নিং। গভর্মেন্টের উচিত ইমিডিয়েট স্টেপ নেওয়া। বাট, পাবলিক তো বোঝেই না।” দৃশ্যপট ৩: ইনস্টাগ্রামে একটি মন খারাপের ছবির নিচে কোনো ক্যাপশন নেই, শুধু একটা ভাঙা হৃদয়ের ইমোজি (💔) আর একটা কান্নার ইমোজি (😭)।
ওপরের তিনটি দৃশ্য আমাদের রোজকার ডিজিটাল জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একুশে ফেব্রুয়ারি এলে আমরা ভাষা শহীদদের স্মরণে প্রভাতফেরিতে যাই, আবেগে আপ্লুত হই, অথচ বছরের বাকি ৩৬৪ দিন আমাদের আঙুলের ডগায় যে বাংলা ভাষা ব্যবহৃত হয়, তার রূপটা ঠিক কেমন? আজ থেকে বিশ বছর আগেও যে ভাষায় চিঠি লেখা হতো, বা যে ভাষায় আমরা ভাবতাম, আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার ফিডে সেই ভাষাটি কি আর আগের মতো আছে?
ডিজিটাল যুগ আমাদের যোগাযোগের গতি বাড়িয়েছে, কিন্তু হয়তো কেড়ে নিচ্ছে ভাষার গভীরতা। নাকি আমরা একে ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তন বলে মেনে নেব? ভাষা তো নদীর মতো, সে তো বহমান। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার এই তীব্র স্রোতে সেই নদী কি তার নিজস্বতা হারিয়ে ফেলছে? আজ নিউজ অফবিট-এর এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা ডেটা, ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণা এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে বোঝার চেষ্টা করব—ডিজিটাল যুগে মাতৃভাষার আসল অবস্থানটা ঠিক কোথায়।
‘বাংলিশ’-এর জন্ম ও রোমান হরফের আগ্রাসন
সোশ্যাল মিডিয়া বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বাংলা ভাষার রূপবদলের প্রথম ও প্রধান লক্ষণ হলো রোমান হরফে বাংলা লেখা, যাকে চলতি কথায় আমরা ‘বাংলিশ’ বলি। “আমি তোমাকে ভালোবাসি”—এই সহজ কথাটি লিখতে গিয়ে যখন কিবোর্ডে ‘Ami tomake valobashi’ টাইপ করা হয়, তখন ভাষার শুধু লিপি বদলায় না, তার মনস্তত্ত্বও বদলে যায়।
কিন্তু কেন এই প্রবণতা? এর পেছনে কি শুধুই নতুন প্রজন্মের আলস্য বা অবজ্ঞা দায়ী? গবেষণা কিন্তু অন্য কথা বলছে। এর শিকড় লুকিয়ে আছে প্রযুক্তির প্রাথমিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে। যখন মোবাইল ফোন বা কম্পিউটার প্রথম জনপ্রিয় হতে শুরু করে, তখন বাংলা টাইপিংয়ের কোনো সহজ বা স্ট্যান্ডার্ড ব্যবস্থা ছিল না। ২০০৩ সালে ‘অভ্র’ কিবোর্ডের আবিষ্কারের আগে পর্যন্ত ইউনিকোডে বাংলা লেখা ছিল এক জটিল প্রক্রিয়া। ফলে, মানুষ বাধ্য হয়েই রোমান হরফ ব্যবহার করে বাংলা মনের ভাব প্রকাশ করতে শুরু করে।
গুগল (Google) এবং কেপিএমজি (KPMG)-র ২০১৭ সালের একটি যৌথ রিপোর্টে ভারতের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ভাষার ব্যবহার নিয়ে এক চমকপ্রদ তথ্য উঠে আসে। রিপোর্টে বলা হয়, ভারতীয় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের এক বিশাল অংশ স্থানীয় ভাষায় কন্টেন্ট কনজিউম করতে বা ভোগ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, কিন্তু ইনপুট বা লেখার সময় তাঁরা ইংরেজি কিবোর্ড ব্যবহার করতেই বেশি অভ্যস্ত। এর কারণ হিসেবে উঠে এসেছে—নির্ভুল বাংলা টাইপিংয়ের জন্য যে সময় ও ধৈর্যের প্রয়োজন, সোশ্যাল মিডিয়ার দ্রুতগতির যুগে তা অনেকের কাছেই নেই।
ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে, একে বলা যেতে পারে ‘টেকনোলজিক্যাল ডিটারমিনিজম’ (Technological Determinism) বা প্রযুক্তির দ্বারা নির্ধারিত আচরণ। অর্থাৎ, প্রযুক্তি আমাদের বাধ্য করেছে ভাষার একটি নতুন রূপ তৈরি করতে। সমস্যা হলো, এই অভ্যাস এখন এতটাই গভীরে চলে গেছে যে, এখন উন্নত ভয়েস টাইপিং বা সহজ বাংলা কিবোর্ড থাকা সত্ত্বেও, একটি বড় অংশ রোমান হরফেই বাংলা লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এতে ভাষার বানানরীতি এবং ব্যাকরণ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নতুন প্রজন্ম যখন ‘স্কুল’ বানান ‘School’ দেখে অভ্যস্ত, তখন তারা বাংলা পরীক্ষায় ‘স্কুল’ লিখতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছে।
ককটেল ভাষা: ‘কোড-মিক্সিং’ নাকি শব্দভাণ্ডারের মৃত্যু?
দ্বিতীয় যে বড় পরিবর্তনটি চোখে পড়ে, তা হলো বাংলা বাক্যের মধ্যে অকাতরে ইংরেজি শব্দের ব্যবহার। “আমি বিষয়টা ফিল করতে পারছি না”, “এটা খুব অসাম একটা মুভি”, “প্লিজ আমাকে জাজ কোরো না”—এই ধরনের বাক্য এখন আমাদের রোজকার কথ্য ও লেখ্য ভাষার অংশ।
ভাষাবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় ‘কোড-মিক্সিং’ (Code-mixing) বা ‘কোড-সুইচিং’ (Code-switching)। এটি সাধারণত দ্বিভাষিক (Bilingual) সমাজে দেখা যায়। একসময় মনে করা হতো, যারা কোনো একটি ভাষায় দুর্বল, তারাই অন্য ভাষার শব্দ ধার করে। কিন্তু আধুনিক সমাজভাষাবিজ্ঞানীরা (Sociolinguists) বলছেন, বিষয়টি এত সরল নয়।
সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ইংরেজি মেশানো বাংলা বলাটা এখন একটি ‘স্টেটাস সিম্বল’ বা সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে ব্যবহারকারী আধুনিক, বিশ্বায়নের সাথে তাল মিলিয়ে চলা এক নাগরিক। বিশেষ করে শহুরে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। তারা মনে করে, খাঁটি বাংলায় কথা বলাটা হয়তো ‘আনস্মার্ট’ বা সেকেলে।
কিন্তু এর একটি অন্ধকার দিকও আছে। ক্রমাগত ইংরেজি শব্দ ব্যবহারের ফলে বাংলা ভাষার নিজস্ব শব্দভাণ্ডার ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে। ‘অনুভব’ করার বদলে আমরা ‘ফিল’ করছি, ‘দারুণ’ বা ‘চমৎকার’-এর বদলে ‘অসাম’ বা ‘ফ্যাব’ বলছি। যখন একটি ভাষার নিজস্ব শব্দগুলো ব্যবহারকারীর স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়, তখন সেই ভাষা তার প্রকাশের শক্তি হারায়। রবীন্দ্রনাথ বা জীবনানন্দের ভাষায় যে সূক্ষ্ম অনুভূতির প্রকাশ সম্ভব, সোশ্যাল মিডিয়ার এই ‘ককটেল’ ভাষায় তা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমরা হয়তো দ্রুত যোগাযোগ করছি, কিন্তু সেই যোগাযোগের গভীরতা কমে যাচ্ছে।
ইমোজির রাজত্ব: যখন ছবি কথা বলে
ডিজিটাল যুগে ভাষার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে ইমোজি, জিফ (GIF) এবং স্টিকার। আগে যে কথাটি বোঝাতে পাঁচ লাইনের একটি চিঠি বা অন্তত দুটি বাক্য লাগত, এখন একটি হলুদ রঙের গোল মুখ বা একটি ছোট অ্যানিমেশন দিয়েই তা বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
মন খারাপ? একটা কান্নার ইমোজি (😭)। খুব হাসি পাচ্ছে? একটা হাসির ইমোজি (😂)। রাগ হয়েছে? একটা লাল রাগী মুখ (😡)।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ইমোজি হলো এক ধরণের ‘Visual shorthand’ বা দৃশ্যমান শর্টহ্যান্ড। এটি আমাদের আবেগকে খুব দ্রুত এবং সহজে প্রকাশ করতে সাহায্য করে। বিশেষ করে টেক্সট মেসেজে যেখানে গলার স্বর বা মুখের ভঙ্গি দেখা যায় না, সেখানে ইমোজি ভুল বোঝাবুঝি কমাতে সাহায্য করে।
কিন্তু বিপদটা অন্য জায়গায়। মানুষের আবেগ তো মাত্র কয়েকটা ইমোজির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের রাগ, দুঃখ, অভিমান, ভালোবাসা—এগুলোর হাজারও শেড বা মাত্রা আছে। একটা সাধারণ কান্নার ইমোজি দিয়ে কি বোঝানো সম্ভব—সেটা প্রিয়জন হারানোর শোক, নাকি পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়ার দুঃখ?
সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের এই জটিল আবেগগুলোকে সরলীকরণ বা ‘Simplification’ করতে শিখিয়েছে। আমরা এখন আর আমাদের অনুভূতির সূক্ষ্মতা প্রকাশ করার মতো শব্দ খুঁজে পাই না, বা খোঁজার চেষ্টাও করি না। ফলে, ভাষার যে মূল কাজ—মনের ভাবকে সম্পূর্ণ ও সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ করা—সেটাই ব্যাহত হচ্ছে। আমরা হয়ে উঠছি এক ধরণের ডিজিটাল আদিম মানুষ, যারা আবার সেই গুহাচিত্র বা হায়ারোগ্লিফিকের যুগে ফিরে যাচ্ছে, যেখানে ছবির মাধ্যমেই সব ভাব প্রকাশ করা হতো।
আশার আলো: ডিজিটাল নবজাগরণ
তবে চিত্রটা কি শুধুই হতাশার? একদমই নয়। সোশ্যাল মিডিয়া যেমন ভাষাকে বিকৃত করছে, তেমনই ভাষাকে ছড়িয়ে দেওয়ার এক অভূতপূর্ব সুযোগও তৈরি করেছে। একে বলা যেতে পারে এক ধরণের ‘ডিজিটাল নবজাগরণ’।
আজ থেকে পনেরো বছর আগেও কি ভাবা যেত যে, দুই বাংলার তরুণ কবিরা ফেসবুকে গ্রুপ খুলে নিজেদের কবিতা শেয়ার করবে এবং হাজার হাজার মানুষ তা পড়বে? বা কোনো একজন গৃহবধূ ইউটিউবে রান্নার চ্যানেল খুলে খাঁটি আঞ্চলিক বাংলায় রেসিপি শেয়ার করবেন এবং তা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা বাঙালিরা দেখবে?
সোশ্যাল মিডিয়া বাংলা ভাষাকে একটি গ্লোবাল প্ল্যাটফর্ম দিয়েছে। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে বসে একজন বাঙালি আজ তার মাতৃভাষায় কন্টেন্ট তৈরি করতে পারছেন এবং তা মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। গুগল, ফেসবুকের মতো টেক জায়ান্টরাও এখন ইউনিকোড এবং স্থানীয় ভাষার গুরুত্ব বুঝতে পারছে। তারা তাদের অ্যালগরিদমকে এমনভাবে সাজাচ্ছে যাতে স্থানীয় ভাষার কন্টেন্ট বেশি রিচ (Reach) পায়।
এখন প্রচুর মানুষ সচেতনভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় শুদ্ধ বাংলায় লেখার চেষ্টা করছেন। অভ্র, গুগল ইনপুট টুলস বা মোবাইলের ডিফল্ট বাংলা কিবোর্ডের ব্যবহার বাড়ছে। ‘বাংলিশ’-এর বিরুদ্ধে এক ধরণের নীরব প্রতিরোধও গড়ে উঠছে ডিজিটাল দুনিয়ায়। মানুষ বুঝতে শিখছে যে, নিজের ভাষায় নিজের মতো করে কথা বলার মধ্যে কোনো লজ্জা নেই, বরং সেটাই আসল স্মার্টনেস।
ভাষা কোনো স্থির পাথর নয়, সে বহমান নদীর মতো। সময়ের সাথে সাথে সে বাঁক বদলাবে, নতুন শব্দ গ্রহণ করবে, পুরনো কিছু বর্জন করবে—এটাই স্বাভাবিক। ডিজিটাল যুগ সেই নদীর গতিপথে আসা এক বিশাল বাঁধের মতো, যা তার গতিপথকে আমূল বদলে দিয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়া বাংলা ভাষাকে মেরে ফেলছে না, বরং তাকে এক নতুন রূপ দিচ্ছে। এই রূপটি হয়তো আমাদের চিরাচরিত ব্যাকরণ বইয়ের সাথে মেলে না, এটি হয়তো অনেক বেশি তরল, মিশ্র এবং দ্রুত। কিন্তু এটিই আজকের প্রজন্মের ভাষা।
ভয়ের কারণ তখনই হবে, যদি আমরা আমাদের শিকড়টাকে ভুলে যাই। যদি রোমান হরফে লিখতে লিখতে বাংলা বর্ণমালাটাই আমাদের কাছে অচেনা হয়ে যায়, বা ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করতে করতে বাংলা শব্দগুলো হারিয়ে ফেলি। চ্যালেঞ্জটা হলো ভারসাম্য বজায় রাখা। ডিজিটাল দুনিয়ার গতির সাথে তাল মেলাতে গিয়ে যেন ভাষার গভীরতা বিসর্জন না দিই।
একুশে ফেব্রুয়ারিতে শুধু শহিদ মিনারে ফুল দেওয়াই যথেষ্ট নয়। আসল শ্রদ্ধা হলো, বছরের প্রতিটি দিন, প্রতিটি মেসেজে, প্রতিটি স্ট্যাটাসে নিজের ভাষাকে ভালোবাসা এবং সচেতনভাবে তার ব্যবহার করা। কারণ, দিনশেষে আমাদের পরিচয় তো আমাদের ভাষাতেই। কিবোর্ডের কাঁটাতার যেন সেই পরিচয়কে ক্ষতবিক্ষত না করে, সেদিকে নজর রাখার দায়িত্ব আমাদেরই।
#Bengali #21february #motherlanguageday
সাম্প্রতিক পোস্ট
- স্মার্ট সিটির কর্পোরেট চাকচিক্যের আড়ালে ‘বিষ-জল’! আইটি হাবের ঠিকানায় সাপুরজির ই-ব্লকে হাহাকার
- ভাগ্য বদলাতে চান? গ্রহের প্রতিকার হিসেবে এই রঙের পোশাকই হতে পারে চাবিকাঠি!
- টি-২০ বিশ্বকাপে ভারতের জয় অব্যাহত │ লণ্ডভণ্ড চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান
- মঞ্চে উঠলেই ভয়? │ পাবলিক স্পিকিং ভীতি কাটানোর ৫টি কৌশল জানুন এখনই
- গায়ে হঠাৎ র্যাশ? মিথ ভেঙে জানুন, চিকেন পক্সের এই লক্ষণগুলো

