East Bengal Durand Cup: বাইশ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর ডুরান্ড কাপের ফাইনালে মোহনবাগানকে ৪-১ গোলে হারিয়ে আবারও শিরোপা জিতল ইস্টবেঙ্গল। প্রথমার্ধেই চার গোলের ঝড়ে ম্যাচের ভাগ্য লিখে দেয় লাল-হলুদ, আর এডমুন্ডের হ্যাটট্রিক হয়ে ওঠে ঐতিহাসিক জয়ের অন্যতম নায়ক।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: যে রাতের অপেক্ষায় লাল-হলুদ সমর্থকেরা ছিলেন দীর্ঘ বাইশ বছর, শেষ পর্যন্ত সেই রাতই হয়ে উঠল উৎসবের রাত। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে রবিবারের ডুরান্ড কাপ ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগানকে ৪-১ গোলে হারিয়ে ট্রফি ঘরে তুলল ইস্টবেঙ্গল। শুধু জয় নয়, প্রথমার্ধেই চার গোল করে কার্যত ম্যাচের ভাগ্য লিখে ফেলল লাল-হলুদ শিবির। আর সেই ঐতিহাসিক জয়ের কেন্দ্রে ছিলেন এডমুন্ড লালরিনডিকা। তাঁর দুরন্ত হ্যাটট্রিকের সঙ্গে বিপিন সিংয়ের একটি গোল—এই চার গোলেই উড়ে গেল সবুজ-মেরুনের প্রতিরোধ।
২০০৪ সালে শেষবার ডুরান্ড কাপ জিতেছিল ইস্টবেঙ্গল। তারপর কেটে গিয়েছে দীর্ঘ ২২ বছর। একাধিক মরসুমে ট্রফির কাছাকাছি গিয়েও শেষ হাসি হাসতে পারেনি লাল-হলুদ। এবার সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটল ঠিক চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগানকে হারিয়েই। আর এই জয় ইস্টবেঙ্গলের ডুরান্ড কাপ জয়ের সংখ্যা নিয়ে গেল ১৭-তে—মোহনবাগানের সমান। অর্থাৎ ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিযোগিতায় দুই কলকাতা প্রধান এখন যৌথভাবে সর্বোচ্চ শিরোপাজয়ী।
প্রথমার্ধেই ঝড়, ২২ মিনিটে তিন গোল!
ম্যাচ শুরুর আগে দুই দলের সাম্প্রতিক পথচলা দেখলে এত বড় ব্যবধানের জয় হয়তো অনেকেই কল্পনা করেননি। বিশেষ করে ডুরান্ড কাপের গ্রুপ পর্বে মোহনবাগানের কাছে ইস্টবেঙ্গলকে হারতে হয়েছিল। ফলে ফাইনাল ছিল এক অর্থে সেই হারের জবাব দেওয়ার মঞ্চ। কিন্তু ম্যাচ শুরু হওয়ার পর দেখা গেল সম্পূর্ণ অন্য ছবি।
১০ মিনিটেই বিপিন সিংয়ের গোলে এগিয়ে যায় ইস্টবেঙ্গল। গোল পাওয়ার পর লাল-হলুদ ফুটবলারদের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়তে থাকে। মাঝমাঠে দ্রুত বল আদান-প্রদান, দুই প্রান্ত দিয়ে আক্রমণ এবং সুযোগ তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরাসরি গোলমুখে যাওয়ার প্রবণতা মোহনবাগানের রক্ষণকে বারবার চাপে ফেলে। এরপর এডমুন্ড লালরিনডিকা নিজের প্রথম গোল করেন। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে ফের জালে বল পাঠিয়ে ব্যবধান ৩-০ করে দেন তিনি।
মাত্র ২২ মিনিটের মধ্যে তিন গোল! যুবভারতীর গ্যালারিতে তখন লাল-হলুদ উচ্ছ্বাস তুঙ্গে। মোহনবাগানের ফুটবলাররা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও ইস্টবেঙ্গলের আক্রমণের গতি থামানো যাচ্ছিল না। ম্যাচের শুরুতেই এমন বিপর্যয় যে কোনও দলের পরিকল্পনাকেই এলোমেলো করে দিতে পারে। ফাইনালের মতো বড় ম্যাচে সেই ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়ানো আরও কঠিন।
মনবীরের গোলে আশা, কিন্তু ফের এডমুন্ডের আঘাত
তিন গোল খাওয়ার পর মোহনবাগান অবশ্য হাল ছাড়েনি। মনবীর সিং গোল করে ব্যবধান কমিয়ে ৩-১ করেন। সেই গোলের পর কিছুটা হলেও সবুজ-মেরুন শিবিরে আশার আলো দেখা দিয়েছিল। মনে হচ্ছিল, প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগে আরও একটি গোল পেলে ম্যাচের চিত্র বদলে যেতে পারে।
কিন্তু ইস্টবেঙ্গল সেই সুযোগই দিল না। বরং প্রথমার্ধের শেষ দিকে ফের আঘাত করলেন এডমুন্ড লালরিনডিকা। তাঁর তৃতীয় গোলেই সম্পূর্ণ হল হ্যাটট্রিক। প্রথমার্ধ শেষ হল ৪-১ ব্যবধানে।
ডার্বির মতো ম্যাচে এক দলের প্রথমার্ধে চার গোল করা এবং তার মধ্যে একজন ভারতীয় ফুটবলারের হ্যাটট্রিক—এমন দৃশ্য নিঃসন্দেহে বিরল। এডমুন্ডের এই পারফরম্যান্স তাই শুধু ডুরান্ড কাপের ফাইনালের ফলাফল বদলায়নি, ম্যাচের ইতিহাসেও আলাদা জায়গা করে নিল।
প্রথমার্ধের শেষ বাঁশি বাজার সময় কার্যত ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ইস্টবেঙ্গলের হাতে। অন্যদিকে মোহনবাগানের সামনে তখন একটাই প্রশ্ন—এত বড় ঘাটতি কীভাবে পূরণ করা সম্ভব?
দ্বিতীয়ার্ধে বল দখলে এগিয়েও গোল পেল না মোহনবাগান
দ্বিতীয়ার্ধে মোহনবাগান মাঠে ফিরে আক্রমণের চেষ্টা বাড়ায়। বল দখলের দিক থেকেও তারা আগের তুলনায় বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু বল দখল আর গোল করার সুযোগ তৈরি—দুটিকে এক জিনিস নয়, রবিবারের ফাইনালে তারই প্রমাণ মিলল।
ইস্টবেঙ্গল তখন নিজেদের রক্ষণকে সংগঠিত রেখে সুযোগ পেলেই দ্রুত আক্রমণে যাওয়ার কৌশল ধরে রাখে। প্রথমার্ধে চার গোলের ব্যবধান তৈরি হয়ে যাওয়ায় তাদের হাতে ছিল বড় সুবিধা। মোহনবাগানকে আক্রমণে উঠতেই হচ্ছিল, আর সেই পরিস্থিতিতে ইস্টবেঙ্গল পাল্টা আক্রমণের সুযোগও পাচ্ছিল।
শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয়ার্ধে আর কোনও গোল হয়নি। প্রথমার্ধের ৪-১ ব্যবধানই ম্যাচের শেষ ফল হয়ে দাঁড়ায়। ইস্টবেঙ্গল শুধু ফাইনাল জিতল না, বরং এমন এক পারফরম্যান্স দিয়ে জিতল যা দীর্ঘদিন লাল-হলুদ সমর্থকদের স্মৃতিতে থেকে যাবে।
গ্রুপ পর্বের হারের জবাব ফাইনালে
এই জয়ের আবেগ আরও বেশি কারণ ডুরান্ড কাপের শুরুতেই দুই দলের দেখা হয়েছিল। সেই ম্যাচে মোহনবাগান ১-০ গোলে ইস্টবেঙ্গলকে হারিয়েছিল। ফলে ফাইনালে পৌঁছনোর পর থেকেই লাল-হলুদ শিবিরের সামনে ছিল সেই হারের জবাব দেওয়ার সুযোগ।
ফাইনালের আগে দুই দলের পথও একেবারে সহজ ছিল না। ইস্টবেঙ্গল সেমিফাইনালে নির্ধারিত সময়ে গোল করতে না পারলেও টাইব্রেকারে জয় পেয়ে ফাইনালে পৌঁছেছিল। অন্যদিকে মোহনবাগানকে শিলংয়ে নর্থইস্ট ইউনাইটেডের বিরুদ্ধে কঠিন লড়াই করতে হয়। বৃষ্টিভেজা মাঠে নির্ধারিত সময়ে গোল না হওয়ার পর টাইব্রেকারে জয় পায় তারা। গোলরক্ষক বিশাল কাইথ গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে দলকে ফাইনালে তুলেছিলেন।
মোহনবাগানের সেমিফাইনালের ভেন্যু, ভেজা মাঠ এবং সফরের ধকল নিয়েও ম্যাচের আগে আলোচনা হয়েছিল। দলের কোচ প্যানাজিওটিস দিলম্পেরিসও ফাইনালের আগে শারীরিক ক্লান্তির বিষয়টি সামনে এনেছিলেন। মাত্র এক দিনের বিশ্রামে ফাইনালে নামার বিষয়টিও ছিল আলোচনায়।
তবে ফাইনালের ফলাফলের ক্ষেত্রে এসব কারণকে একমাত্র ব্যাখ্যা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কারণ মাঠে ইস্টবেঙ্গলের প্রথমার্ধের আক্রমণাত্মক ফুটবল, সুযোগ কাজে লাগানোর দক্ষতা এবং দ্রুত গোল পাওয়াই ম্যাচের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়।
হাবাসের প্রত্যাবর্তনে ট্রফি, বাইশ বছর পর ইতিহাস
ইস্টবেঙ্গলের এই সাফল্যের সঙ্গে কোচ অ্যান্টোনিও লোপেস হাবাসের নামও স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসছে। ডুরান্ড কাপের আগে তাঁর নিয়োগ ঘিরে ইস্টবেঙ্গল শিবিরে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। অন্যদিকে তিনি এর আগে মোহনবাগানের সঙ্গে সাফল্যের স্বাদ পেয়েছেন। ফলে ফাইনালে তাঁর প্রাক্তন দলের বিপক্ষে নতুন দলের হয়ে ট্রফি জয় এই ডার্বিকে আরও আলাদা মাত্রা দিয়েছে। ফাইনালের আগে ইস্টবেঙ্গলের কর্তৃপক্ষও হাবাসের উপর আস্থা প্রকাশ করেছিলেন।
তবে এই জয়কে শুধু কোচের কৃতিত্বে সীমাবদ্ধ রাখলে ভুল হবে। কারণ ফাইনালে ইস্টবেঙ্গলের প্রতিটি বিভাগেই সমন্বিত পারফরম্যান্স দেখা গিয়েছে। আক্রমণভাগ সুযোগ কাজে লাগিয়েছে, মাঝমাঠ দ্রুত বল এগিয়ে দিয়েছে এবং রক্ষণ বড় ব্যবধানের পরেও নিজেদের সংগঠন ধরে রেখেছে।
আর সবকিছুর উপরে ছিলেন এডমুন্ড লালরিনডিকা। প্রথমার্ধে তাঁর তিন গোলই ম্যাচের সবচেয়ে বড় গল্প। তাঁর হ্যাটট্রিকের সঙ্গে বিপিনের গোল মিলে ইস্টবেঙ্গলের স্কোর দাঁড়ায় চার। অন্যদিকে মোহনবাগানের একমাত্র গোল আসে মনবীর সিংয়ের কাছ থেকে।
২০০৪ থেকে ২০২৬—দীর্ঘ অপেক্ষার শেষে সমান শিরোপা
ইস্টবেঙ্গলের শেষ ডুরান্ড কাপ জয় এসেছিল ২০০৪ সালে। তার পর ২২ বছর কেটে গেলেও ট্রফিটি আর ঘরে ফেরেনি। ২০২৬ সালে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটল। এবার শুধু ট্রফি জয় নয়, ডুরান্ড কাপের ইতিহাসেও বড় পরিবর্তন আনল এই জয়।
ফাইনালের আগে ইস্টবেঙ্গলের ডুরান্ড শিরোপা ছিল ১৬টি, আর মোহনবাগানের ছিল ১৭টি। ৪-১ জয়ের পর ইস্টবেঙ্গলের সংখ্যাও দাঁড়াল ১৭-তে। ফলে ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিযোগিতায় সর্বাধিক শিরোপার দৌড়ে দুই কলকাতা প্রধান এখন পাশাপাশি।
সবচেয়ে বড় কথা, এই জয় শুধু একটি ট্রফির হিসাব নয়। এটি দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান, গ্রুপ পর্বের হারের জবাব এবং একই সঙ্গে কলকাতা ডার্বির ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায়। যে সমর্থকেরা ২০০৪ সালের পর থেকে অপেক্ষা করেছেন, তাঁদের কাছে ২০২৬ সালের এই ৪-১ জয় তাই নিছক একটি ম্যাচের ফল নয়—এটি বহু বছরের আবেগের বিস্ফোরণ।
যুবভারতীর মাঠে যখন শেষ বাঁশি বেজে গেল, তখন স্কোরবোর্ডে ৪-১। আর সেই সংখ্যার সঙ্গে লেখা হয়ে গেল ইস্টবেঙ্গলের ১৭তম ডুরান্ড কাপ জয়ের ইতিহাস। বাইশ বছর পর লাল-হলুদ শিবির আবার ডুরান্ডের রাজা।
#EastBengal #DurandCup #EastBengalDurandCup #DurandCupFinal #EastBengalVictory #MohunBagan #IndianFootball #KolkataFootball #EdmundLalrinindika #Football
সাম্প্রতিক পোস্ট
স্কুলের শৌচাগারে সাপ! নামী বেসরকারি স্কুলের নিরাপত্তা নিয়ে উঠল প্রশ্ন, কী বলছে কর্তৃপক্ষ
নিউ মার্কেটের অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্যে আসল কারণ কী? ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য
অভিজিৎ দীপকে কি তবে এবার বিজেপিতে? রাজনৈতিক প্রস্তাব ঘিরে তুঙ্গে জল্পনা
ঋতব্রতই বিরোধী দলনেতা, হাইকোর্টের বড় পর্যবেক্ষণ, কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের পদক্ষেপ কী?

