Ishwar Chandra Vidyasagar Legacy: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মদিনে তাঁর জীবন, কর্ম ও আদর্শকে নতুন করে ফিরে দেখার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘সাগর তর্পণ’ থেকে আজকের সময়—এই দীর্ঘ যাত্রাপথ আমাদের ভাবায়, মানুষটি চলে গেলেও তাঁর আদর্শ কতটা এখনও আমাদের সমাজে জীবন্ত। লিখেছেন সুস্মিতা প্রামাণিক
Ishwar Chandra Vidyasagar Legacy: আজ থেকে ঠিক ২০৬ বছর আগে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় জন্মেছিলেন। আর তাঁর লোকান্তরিত হওয়ার কুড়ি বছর পর অর্থাৎ ১৯১১ সাল নাগাদ কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ‘সাগর তর্পণ ‘ কবিতাটি লেখেন, যা পরে তাঁর অভ্র আবীর কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়।
সাগর-তর্পণ থেকে আজকের বিদ্যাসাগর, এই যাত্রা পথটি যদি আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলে স্বাভাবিকভাবেই কতকগুলো প্রশ্নের মুখোমুখি হই।
মানুষটির মৃত্যু হয়েছে, আদর্শটির কি মৃত্যু হয়েছে?
“বীরসিংহের সিংহশিশু! বিদ্যাসাগর! বীর!”
সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘সাগর-তর্পণ’ শুরু হয় যেন একটি বিস্ময়বোধক উচ্চারণ দিয়ে। সেখানে বিদ্যাসাগর শুধু একজন পণ্ডিত নন, শুধু একজন সমাজসংস্কারকও নন—তিনি একই সঙ্গে দয়ার সাগর এবং আগুনের মতো তেজস্বী এক মানুষ। তাঁর চরিত্রের এই দুই বিপরীত অথচ পরস্পরসম্পূরক দিকই কবিকে বিস্মিত করেছে—একদিকে অসহায়ের জন্য অবারিত করুণা, অন্যদিকে অন্যায় ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম।
আজ, একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে—সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের সেই বিদ্যাসাগর কি এখনও আমাদের মধ্যে আছেন?
প্রশ্নটি শুধু একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিকে স্মরণ করার নয়। প্রশ্নটি আসলে আমাদের নিজেদের অবস্থান নিয়ে।
বিদ্যাসাগরকে আমরা যতটা মূর্তি, জন্মদিন, মৃত্যুদিন আর স্মরণসভায় খুঁজি, তাঁর জীবনকে ততটা অনুসরণ করি কি?
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্ম ১৮২০ সালে মেদিনীপুরের বীরসিংহ গ্রামে এক দরিদ্র পরিবারে। নিজের অধ্যবসায়, মেধা ও কঠোর পরিশ্রমে তিনি সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের পদে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর পদ বা পাণ্ডিত্য নয়; তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়—মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সাহস। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্যেও তাঁকে মানবতাবাদী, পণ্ডিত ও শক্তিশালী সমাজসংস্কারক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সত্যেন্দ্রনাথ তাই লিখেছিলেন, –
“নিঃস্ব হয়ে বিশ্বে এলে, দয়ার অবতার!
কোথাও তবু নোয়াও নি শির জীবনে একবার!”
এই ‘মাথা না নোয়ানো’ কথাটির অর্থ অহংকার নয়। এটি অন্যায়ের কাছে মাথা না নোয়ানোর কথা।
উনিশ শতকের বাংলায় বিধবাবিবাহ ছিল সামাজিক বিতর্কের বিষয়। বিদ্যাসাগর শুধু আবেগের ভাষায় কথা বলেননি; শাস্ত্রের ভিতর থেকেই যুক্তি খুঁজেছেন, মতামত সংগঠিত করেছেন এবং বিধবাবিবাহের পক্ষে জনমত তৈরি করেছেন। তাঁর উদ্যোগের পর ১৮৫৬ সালের Hindu Widows’ Remarriage Act বিধবাবিবাহকে আইনি স্বীকৃতি দেয়।
নারীশিক্ষার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মেয়েদের শিক্ষার প্রসারে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন এবং বিভিন্ন জেলায় বহু বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হন; গবেষণামূলক সূত্রে তাঁর সঙ্গে অন্তত ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা বা প্রসারের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু এখানেই বিদ্যাসাগরের আধুনিকতা শেষ নয়।
তিনি বুঝেছিলেন, সমাজের পরিবর্তন শুধু আইন করে হয় না। মানুষের চিন্তা বদলাতে হয়। আর চিন্তা বদলানোর সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম শিক্ষা।
আজ আমরা শিক্ষার প্রসার নিয়ে গর্ব করি। বিদ্যালয় বেড়েছে, কলেজ বেড়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় বেড়েছে, ডিজিটাল শিক্ষার সুযোগ এসেছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকে যায়—শিক্ষা কি সত্যিই আমাদের মানুষ করেছে?
ডিগ্রি বেড়েছে, তথ্য বেড়েছে, প্রযুক্তি বেড়েছে; কিন্তু অন্যের দুঃখের প্রতি আমাদের সংবেদনশীলতা কি সেই অনুপাতে বেড়েছে?
এই জায়গাতেই ‘সাগর-তর্পণ’ আজও আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে।
কবি বিদ্যাসাগরের স্মৃতির জন্য মূর্তি খুঁজতে চান না। তিনি বলেন—
“মানুষ খুঁজি তোমার মতো, –একটি তেমন লোক,—
স্মরণ চিহ্ন মূর্ত্ত! –যে জন ভুলিয়ে দেবে শোক।”
কী গভীর কথা!
মূর্তি তৈরি করা সহজ। মালা দেওয়া সহজ। বক্তৃতা দেওয়া সহজ। কঠিন হল এমন একজন মানুষ হয়ে ওঠা, যাঁর জীবন অন্যের জীবনে আলো জ্বালায়।
আজ বিদ্যাসাগরের অসংখ্য মূর্তি আছে। তাঁর নামে রাস্তা আছে, বিদ্যালয় আছে, প্রতিষ্ঠান আছে। তাঁর জন্মদিনে অনুষ্ঠান হয়, মৃত্যুদিনে শ্রদ্ধা জানানো হয়। কিন্তু কবির প্রশ্নটি এখনও থেকে যায়—বিদ্যাসাগরের মতো মানুষ কোথায়?
এই প্রশ্নের উত্তর অবশ্য কোনও একজন ব্যক্তির মধ্যে খুঁজলে ভুল হবে। বরং প্রশ্নটি আমাদের প্রত্যেকের কাছে ফিরে ফিরে আসে।
আমরা কি অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করি?
আমরা কি নিজের সুবিধার বাইরে গিয়ে অন্যের কথা ভাবি?
আমরা কি মেয়েদের শিক্ষা ও স্বাধীনতাকে সত্যিই সমান গুরুত্ব দিই?
বিধবা, একলা নারী, দরিদ্র শিশু, প্রান্তিক মানুষ—তাঁদের প্রতি আমাদের আচরণ কেমন?
শিক্ষিত হওয়ার পরেও যদি আমরা কুসংস্কার, বিদ্বেষ, নারী-অবমাননা কিংবা সামাজিক বৈষম্যের কাছে চুপ করে থাকি, তাহলে বিদ্যাসাগরের শিক্ষা কোথায়?
এই কারণেই কবিতার ‘চটি’ এত গুরুত্বপূর্ণ।
বিদ্যাসাগরের চটি কোনও সাধারণ জুতোর স্মৃতি নয়। সেটি তাঁর জীবনযাত্রার প্রতীক। সাধারণ দেশি চটি পরে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে গিয়েছেন, আবার সেই চটি পরেই ক্ষমতার দরজায় দাঁড়িয়ে নিজের কথা বলেছেন। সত্যেন্দ্রনাথ লিখেছেন—
“সেই যে চটি—দেশী চটি—বুটের বাড়া ধন,
খুঁজব তারে, আনব তারে, এই আমাদের পণ।”
চটির মধ্যে কবি আসলে বিদ্যাসাগরের সরলতা ও আত্মমর্যাদাকে খুঁজেছেন।
আজকের পৃথিবীতে এই চটির প্রতীকটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
আমরা এখন ব্র্যান্ডের জুতো পরি, দামি পোশাক পরি, আধুনিক গাড়িতে চলি। আমাদের পরিচয়ের সঙ্গে জিনিসপত্রের সম্পর্ক ক্রমশ বেড়েছে। কিন্তু বিদ্যাসাগর যেন তাঁর চটি দিয়ে মনে করিয়ে দেন—মানুষের বড়ত্ব পায়ের জুতোয় নয়, সে কোন পথে হাঁটছে তাতে।
চটি তাই আজও একটি প্রশ্ন।
আমরা কোন পথে হাঁটছি?
সুবিধার পথে, না সত্যের পথে?
নিজের জন্য, না সকলের জন্য?
সামাজিক স্বীকৃতির জন্য, না বিবেকের তাগিদে?
আজকের পৃথিবীতে আরও একটি জিনিস বিদ্যাসাগরের কথা মনে করিয়ে দেয়—যুক্তি।
তথ্যের যুগে বাস করেও আমরা অনেক সময় যুক্তির চেয়ে গুজবকে বেশি বিশ্বাস করি। সামাজিক মাধ্যমে কোনও খবর দেখলেই যাচাই না করে ছড়িয়ে দিই। বিজ্ঞান ও যুক্তির যুগে কুসংস্কারও নতুন পোশাক পরে ফিরে আসে।
সত্যেন্দ্রনাথের ভাষায়—
“শাস্ত্রে যারা শস্ত্র গড়ে হৃদয় বিদারণ,
তর্ক যাদের অর্কফলার তূমুল আন্দোলন;
বিচার যাদের যুক্তিবিহীন অক্ষরে নির্ভর,—
সাগরের এই চটি তারা দেখুক নিরন্তর।”
আজকের ভাষায় বললে—শুধু উদ্ধৃতি দিয়ে সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় না; যুক্তি চাই, মানবিকতা চাই, বাস্তব বোধ চাই।
বিদ্যাসাগরের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এখানেই—প্রশ্ন করতে শেখা।
যে সমাজে কোনও প্রথা অন্যায় তৈরি করে, সেখানে শুধু ‘এভাবেই চলে আসছে’ বলে চুপ করে থাকা যায় না। বিদ্যাসাগর সেই চুপ করে থাকার মানুষ ছিলেন না।
তাঁর দয়া ছিল দুর্বলতা নয়। তাঁর যুক্তিবাদ ছিল শুষ্কতা নয়। তাঁর তেজ ছিল অহংকার নয়।
এই তিনটি—দয়া, যুক্তি ও সাহস—একসঙ্গে মিলে তৈরি হয়েছিল বিদ্যাসাগর।
আজকের সমাজে এই তিনটিরই প্রয়োজন।
দয়া আছে, কিন্তু অনেক সময় যুক্তি নেই।
যুক্তি আছে, কিন্তু মানবিকতা নেই।
সাহস আছে, কিন্তু তা কখনও কখনও কেবল নিজের স্বার্থ রক্ষার জন্য।
বিদ্যাসাগর আমাদের শেখান—মানুষের জন্য কাজ করতে গেলে তিনটিকেই একসঙ্গে প্রয়োজন।
তাই ‘সাগর-তর্পণ’ শুধু উনবিংশ শতাব্দীর একজন প্রাতঃস্মরণীয় মনীষীর উদ্দেশে লেখা শোকগাথা নয়। এটি এক ধরনের সামাজিক আয়না।
কবিতার শেষদিকে সত্যেন্দ্রনাথের আক্ষেপ—
“নামের সঙ্গে যুক্ত আছে জীবন-ব্যাপী কাজ,
কাজ দেবে না? নামটি নেবে?—একি বিষম লাজ!”
এই পংক্তি আজও যেন আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে।
আমরা বিদ্যাসাগরের নাম নেব, তাঁর ছবি রাখব, তাঁর জন্মদিন পালন করব—কিন্তু তাঁর কাজের আদর্শ নেব না?
তাহলে সেই শ্রদ্ধার মূল্য কোথায়?
আজ বিদ্যাসাগরকে সত্যিকারের শ্রদ্ধা জানানোর অর্থ নতুন করে তাঁর মূর্তি বানানো নয়। বরং কোনও মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেলে তার পাশে দাঁড়ানো; কোনও বিধবা বা একলা নারীকে করুণার চোখে না দেখে মর্যাদার চোখে দেখা; কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুক্তি দিয়ে কথা বলা; দরিদ্র শিশুর শিক্ষার দায়িত্ব নেওয়া; অন্যায় দেখলে নিজের সুবিধার হিসেব ভুলে প্রতিবাদ করা।
অর্থাৎ, বিদ্যাসাগরকে স্মরণ করার সবচেয়ে বড় উপায়—নিজের ভিতরে একটু বিদ্যাসাগর তৈরি করা।
একজন মানুষ চলে যান। তাঁর পোশাক পুরোনো হয়, তাঁর ব্যবহৃত চটি জাদুঘরে উঠে যায়, তাঁর কণ্ঠস্বর আর শোনা যায় না। কিন্তু তাঁর আদর্শ যদি মানুষের আচরণে বেঁচে থাকে, তবে মৃত্যু তাঁকে নিঃশেষ করতে পারে না।
সত্যেন্দ্রনাথ তাই তাঁকে বলেছেন—
“অদ্বিতীয় বিদ্যাসাগর! মৃত্যু-বিজয় নাম।”
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই ‘মৃত্যু-বিজয়’ কথাটির নতুন অর্থ করা যায়।
বিদ্যাসাগর বেঁচে থাকবেন না তাঁর মূর্তিতে, শুধু বইয়ের পাতাতেও নয়। তিনি বেঁচে থাকবেন যে মানুষটি অন্যায়ের সামনে মাথা নোয়াবে না, যে মানুষটি অসহায়ের পাশে দাঁড়াবে, যে মানুষটি যুক্তিকে অন্ধ বিশ্বাসের উপরে রাখবে, যে মানুষটি শিক্ষাকে মানুষের মুক্তির পথ বলে মনে করবে—তার মধ্যে।
সেই মানুষটির সন্ধানেই যেন আজও কবির আহ্বান—
“মানুষ খুঁজি তোমার মতো—একটি তেমন লোক।”
আর সেই খোঁজ শেষ পর্যন্ত বাইরে নয়।
আমাদের নিজেদের মধ্যেই।
কারণ বিদ্যাসাগরের আসল স্মৃতিস্তম্ভ কোনও পাথরের মূর্তি নয়—একটি সৎ, যুক্তিবাদী, সাহসী ও মানবিক মানুষ।
সেই মানুষটি যদি আজও তৈরি হয়, তবে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘সাগর-তর্পণ’ শুধু অতীতের কবিতা হয়ে থাকবে না; হয়ে উঠবে বর্তমানেরও আয়না।
আর বীরসিংহের সেই “সিংহশিশু” তখন ইতিহাসের পাতায় নয়—আমাদের প্রতিদিনের জীবনেই আবার ফিরে আসবেন। কেমন করে ভুলি, তিনি সেদিন ছিলেন বলেই আজকে শব্দের অক্ষরে একজন মানবী হিসেবে এই লেখা লিখতে পারছি। প্রণাম জানাই সেই নরদেবতা কে। আমার প্রণাম নেবেন শ্রীযুক্ত ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় ।
জয়তু বিদ্যাসাগর।।
সাম্প্রতিক পোস্ট
স্কুলের শৌচাগারে সাপ! নামী বেসরকারি স্কুলের নিরাপত্তা নিয়ে উঠল প্রশ্ন, কী বলছে কর্তৃপক্ষ
নিউ মার্কেটের অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্যে আসল কারণ কী? ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য
অভিজিৎ দীপকে কি তবে এবার বিজেপিতে? রাজনৈতিক প্রস্তাব ঘিরে তুঙ্গে জল্পনা
ঋতব্রতই বিরোধী দলনেতা, হাইকোর্টের বড় পর্যবেক্ষণ, কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের পদক্ষেপ কী?

