Akashvani 90 Years Classical Music Event: আকাশবাণীর ৯০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানে পদ্মশ্রী পণ্ডিত কুমার বোস ও পণ্ডিত দেবজ্যোতি বোসের রাগ বেহাগ ও রাগ দেশ পরিবেশনা মুগ্ধ করল শ্রোতাদের। সত্যজিৎ রায়ের বেতার-সংযোগ, আকাশবাণীর ইতিহাস ও শাস্ত্রীয় সংগীতের ঐতিহ্য নিয়ে বিশেষ ফিচার।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: কখনও ইতিহাস, কখনও স্মৃতি, কখনও আবার নিখাদ শাস্ত্রীয় সুর— এই তিনের অপূর্ব মেলবন্ধনে আকাশবাণীর ৯০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠান যেন এক চলমান সাংস্কৃতিক দলিল হয়ে উঠেছিল। ভারতীয় বেতারের ইতিহাসে এক বিশেষ অধ্যায়ের নাম আকাশবাণী। সেই ঐতিহ্যের নব্বই বছর পূর্তি উপলক্ষে দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে ‘এআইআর অ্যাট নাইন্টি’ উদযাপন। আর এই বিশেষ মুহূর্তকে স্মরণীয় করে তুলতে এক অনন্য শাস্ত্রীয় সঙ্গীত সন্ধ্যার আয়োজন করল আকাশবাণী কলকাতা।
ভারতীয় জাদুঘরের ঐতিহ্যবাহী এবিসি শতবর্ষ প্রেক্ষাগৃহে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের শুভ উদ্বোধন করেন শ্রী এস সঞ্জীব, অ্যাডিশনাল ডিরেক্টর জেনারেল, কন্টেন্ট অপারেশনস, ইস্টার্ন রিজিয়ন, আকাশবাণী ও দূরদর্শন, কলকাতা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শ্রী ধ্রুবনন্দ, অ্যাডিশনাল ডিরেক্টর জেনারেল, অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড ব্রডকাস্টিং। তাঁদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানকে আরও মর্যাদাপূর্ণ করে তোলে।
সন্ধ্যার সূচনায় আকাশবাণী কলকাতার শিল্পীরা সমবেতভাবে যন্ত্রানুসঙ্গীত এর মাধ্যমে পরিবেশন করেন ‘বন্দে মাতরম’। দেশাত্মবোধক সেই আবেগঘন পরিবেশনার মধ্য দিয়েই শুরু হয় সুরের মহাসন্ধ্যা। এরপর ঠুমরি, দাদরা এবং টপ্পার অপূর্ব পরিবেশনায় শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন আকাশবাণী কলকাতার শীর্ষস্থানীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী বিদুষী আইভি বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কণ্ঠের আবেগ, রাগের সূক্ষ্মতা এবং উপস্থাপনার সৌন্দর্য উপস্থিত দর্শকদের মন জয় করে নেয়।মঞ্চে উঠে এসেছিল ভারতের বেতার ঐতিহ্যের বহু অজানা অধ্যায়, উঠে এসেছিল সত্যজিৎ রায়ের বেতার-সংযোগ, শিল্পীদের ব্যক্তিগত স্মৃতি, আর শেষ পর্যন্ত পদ্মশ্রী পণ্ডিত কুমার বোস ও পণ্ডিত দেবজ্যোতি বোসের যুগল পরিবেশনায় যেন পূর্ণতা পেল গোটা সন্ধ্যা।
শুধু একটি স্মরণানুষ্ঠান নয়, এটি ছিল ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত ও আকাশবাণীর পারস্পরিক সম্পর্কের এক আবেগঘন পুনর্পাঠ।
আকাশবাণী: শুধুই বেতার নয়, এক সাংস্কৃতিক বিদ্যালয় (Akashvani 90 Years Classical Music Event)
অনুষ্ঠানের বিভিন্ন বক্তৃতা ও স্মৃতিচারণে বারবার উঠে এসেছে আকাশবাণীর প্রকৃত পরিচয়। বক্তাদের কথায়, এক সময় আকাশবাণী শুধুমাত্র সংবাদ বা বিনোদনের মাধ্যম ছিল না; এটি ছিল শিল্পীদের কাছে এক “গুরুস্থানীয়” প্রতিষ্ঠান। বহু শিল্পী এখান থেকেই রাগ-রাগিণী চিনেছেন, উচ্চারণ শিখেছেন, সুরের শৃঙ্খলা ও উপস্থাপনার নন্দনতত্ত্ব আত্মস্থ করেছেন।
এই প্রসঙ্গে আলোচকরা স্মরণ করেন কীভাবে আকাশবাণী গ্রামবাংলা থেকে শহুরে সংস্কৃতি— সর্বত্র শিল্পচর্চার এক বড় প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছিল। এমনকি কৃষিক্ষেত্রেও বেতারের অবদান উঠে আসে আলোচনায়। “রেডিও রাইস”-এর গল্প, অল ইন্ডিয়া রেডিওর গ্রামীণ উন্নয়নমূলক সম্প্রচার, কিংবা আঞ্চলিক ভাষার নাটক— সব মিলিয়ে আকাশবাণী যেন ভারতীয় সমাজজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সত্যজিৎ রায় ও বেতারের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক (Akashvani 90 Years Classical Music Event)
অনুষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল সত্যজিৎ রায়কে ঘিরে আলোচনা। সেখানে জানানো হয়, তাঁর “ফটিকচাঁদ”, “কাঞ্চনজঙ্ঘা”, “আংটি ও আধুলি”-র মতো রচনাগুলি বেতার-নাটকের রূপে সম্প্রচারিত হয়েছিল। প্রথমদিকে সত্যজিৎ রায় নাকি এই রূপান্তর নিয়ে সংশয়ে ছিলেন। তাঁর প্রশ্ন ছিল— একটি দৃশ্যনির্ভর চিত্রনাট্য কি আদৌ শব্দের মাধ্যমে জীবন্ত করা সম্ভব? কিন্তু নাট্যকার ও প্রযোজকদের নিষ্ঠা এবং সাউন্ড ডিজাইনের অভিনব ব্যবহারে তিনি শেষ পর্যন্ত সন্তুষ্ট হন।
বিশেষ করে “আংটি ও আধুলি”-র বেতাররূপে হাওড়া থেকে বর্ধমানের বিভিন্ন স্টেশনের শব্দ, হকারের ডাক, যাত্রীর কথোপকথন— এই সব বাস্তব শব্দ সংগ্রহ করে নাটকে ব্যবহার করার প্রসঙ্গ শ্রোতাদের মুগ্ধ করে। এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, শব্দের মাধ্যমেও কীভাবে দৃশ্য নির্মাণ করা যায়, আর সেই শিল্পরীতিকে কত গভীরভাবে বুঝতেন সত্যজিৎ রায়।
বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের ঐতিহ্য ও বেতারের আবেগ
যদিও অনুষ্ঠানের মূল কেন্দ্র ছিল সংগীত, তবু আকাশবাণীর ইতিহাস বলতে গিয়ে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের নামও এক আবেগময় স্মৃতি হয়ে ফিরে আসে। “মহিষাসুরমর্দিনী”-র সেই অনবদ্য কণ্ঠ, বেতারের সঙ্গে বাঙালির মানসিক সম্পর্ক— সবটাই যেন অনুষ্ঠানের আবহে উপস্থিত ছিল অদৃশ্যভাবে।
উপস্থাপকদের কথায় বোঝা যায়, আকাশবাণীর শক্তি ছিল শুধু প্রযুক্তিতে নয়, মানুষের আবেগে। ভোরের বেতার, রেডিও নাটক, রবিবারের সংগীত আসর— এগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্মকে এক অদৃশ্য সাংস্কৃতিক বন্ধনে বেঁধে রেখেছে।
মঞ্চে কুমার বোস: তবলার মহারথীর অনবদ্য উপস্থিতি
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বের প্রধান আকর্ষণ ছিলেন পদ্মশ্রী পণ্ডিত কুমার বোস। উপস্থাপক যখন তাঁর পরিচয় দিচ্ছিলেন, তখনই স্পষ্ট হচ্ছিল— ভারতীয় তবলার জগতে তিনি এক জীবন্ত কিংবদন্তি।
বেনারস ঘরানার এই প্রখ্যাত তবলিয়া প্রথম তালিম পান তাঁর বাবা পণ্ডিত বিশ্বনাথ বোসের কাছে। পরে তিনি তালিম নেন প্রবাদপ্রতিম পণ্ডিত কিশান মহারাজের কাছে। তাঁর বাজনার বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হয় শক্তিশালী ওপেন-হ্যান্ড স্ট্রাইকিং টেকনিক, নিখুঁত লয়জ্ঞান এবং আবেগঘন উপস্থাপনা।
দেশ-বিদেশের অসংখ্য মঞ্চে তিনি একক ও সংগত— দুই ক্ষেত্রেই সমান দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। শুধু শাস্ত্রীয় সংগীত নয়, নৃত্য ও চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও তাঁর কাজ উল্লেখযোগ্য।
২০২৬ সালে শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের জন্য ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করেছে— এই ঘোষণায় গোটা প্রেক্ষাগৃহ করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে।

দেবজ্যোতি বোস: সরদের তারে ঐতিহ্য ও সৃষ্টিশীলতার মেলবন্ধন (Akashvani 90 Years Classical Music Event)
পণ্ডিত দেবজ্যোতি বোসের পরিচয়ও সমান উজ্জ্বল। সেনিয়া-বঙ্গশ ঘরানার এই বিশিষ্ট সরোদিয়া জন্মেছেন এক সংগীতময় পরিবারে। বাবা পণ্ডিত বিশ্বনাথ বোস, মা বিদুষী ভারতী বোস, আর দুই দাদা— পণ্ডিত কুমার বোস ও আচার্য জয়ন্ত বোস— সকলেই সংগীতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ওস্তাদ আমজাদ আলি খাঁর শিষ্য হিসেবে তাঁর সংগীতযাত্রা শুরু হয়। পাশাপাশি পণ্ডিত রাজেন মিশ্র ও পণ্ডিত বিজয় কিচলুর কাছ থেকেও তিনি তালিম নিয়েছেন।
১৯৮১ সাল থেকে দেশ-বিদেশের বড় বড় সম্মেলনে তাঁর নিয়মিত পরিবেশনা তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দিয়েছে। টেলিফিল্ম, মেগা সিরিয়াল এবং চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনার অভিজ্ঞতাও তাঁকে বহুমাত্রিক শিল্পীতে পরিণত করেছে।
এছাড়াও পণ্ডিত দেবজ্যোতি বোসের শিল্পসত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর বাদনধারার বৈচিত্র্য। সেনিয়া বঙ্গাশ ঘরানার ঐতিহ্য অনুসরণ করলেও তিনি শুধুমাত্র প্রথাগত শাস্ত্রীয় পরিবেশনাতেই সীমাবদ্ধ নন; আধুনিক সুরভাবনা ও সমকালীন সংগীতধারার সঙ্গেও তিনি দক্ষতার সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। সরোদবাদনে তাঁর এই স্বাতন্ত্র্যই তাঁকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে সংগীতমহলে।
মায়ের কাছ থেকেই তাঁর সংগীত শিক্ষার প্রাথমিক সূচনা। পরে ওস্তাদ আমজাদ আলি খানের কাছে সরোদের তালিম নিয়ে তিনি নিজের শিল্পভাষাকে আরও সমৃদ্ধ করেন। দরবারের মতো মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চেও তিনি সরোদ পরিবেশন করেছেন, যেখানে তাঁর বাজনায় একদিকে যেমন ঘরানার শুদ্ধতা ধরা পড়ে, তেমনই অনুভূত হয় আধুনিকতার সংবেদনশীল স্পর্শ।
রাগ বেহাগ থেকে রাগ দেশ: সুরের আবেশে ডুবল প্রেক্ষাগৃহ
মঞ্চে উঠে দেবজ্যোতি বোস প্রথমেই আকাশবাণীর প্রতি নিজের আবেগের কথা জানান। তিনি বলেন, ছোটবেলায় আকাশবাণীকেই তাঁরা “গুরু” মনে করতেন। অসংখ্য রাগ-রাগিণী, সংগীতের গভীরতা এবং শিল্পীসত্তার বোধ তিনি এই মাধ্যম থেকেই পেয়েছেন।
এরপর তিনি জানান, সময় সীমিত হলেও তিনি রাগ বেহাগ পরিবেশন করবেন। সংক্ষিপ্ত আলাপ দিয়েই শুরু হয় সেই সুরযাত্রা। ধীরে ধীরে সরদের তারে বেহাগের মাধুর্য ছড়িয়ে পড়তেই তবলায় কুমার বোসের নিখুঁত সংগত যেন পরিবেশনাকে অন্য মাত্রা দেয়।
পরে গুরুদেবের বন্দিশ পরিবেশন করেন দেবজ্যোতি বোস। আর অনুষ্ঠানের একেবারে শেষ দিকে তিনি রাগ দেশ পরিবেশন করেন— যা “বন্দে মাতরম”-এর শতবর্ষ উপলক্ষে গুরুদেবের স্মৃতিকে উৎসর্গ করা হয়। রাগ দেশের আবেগঘন সুরে তখন গোটা প্রেক্ষাগৃহ যেন স্তব্ধ। কেউ আর শুধু শ্রোতা নন, প্রত্যেকেই যেন ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের গভীর ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছেন।
শেষ মুহূর্তে আবেগ, নীরবতা এবং দীর্ঘ করতালি
পরিবেশনা শেষ হওয়ার পর উপস্থাপক বলেন, “আমরা সত্যিই মন্ত্রমুগ্ধ।” সেটা শুধু আনুষ্ঠানিক প্রশংসা ছিল না; গোটা সন্ধ্যার আবহই যেন সেই কথার সাক্ষ্য দিচ্ছিল।
আকাশবাণীর ৯০ বছরের ইতিহাস, সত্যজিৎ রায়ের স্মৃতি, বেতার নাটকের ঐতিহ্য, শিল্পীদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং শেষ পর্যন্ত কুমার বোস–দেবজ্যোতি বোসের সুর— সব মিলিয়ে অনুষ্ঠানটি এক বিরল সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। এ যেন কেবল একটি মঞ্চানুষ্ঠান নয়; ভারতীয় সুরঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের পুনর্মিলনের এক আবেগঘন সন্ধ্যা।
#Akashvani90Years #KumarBose #DebjyotiBose #IndianClassicalMusic #Sarod #Tabla #RagaBehag #RagaDesh #AIR90 #SatyajitRay #HindustaniMusic #BengaliCulture #ClassicalMusicConcert #PadmaShri #AkashvaniKolkata

