Bengali Gamcha: সময় বদলায়। বদলাবেই। নিয়নের আলো ফিকে হয়ে এলইডি’র উজ্জলতায়। স্মার্টফোন মাপে রক্তচাপ। মুহূর্তগুলো বন্দি আজ আঙুলের ছোঁয়ায়। তবু ছুটির দিনে ক্লান্ত দুপুরে ভাতঘুম মন। শিরিষ গাছের দীর্ঘ ছায়া আড়মোড়া ভাঙে তপ্ত ছাদে। আর মন কেমন করা রবিবার দুপুরে মজে থাকে ‘রোদ্দুরের কথকতা‘। কলমে-দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়
গামছা কোনো বস্তু নয়, গামছা একটা দর্শন। তোয়ালে বড়লোকের আত্মীয়, লুঙ্গি গামছার ভাই, আর গামছা হলো বাড়ির সেই কাজের ছেলেটা যে সব পারে।
বাঙালি বিজ্ঞানীরা আজও গামছার সংজ্ঞা দিতে পারেনি। জিনিসটা দেখতে চৌকো, কিন্তু কাজে গোলাকার। মানে সবদিকেই চলে।
এর ব্যবহার কতরকম দেখুন। স্নানপর্বে গামছা ছাড়া স্নান হয় না, স্নান ছাড়া গামছা বেঁচে থাকে। গায়ে জল মুছতে মুছতে যে পরিমাণ জল গামছা শুষে নেয়, তার চেয়ে বেশি জল সে নিংড়ে ফেলে দিতে পারে। এটাই তার ত্যাগ।
বহুরূপী রূপে সকালে এটি গামছা, দুপুরে এটি রুমাল, বিকেলে মাথার পাগড়ি, সন্ধ্যায় বাজারের থলে। আর রাতে? রাতে এটি মশারি বাঁধার দড়ি। এক গামছায় গোটা সংসার। আমাজনের ডেলিভারি বয়ও এত মাল্টিটাস্কিং পারে না।
ফ্যাশন স্টেটমেন্ট রূপে লাল-সাদা চেক গামছা কাঁধে ফেললেই আপনি কবি। ঘাড়ে ফেললে নেতা। আর মাথায় বাঁধলে আপনি একদম খাঁটি কৃষক, যিনি জমিতে ফেসবুক নয়, ধান চাষ করেন। কোনো ব্র্যান্ডের পক্ষে এই রেঞ্জ দেওয়া সম্ভব নয়।
গামছার কোনো শেষ নেই। একটু ছিঁড়লেই আরেকটু বেরোয়। সুতো বেরোতে বেরোতে সে নিজেই একসময় জাল হয়ে যায়, তবুও ফেলে দেওয়া যায় না। কারণ মা বলেছেন, “ওই ছেঁড়াটা দিয়েই তো উনুন ধরাবো।”
আসলে তোয়ালে আপনাকে মুছে দেয়, গামছা আপনাকে মনে রাখে। বাবার আলমারিতে আজও একটা গামছা আছে, রং চটে গেছে, কিন্তু গন্ধটা একই আছে – রোদ, সর্ষের তেল আর ছোটবেলার পুকুরঘাটের।
তাই গামছাকে অবহেলা করবেন না। ওয়াশিং মেশিনে দেবেন না, ওতে ওর আত্মসম্মানে লাগে। ওকে রোদে দিন, বাতাসে উড়তে দিন। ও বাঙালির শেষ সুপারহিরো – নীরবে সব সামলায়, কখনো ক্যাপ পরে না।
বলা ভালো গামছা আমার কাছে একটি অসমাপ্ত গবেষণা ।
বাঙালির এমন কোন পালা পার্বণ উৎসব অনুষ্ঠান নেই যেখানে গামছা লাগে না। ছোট বড় মাঝারি বিভিন্ন সাইজের বিভিন্ন রঙের বিভিন্ন কোয়ালিটির গামছা সর্বত্র বিরাজমান। সমস্ত পুজো পার্বণে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তার অনিবার্য উপস্থিতি। আমার কাছে বিস্ময়।
বাঙালির জীবনে তিনটি জিনিস চিরন্তন। মা-র বকুনি, বাবার উপদেশ আর গামছা। প্রথম দুটো থেকে আপনি পালাতে পারবেন, তৃতীয়টা থেকে পারবেন না।
আমাদের বাড়িতে গামছার জন্ম হয় না, আবির্ভাব হয়। কোথা থেকে আসে কেউ জানে না। মনে হয় আলমারি নিজেই প্রসব করে। একটা কিনলে তিনটে বেরোয়। লাল চেক, সবুজ চেক, আর একটা এমন রঙের যার কোনো নাম বাংলা অভিধানে নেই।
বাবার-গামছা মোটা, গাম্ভীর্যপূর্ণ, রোদে দিলে শক্ত। পুরুষালি। এটা দিয়ে গা মুছলে শরীরের ময়লা তো বটেই, গত জন্মের পাপও উঠে যাবে।
মা-র স্পেশাল গামছা নরম, কিন্তু ওটা গামছা নয়, ওটা পারিবারিক সম্পত্তি। ওটা দিয়ে হাত মুছলে বকা খেতে হবে। ওটা তুলে রাখা আছে অতিথি এলে দেবার জন্য, যে অতিথি আজও আসেনি।
নিজের গামছার কোনো অস্তিত্ব নেই। আপনি কিনবেন, দুদিন পর দেখবেন ওটা দাদুর মাথায়, ভাইয়ের কাঁধে, আর শেষমেশ রান্নাঘরে বঁটি মোছা হচ্ছে।
তাহলে গামছা আসলে কী কী?
বিজ্ঞান বইতে লেখা নেই, কিন্তু বাঙালি জানে গামছা একাধারে – তোয়ালে , যা তোয়ালের চেয়ে বেশি জল টানে এবং কম সময়ে শুকায়।
অথবা টুপি, পাগড়ি, হেলমেট,যা রোদে মাথায়, মাঠে কোমরে, বৃষ্টিতে মাথা বাঁচাতে।
অন্যদিকে ওয়াটার ফিল্টার, যা টিউবওয়েলের মুখে গামছা বেঁধে জল ভরার যে টেকনোলজি, নাসা আজও আবিষ্কার করতে পারেনি।
আবার শপিং ব্যাগ ও ভাবা যায়। যা গামছায় বাঁধা যায় না এমন কিছু পৃথিবীতে নেই। আলু থেকে শুরু করে ছোটখাটো বাচ্চা পর্যন্ত।
গামছা রুমাল -ই-তো, যা গরমে ঘাম মোছা, ঠান্ডায় নাক মোছা, আর কান্না পেলে চোখ মোছা – এক কাপড়ে তিন কাজ।
ধরুন অস্ত্র, যা বন্ধুরা ঝগড়া করলে গামছা পাকিয়ে বাড়ি। সে বাড়ি খেলে চোট লাগে না, কিন্তু অপমান লাগে খুব।
বাঙালি পুরুষ ও গামছা এক ঐতিহাসিক সম্পর্ক , অনেকটা তেনজিং নোর্গের সঙ্গে এভারেস্টের সম্পর্কের মতো গভীর ।
একজন বাঙালি পুরুষকে চেনা যায় তার গামছা রাখার স্টাইল দেখে।
কাঁধে ফেলা গামছা মানে তিনি ভাবুক। বাজারে যাচ্ছেন কিন্তু মনে মনে কবিতা লিখছেন।
গলায় জড়ানো গামছা মানে তিনি ব্যস্ত। হয় মিটিং আছে, নয়তো পাড়ার ক্লাবে তাসের আড্ডা।
আর মাথায় বাঁধা গামছা মানে, খবরদার, এখন তাকে ঘাঁটাবেন না। তিনি এখন সিরিয়াস কাজে আছেন – হয়তো আম গাছে ঢিল ছুঁড়ছেন।
তোয়ালে শরীর মোছে। গামছা ইতিহাস মোছে না, ইতিহাস ধরে রাখে।
আচ্ছা, রম্য থাক, এবার একটু মন খারাপ করা ভালো লাগার গল্প হোক। গামছা নিয়ে আমাদের সবারই তো একটা করে গল্প আছে।
গামছা নিয়ে তিনটে স্মৃতি এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে।
দাদুর গামছার গল্পটা আগে বলি। ত্রিবেণী তে আমাদের মামাবাড়ির পুকুরঘাটে দাদুর জন্য একটা বাঁশের খুঁটি পোঁতা ছিল। স্নানের পর দাদু তাঁর লাল গামছাটা ওখানেই মেলে দিতেন। রোদে পুড়ে, হাওয়ায় উড়ে গামছাটা শক্ত কাঠ হয়ে থাকত। আমি চুপিচুপি ওটা নিয়ে ঘষে ঘষে গা মুছতাম। কী জ্বালা করত! মনে হতো কেউ শিরিষ কাগজ দিয়ে গা ঘষে দিচ্ছে। দাদু হাসত আর বলত, “ওই জ্বালাটাই তো আসল স্নান রে, ময়লা তো মনেও থাকে।”
দাদু নেই আজ পঁচিশ বছর। খুঁটিটা আছে, কিন্তু গামছাটা নেই। তবুও বর্ষাকালে যখন হাওয়া দেয়, মনে হয় ওই খুঁটি থেকেই দাদুর গামছার গন্ধ ভেসে আসছে। শুনেছি ঐরকমই কোনো একটা গামছা নিয়ে আমার তরুণ বয়স্ক ছোটমামা ভোর রাত্রে কোন এক গভীর অভিমানে আম গাছের দিকে হাঁটা দেয়। তারপর দীর্ঘ ছোটবেলা মামার বাড়ি গেছি। ছোট মামাকে আর দেখতে পাইনি। তার কথাও কারোর মুখে শুনিনি।
এবার নবীনদার বাবার কাঁধের গামছার গল্পটা বলি।
নবীনদার বাবা কোনোদিন রুমাল ব্যবহার করেননি। অফিস, বাজার, বিয়ে বাড়ি – সবখানে কাঁধে একটা সাদা গামছা।
ছোটবেলায় জ্বর হলে নবীনদার বাবা ওই গামছাটা জলে ভিজিয়ে নবীনদার কপালে দিয়ে দিতেন। কী অদ্ভুত ঠান্ডা ছিল ওটা। জ্বরের ঘোরে নবীনদা ওই গামছাটাই আঁকড়ে ঘুমিয়ে পড়ত। ওটাতে বাবার ঘামের গন্ধ, সাইকেলের তেলের গন্ধ, আর একটু নবীনদার গন্ধ মিশে থাকত।
মায়ের আঁচলের মতোই মায়ের একটা গামছা ছিল। একদম নরম হয়ে যাওয়া, পাতলা। ওটা দিয়ে মা গরম ভাতের হাঁড়ি ধরতেন।
একবার হারিয়ে ফেলেছিলাম বলে কী বকা! পরে বুঝেছি, ওটা শুধু গামছা ছিল না, ওটা ছিল মায়ের হাতের এক্সটেনশন।
এখন আমি বড় হয়েছি, দামি পারফিউম ব্যবহার করি। কিন্তু জ্বর এলে আজও মনে হয়, ইস, মায়ের হলুদের গন্ধমাখা আঁচল আর ওই গামছাটা যদি কপালে পেতাম!
আজ মা ও নেই। মায়ের গামছা ও নেই।
আমরা শহরে এসে অনেক কিছু কিনেছি। মাইক্রোফাইবার তোয়ালে, কিচেন ন্যাপকিন, কত কী। কিন্তু মায়ের ওই ছেঁড়া গামছাটার মতো একটাও জিনিস রান্নাঘরে আর নেই ।
আমাদের পাড়ার চিনুদা শবযাত্রী হয়ে এই আটানব্বইতম শবদাহ করে এলো, সন্টুদার দাদুকে নিয়ে গিয়ে। আর দুটো হলেই সেঞ্চুরি। সেই চিনুদা জেঠিমার নতুন গামছাটা নিয়ে গিয়েছিল। ফেরার সময় অন্য কোন শবযাত্রী দলের সবুজ গামছা মাথায় করে চলে আসে। তাতে প্রায় ত্যাজ্যপুত্র হয়ে যাচ্ছিল। পরবর্তীকালে দেখেছি চিনুদা আমার সারাদিন গামছাবতার হয়েই ঘুরে বেড়ায়। উর্ধাঙ্গ অনাবৃত, পরনে একটি গামছা। এইরকম তুরীয় অবস্থায় পৌঁছে দেওয়া গামছার পক্ষেই সম্ভব।
আসলে গামছা কখনো ফেলে দেওয়া যায় না। একটা সময় পর ওটা আর কাপড় থাকে না, স্মৃতি হয়ে যায়। হয়ে যায় পরমাত্মীয় ।।
#bengaligamcha #gamcha #bengaliculture #bengalilifestyle #bengaliheritage #traditionalgamcha #ruralbengal #bengalifashion #bengalicustoms
সাম্প্রতিক পোস্ট
‘সাথীরা, প্রশ্নফাঁস মাফিয়াদের রেয়াত নয়’– সংসদে বিল পাসের পর প্রথমবার কী বললেন প্রধানমন্ত্রী?
সিলেবাসে বড় পরিবর্তন কবে থেকে? শিক্ষক নিয়োগেও সুখবর? কী বললেন শিক্ষামন্ত্রী?
আবার কি বদলে যাবে নোট? দেশে আসছে প্লাস্টিকের নোট,জানুন, কী বদল আসছে?
১লা আগস্ট থেকে স্কুলের খাবারের দায়িত্ব ইস্কনের, ডিম বিতরণ, ও শিক্ষক নিয়োগে বড় ঘোষণা
কেন জেন জির ‘ক্রাশ’ সৌরভ দাস ও অভিজিৎ দীপকে? নেপথ্যে কী রহস্য?

