সাবমেরিনে মৃত্যুঞ্জয়ী যাত্রা থেকে সিঙ্গাপুরের ঐতিহাসিক জনসভা—জানুন এক ভবঘুরে সন্ন্যাসীর বেশে দেশত্যাগী সুভাষচন্দ্রের Azad Hind Fauj-এর সর্বাধিনায়ক হয়ে ওঠার রোমহর্ষক ও অজানা কাহিনী।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক : ১৯৪১ সাল। জানুয়ারি মাসের ১৬ তারিখ। কনকনে শীতের রাত। কলকাতার এলগিন রোডের বাড়িটা নিঝুম হয়ে আছে। ব্রিটিশ গোয়েন্দারা বাড়ির চারপাশে টিকটিকির মতো পাহারা দিচ্ছে। তাদের বিশ্বাস, “বিদ্রোহী সুভাষ” এই বাড়ির ভেতরেই বন্দি। কিন্তু তারা ঘুণাক্ষরেও টের পেল না যে, রাত ১টা ৩৫ মিনিটে একটি কালো রঙের ‘ওয়ান্ডারার’ গাড়ি নিঃশব্দে গেট পেরিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। গাড়ির পেছনের সিটে বসে ছিলেন এক বিমা এজেন্ট, নাম ‘মহম্মদ জিয়াউদ্দিন’।
আসলে তিনি জিয়াউদ্দিন নন, তিনি ভারতের স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা—সুভাষচন্দ্র বসু। সেই রাতেই শুরু হয়েছিল এক মহানিষ্ক্রমণ, যা পরবর্তীকালে জন্ম দেবে এশিয়ার সর্ববৃহৎ বিপ্লবী সেনাবাহিনী—’আজাদ হিন্দ ফৌজ’ (Azad Hind Fauj)।
ইতিহাসের বইতে আমরা পড়ি যে রাসবিহারী বসু আইএনএ (INA) তৈরি করেছিলেন এবং সুভাষচন্দ্র তার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কিন্তু এই এক লাইন কি সেই বিশাল যজ্ঞের বর্ণনা দিতে পারে? একজন মানুষ, যার হাতে কোনো সম্বল নেই, দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে, শুধুমাত্র নিজের ব্যক্তিত্ব আর দেশপ্রেমের জোরে কীভাবে গড়ে তুললেন ৬০,০০০ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী?
আজ ২৩শে জানুয়ারি, নেতাজির জন্মজয়ন্তীতে আমরা শুনব সেই অবিশ্বাস্য রূপকথা, যা হার মানাবে হলিউডের যেকোনো থ্রিলার সিনেমাকেও।
আরও পড়ুনঃ “তোমরা আমাকে রক্ত দাও…”— জানুন এই উক্তির পেছনের আসল গল্প
জার্মানির মোহভঙ্গ ও সাবমেরিনের দুঃসাহসিক যাত্রা
ভারত থেকে পালিয়ে আফগানিস্তান ও রাশিয়া হয়ে সুভাষচন্দ্র যখন জার্মানিতে পৌঁছালেন, তখন তাঁর আশা ছিল হিটলারের সাহায্য নিয়ে ব্রিটিশদের তাড়াবেন। তিনি সেখানে ভারতীয় যুদ্ধবন্দিদের নিয়ে ‘ফ্রি ইন্ডিয়া লিজিয়ন’ তৈরিও করেছিলেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তিনি বুঝলেন, ইউরোপের মাটি থেকে ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্ভব নয়। যুদ্ধ চলছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। তাঁকে সেখানে পৌঁছাতেই হবে।
কিন্তু যাবেন কীভাবে? আকাশপথ বন্ধ। জলপথে ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির কড়া পাহারা। তখন নেওয়া হলো এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। সাবমেরিনে করে পাড়ি দিতে হবে অর্ধেক পৃথিবী।
১৯৪৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। উত্তর সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যে জার্মান ইউ-বোট ‘U-180’-এ উঠলেন নেতাজি এবং তাঁর সঙ্গী আবিদ হাসান। দীর্ঘ ৯০ দিন ধরে জলের নিচে, দমবন্ধ করা পরিবেশে চলল যাত্রা। এরপর মাদাগাস্কারের কাছে সমুদ্রের মাঝখানে ঘটল এক ঐতিহাসিক ঘটনা। উত্তাল সমুদ্রে রবারের ডিঙি ভাসিয়ে জার্মান সাবমেরিন থেকে নেতাজি উঠে এলেন জাপানি সাবমেরিন ‘I-29’-এ। বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসে এমন দুঃসাহসিক সাবমেরিন বদল আর কোনো নেতা করেননি। মৃত্যুর চোখে চোখ রেখে তিনি পৌঁছে গেলেন টোকিও।
সিঙ্গাপুর: বাঘের হাতে মশাল হস্তান্তর
তখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে জাপানের জয়জয়কার। সিঙ্গাপুর পতন হয়েছে। হাজার হাজার ভারতীয় ব্রিটিশ সেনাকে যুদ্ধবন্দি (POW) করে রাখা হয়েছে। ওদিকে জাপানে বসে বৃদ্ধ বিপ্লবী রাসবিহারী বসু স্বপ্ন দেখছেন একটি মুক্তি ফৌজের। ক্যাপ্টেন মোহন সিং-এর উদ্যোগে ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি’ বা আইএনএ-র প্রাথমিক গঠন তখন টলমল করছে। নেতৃত্বের অভাবে সৈন্যরা দিশেহারা। দরকার একজন সত্যিকারের নেতার।
১৯৪৩ সালের ২রা জুলাই। সিঙ্গাপুরে পা রাখলেন সুভাষচন্দ্র বসু। বিমানবন্দর থেকে রাস্তার দুপাশে হাজার হাজার ভারতীয় তাঁকে দেখার জন্য ভিড় জমাল। তাদের চোখে তখন জল, মুখে স্লোগান—”আমাদের নেতা এসে গেছে।”
৪ জুলাই, ১৯৪৩। সিঙ্গাপুরের বিখ্যাত ‘ক্যাথে বিল্ডিং’-এর সামনে জনসমুদ্র। মঞ্চে দাঁড়ালেন দুই ‘বসু’। অশীতিপর বৃদ্ধ রাসবিহারী বসু মাইক হাতে নিলেন। তিনি বললেন, “আমি এতদিন এই আন্দোলনের মশাল বয়ে নিয়ে এসেছি। আজ আমি যোগ্য উত্তরসূরি পেয়েছি। আজ থেকে সুভাষচন্দ্রই তোমাদের নেতা, তোমাদের নেতাজি।” সেই মুহূর্তেই সুভাষচন্দ্র বসু আইএনএ-র সুপ্রিম কম্যান্ডার বা সর্বাধিনায়ক হিসেবে শপথ নিলেন। মৃতপ্রায় ফৌজে যেন প্রাণ ফিরে এল। সৈনিকরা সমস্বরে চিৎকার করে উঠল—”চলো দিল্লি!”
ছাই থেকে ফিনিক্স পাখি: ফৌজের পুনর্গঠন
দায়িত্ব নেওয়ার পরই নেতাজি বুঝলেন, এই বাহিনীকে ব্রিটিশদের মতো আধুনিক অস্ত্রে নয়, লড়তে হবে মনের জোরে। তিনি শুরু করলেন আজাদ হিন্দ ফৌজের আমূল সংস্কার।
- গান্ধী, নেহরু ও আজাদ ব্রিগেড: রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও নেতাজি ছিলেন উদার। তিনি ফৌজের সেরা তিনটি ব্রিগেডের নাম রাখলেন—গান্ধী ব্রিগেড, নেহরু ব্রিগেড এবং আজাদ ব্রিগেড। আর নিজের নামে রাখা হলো ‘সুভাষ ব্রিগেড’।
- রানি অফ ঝাঁসি রেজিমেন্ট: নেতাজি বিশ্বাস করতেন, স্বাধীনতা শুধু পুরুষের অধিকার নয়। তিনি তৈরি করলেন বিশ্বের প্রথম মহিলা কমব্যাট ইউনিট—’রানি অফ ঝাঁসি রেজিমেন্ট’। ডাক্তার লক্ষ্মী স্বামীনাথন (পরে সেহগল) হলেন এর নেত্রী। বন্দুক কাঁধে তুলে নিলেন সাধারণ ঘরের মেয়েরা।
- ধর্ম নিরপেক্ষতা: ব্রিটিশরা ভারতীয় সেনায় ‘জাঠ রেজিমেন্ট’, ‘রাজপুত রেজিমেন্ট’ তৈরি করে বিভাজন করে রেখেছিল। নেতাজি সেই দেওয়াল ভেঙে দিলেন। আজাদ হিন্দ ফৌজে সবাই এক মেসে খেতেন, এক তাঁবুতে শুতেন। সেখানে হিন্দু-মুসলিম-শিখ নয়, পরিচয় ছিল একটাই—’ভারতীয়’। তাদের স্লোগান হলো—”জয় হিন্দ”।
অনাহারের যুদ্ধ ও মোইরাং-এ তেরঙা
১৯৪৩ সালের ২১ অক্টোবর নেতাজি গঠন করলেন ‘আর্জি হুকুমত-এ-আজাদ হিন্দ’ বা স্বাধীন ভারতের অস্থায়ী সরকার। জাপান, জার্মানি-সহ ৯টি দেশ এই সরকারকে স্বীকৃতি দিল। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ জাপানের হাত থেকে স্বাধীন হয়ে ভারতের প্রথম ভূখণ্ড হিসেবে নেতাজির শাসনে এল। তিনি নাম দিলেন ‘শহিদ’ ও ‘স্বরাজ’ দ্বীপ।
১৯৪৪ সাল। শুরু হলো সেই চূড়ান্ত অভিযান—’অপারেশন ইউ-গো’। জাপানি সেনার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আরাকান ও মণিপুরের জঙ্গলে ঝাঁপিয়ে পড়ল আজাদ হিন্দ ফৌজ। পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। খাবার নেই, ওষুধ নেই, ম্যালেরিয়া আর জোকের উপদ্রব। আকাশ থেকে ব্রিটিশরা বোমা ফেলছে। গাছের পাতা আর ঘাস সেদ্ধ করে খেয়ে বেঁচে ছিলেন আমাদের সৈন্যরা। তবুও তাঁরা পিছু হটেননি।
১৪ এপ্রিল, ১৯৪৪। মণিপুরের মোইরাং-এ প্রথমবারের মতো ব্রিটিশদের হটিয়ে ভারতের মাটিতে তেরঙা পতাকা ওড়ালেন আইএনএ-র কর্নেল শৌকত মালিক। ভারতের মাটির গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে কেঁদে ফেলেছিলেন সৈন্যরা। তাঁরা ভেবেছিলেন দিল্লি আর বেশি দূর নয়।
প্রকৃতির ছলনা ও ত্যাগের মহিমা
কিন্তু ইতিহাস সবসময় বিজয়ীর পক্ষে থাকে না। বর্ষা নামল অঝোর ধারায়। জাপানি সাপ্লাই লাইন ভেঙে পড়ল। ব্রিটিশদের বিমান হামলা বাড়ল। খাবার ও ওষুধের অভাবে হাজার হাজার আইএনএ সৈন্য মণিপুরের জঙ্গলে শহিদ হলেন। নেতাজি বাধ্য হলেন পিছু হটার নির্দেশ দিতে।
অনেকে বলেন আজাদ হিন্দ ফৌজ হেরে গিয়েছিল। কিন্তু সত্যিই কি তাই? ১৯৪৫ সালে লাল কেল্লায় যখন আইএনএ অফিসারদের (শাহ নওয়াজ, প্রেম সায়গল, গুরবক্স সিং ধিলোঁ) বিচার শুরু হলো, তখন গোটা ভারত জ্বলে উঠল। ব্রিটিশ রয়্যাল নেভি বিদ্রোহ ঘোষণা করল। ব্রিটিশরা বুঝল, নেতাজি শরীরীভাবে না থাকলেও, তাঁর তৈরি করা আগুনের আঁচ থেকে সাম্রাজ্যকে বাঁচানো অসম্ভব। ১৯৪৭-এর স্বাধীনতা আসলে সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধেরই ফসল।
এক অসমাপ্ত অধ্যায়
আজাদ হিন্দ ফৌজ কোনো বেতনভুক সেনাবাহিনী ছিল না। তাঁরা লড়েছিলেন একমুঠো ভাতের জন্য নয়, লড়েছিলেন একমুঠো স্বাধীনতার জন্য। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এই বাহিনীকে রক্তমাংসের শরীর দিয়ে গড়েননি, গড়েছিলেন ইমোশন বা আবেগ দিয়ে। তাই ২৩শে জানুয়ারি যখন আমরা নেতাজির মূর্তিতে মালা দেব, তখন মনে রাখবেন—এই মানুষটি একা হাতে, শূন্য থেকে এমন এক ফৌজ তৈরি করেছিলেন, যা বিশ্বের মহাশক্তিধর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল। আজাদ হিন্দ ফৌজ আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ইচ্ছেশক্তির চেয়ে বড় কোনো অস্ত্র নেই, আর দেশপ্রেমের চেয়ে বড় কোনো ধর্ম নেই।
সাম্প্রতিক পোস্ট
- ‘ফেলে আসা দোলের স্মৃতি’: কেন উৎসবের দিনে আমাদের পুরনো কথা বেশি মনে পড়ে?
- আপনার রঙের আনন্দ যেন ওদের বিষাদ না হয়: দোলের দিনে পোষ্য ও রাস্তার প্রাণীদের সুরক্ষায় ৫টি জরুরি পদক্ষেপ
- এই ১০টি বাংলা গান প্লেলিস্টে রাখলেই মুহূর্তে জমবে দোলের পার্টি ! রবীন্দ্রসঙ্গীত থেকে হোলি হিটস এক্সক্লুসিভ
- শ্রীচৈতন্যের নবদ্বীপ থেকে রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন: বাংলার দোল উৎসব বিবর্তনের এক অজানা ইতিহাস
- দোল পূর্ণিমা ২০২৬: রাশি অনুযায়ী কোন রঙের আবিরে খুলবে ভাগ্যের দরজা? জানুন, শুভ সময়

