Jahangir Khan Withdraws From Falta By Election: ভোটে বাধা, এফআইআর, আদালতের রক্ষাকবচ এবং দলীয় দূরত্ব— সব বিতর্কের মাঝেই ফলতা পুনর্নির্বাচনের ঠিক আগে ভোটের ময়দান থেকে সরে দাঁড়ালেন জাহাঙ্গীর খান। রাজনৈতিক মহলে এখন একটাই প্রশ্ন, ‘পুষ্পা’ হঠাৎ কেন ঝুঁকে গেল?
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: দক্ষিণ ২৪ পরগণার ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের পুনর্নির্বাচন ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে বড়সড় চাঞ্চল্য। একুশে মে হওয়ার কথা ছিল এই পুনর্নির্বাচন, কিন্তু ভোটের ঠিক আগের দিন কার্যত রাজনৈতিক বোমা ফাটালেন তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গীর খান। তিনি ঘোষণা করলেন, তিনি আর এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন না। ফলে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর চর্চা — এটা কি শুধুই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, নাকি দলের চাপ? নাকি বিজেপির লাগাতার আক্রমণ ও বিতর্কের মুখে ‘পুষ্পা’ শেষ পর্যন্ত সত্যিই ঝুঁকে গেল?
গত ২৯ এপ্রিল ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ চলাকালীন একাধিক অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় গ্রামবাসীদের একাংশ অভিযোগ করেন, ভোটদানে বাধা দেওয়া হয়েছে এবং বিরোধী সমর্থকদের উপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। সেই অভিযোগের তির ঘুরে যায় জাহাঙ্গীর খানের দিকেই। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর পর্যন্ত দায়ের হয়। এরপর জাহাঙ্গীর খান কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন এবং বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের এজলাস থেকে অন্তর্বর্তী রক্ষাকবচ পান। আদালত জানায়, আগামী ২৬ মে পর্যন্ত তাঁকে গ্রেফতার করা যাবে না। তবে একইসঙ্গে আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল — নির্বাচন কমিশনের সমস্ত নির্দেশ মেনে চলতে হবে এবং কাউকে ভোটদানে বাধা দেওয়া যাবে না।
কিন্তু সেই আইনি স্বস্তি পাওয়ার পরও কেন ভোটের ময়দান থেকে সরে দাঁড়ালেন জাহাঙ্গীর? এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক অন্দরে।
‘পুষ্পা কখনও ঝোঁকে না’ — তাহলে হঠাৎ সরে দাঁড়ালেন কেন?
নিজেকে বহুবার ‘পুষ্পা’ বলে উল্লেখ করেছেন জাহাঙ্গীর খান। তাঁর দাবি ছিল, তিনি মাথা নত করেন না। কিন্তু ভোটের প্রচারের শেষ দিনেই তিনি জানিয়ে দেন, তিনি আর রিপোল বা পুনর্নির্বাচনে লড়ছেন না। রাজনৈতিক মহলের মতে, এর পিছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে।
বিজেপির তরফে দীর্ঘদিন ধরেই ফলতা কেন্দ্র নিয়ে ইভিএম কারচুপি, ভোট লুট এবং বিরোধী এজেন্টদের বাধা দেওয়ার অভিযোগ তোলা হচ্ছিল। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও এই কেন্দ্রকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। ভোটের আগের দিন তিনি ফলতায় প্রচার করতে গিয়ে দাবি করেন, “জাহাঙ্গীর খান জানেন তিনি পোলিং এজেন্ট পাবেন না, তাই ভোটে লড়ার সাহস দেখাচ্ছেন না।”
অন্যদিকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, দলের অন্দরেও জাহাঙ্গীর খানকে নিয়ে অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল। কারণ ভোট-পরবর্তী বিতর্ক এবং এফআইআরের ঘটনা তৃণমূলের ভাবমূর্তিতে চাপ ফেলছিল। বিশেষ করে ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্র, যেখানে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, সেই এলাকার অন্তর্গত ফলতা কেন্দ্র নিয়ে কোনও নেতিবাচক বার্তা যাক, তা দল চাইছিল না বলেই মনে করা হচ্ছে।
কুণাল ঘোষের মন্তব্যে বাড়ল জল্পনা
এই ইস্যুতে তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষের মন্তব্যও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি সরাসরি বলেন, “জাহাঙ্গীর খান কেন ভোটে দাঁড়াচ্ছেন না, সেটা তিনিই ভালো বলতে পারবেন। বিজেপি সেখানে কোনও ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে কিনা, সেটাও খতিয়ে দেখা উচিত।”
তবে একইসঙ্গে তিনি এও স্পষ্ট করেন যে, ডায়মন্ড হারবার মডেলের স্রষ্টা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ই এই বিষয়ে শেষ কথা বলবেন। কারণ তিনি ওই এলাকার সাংসদ এবং সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। ফলে দলীয়ভাবে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা তাঁরাই ঠিক করবেন।
রাজনৈতিক মহলের মতে, কুণাল ঘোষের বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে যে জাহাঙ্গীর খানের সঙ্গে দলের একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কারণ তিনি নিজেই বলেন, “যে নিজেকে বস বলে দাবি করত, সে যদি হঠাৎ নিজেকে সরিয়ে নেয়, তাহলে সেটা দলের জন্য খুব ইতিবাচক বার্তা নয়।”
মুখ্যমন্ত্রীর ‘সোনার ফলতা’ স্বপ্নের কথাও বললেন জাহাঙ্গীর
ভোট থেকে সরে দাঁড়ানোর পর জাহাঙ্গীর খান অবশ্য নিজের সিদ্ধান্তকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর দাবি, বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফলতাকে ‘সোনার ফলতা’ হিসেবে গড়ে তুলতে চান। ইতিমধ্যেই এই এলাকার উন্নয়নের জন্য একাধিক বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি চান, আগামী দিনে ফলতার মানুষ ভালো থাকুক, শান্তিতে থাকুক এবং উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাক।
জাহাঙ্গীরের কথায়, “আমি চাই ফলতার মানুষ ভালো থাকুক। মুখ্যমন্ত্রী যেভাবে উন্নয়নের পরিকল্পনা করেছেন, সেটা সফল হোক। আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনও বিতর্কের কারণে সেই উন্নয়নের পথে বাধা হতে চাই না।”
তবে রাজনৈতিক মহলের প্রশ্ন, এটা কি সত্যিই উন্নয়নের স্বার্থে নেওয়া সিদ্ধান্ত? নাকি ক্রমবর্ধমান চাপ, বিতর্ক, আইনি জটিলতা এবং দলীয় অস্বস্তির কারণেই শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হলেন জাহাঙ্গীর খান?
ফলতা এখন রাজ্য রাজনীতির নজরকাড়া কেন্দ্র
ফলতা বিধানসভা কেন্দ্র বরাবরই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকেই সবথেকে বেশি ভোটের লিড পেয়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ফলে এই কেন্দ্রের রাজনৈতিক বার্তা এখন শুধু দক্ষিণ ২৪ পরগণাতেই সীমাবদ্ধ নয়, তা গোটা রাজ্যের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
একদিকে বিজেপির আক্রমণ, অন্যদিকে তৃণমূলের অন্দরমহলের নীরবতা — সব মিলিয়ে ফলতার পুনর্নির্বাচনের আগে জাহাঙ্গীর খানের সরে দাঁড়ানো এখন রাজ্য রাজনীতির অন্যতম বড় চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে।

