Makhan Lal Sarkar BJP: শুভেন্দু অধিকারীর শপথের দিন মঞ্চে এক আবেগঘন মুহূর্তের সাক্ষী থাকল ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড। কে এই বর্ষীয়ান নেতা, যাঁর পা ছুঁয়ে প্রণাম করে পরম শ্রদ্ধায় চাদর পরিয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী? জানুন তাঁর অবিশ্বাস্য ইতিহাস।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: আজ এক ঐতিহাসিক দিনের সাক্ষী থাকল তিলোত্তমা কলকাতা। ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে (Brigade Parade Ground) যখন বাংলার প্রথম বিজেপি (BJP) সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন শুভেন্দু অধিকারী, তখন মঞ্চে ঘটল এক অভূতপূর্ব ও আবেগঘন ঘটনা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) হঠাৎই মঞ্চে উপস্থিত এক ৯৮ বছরের বৃদ্ধের কাছে এগিয়ে যান, তাঁকে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরেন এবং তাঁর পা ছুঁয়ে প্রণাম করেন। শুধু তাই নয়, সস্নেহে ও পরম শ্রদ্ধায় সেই বর্ষীয়ান মানুষটির গায়ে একটি চাদর পরিয়ে দেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। উপস্থিত হাজার হাজার জনতা তখন ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগানে মুখরিত।
সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে চায়ের আড্ডা, সর্বত্র এখন একটাই প্রশ্ন— কে এই বৃদ্ধ? যাঁকে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এতটা সম্মান প্রদর্শন করলেন? এই মানুষটির নাম মাখনলাল সরকার (Makhan Lal Sarkar)। তিনি শিলিগুড়ির (Siliguri) বাসিন্দা এবং ভারতীয় জনতা পার্টির একেবারে শুরুর দিকের একজন ঘাসরুট স্তরের কর্মী (Grassroots worker)। আসুন, আজ জেনে নিই এই বর্ষীয়ান নেতার এক রোমাঞ্চকর ও ত্যাগী রাজনৈতিক জীবনের অজানা ইতিহাস।
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ছায়াসঙ্গী ও কাশ্মীরে কারাবাস
মাখনলাল সরকার কেবল একজন সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী নন, তিনি স্বাধীন ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের (Nationalist movement) এক জীবন্ত ইতিহাস। ৯৭-৯৮ বছর বয়সী এই বৃদ্ধ জীবনের অধিকাংশ সময়টাই উৎসর্গ করেছেন দেশ ও দশের সেবায়। তিনি ছিলেন ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের (Syama Prasad Mookerjee) অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী বা ছায়াসঙ্গী। এমনকি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবনের শেষ যাত্রাতেও তিনি তাঁর সুযোগ্য সঙ্গী ছিলেন।
১৯৫২ সালে যখন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কাশ্মীরে ভারতের জাতীয় পতাকা (Indian tricolour) উত্তোলনের দাবিতে এক ঐতিহাসিক আন্দোলন শুরু করেছিলেন, সেই সময় মাখনলাল বাবু তাঁর সঙ্গে কাশ্মীরে পাড়ি দেন। সেই উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পুলিশ তাঁদের প্রবল বাধা দেয় এবং তিনি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গেই কাশ্মীরে গ্রেপ্তার হন (Arrested in Kashmir)। স্বাধীন ভারতের অখণ্ডতা রক্ষার সেই রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে তাঁর এই অকুতোভয় অংশগ্রহণ তাঁকে দলের অন্দরে চিরকাল এক আলাদা শ্রদ্ধার জায়গা এনে দিয়েছে।
কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে দেশাত্মবোধক গান গাওয়ার জেদ!
মাখনলাল বাবুর সাহসিকতা ও জেদের আরও একটি অবিশ্বাস্য গল্প রয়েছে। রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya) সম্প্রতি এই বর্ষীয়ান নেতার একটি অজানা ঘটনার কথা প্রকাশ্যে আনেন। জানা যায়, একবার দিল্লিতে একটি দেশাত্মবোধক বা জাতীয়তাবাদী গান গাওয়ার তথাকথিত ‘অপরাধে’ দিল্লি পুলিশ (Delhi Police) তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল। তাঁকে যখন আদালতে বিচারকের সামনে পেশ করা হয়, তখন তাঁকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছিল। কিন্তু মাখনলাল সরকার তো সহজে হার মানার পাত্র নন!
তিনি আদালতে দাঁড়িয়ে বিচারকের চোখে চোখ রেখে ক্ষমা চাইতে সরাসরি অস্বীকার করেন। শুধু তাই নয়, যে গানটি গাওয়ার জন্য তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ভরা আদালতে তিনি সেই একই গান আবার দৃপ্ত কণ্ঠে গেয়ে শোনান। তাঁর এই অদম্য দেশপ্রেম এবং সাহস দেখে বিচারক এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তিনি তাঁকে শুধু সসম্মানে মুক্তিই দেননি, বরং বাড়ি ফেরার জন্য একটি ফার্স্ট-ক্লাস ট্রেনের টিকিট (First-class ticket) এবং পথখরচ হিসেবে ১০০ টাকা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে তাঁর নিজস্ব আদর্শের প্রতি ঠিক কতটা অবিচল নিষ্ঠা ছিল।
উত্তরবঙ্গে বিজেপির উত্থান ও মাখনলালের অবদান
পরবর্তীকালে যখন ১৯৮০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) গঠিত হয়, তখন এই সংগঠনকে বাংলায় শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানোর জন্য যাদের ওপর ভরসা করা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে মাখনলাল সরকার ছিলেন অন্যতম। তাঁকে তৎকালীন পশ্চিম দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি এবং দার্জিলিং জেলার সাংগঠনিক কোঅর্ডিনেটর (Organisational coordinator) হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়।
দায়িত্ব পেয়ে তিনি আক্ষরিক অর্থেই গ্রামে গ্রামে ঘুরে সংগঠনের কাজ শুরু করেন। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমে মাত্র এক বছরের মধ্যেই ওই অঞ্চলগুলোতে প্রায় ১০ হাজার নতুন সদস্য বিজেপিতে যোগদান করেন। তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতার ওপর ভরসা করে ১৯৮১ সাল থেকে শুরু করে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত, টানা সাত বছর তাঁকে জেলা সভাপতির (District President) পদে বহাল রাখা হয়। সেই সময়ে দলের নিয়ম অনুযায়ী কোনো নেতাকে সাধারণত দুই বছরের বেশি একই পদে রাখা হতো না। কিন্তু মাখনলালবাবুর ক্ষেত্রে এই দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব একটি বিরল এবং উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম (Rare achievement) হিসেবে পরিগণিত হয়। কোনো পদের লালসা বা প্রচারের আলো ছাড়াই তিনি নীরবে সংগঠনের কাজ করে গেছেন আজীবন।
নিঃস্বার্থ কর্মযোগীর প্রতি প্রধানমন্ত্রীর এই সম্মান কেন?
আজকের এই হাই-ভোল্টেজ রাজনৈতিক আবহে, যেখানে ক্ষমতা ও প্রচারের আলোয় থাকার জন্য সবাই ব্যস্ত, সেখানে মাখনলাল সরকারের মতো একজন নিঃস্বার্থ কর্মীকে প্রধানমন্ত্রী যেভাবে সম্মান জানালেন, তা এক গভীর রাজনৈতিক ও মানবিক বার্তা বহন করে। শুভেন্দু অধিকারীর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, জে পি নাড্ডা থেকে শুরু করে একাধিক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও হেভিওয়েট নেতারা। কিন্তু সেই সবার মাঝখানেও প্রধানমন্ত্রী মোদী ভুলে যাননি দলের সেই আদি এবং অকৃত্রিম কাণ্ডারীকে। পা ছুঁয়ে প্রণাম করা এবং পরম যত্নে চাদর পরিয়ে সম্মান জানানোর মধ্যে দিয়ে আসলে বিজেপি তাদের লক্ষ লক্ষ তৃণমূল স্তরের কর্মীদের এই বার্তাই দিল যে, দল কখনোই তাঁদের অবদান ভোলে না।
দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে আজ যখন বিজেপি রাজ্যে প্রথম সরকার গড়ল, তখন সেই জয়ের নেপথ্যে মাখনলাল সরকারের মতো অগণিত নাম-না-জানা কর্মীর ঘাম ও চোখের জল মিশে আছে।
আজকের এই ঐতিহাসিক দিনে একজন ৯৮ বছরের নিঃস্বার্থ রাজনৈতিক কর্মীর প্রতি এই সম্মান জ্ঞাপন আপনার কেমন লাগল? এভাবেই কি পুরনো দিনের ত্যাগী কর্মীদের সম্মান জানানো উচিত বলে আপনি মনে করেন? আপনার মূল্যবান মতামত আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া পেজে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না। রাজনীতি ও সমাজের এমন আরও অজানা ও আবেগঘন খবর পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন NewsOffBeat-এ।
Most Viewed Posts
- ‘মায়া ভরা রাতি’ আবার ফিরছে—অরিজিৎ সিং-এর কণ্ঠে নতুন করে জেগে উঠবে এক চিরন্তন গান
- ২০২৬-এ মেষ রাশির জন্য আসছে বড় মোড় │ Aries Horoscope 2026 Full Prediction
- পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে তরুণ তুর্কিদের ঝড়! ভোটের ময়দানে কতটা প্রভাব ফেলছে যুব মুখ?
- বিতর্ক পিছু ছাড়েনি, মামলা মাথায় নিয়েই ভোটের ময়দানে! তৃণমূল-বিজেপির হেভিওয়েটদের ভোটযুদ্ধ ঘিরে উত্তাপ
- বাড়িতে রাখুন এই নয় গাছ, সৌভাগ্য ফিরবেই

