Mosquito Evolution: ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়া ছড়ানো মশা কবে থেকে মানুষের রক্ত খেতে শুরু করল? ভারত ও বিদেশের একদল বিজ্ঞানীর যুগান্তকারী জিনোমিক গবেষণায় উঠে এল চমকে দেওয়ার মতো তথ্য। আধুনিক মানুষের (Homo sapiens) উদ্ভবের আগেই, ‘হোমো ইরেক্টাস’-এর আমল থেকে মশার সাথে মানুষের এই রক্তক্ষয়ী লড়াই চলছে।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: দৃশ্যপট: প্রায় ১৮ লক্ষ বছর আগের এক গভীর আদিম অরণ্য। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ঘন জঙ্গলে রাত নেমেছে। গাছের কোটরে বা গুহার অন্ধকারে ঘুমিয়ে আছে আমাদের আদিমতম পূর্বপুরুষদের একজন—যাঁকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘হোমো ইরেক্টাস’ (Homo erectus)। ঠিক সেই সময়ে, অন্ধকারের বুক চিরে উড়ে এল একটি ছোট্ট পতঙ্গ। নিঃশব্দে বসল সেই আদিম মানুষের চামড়ার ওপর, আর শুষে নিল গরম রক্ত।
আজ রাতে আপনার কানের কাছে যে মশাটি ভনভন করছে, সে হয়তো আপনার বিরক্তির কারণ। কিন্তু আপনি কি জানেন, মশার এই মানুষের রক্ত খাওয়ার অভ্যাসটি কোনো সাম্প্রতিক ঘটনা নয়? আধুনিক মানুষ বা ‘হোমো স্যাপিয়েন্স’ পৃথিবীতে আসার বহু আগে থেকেই মশা মানুষের রক্ত পান করতে শিখে গিয়েছিল! উত্তর-পূর্ব ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মশা নিয়ে করা এক সাম্প্রতিক জিন-ভিত্তিক গবেষণায় এমনই এক রোমাঞ্চকর তথ্য উঠে এসেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, ম্যালেরিয়া জীবাণু বহনকারী নির্দিষ্ট কিছু মশার প্রজাতি আজ থেকে প্রায় ১.৮ মিলিয়ন বা ১৮ লক্ষ বছর আগে থেকেই মানুষের রক্ত খাওয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছিল। আজ নিউজ অফবিট-এর এই বিশেষ বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে আমরা ডুব দেব বিবর্তনের সেই গভীর অতীতে, যেখানে লুকিয়ে আছে মশা ও মানুষের এই চিরন্তন শত্রুতার বৈজ্ঞানিক ইতিহাস।
গবেষণার নেপথ্যে: জিনোমের সুতোয় বাঁধা ইতিহাস
আমেরিকার ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটির (Vanderbilt University) জীববিজ্ঞানী এবং পোস্টডক্টোরাল গবেষক উপাসনা সিংয়ের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক গবেষক দল এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটি করেছেন। এই দলে যুক্তরাজ্যের ম্যাঞ্চেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় (University of Manchester) এবং ভারতের ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ (ICMR)-এর বিজ্ঞানীরাও যুক্ত ছিলেন।
তাঁরা উত্তর-পূর্ব ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ম্যালেরিয়া বাহক ‘অ্যানোফিলিস বাইমাই’ (Anopheles baimaii)-সহ ১১টি অ্যানোফিলিস প্রজাতির মোট ৩৮টি মশার ডিএনএ (DNA) সিকোয়েন্সিং করেন। ডিএনএ সিকোয়েন্স, অত্যাধুনিক কম্পিউটার মডেল এবং ডিএনএ মিউটেশনের হারের ওপর ভিত্তি করে তাঁরা মশার বিবর্তনের একটি বিশাল ‘ফ্যামিলি ট্রি’ বা বংশলতিকা তৈরি করেন। এই গবেষণাপত্রটি সম্প্রতি বিখ্যাত বিজ্ঞান পত্রিকা ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’ (Scientific Reports)-এ প্রকাশিত হয়েছে।
উপাসনা সিং সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, “অ্যানোফিলিস প্রজাতির মশাদের মধ্যে মানুষের রক্ত খাওয়ার প্রবণতা আমাদের আগের ধারণার চেয়ে অনেক আগে উদ্ভূত হয়েছিল। এবং মজার বিষয় হলো, এটি শারীরবৃত্তীয়ভাবে আধুনিক মানুষের (anatomically modern humans) আগমনের সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবেই বিকশিত হয়েছিল”।
আধুনিক মানুষ নয়, মশার প্রথম শিকার ছিল ‘হোমো ইরেক্টাস’
বিজ্ঞান বলছে, মালয় উপদ্বীপ, সুমাত্রা, জাভা এবং বোর্নিও অঞ্চলে আধুনিক মানুষের আগমন ঘটেছিল আজ থেকে মাত্র ৭৬,০০০ থেকে ৬৩,০০০ বছর আগে। কিন্তু অ্যানোফিলিস মশা তারও বহুকাল আগে থেকে মানুষের রক্তে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। এর কারণ কী? গবেষকরা প্রমাণ পেয়েছেন যে, আজ থেকে প্রায় ১৮ লক্ষ বছর আগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মানুষের আরেক আদিম প্রজাতি ‘হোমো ইরেক্টাস’-এর পদার্পণ ঘটেছিল, এবং ঠিক সেই সময়ের সাথেই মশার বিবর্তনের এই পরিবর্তনের হুবহু মিল পাওয়া যায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পাওয়া ১৮ লক্ষ বছর আগের প্রাচীন পাথরের হাতিয়ারগুলিও প্রমাণ করে যে হোমো ইরেক্টাসরা সেখানে বাস করত। মশার এই বিবর্তন মূলত দুটি ধাপে ঘটেছিল বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন:
আজ থেকে প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন থেকে ২.৬ মিলিয়ন বছর আগে, যখন মাটিতে বসবাসকারী প্রজাতির সংখ্যা বাড়তে থাকে, তখন মশারাও গাছের ডালে থাকা বানরদের রক্ত খাওয়ার বদলে মাটিতে থাকা প্রাণীদের দিকে আকৃষ্ট হতে শুরু করে।
এরপর, বিবর্তনের ধারায় মশাদের জিনগত পরিবর্তন ঘটে এবং তারা হোমো ইরেক্টাস-এর মতো আদিম মানুষের শরীরের গন্ধের প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট হতে শুরু করে, যা ঘটেছিল প্রায় ১৮ লক্ষ বছর আগে।
ডেঙ্গু বা জিকা ছড়ানো মশাদের গল্পটা কিন্তু আলাদা!
এই গবেষণার অন্যতম চমকপ্রদ দিক হলো বিভিন্ন প্রজাতির মশার মধ্যে তুলনামূলক বিশ্লেষণ। অ্যানোফিলিস মশা যেখানে ১৮ লক্ষ বছর ধরে মানুষের রক্ত খাচ্ছে, সেখানে অন্যান্য প্রাণঘাতী রোগ ছড়ানো মশারা কিন্তু এই খেলায় অনেক নতুন।
উপাসনা সিং জানান, ডেঙ্গু ও জিকা ভাইরাস ছড়ানো ‘এডিস ইজিপ্টাই’ (Aedes aegypti) এবং ‘কিউলেক্স পিপিএন্স’ (Culex pipiens)-এর মতো মশারা মাত্র ১০,০০০ বছর আগে মানুষের রক্ত খেতে শুরু করে। এই সময়কালটি আধুনিক মানুষের কৃষিকাজ শুরু করা এবং জনসংখ্যার ব্যাপক বিস্তারের (demographic expansion) সাথে মিলে যায়।
আগের গবেষণাগুলো থেকে জানা যায় যে, পৃথিবীতে মশার উদ্ভব হয়েছিল ২০০ মিলিয়ন বা ২০ কোটি বছরেরও আগে, এবং তারা কোটি কোটি বছর ধরে বিভিন্ন মেরুদণ্ডী প্রাণীর রক্ত খেয়ে বেঁচে ছিল। পৃথিবীতে প্রায় ৩,৫০০ প্রজাতির মশা থাকলেও, তার মধ্যে খুব সামান্য একটি অংশই মানুষের রক্ত পান করে।
বিজ্ঞানীদের এই আবিষ্কার শুধু ইতিহাসের পাতায় লেখা একটি রোমাঞ্চকর তথ্য নয়, এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে।
মশাদের জিনের এই ইতিহাস আদিম মানুষের জীবনযাপন সম্পর্কে নতুন আলো ফেলছে। উপাসনা সিং বলেন, “এই অঞ্চলগুলিতে আদিম হোমিনিডদের (hominin) বসবাসের প্রমাণের পাশাপাশি আমাদের ডেটা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ইঙ্গিত দেয়। তা হলো—সেই আদিম মানুষের জনসংখ্যা এতটাই ঘন ও বড় ছিল যে, তা মশাদের বিবর্তনের ওপর একটি ‘সিলেক্টিভ প্রেশার’ বা চাপ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল”।
বিশ্ব জুড়ে ম্যালেরিয়া আজও এক বিশাল জনস্বাস্থ্য সংকট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বব্যাপী ম্যালেরিয়ায় প্রায় ২৪৯ মিলিয়ন মানুষ আক্রান্ত হন এবং ৬,০৮,০০০-এরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। মশা কীভাবে মানুষের গন্ধের প্রতি আকৃষ্ট হলো, সেই জিনগত বিবর্তনের পথটি বুঝতে পারলে ভবিষ্যতে মশা নিয়ন্ত্রণের আরও উন্নত এবং লক্ষ্যভিত্তিক কৌশল আবিষ্কার করা সম্ভব হবে। ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জাপানি এনসেফালাইটিস এবং ওয়েস্ট নাইল ফিভারের মতো একাধিক ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই জ্ঞান হাতিয়ার হতে পারে।
আমরা প্রায়ই ভাবি মানুষই এই পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী জীব। কিন্তু বিবর্তনের ইতিহাস বলছে, একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পতঙ্গ লক্ষ লক্ষ বছর ধরে আমাদের অস্তিত্বের সাথে নিজেকে নিখুঁতভাবে জড়িয়ে নিয়েছে। ১৮ লক্ষ বছর আগের সেই হোমো ইরেক্টাস হয়তো আজ আর পৃথিবীতে নেই, কিন্তু তার রক্তের স্বাদ মশার জিনে আজও অমর হয়ে আছে। আধুনিক বিজ্ঞান সেই প্রাচীন রহস্যেরই জট খুলল।
সাম্প্রতিক পোস্ট
- স্মার্ট সিটির কর্পোরেট চাকচিক্যের আড়ালে ‘বিষ-জল’! আইটি হাবের ঠিকানায় সাপুরজির ই-ব্লকে হাহাকার
- ভাগ্য বদলাতে চান? গ্রহের প্রতিকার হিসেবে এই রঙের পোশাকই হতে পারে চাবিকাঠি!
- টি-২০ বিশ্বকাপে ভারতের জয় অব্যাহত │ লণ্ডভণ্ড চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান
- মঞ্চে উঠলেই ভয়? │ পাবলিক স্পিকিং ভীতি কাটানোর ৫টি কৌশল জানুন এখনই
- গায়ে হঠাৎ র্যাশ? মিথ ভেঙে জানুন, চিকেন পক্সের এই লক্ষণগুলো

