হিটলারের সঙ্গে হাত মেলানো থেকে কংগ্রেসের সভাপতির পদ ত্যাগ—দেশপ্রেম নাকি জেদ? জানুন সুভাষচন্দ্র বসুর জীবনের এমন ৫টি মোড়, যা নিয়ে আজও ঐতিহাসিকদের মধ্যে চলে তর্ক এবং Netaji Controversy-র চুলচেরা বিশ্লেষণ।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক : আগামীকাল ২৩শে জানুয়ারি। বাঙালির ক্যালেন্ডারে লাল কালিতে দাগানো এক আবেগের দিন। পাড়ায় পাড়ায় বাজবে “কদম কদম বাড়ায়ে যা”, মূর্তিতে পড়ানো হবে গাঁদা ফুলের মালা। আমরা সবাই জানি তিনি ‘দেশনায়ক’, তিনি ‘নেতাজি’।
কিন্তু ইতিহাসের আয়নার সামনে দাঁড়ালে দেখা যায়, এই মহামানবের পথচলা মোটেই মসৃণ ছিল না। তাঁকে শুধু ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়তে হয়নি, লড়তে হয়েছিল নিজের দেশের নেতাদের বিরুদ্ধে, এমনকি বিশ্ব রাজনীতির জটিল স্রোতের বিরুদ্ধেও। তাঁর নেওয়া এমন কিছু সিদ্ধান্ত ছিল, যা সেই সময়ে দাঁড়িয়ে অনেকের কাছে মনে হয়েছিল ‘হঠকারী’, ‘ভুল’ কিংবা ‘অনৈতিক’।
আরও পড়ুন : তরুণদের আজও অনুপ্রাণিত করে নেতাজির কোন ৫টি গুণ?
গান্ধীজির অহিংসা যখন ভারতের মূলমন্ত্র, তখন নেতাজি বেছে নিয়েছিলেন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পথ। গণতন্ত্রের পূজারি হয়েও হাত মিলিয়েছিলেন হিটলারের মতো একনায়কের সঙ্গে। কেন তিনি এমনটা করেছিলেন? এই সিদ্ধান্তগুলো কি ভুল ছিল? নাকি সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা এক রাষ্ট্রনেতার ‘মাস্টারস্ট্রোক’?
নেতাজির জন্মজয়ন্তীর প্রাক্কালে আজ আমরা আলো ফেলব তাঁর জীবনের সেই ধূসর অধ্যায়গুলোর ওপর। জানব তাঁর নেওয়া ৫টি বিতর্কিত সিদ্ধান্তের পেছনের আসল গল্প।
৩. মহাত্মার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ: কংগ্রেস সভাপতি পদ ত্যাগ (The Tripuri Crisis, 1939)
১৯৩৯ সাল। ত্রিপুরী কংগ্রেসের অধিবেশন। দৃশ্যপটটা ছিল অত্যন্ত নাটকীয়। একদিকে পট্টভি সীতারামাইয়া (যাকে মহাত্মা গান্ধী সমর্থন করছিলেন), আর অন্যদিকে অসুস্থ শরীরে স্ট্রেচারে করে আসা সুভাষচন্দ্র বসু। সবাই জানতেন, সীতারামাইয়া হারা মানে খোদ গান্ধীজির হারা। তবুও সুভাষ পিছু হটেননি। তিনি নির্বাচনে লড়লেন এবং জিতলেন। গান্ধীজি প্রকাশ্যে বললেন, “পট্টভির হার আমারই হার।”
বিতর্ক: অনেকে বলেন, সুভাষচন্দ্র যদি সেদিন একটু নমনীয় হতেন বা গান্ধীজির সঙ্গে সমঝোতা করতেন, তবে হয়তো তাঁকে কংগ্রেস ছাড়তে হতো না। দেশভাগ হয়তো আটকানো যেত। নেতাজির যুক্তি: সুভাষের কাছে ব্যক্তির চেয়ে আদর্শ বড় ছিল। তিনি বুঝেছিলেন, নরমপন্থী কংগ্রেস দিয়ে স্বাধীনতা আসবে না। ব্রিটিশদের তাড়াতে হলে চরমপন্থী আন্দোলনের দরকার। তাই তিনি পদত্যাগ করে ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ গঠন করেন। এই সিদ্ধান্তই তাঁকে ভারতীয় রাজনীতির মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, কিন্তু তাঁকে করে তোলে আপামর ভারতবাসীর নেতা।
৩. শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু: হিটলারের সঙ্গে হাত মেলানো (The Axis Connection)
নেতাজির জীবনের সবথেকে বিতর্কিত এবং সমালোচিত সিদ্ধান্ত হলো নাৎসি জার্মানি এবং জাপানের সাহায্য নেওয়া। ১৯৪১ সালে দেশ থেকে পালিয়ে তিনি সোজা বার্লিনে গিয়ে অ্যাডলফ হিটলারের সঙ্গে দেখা করেন। সেই সময় হিটলার মানেই ইহুদি নিধন, হিটলার মানেই ফ্যাসিজম। সারা বিশ্ব যখন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়ছে, তখন ভারতের মুক্তিপাগল ছেলেটি হাত মেলাচ্ছেন সেই শয়তানের সঙ্গে!
বিতর্ক: আজও অনেক বামপন্থী এবং পশ্চিমী ঐতিহাসিক নেতাজিকে ‘ফ্যাসিস্টদের বন্ধু’ বলে দাগিয়ে দেন। তাঁদের প্রশ্ন, হিটলার জিতলে ভারত কি সত্যিই স্বাধীন হতো? নাকি জার্মানির উপনিবেশ হতো? নেতাজির যুক্তি: নেতাজি রাজনীতিতে আবেগের ধার ধারতেন না। তিনি চাণক্যনীতি মেনে চলতেন—”শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু।” তিনি জানতেন, ব্রিটিশদের হারানোর ক্ষমতা একা ভারতের নেই। তাই তিনি সাপ হয়ে বাঘের (ব্রিটিশ) পায়ে ছোবল মারতে চেয়েছিলেন। তিনি স্পষ্ট বলেছিলেন, “আমি ভারতের স্বাধীনতার জন্য শয়তানের সঙ্গেও হাত মেলাতে পারি।”
৩. ভাই যখন ভাইয়ের বুকে গুলি চালায়: আইএনএ বনাম ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মি
আজাদ হিন্দ ফৌজ যখন ইম্ফল ও কোহিমার দিকে এগিয়ে আসছিল, তখন উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে ছিল ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মি। অর্থাৎ, এক ভারতীয়র বন্দুকের নল আরেক ভারতীয়র দিকে! নেতাজির নির্দেশে আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্যরা ব্রিটিশ বাহিনীর ওপর গুলি চালিয়েছিল। সেই ব্রিটিশ বাহিনীতে থাকা ভারতীয় জওয়ানরাও মারা গিয়েছিল।
বিতর্ক: নিজের দেশের মানুষের রক্ত ঝরানো কি কোনো দেশপ্রেমিকের কাজ? নেতাজির যুক্তি: নেতাজির আশা ছিল, আইএনএ-কে দেখলেই ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির ভারতীয় সৈন্যরা বিদ্রোহ করবে এবং তাঁর দলে যোগ দেবে। বাস্তবেও তাই হয়েছিল। তবে যুদ্ধের ময়দানে যেটুকু রক্তপাত হয়েছিল, তা ছিল স্বাধীনতার বেদীতে অনিবার্য বলিদান। তিনি বিশ্বাস করতেন, দাসত্ব করে বেঁচে থাকার চেয়ে দেশের জন্য ভাই ভাইয়ের বিরুদ্ধে লড়া শ্রেয়।
৩. গোপন প্রেম ও বিবাহ: এমিলি শেঙ্কল (The Secret Marriage)
সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন আজীবন সন্ন্যাসী ভাবাপন্ন। দেশই তাঁর ধ্যান, দেশই তাঁর জ্ঞান। কিন্তু ভিয়েনাতে থাকাকালীন তিনি প্রেমে পড়েন তাঁর অস্ট্রিয়ান সেক্রেটারি এমিলি শেঙ্কলের। ১৯৩৭ সালে তাঁরা গোপনে বিয়ে করেন এবং তাঁদের একটি কন্যা সন্তানও হয়—অনিতা বসু। এই খবরটি দীর্ঘকাল ভারতবাসী এমনকি তাঁর পরিবারের কাছেও গোপন ছিল।
বিতর্ক: অনেকে প্রশ্ন তোলেন, যিনি দেশের জন্য সবকিছু ত্যাগ করেছেন, তিনি কেন বিদেশের মাটিতে সংসার পাতলেন? কেন এই সম্পর্ক গোপন রাখলেন? নেতাজির যুক্তি: এটি ছিল তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের এক মানবিক দিক। ব্রিটিশ গোয়েন্দারা যাতে তাঁর পরিবারকে হেনস্থা করতে না পারে, হয়তো সেজন্যই তিনি এই গোপনীয়তা বজায় রেখেছিলেন। এমিলি নিজেও আজীবন ত্যাগ স্বীকার করে গেছেন। তিনি জানতেন তাঁর স্বামী কোনো সাধারণ মানুষ নন, তিনি আগুনের পরশমণি।
৩. অন্তর্ধান রহস্য: প্লেন ক্র্যাশ নাকি সন্ন্যাস? (The Disappearance)
১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট। তাইহোকু বিমানবন্দর। জাপানি বোমারু বিমানে করে নেতাজি পাড়ি দিলেন অজ্ঞাত গন্তব্যে। এরপর খবর এল—বিমান দুর্ঘটনায় তিনি মারা গেছেন। কিন্তু এই ‘মৃত্যু’ মেনে নেওয়াটাই ছিল তাঁর জীবনের শেষ বিতর্কিত অধ্যায়। তিনি কি সত্যিই মারা গিয়েছিলেন? নাকি তিনি নিজেই চেয়েছিলেন পৃথিবী তাঁকে মৃত ভাবুক?
বিতর্ক: গুমনামী বাবা থেকে শুরু করে রাশিয়ার জেল—নেতাজির শেষ জীবন নিয়ে হাজারও তত্ত্ব। ভারত সরকার গঠিত মুখার্জি কমিশন বলেছিল, তাইহোকুতে সেদিন কোনো বিমান দুর্ঘটনাই ঘটেনি। তাহলে নেতাজি কোথায় গেলেন? তিনি কি ইচ্ছা করেই আত্মগোপন করেছিলেন? বিশ্লেষণ: যদি তিনি আত্মগোপন করে থাকেন, তবে সেটাও ছিল এক কঠিন সিদ্ধান্ত। হয়তো তিনি চেয়েছিলেন ভারত স্বাধীন হওয়ার পর কোনো গৃহযুদ্ধ না হোক। নেহরু বা প্যাটেলের সঙ্গে ক্ষমতার লোভে যাতে সংঘাত না বাধে, তাই হয়তো এই মহানায়ক নিজেকে ইতিহাসের আড়ালে সরিয়ে নিয়েছিলেন।
আজ ৮৫ বছর পর এসি রুমে বসে নেতাজির ভুল ধরা খুব সহজ। কিন্তু ১৯৪০-এর দশকে দাঁড়িয়ে, যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য অস্ত যেত না, তখন ওই সিদ্ধান্তগুলো নিতে বুকের পাটা লাগত। হয়তো হিটলারের সাহায্য নেওয়া ভুল ছিল, হয়তো কংগ্রেস ছাড়া ভুল ছিল—কিন্তু তাঁর উদ্দেশ্য বা ‘ইনটেনশন’ নিয়ে কোনো বিতর্ক হতে পারে না। তিনি যা করেছিলেন, ভারতের জন্য করেছিলেন। তাঁর নেওয়া বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোই প্রমাণ করে যে, তিনি কোনো মাটির পুতুল বা দেবতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন রক্তমাংসের এক মানুষ, যিনি দেশের জন্য নিজের নাম, যশ, এমনকি নিজের অস্তিত্বকেও বাজি রাখতে পিছপা হননি।
নেতাজি বিতর্কের ঊর্ধ্বে নন, কিন্তু তিনি সন্দেহের ঊর্ধ্বে। তাঁর মৃত্যুহীন প্রাণ আজও আমাদের বলে—”আমি আছি, আমি থাকব।”
(আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাশিফল আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল WhatsApp চ্যানেলে যোগ দিন! সবচেয়ে আগে পান জ্যোতিষ, অফবিট নিউজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনধারা ও অফবিট এক্সক্লুসিভ আপডেট —আমাদের WhatsApp Channel-এ যোগ দিন)
Most Viewed Posts
- ২০২৬-এ মেষ রাশির জন্য আসছে বড় মোড় │ Aries Horoscope 2026 Full Prediction
- মোটা হবেন না, মিষ্টি খান নিশ্চিন্তে │ Guilt-Free Sweets for Diwali Delight
- ‘মায়া ভরা রাতি’ আবার ফিরছে—অরিজিৎ সিং-এর কণ্ঠে নতুন করে জেগে উঠবে এক চিরন্তন গান
- বাড়িতে রাখুন এই নয় গাছ, সৌভাগ্য ফিরবেই
- Dharmendra death: ধর্মেন্দ্রর জীবনের এই ১১টি তথ্য অনেকেই জানেন না │ 11 Untold Facts About Dharmendra

