New Market Hotel Fire নিয়ে তদন্তের পাশাপাশি হোটেলের অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ও বাণিজ্যিক ছাড়পত্র নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন। ফিরহাদ হাকিমের দাবি, কাউকে দোষারোপ নয়, ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা ঠেকাতে দেশজুড়ে নির্দিষ্ট নিরাপত্তা বিধি ও তৃতীয় পক্ষের অডিট জরুরি।
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: নিউ মার্কেটের হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৮ জনের মৃত্যুর পর এবার প্রশ্ন উঠেছে হোটেলটির অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক লাইসেন্স নিয়ে। ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে বর্তমান পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল হোটেলটির অনুমোদন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, এমন ঘিঞ্জি একটি ভবনে কীভাবে হোটেল চালানোর প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমতি মিলল? কীভাবে দেওয়া হল বাণিজ্যিক লাইসেন্স?
এই পরিস্থিতিতে প্রাক্তন পুরমন্ত্রী ও তৃণমূল বিধায়ক ফিরহাদ হাকিম অবশ্য সরাসরি রাজনৈতিক দোষারোপের পথে না গিয়ে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা ঠেকাতে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেছেন। তাঁর বক্তব্য, কোনো একটি সরকার বা ব্যক্তিকে দোষারোপ করে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং হোটেল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা যাচাইয়ের জন্য আলাদা ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা তৈরি করা দরকার। একই সঙ্গে তিনি মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে এই ঘটনার তদন্তে একটি বিশেষ দল গঠনের কথাও জানিয়েছেন।
হোটেলের অনুমতি কীভাবে, প্রশ্ন পুরমন্ত্রীর
নিউ মার্কেটের অগ্নিকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে বর্তমান পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল হোটেলটির পরিকাঠামো এবং অনুমোদন ব্যবস্থা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হোটেলের ঘরগুলির আকার অত্যন্ত ছোট, এক একটি ঘরে প্রায় ছয়জন করে থাকার ব্যবস্থা ছিল এবং আগুন লাগার পরে বেরিয়ে আসার পথও যথেষ্ট সরু ছিল।
হোটেলটির ঘরভাড়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে মাথাপিছু প্রায় আড়াইশো টাকা এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণহীন ঘরে মাথাপিছু প্রায় দেড়শো টাকা ভাড়া নেওয়া হত। একই ঘরে একাধিক মানুষ থাকতেন। ফলে এতটা ঘিঞ্জি পরিবেশে অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।
পুরমন্ত্রীর মূল প্রশ্ন, এমন একটি হোটেল কীভাবে প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন পেল? বাণিজ্যিক লাইসেন্স দেওয়ার আগে ভবনের নিরাপত্তা, অগ্নিনিরাপত্তা এবং অন্যান্য পরিকাঠামো খতিয়ে দেখা হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে পুরমন্ত্রী কার্যত আগের সরকারের আমলের প্রশাসনিক ব্যবস্থার দিকে প্রশ্ন তুলেছেন। একই সঙ্গে প্রাক্তন পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমের দিকেও তাঁর বক্তব্যের রাজনৈতিক ইঙ্গিত ছিল বলে মনে করা হচ্ছে।
‘কাউকে দোষারোপ করে কোনো লাভ নেই’, পাল্টা বার্তা ফিরহাদ হাকিমের
বর্তমান পুরমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে ফিরহাদ হাকিম রাজনৈতিক সংঘাত বাড়ানোর বদলে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা রোধের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, এ ধরনের ঘটনার পরে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা শুরু করলে সমস্যার বাস্তব সমাধান হবে না।
“কাউকে দোষারোপ করে কোনো লাভ নেই।”
ফিরহাদ হাকিমের মতে, অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনা রোধ করতে সারা দেশে একটি নির্দিষ্ট ও কার্যকর নিরাপত্তা পদ্ধতি থাকা দরকার। শুধু কোনো একটি হোটেল বা কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিলে হবে না। একই ধরনের বিপজ্জনক ভবন, হোটেল এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়মিতভাবে পরীক্ষা করার জন্য একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, কোনো সরকারের পক্ষেই প্রতিটি হোটেল বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়মিতভাবে নিজের হাতে পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। সেই কারণেই বাইরের নিরপেক্ষ সংস্থার মাধ্যমে নিরাপত্তা যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
নিরপেক্ষ নিরাপত্তা যাচাইয়ের পক্ষে ফিরহাদ
ফিরহাদ হাকিমের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের একটি অগ্নিকাণ্ডের পরই বেসরকারি ও নিরপেক্ষ সংস্থার মাধ্যমে নিরাপত্তা যাচাইয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনের কারণে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি বলে তিনি দাবি করেছেন।
তাঁর বক্তব্যের মূল বক্তব্য হল, একটি হোটেল বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে প্রশাসনের পাশাপাশি স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞদেরও যুক্ত করা দরকার। কারণ শুধু কাগজপত্রে অনুমতি রয়েছে কি না, তা দেখলেই একটি ভবন নিরাপদ হয়ে যায় না। ভবনের বাস্তব পরিস্থিতি, জরুরি বহির্গমন পথ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক সংযোগ, ঘরের ধারণক্ষমতা এবং মানুষের নিরাপদে বেরিয়ে আসার সুযোগ—সবকিছুই পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
বাণিজ্যিক লাইসেন্সের প্রসঙ্গেও ফিরহাদ হাকিম বর্তমান ব্যবস্থার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাণিজ্যিক লাইসেন্স অনলাইন ব্যবস্থায় দেওয়া হয়। এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং প্রক্রিয়াকে সহজ করা। এর অর্থ কোনোভাবেই অনিয়মকে উৎসাহিত করা নয় বলে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন।
‘এক বছর পর বিরোধী দলে থাকলে কি আবার দোষারোপ করব?’
ফিরহাদ হাকিমের বক্তব্যে রাজনৈতিক দোষারোপের বিষয়টিও বিশেষভাবে উঠে এসেছে। তাঁর প্রশ্ন, সরকার পরিবর্তনের পর যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে নতুন সরকারকে দোষারোপ করেই কি সমস্যার সমাধান হবে?
তিনি যুক্তি দেন, প্রশাসনিক ব্যবস্থায় কোথাও ত্রুটি থাকলে সেটি চিহ্নিত করে সংশোধন করা দরকার। কারণ অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনা কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য বড় বিপদ। তাই এই ধরনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের বদলে ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনা কীভাবে আটকানো যায়, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এই কারণেই তিনি সারা দেশে হোটেল ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা, বিশেষ তদন্তের ইঙ্গিত
নিউ মার্কেটের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তদন্তের বিষয়টিও সামনে এসেছে। ফিরহাদ হাকিম জানিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে এই ঘটনার তদন্তের জন্য একটি বিশেষ দল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তদন্তের ক্ষেত্রে শুধু আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হল, তা খতিয়ে দেখাই যথেষ্ট নয়। হোটেলটি কীভাবে অনুমোদন পেল, বাণিজ্যিক লাইসেন্স কীভাবে দেওয়া হল, অগ্নিনিরাপত্তার প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করা হয়েছিল কি না এবং ভবনের বাস্তব পরিকাঠামো সরকারি নথির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রাথমিকভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে আগুনের সূত্রপাতের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। তবে আগুনের উৎসের পাশাপাশি ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাই এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
আগুনের কারণের চেয়েও বড় প্রশ্ন, এত ঘিঞ্জি ভবনে হোটেলের অনুমতি কীভাবে?
নিউ মার্কেটের এই দুর্ঘটনার পর সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তা হল—এমন ঘিঞ্জি একটি ভবনে একের পর এক হোটেল চালানোর অনুমতি কীভাবে দেওয়া হল?
ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি দেখে দমকল বিভাগের আধিকারিকদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। একটি ভবনে একাধিক ঘর, সীমিত জায়গা, একটি ঘরে একাধিক মানুষের থাকা এবং সরু বেরোনোর পথ—এই সবকিছু মিলিয়ে আগুন লাগার পর মানুষের নিরাপদে বেরিয়ে আসা কতটা কঠিন হতে পারে, তা দুর্ঘটনার পর আরও স্পষ্ট হয়েছে।
ফলে শুধু আগুনের সূত্রপাতের কারণ খুঁজে বের করলেই তদন্ত শেষ হবে না। ভবনটির অনুমোদন থেকে শুরু করে হোটেল পরিচালনার অনুমতি, বাণিজ্যিক লাইসেন্স, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নিয়মিত পরিদর্শন—প্রতিটি ধাপ খতিয়ে দেখার দাবি জোরালো হচ্ছে।
পরপর অগ্নিকাণ্ডের পর নিরাপত্তা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত
নিউ মার্কেটের ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক স্তরেও নড়াচড়া শুরু হয়েছে। পরপর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় হোটেলগুলির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নতুন করে পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। লালবাজারের পক্ষ থেকেও একটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠনের কথা সামনে এসেছে।
ঘটনার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দমকল মন্ত্রী কৌশিক চৌধুরীর দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। সেই আলোচনার পর মন্ত্রীর বক্তব্যে পূর্বতন সরকারের সময়কার প্রশাসনিক অবহেলা ও গাফিলতির অভিযোগ উঠে এসেছে।
তাঁর দাবি, পূর্ববর্তী সরকারের সময়কার প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রভাবই এখন বর্তমান প্রশাসনকে সামলাতে হচ্ছে। যদিও অন্যদিকে ফিরহাদ হাকিমের বক্তব্য, অতীতের সরকারকে দোষারোপ করে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করাই বেশি জরুরি।
ফলে নিউ মার্কেটের অগ্নিকাণ্ড এখন শুধু একটি দুর্ঘটনার তদন্তে সীমাবদ্ধ নেই। হোটেলের অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা, বাণিজ্যিক লাইসেন্স, ভবনের ধারণক্ষমতা এবং প্রশাসনিক নজরদারি—সবকিছু নিয়েই একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। ১৮ জনের মৃত্যুর এই মর্মান্তিক ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামী দিনে শহরের ঘিঞ্জি হোটেল ও বাণিজ্যিক ভবনগুলির নিরাপত্তা কতটা কঠোরভাবে পরীক্ষা করা হয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।
#NewMarketHotelFire #NewMarketFire #FirhadHakim #KolkataFire #FireSafety #FireAudit #HotelFire #ThirdPartyAudit #FireInvestigation
সাম্প্রতিক পোস্ট
‘সাথীরা, প্রশ্নফাঁস মাফিয়াদের রেয়াত নয়’– সংসদে বিল পাসের পর প্রথমবার কী বললেন প্রধানমন্ত্রী?
সিলেবাসে বড় পরিবর্তন কবে থেকে? শিক্ষক নিয়োগেও সুখবর? কী বললেন শিক্ষামন্ত্রী?
আবার কি বদলে যাবে নোট? দেশে আসছে প্লাস্টিকের নোট,জানুন, কী বদল আসছে?

