ম্যাল রোডের ঝলমলে আলো যেমন সত্য, পাহাড়ের নিস্তব্ধতাও তেমনই সত্য। চেনা শহরের ঠিক পাশেই লুকিয়ে আছে অচেনা কিছু গ্রাম। যেখানে মেঘেরা জানলায় এসে বসে। ব্যাগে দু-দিনের ছুটি ভরে বেরিয়ে পড়ুন এই ৫টি ঠিকানায়। রইল Offbeat Hills Near Darjeeling-এর হদিশ ও খরচের খুঁটিনাটি।
এই পোস্টে যা যা পাবেন
নিউজ অফবিট ডিজিটাল ডেস্ক: দার্জিলিং। নামটাই যথেষ্ট। কুয়াশা মাখা এক চিলতে আবেগ। কারোর ভালো লাগে ম্যাল রোডের সেই জমজমাট আড্ডা। কেভেন্টার্সের ছাদ। গ্ল্যারিজের ধোঁয়া ওঠা কফি। ওই কোলাহল, ওই রঙিন ভিড়—ওটাই তো পাহাড়ের রানির রাজকীয় রূপ। সেই রূপ আমাদের বড্ড প্রিয়। বড্ড আপন।
কিন্তু মন? সে তো বড় বিচিত্র। মাঝে মাঝে সে আর কোলাহল চায় না। সে চায় নিস্তব্ধতা। সে চায়, জানলা খুললেই কাঞ্চনজঙ্ঘা থাকুক একান্তে। সে চায়, অ্যালার্ম ঘড়ির বদলে পাখির ডাকে ঘুম ভাঙুক। সে চায়, বিকেলের নাম না জানা কোনো পাহাড়ি রাস্তায় উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাঁটতে।
চেনা দার্জিলিং শহরের ঠিক আড়ালেই আছে এমন এক মায়াবী জগত। খুব বেশি দূরে নয়। মাত্র ১৫-২০ কিলোমিটারের মধ্যেই (Offbeat Hills Near Darjeeling)। সেখানে পাহাড় কথা বলে। পাইন বনের ফাঁক দিয়ে রোদ এসে আল্পনা আঁকে। সেখানে সময়ের তাড়া নেই।
লামাহাট্টা বা তিনচুলে এখন অনেকেরই চেনা। আজ আমরা হাঁটব সম্পূর্ণ নতুন পথে। খুঁজে নেব এমন ৫টি গ্রাম, যা গুগল ম্যাপের চেয়েও বেশি গেঁথে থাকে মনের ম্যাপে। আপনি সোলো ট্রাভেলার হোন বা সপরিবারে—এই গ্রামগুলো আপনাকে ফেরাবে না।
আরও পড়ুন : জঙ্গলমহলের এই লাল মাটির পথে উইকেন্ড ট্যুর প্ল্যান করুন
চলুন, ভিড় থেকে একটু দূরে যাই। আজ আমাদের সঙ্গী হোক শুধুই প্রকৃতি।

১. রংরুন (Rangaroon): চায়ের দেশের গোপন রূপকথা
দার্জিলিং শহর থেকে খুব একটা দূরে নয়। বড়জোর ১৬ থেকে ১৮ কিলোমিটার। কিন্তু এই সামান্য দূরত্বের মধ্যেই যে পৃথিবীটা কতটা বদলে যেতে পারে, তা রংরুন না গেলে বিশ্বাস করা কঠিন।
রংরুন কোনো সাধারণ গ্রাম নয়। এটি একটি ক্যানভাস। ১৮৫৭ সাল। সিপাহী বিদ্রোহের সময় যখন গোটা দেশ উত্তাল, ঠিক সেই সময় ব্রিটিশরা পাহাড়ের এই নির্জন কোণে গড়ে তুলেছিল এক চায়ের সাম্রাজ্য। নাম দিয়েছিল—’রংরুন টি এস্টেট’। স্থানীয় লেপচা ভাষায় ‘রংরুন’-এর অর্থ হলো ‘নদীর মোড়’ বা ‘বাঁক’। নিচের উপত্যকায় রংদং নদী যেখানে বাঁক নিয়েছে, তার নামানুসারেই এই গ্রামের নামকরণ।
আজও রংরুনে পা দিলে মনে হয়, টাইম মেশিন চড়ে সেই ব্রিটিশ আমলে ফিরে গেছি। পুরনো কলোনিয়াল বাংলো, কাঠের বাড়ি, আর দিগন্তবিস্তৃত সবুজ চা বাগান। এখানে কুয়াশারা কথা বলে। রোদ উঠলে কাঞ্চনজঙ্ঘা হাসে। আর সন্ধে নামলে? সে এক মায়াবী দৃশ্য। ওপরের পাহাড়ের চূড়ায় জ্বলে ওঠে হাজার হাজার আলো। মনে হয়, আকাশের তারাগুলো সব পাহাড়ে এসে বাসা বেধেছে। ওটাই যে আমাদের চেনা দার্জিলিং শহর!
ভিড় নেই। কোলাহল নেই। আছে শুধু এক রাশ সবুজ আর একবুক শান্তি।
কেন যাবেন?
অনেকেই প্রশ্ন করেন, “দার্জিলিং ছেড়ে কেন নিচে নামব?” উত্তরটা খুব সহজ। আপনি যদি পাহাড়কে নিজের মতো করে পেতে চান, তবে রংরুন আপনার জন্য।
প্রথমত, কাঞ্চনজঙ্ঘা। দার্জিলিংয়ের ম্যাল রোড থেকে আমরা যে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখি, রংরুন থেকে তার রূপ সম্পূর্ণ অন্যরকম। এখানে পাহাড়ের রানিকে মনে হয় অনেক বেশি আপন, অনেক বেশি কাছে। সকালবেলা চায়ের কাপ হাতে ব্যালকনিতে দাঁড়ালে মনে হবে, তুষারশুভ্র শৃঙ্গটি যেন শুধু আপনার জন্যই সেজেছে। মাঝে মাঝে মেঘের চাদর সরে গিয়ে যখন সোনালি রোদ বরফের ওপর পড়ে, সেই মুহূর্তটি ক্যামেরায় নয়, হৃদয়ে ধরে রাখার মতো।
দ্বিতীয়ত, ঐতিহ্য বা হেরিটেজ। ১৭০ বছরের পুরোনো চা বাগান। এখানকার বাতাসে মিশে আছে এক অদ্ভুত আভিজাত্য। গ্রামের সরু পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখবেন পুরোনো ব্রিটিশ আমলের সব স্ট্রাকচার। চা পাতা তোলার দৃশ্য, কারখানার ভোঁ—সব মিলিয়ে এক নস্টালজিক পরিবেশ।
তৃতীয়ত, নিস্তব্ধতা। এখানে গাড়ির হর্ন নেই। আছে শুধু পাখির ডাক আর বাতাসের শব্দ। রংরুন হলো সেই জায়গা, যেখানে আপনি নিজের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন। বই পড়া, গান শোনা বা প্রিয় মানুষের হাত ধরে চুপ করে বসে থাকার জন্য এর চেয়ে ভালো ঠিকানা আর হয় না।
কীভাবে যাবেন?
শিলিগুড়ি বা এনজেপি (NJP) থেকে রংরুনের দূরত্ব প্রায় ৭২ কিলোমিটার। পাহাড়ি পথে সময় লাগে মোটামুটি ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘণ্টা।
রুট ম্যাপ: এনজেপি বা বাগডোগরা থেকে প্রথমে রোহিণী রোড বা পাঙ্খাবাড়ি রোড ধরে কার্শিয়াং। সেখান থেকে হিলকার্ট রোড ধরে সোজা জোরবাংলো (Jorebunglow)। জোরবাংলো থেকে ডানদিকের রাস্তা (যেটা দার্জিলিংয়ের দিকে যাচ্ছে) ধরে এগোতে হবে ‘৩ নম্বর মাইল’ (3rd Mile) পর্যন্ত। এই ৩ নম্বর মাইল জায়গাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকেই পিচ রাস্তা ছেড়ে বাঁদিকের একটি সরু রাস্তা খাড়াই নিচে নেমে গেছে। এই রাস্তা ধরেই প্রায় ৮-৯ কিলোমিটার নিচে নামলে আপনি পৌঁছে যাবেন রংরুন চা বাগানে।
গাড়ি ভাড়া ও অপশন:
- রিজার্ভ গাড়ি: এনজেপি বা বাগডোগরা থেকে সরাসরি রংরুন যাওয়ার জন্য ছোট গাড়ি (WagonR/Alto) ভাড়া পড়বে আনুমানিক ৩,৫০০ থেকে ৪,০০০ টাকা। বড় গাড়ি (Bolero/Innova) হলে ৪,৫০০ টাকার আশেপাশে। (সিজন অনুযায়ী ভাড়া কম-বেশি হতে পারে)।
- শেয়ার গাড়ি: পকেটের সাশ্রয় করতে চাইলে এনজেপি বা শিলিগুড়ি জংশন থেকে দার্জিলিংগামী শেয়ার জিপে উঠুন। ভাড়া নেবে ৪০০-৫০০ টাকা (মাথাপিছু)। চালককে আগেই বলে রাখবেন আপনি ‘৩ নম্বর মাইল’-এ নামবেন। সেখানে নেমে আপনাকে হোমস্টের মালিককে ফোন করতে হবে। তাঁরা গাড়ি পাঠিয়ে আপনাকে পিক-আপ করে নেবে। ৩ নম্বর মাইল থেকে রংরুন পর্যন্ত লোকাল গাড়ির ভাড়া সাধারণত ৮০০ থেকে ১,০০০ টাকা হয়ে থাকে।
বাইক রাইডারদের জন্য: আপনি যদি বাইক নিয়ে যান, তবে সাবধান। ৩ নম্বর মাইল পর্যন্ত রাস্তা মাখনের মতো। কিন্তু তারপরের উতরাই বা ঢাল বেশ খাড়াই। ব্রেক এবং টায়ার ভালো থাকা আবশ্যিক।
রাস্তার অবস্থা: ৩ নম্বর মাইল পর্যন্ত রাস্তা খুব সুন্দর। কিন্তু সেখান থেকে রংরুন পর্যন্ত শেষ ৮-৯ কিলোমিটার রাস্তাটি কিছুটা চ্যালেঞ্জিং। এটি চা বাগানের ভেতর দিয়ে যাওয়া রাস্তা। কোথাও পিচ ঢালা, আবার কোথাও কাঁচা পাথুরে। রাস্তাটি বেশ সরু এবং খাড়াই। বর্ষাকালে এই রাস্তা কিছুটা পিচ্ছিল হতে পারে। তবে ভয়ের কিছু নেই, অভিজ্ঞ পাহাড়ি চালকরা অনায়াসেই এই রাস্তায় গাড়ি চালান। আর এই রাস্তার দুপাশের সৌন্দর্য এতই মুগ্ধকর যে, ঝাঁকুনিটা আপনার গায়েই লাগবে না।
কী কী দেখবেন?
রংরুনে দেখার মতো জায়গা অফুরন্ত নয়, কিন্তু যা আছে তা মনের খিদে মেটানোর জন্য যথেষ্ট।
- সূর্যোদয় ও কাঞ্চনজঙ্ঘা: ভোরবেলা আপনার প্রথম কাজ হবে হোমস্টের ছাদ বা বারান্দায় বসা। এখান থেকে সূর্যোদয়ের সময় কাঞ্চনজঙ্ঘার রঙের খেলা দেখা এক পরম প্রাপ্তি। যেহেতু সামনে কোনো বাধা নেই, তাই আকাশ পরিষ্কার থাকলে ভিউ পাবেন ১৮০ ডিগ্রি।
- চা বাগান ভ্রমণ: ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়ুন চা বাগানে। আঁকাবাঁকা পথ ধরে হাঁটুন। চা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলুন। ছবি তোলার জন্য এর চেয়ে ভালো ব্যাকগ্রাউন্ড আর হয় না।
- রংদং নদী (Rungdung River): গ্রামের কিছুটা নিচে বয়ে গেছে খরস্রোতা রংদং নদী। হোমস্টে থেকে গাইড নিয়ে ট্রেকিং করে নদীর পাড়ে যেতে পারেন। সময় লাগবে যেতে-আসতে প্রায় ২-৩ ঘণ্টা। নদীর ঠান্ডা জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকা বা রিভার সাইড পিকনিক করার মজাই আলাদা।
- পুরনো বাংলো: ১৮৫৭ সালে তৈরি হওয়া সাহেবদের বাংলোটি বাইরে থেকে দেখতে পারেন। এর স্থাপত্য আপনাকে মুগ্ধ করবে।
- রাতের দার্জিলিং: সন্ধ্যাবেলা যখন অন্ধকার নামবে, তখন তাকান ওপরের দিকে। দেখবেন পাহাড়ের গায়ে লক্ষ লক্ষ জোনাকি জ্বলছে। ওটাই দার্জিলিং শহর। এখান থেকে টাইগার হিলও দেখা যায়।
কোথায় থাকবেন?
রংরুনে এখন বেশ কিছু সুন্দর হোমস্টে গড়ে উঠেছে। এরা মূলত স্থানীয় মানুষেরাই চালান। আতিথেয়তা এবং ঘরোয়া খাবার এদের ইউএসপি। এখানে দালালের মাধ্যমে বুক না করে সরাসরি মালিকের সঙ্গে কথা বলা ভালো।
রইল কিছু জনপ্রিয় এবং ভেরিফায়েড হোমস্টের নাম ও যোগাযোগ (গুগল সার্চ করে ক্রস-ভেরিফাই করে নেওয়া বাঞ্ছনীয়):
১. খালিং কটেজ (Khaling Cottage): রংরুনের অন্যতম পুরোনো এবং জনপ্রিয় হোমস্টে। এদের অবস্থান এবং আতিথেয়তার খুব সুনাম আছে। মালিক অত্যন্ত ভদ্র।
- লোকেশন: চা বাগানের ঠিক মাঝখানে।
২. রংরুন টি হাউজ (Rangaroon Tea House): যারা একটু হেরিটেজ ফিল চান, তাদের জন্য এটি ভালো অপশন। ভিউ খুব সুন্দর।
৩. মিতালি হোমস্টে (Mitali Homestay): বাজেট ট্রাভেলারদের জন্য খুব ভালো। ঘরগুলো পরিষ্কার এবং খাবার খুব সুস্বাদু।
খরচ কত?
বাঙালি মানেই একটু হিসেবী ভ্রমণ। তাই একটা খসড়া বাজেট (Kolkata to Kolkata) দিয়ে দেওয়া হলো। এটি একটি ২ রাত্রি ৩ দিনের ট্রিপের জন্য (মাথাপিছু আনুমানিক)।
- ট্রেন ভাড়া: স্লিপার ক্লাস (যাওয়া-আসা) – ৮০০-১,০০০ টাকা।
- থাকা-খাওয়া: রংরুনের হোমস্টেগুলোতে সাধারণত থাকা ও খাওয়া (সকালের চা থেকে রাতের ডিনার) নিয়ে জনপ্রতি ১,৫০০ টাকা থেকে ১,৮০০ টাকা নেওয়া হয়।
- ২ দিন x ১,৫০০ = ৩,০০০ টাকা।
- গাড়ি ভাড়া: ৪ জন একসঙ্গে গেলে গাড়ি ভাড়া ভাগ হয়ে যায়। এনজেপি থেকে যাওয়া-আসা এবং সাইট সিয়িং মিলিয়ে মাথাপিছু খরচ পড়তে পারে ২,০০০-২,৫০০ টাকা।
- মোট খরচ: মোটামুটি ৬,০০০ থেকে ৭,০০০ টাকার মধ্যে আপনি রংরুন থেকে ঘুরে আসতে পারেন।
অতিরিক্ত তথ্য (বয়স্ক ও সোলো ট্রাভেলারদের জন্য):
- বয়স্কদের জন্য: রংরুন বয়স্কদের জন্য বেশ আরামদায়ক। কারণ গাড়ি একদম হোমস্টের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়। হোমস্টে থেকে ভিউ পয়েন্টে যাওয়ার জন্য চড়াই-উতরাই ভাঙতে হয় না। বারান্দায় বসেই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। তবে, রংদং নদীতে ট্রেকিং করা বয়স্কদের জন্য বা যাদের হাঁটুর ব্যথা আছে, তাদের জন্য একেবারেই উচিত নয়।
- সোলো ট্রাভেলার: জায়গাটি অত্যন্ত নিরাপদ। স্থানীয় মানুষ খুব সাহায্যকারী। সোলো ফিমেল ট্রাভেলাররাও নিশ্চিন্তে যেতে পারেন। তবে একা গেলে গাড়ি ভাড়ার খরচটা একটু গায়ে লাগতে পারে। সেক্ষেত্রে শেয়ার জিপে ৩ নম্বর মাইল পর্যন্ত এসে, সেখান থেকে হোমস্টের বাইক বা ছোট গাড়ির ব্যবস্থা করতে বললে খরচ কিছুটা কমবে।

২. বুংকুলুং (Bunkulung): পাহাড়ের কোলে এক টুকরো ‘কৃষি-স্বর্গ’
দার্জিলিং বা কার্শিয়াং মানেই আমাদের চোখে ভাসে পাইন বনের সারি, খাড়াই রাস্তা আর হাড়হিম করা ঠান্ডা। কিন্তু বুংকুলুং সেই চেনা ছকের বাইরে। এটি কোনো পাহাড়ের চূড়া নয়, বরং পাহাড়ের দু-হাতের মাঝে সযত্নে লালিত এক উপত্যকা বা ভ্যালি।
স্থানীয়রা একে আদর করে ডাকেন ‘দ্য এগ্রিকালচারাল হাব অফ মিরিক’। কেন জানেন? কারণ, এখানে তাকালে শুধু চা বাগান নয়, চোখে পড়বে মাইলের পর মাইল জুড়ে সোনালি ধানের খেত, আনারসের বাগান আর এলাচ ও কমলার চাষ। আর এই সবুজের মাঝখান দিয়ে এঁকেবেঁকে বয়ে চলেছে পাহাড়ি নদী ‘বালাসন’ (Balason River)।
শিলিগুড়ির খুব কাছে হওয়ায় সপ্তাহান্তের ছুটিতে বা দু-দিনের ছোট্ট সফরে বুংকুলুং এখন অফবিট প্রেমীদের কাছে এক গোপন আকর্ষণ। এখানে নাগরিক কোলাহল পৌঁছায় না। এখানে সময় মাপা হয় ঘড়ির কাঁটায় নয়, বরং নদীর স্রোতের ছন্দে। যারা উচ্চতা বা হাই অল্টিটিউড পছন্দ করেন না, বরং একটু আরামদায়ক আবহাওয়া আর সমতলে হাঁটাহাঁটি করতে ভালোবাসেন—তাদের জন্য বুংকুলুং এক আদর্শ ঠিকানা।
কেন যাবেন?
পাহাড়ের হাজারো জায়গার ভিড়ে বুংকুলুং কেন বাছবেন? কারণগুলো বেশ লোভনীয়।
প্রথমত, নদী ও নীরবতা। বুংকুলুংয়ের প্রাণভোমরা হলো বালাসন নদী। পাহাড়ি নদী এখানে খুব শান্ত, কিন্তু তার কুলকুল শব্দ সর্বক্ষণ আপনার কানে বাজবে। নদীর পাড়ে বড় বড় পাথরের ওপর বসে পা ডুবিয়ে থাকার যে শান্তি, তা ফাইভ স্টার হোটেলের জাকুজিতেও পাবেন না।
দ্বিতীয়ত, গ্রাম্য জীবন। এটি একটি আদর্শ গ্রাম। এখানে কৃত্রিমতা নেই। সকালে ঘুম ভাঙবে মোরগের ডাকে। দেখবেন গ্রামের মানুষেরা কাঁধে ঝুড়ি নিয়ে খেতে কাজ করতে যাচ্ছে। পুকুর ভরা মাছ, আর ক্ষেত ভরা সবজি। এখানকার বাতাস এতই বিশুদ্ধ যে এক নিশ্বাসে মনে হবে শরীর জুড়িয়ে গেল।
তৃতীয়ত, আরামদায়ক আবহাওয়া। দার্জিলিং বা সান্দাকফুর মতো হাড় কাঁপানো ঠান্ডা এখানে নেই। যেহেতু এটি উপত্যকা, তাই আবহাওয়া সারা বছরই খুব মনোরম থাকে। বয়স্ক মানুষ বা শিশুদের নিয়ে যাওয়ার জন্য এটি অন্যতম সেরা জায়গা।
কীভাবে যাবেন?
শিলিগুড়ি বা এনজেপি (NJP) থেকে বুংকুলুংয়ের দূরত্ব মাত্র ৪৮ কিলোমিটার। সময় লাগে দেড় থেকে দু-ঘণ্টা।
রুট ম্যাপ: এনজেপি থেকে বেরিয়ে প্রথমে সেভক রোড বা খাপরাইল মোড় হয়ে আপনাকে ধরতে হবে ‘দুধিয়া’ (Dudhia) যাওয়ার রাস্তা। দুধিয়া পিকনিক স্পট হিসেবে বেশ পরিচিত। সেখান থেকে বালাসন নদীর ওপরের ব্রিজ পার করে মিরিকের রাস্তায় উঠতে হবে। মিরিক যাওয়ার পথেই পড়ে ‘সৌরেনি’ (Soureni)। এখান থেকে একটি রাস্তা নেমে গেছে নিচের দিকে। সেই পথ ধরেই পৌঁছে যাওয়া যায় বুংকুলুং। আরেকটি রাস্তা হলো পানিঘাটা হয়ে সরাসরি নদীর পাড় ধরে বুংকুলুং ঢোকা। এই রাস্তাটি অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়দের খুব পছন্দের, কারণ দুপাশে শুধুই জঙ্গল আর নদী।
গাড়ি ভাড়া ও অপশন:
- রিজার্ভ গাড়ি: এনজেপি বা বাগডোগরা থেকে সরাসরি বুংকুলুংয়ের জন্য ছোট গাড়ি (WagonR/Alto) ভাড়া পড়বে আনুমানিক ২,৫০০ থেকে ৩,০০০ টাকা। বড় গাড়ি (Bolero/Innova) হলে ৩,৫০০ টাকার আশেপাশে। দূরত্ব কম হওয়ায় ভাড়া দার্জিলিংয়ের চেয়ে কম।
- শেয়ার গাড়ি: পকেটের সাশ্রয় করতে চাইলে শিলিগুড়ি জংশন বা দার্জিলিং মোড় থেকে মিরিকগামী শেয়ার জিপ বা বাসে উঠুন। ভাড়া নেবে ১০০-১৫০ টাকা। আপনাকে নামতে হবে ‘দুধিয়া’ বা ‘সৌরেনি’-তে। সেখান থেকে আপনাকে লোকাল গাড়ি রিজার্ভ করে গ্রামে ঢুকতে হবে। সৌরেনি থেকে বুংকুলুংয়ের লোকাল গাড়ি ভাড়া ৭০০-৮০০ টাকা।
রাস্তার অবস্থা: শিলিগুড়ি থেকে দুধিয়া পর্যন্ত রাস্তা মাখনের মতো মসৃণ। দুপাশে চা বাগান আর জঙ্গল। তবে সৌরেনি থেকে গ্রামে ঢোকার শেষ কয়েক কিলোমিটার রাস্তাটি একটু কাঁচা বা পাথুরে হতে পারে। বর্ষাকালে নদীর জল বাড়লে পানিঘাটার রাস্তাটি অনেক সময় বন্ধ থাকে, তখন মিরিক হয়ে ঘুরে আসাই শ্রেয়। তবে সাধারণ সময়ে হ্যাচব্যাক গাড়ি নিয়েও অনায়াসে পৌঁছে যাওয়া যায়।
কী কী দেখবেন?
বুংকুলুংয়ে দর্শনীয় স্থান বলতে প্রকৃতি নিজেই। তবুও কিছু নির্দিষ্ট পয়েন্ট আছে যা মিস করা উচিত নয়।
- বালাসন নদী ও ঝুলন্ত ব্রিজ: গ্রামের বুক চিরে বয়ে যাওয়া বালাসন নদীর ওপর একটি সুন্দর ঝুলন্ত ব্রিজ বা ক্যান্টিলিভার ব্রিজ আছে। এর ওপর দাঁড়িয়ে ছবি তুললে মনে হবে যেন সিনেমার দৃশ্য। নদীর চরে বসে পিকনিক করা বা পাথরে বসে সময় কাটানো—এটাই এখানকার প্রধান অ্যাক্টিভিটি।
- ফিশারিজ প্রজেক্ট (Pisciculture): বুংকুলুং মাছ চাষের জন্য বিখ্যাত। এখানে পুকুরে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ হয়। আপনি চাইলে তা দেখতে পারেন এবং টাটকা মাছ ভাজা বা ঝোল দিয়ে দুপুরের খাবারও খেতে পারেন।
- মুরমাহ চা বাগান (Murmah Tea Garden): গ্রামের খুব কাছেই এই চা বাগান। সবুজ কার্পেটের মতো বিছানো চা বাগানের মাঝে হাঁটা এক দারুণ অভিজ্ঞতা। কাছেই আছে গয়াবাড়ি টি ফ্যাক্টরি।
- কৃষিকাজ দেখা: এখানকার লিম্বু সম্প্রদায়ের মানুষেরা খুব পরিশ্রমী। তাদের ধান চাষ, এলাচ বাগান বা আনারস বাগান ঘুরে দেখা এক অনন্য অভিজ্ঞতা। শহুরে শিশুরা জানতেই পারে না সবজি কীভাবে ফলে—তাদের জন্য এটি এক শিক্ষামূলক ভ্রমণ হতে পারে।
- মিরিক লেক: এখান থেকে মিরিক মাত্র ১৫ কিলোমিটার। হাতে সময় থাকলে গাড়ি নিয়ে আধবেলায় মিরিক লেক এবং পশুপতি মার্কেট (নেপাল সীমান্ত) ঘুরে আসতেই পারেন।
কোথায় থাকবেন?
বুংকুলুংয়ে থাকার জন্য ইকো-রিসর্ট এবং হোমস্টে—দুটোই আছে। এখানকার আতিথেয়তা আপনাকে মুগ্ধ করবেই।
কিছু জনপ্রিয় থাকার জায়গা (যাওয়ার আগে ক্রস-ভেরিফাই করে নেবেন):
১. বুংকুলুং ইকো হাট (Bunkulung Eco Hut): এটি এখানকার সবথেকে জনপ্রিয় থাকার জায়গা। সুন্দর সাজানো বাগান, কাঠের কটেজ এবং বারান্দা থেকে নদীর দৃশ্য। এদের খাবার খুবই সুস্বাদু। ২. খোলা বাড়ি হোমস্টে (Khola Bari Homestay): নদীর একদম কাছে। ঘরোয়া পরিবেশ এবং বাজেট ফ্রেন্ডলি। ৩. লিম্বু হোমস্টে: স্থানীয় লিম্বু সংস্কৃতির স্বাদ পেতে এখানে থাকতে পারেন।
খরচ কত?
আসুন দেখে নিই কলকাতা থেকে কলকাতা—২ রাত্রি ৩ দিনের আনুমানিক বাজেট (মাথাপিছু)।
- ট্রেন ভাড়া: স্লিপার ক্লাস (যাওয়া-আসা) – ৮০০-১,০০০ টাকা।
- থাকা-খাওয়া: বুংকুলুংয়ের হোমস্টে বা ইকো হাটে থাকা-খাওয়া (জনপ্রতি প্রতিদিন) ১,২০০ থেকে ১,৫০০ টাকার মধ্যে হয়ে যায়।
- ২ দিন x ১,৪০০ = ২,৮০০ টাকা।
- গাড়ি ভাড়া: ৪ জন শেয়ার করলে এনজেপি থেকে যাওয়া-আসা এবং মিরিক ঘোরা মিলিয়ে মাথাপিছু খরচ পড়বে ১,৫০০-২,০০০ টাকা।
- মোট খরচ: সব মিলিয়ে জনপ্রতি ৫,৫০০ থেকে ৬,০০০ টাকার মধ্যে আপনি এই সুন্দর গ্রামটি ঘুরে আসতে পারেন।
অতিরিক্ত তথ্য (বয়স্ক ও সোলো ট্রাভেলারদের জন্য):
- বয়স্কদের জন্য: ১০০ শতাংশ উপযুক্ত। বুংকুলুং পাহাড়ি গ্রাম হলেও এটি একটি উপত্যকা বা সমতল ভূমি। এখানে কোনো চড়াই-উতরাই ভাঙতে হয় না। গাড়ি একদম রিসর্টের গেট অবধি যায়। শ্বাসকষ্টের সমস্যা হওয়ার ভয় নেই এবং হাড় কাঁপানো ঠান্ডাও নেই। যারা পাহাড়ে গিয়েও হাঁটাহাঁটি করতে ভয় পান, তাদের জন্য এটি সেরা অপশন।
- সোলো ট্রাভেলার: সোলো ট্রাভেলারদের জন্য এটি অত্যন্ত নিরাপদ এবং সুবিধাজনক। যেহেতু শিলিগুড়ি থেকে খুব কাছে এবং মিরিকের রাস্তায় প্রচুর গাড়ি চলে, তাই যাতায়াতে কোনো সমস্যা হয় না। শেয়ার গাড়িতে দুধিয়া বা মিরিক পর্যন্ত এসে সহজেই পৌঁছানো যায়। বাইকারদের জন্য তো এই রুটটি স্বপ্নের মতো সুন্দর।

৩. মহল দিরাম (Mahal Diram): মেঘেদের নিজস্ব বারান্দা
নামটা শুনলেই কেমন একটা রাজকীয় বা ‘রয়্যাল’ ভাব আসে, তাই না? ‘মহল’ মানে প্রাসাদ। যদিও এখানে রাজাদের কোনো প্রাসাদ নেই, কিন্তু প্রকৃতির যে ঐশ্বর্য এখানে ছড়িয়ে আছে, তা কোনো রাজমহলের চেয়ে কম নয়।
মহল দিরাম (অনেকে বলেন ‘মহলধী রাম’) হলো কার্শিয়াং রেঞ্জের অন্যতম সর্বোচ্চ পয়েন্ট। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ৭০০০ ফুটের কাছাকাছি। সিটং, লাটপাঞ্চার বা অহলদাঁড়ার নাম তো অনেক শুনেছেন, কিন্তু এই মহল দিরাম হলো সেই সব কিছুর ‘অভিভাবক’। এখান থেকে নিচের পৃথিবীটাকে মনে হয় খেলনা দেশ।
চারপাশে ঘন চা বাগান, মাঝখানে পাইন আর ওক গাছের জঙ্গল, আর তার ঠিক ওপরে আকাশ ছোঁয়া এক মালভূমি—এটাই মহল দিরাম। এখানকার আবহাওয়া বড়ই খামখেয়ালি। এই মুহূর্তে হয়তো ঝলমলে রোদ, কাঞ্চনজঙ্ঘা হাসছে; ঠিক পরের মুহূর্তেই কোথা থেকে একরাশ মেঘ এসে আপনাকে জাপটে ধরবে। এখানে মেঘ শুধু দেখা যায় না, মেঘের স্বাদ নেওয়া যায়। কুয়াশা যখন ঘরের জানলা দিয়ে বিছানায় এসে লুটোপুটি খায়, তখন মনে হয় স্বর্গের খুব কাছাকাছি চলে এসেছি।
ভিড়ভাট্টা নেই, গাড়ির হর্ন নেই। আছে শুধু চা বাগানের শ্রমিকদের কর্মব্যস্ততা আর প্রকৃতির আদিম রূপ।
কেন যাবেন?
পাহাড় তো অনেক আছে, কিন্তু মহল দিরাম কেন আপনার বাকেট লিস্টে থাকবে?
প্রথমত, ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ। উত্তরবঙ্গের খুব কম জায়গা থেকেই ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ পাওয়া যায়। মহল দিরামের হোমস্টের ছাদে দাঁড়ালে একদিকে দেখা যায় কাঞ্চনজঙ্ঘার বিশাল বিস্তার (পুরো স্লিপিং বুদ্ধ)। আর ঠিক উল্টো দিকে তাকালে দেখা যায় তিস্তা নদী এঁকেবেঁকে সমতলের দিকে ছুটে চলেছে। পরিষ্কার দিনে শিলিগুড়ি শহর আর ডুয়ার্সের জঙ্গলও এখান থেকে নজরে আসে।
দ্বিতীয়ত, মেঘের রাজ্য। যারা মেঘ ভালোবাসেন, তাদের জন্য এটি তীর্থস্থান। উচ্চতা বেশি হওয়ার কারণে মেঘ এখানে ভেসে বেড়ায় না, মেঘ এখানে আটকে থাকে। চায়ের কাপ হাতে মেঘের ভেতর বসে থাকার অভিজ্ঞতা এখানে নিত্যদিনের ঘটনা।
তৃতীয়ত, নির্জনতা ও লাক্সারি। মহল দিরামের হোমস্টে বা রিসোর্টগুলো চা বাগানের ঠিক মাঝখানে। এখানে লোকবসতি খুব কম। তাই যারা সত্যিকারের ‘আইসোলেশন’ বা নির্জনতা খুঁজছেন, তাদের জন্য এটি সেরা। এখানকার চা বাগানগুলোও খুব সাজানো।
কীভাবে যাবেন?
শিলিগুড়ি বা এনজেপি (NJP) থেকে মহল দিরামের দূরত্ব প্রায় ৬০-৬৫ কিলোমিটার। সময় লাগে ৩ ঘণ্টার আশেপাশে।
রুট ম্যাপ: এনজেপি থেকে বেরিয়ে প্রথমে হিলকার্ট রোড বা রোহিনী রোড ধরে কার্শিয়াং পৌঁছতে হবে। কার্শিয়াং স্টেশন পার করে দার্জিলিং যাওয়ার পথে পড়ে ‘বাগোর’ বা ‘বাগোরা’ (Bagora)। এটি বায়ুসেনার এলাকা। এখান থেকে ডানদিকে একটি রাস্তা জঙ্গলের ভেতর দিয়ে উঠে গেছে। এই পথটি গেছে ‘চিমনি’ (Chimney) গ্রাম হয়ে। চিমনি থেকে আরও কিছুটা এগিয়ে গেলেই আপনি পৌঁছে যাবেন মহল দিরাম চা বাগানে। রাস্তাটি মহানন্দা ওয়াইল্ডলাইফ স্যানচুয়ারির বাফার জোনের মধ্য দিয়ে গেছে, তাই যাত্রাপথটি রোমাঞ্চকর।
গাড়ি ভাড়া ও অপশন:
- রিজার্ভ গাড়ি: এনজেপি থেকে সরাসরি মহল দিরাম যাওয়ার জন্য ছোট গাড়ি (WagonR/Alto) ভাড়া পড়বে ৩,০০০ থেকে ৩,৫০০ টাকা। বড় গাড়ি (Bolero/Sumo) হলে ৩,৫০০-৪,০০০ টাকা। যেহেতু রাস্তাটি শেষের দিকে একটু অফবিট, তাই চালকরা সামান্য বেশি চাইতে পারেন।
- শেয়ার গাড়ি: এনজেপি বা শিলিগুড়ি জংশন থেকে কার্শিয়াংগামী শেয়ার জিপে উঠুন (ভাড়া ১০০-১৫০ টাকা)। কার্শিয়াং বা বাগোরা জিরো পয়েন্টে নেমে আপনাকে লোকাল গাড়ি রিজার্ভ করতে হবে। কার্শিয়াং থেকে মহল দিরামের রিজার্ভ ভাড়া ১,২০০-১,৫০০ টাকার মতো।
বাইক রাইডারদের জন্য: বাইকারদের জন্য এই রুটটি স্বপ্নের মতো। কার্শিয়াং পর্যন্ত চওড়া রাস্তা, তারপর বাগোরার পাইন বন আর কুয়াশা। তবে চিমনি গ্রামের পর থেকে রাস্তাটি কিছুটা খারাপ হতে পারে। বর্ষাকালে বাইক নিয়ে সাবধানে চলাই ভালো, কারণ জোঁকের উপদ্রব থাকে এবং রাস্তা পিচ্ছিল হয়।
রাস্তার অবস্থা: বাগোরা পর্যন্ত রাস্তা খুব ভালো। সেখান থেকে চিমনি পর্যন্ত রাস্তাটি সরু কিন্তু পিচ ঢালা, দুপাশে ঘন জঙ্গল। চিমনি থেকে মহল দিরাম পর্যন্ত শেষ কয়েক কিলোমিটার রাস্তাটি চা বাগানের ভেতর দিয়ে গেছে, তাই সেটি একটু কাঁচা বা পাথুরে (Bumpy) হতে পারে। তবে বলেরো বা সুমো জাতীয় গাড়ি অনায়াসে চলে যায়। ছোট গাড়ি নিয়ে গেলে একটু সাবধানে চালাতে হবে।
কী কী দেখবেন?
মহল দিরামে বসে থাকাই সবথেকে বড় ‘দেখা’। তবুও আশেপাশে ঘোরার মতো দারুণ কিছু জায়গা আছে।
- সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত: এখানকার সূর্যোদয় টাইগার হিলের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। আর সূর্যাস্তের সময় যখন কাঞ্চনজঙ্ঘার ওপর শেষ আলো পড়ে, তখন মনে হয় পাহাড়টা সোনায় মুড়ে দেওয়া হয়েছে।
- চিমনি গ্রাম ও হেরিটেজ চিমনি: মহল দিরাম থেকে কিছুটা নিচেই চিমনি গ্রাম। এখানে ১০০ বছরের পুরোনো একটি ইঁটের তৈরি বিশাল চিমনি আছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশরা এটি তৈরি করেছিল। ঘন কুয়াশার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এই ভাঙা চিমনিটি দেখলে গা ছমছম করবে।
- অহলদাঁড়া ভিউ পয়েন্ট (Ahaldara): এখান থেকে অহলদাঁড়া খুব কাছে। গাড়ি নিয়ে বা ট্রেকিং করে ঘুরে আসতে পারেন।
- চা বাগান ও ট্রেকিং: রিসোর্টের চারপাশেই মহল দিরাম টি এস্টেট। চা বাগানের সরু পথ দিয়ে হাঁটা এবং চা পাতা তোলা দেখা এক দারুণ অভিজ্ঞতা।
- নামথিং পোখরি (Namthing Pokhri): এটি একটি প্রাকৃতিক জলাশয়, যা বিরল প্রজাতির ‘হিমালয়ান স্যালাম্যান্ডার’-এর বাসস্থান। কপাল ভালো থাকলে এদের দেখা পেতে পারেন।
কোথায় থাকবেন?
মহল দিরামে থাকার অপশন খুব বেশি নেই, যা আছে তা বেশ উন্নতমানের।
১. মহল দিরাম টি রিসোর্ট (Mahal Diram Tea Resort): এটি এখানকার সবথেকে বিখ্যাত থাকার জায়গা। চা বাগানের মাঝে অবস্থিত এই রিসোর্টটি বেশ সাজানো। কাঠের ঘর, বড় কাঁচের জানলা এবং বারান্দা। এদের পরিষেবা খুব ভালো। ২. লোকাল হোমস্টে: রিসোর্টের আশেপাশে এখন গ্রামের মানুষেরা দু-একটি ছোট হোমস্টে বানিয়েছেন। সেখানে থাকলে একদম ঘরোয়া পরিবেশ পাবেন। খরচ কিছুটা কম হবে।
(টিপস: মহল দিরাম এখন বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে, তাই সিজনে গেলে ২ মাস আগে বুকিং করা নিরাপদ।)
খরচ কত?
আসুন দেখে নিই কলকাতা থেকে কলকাতা—২ রাত্রি ৩ দিনের বাজেট।
- ট্রেন ভাড়া: স্লিপার ক্লাস – ৮০০-১,০০০ টাকা।
- থাকা-খাওয়া: মহল দিরামের রিসোর্ট বা হোমস্টেগুলো একটু প্রিমিয়াম। থাকা-খাওয়া (জনপ্রতি প্রতিদিন) ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা ধরতে পারেন।
- ২ দিন x ১,৮০০ = ৩,৬০০ টাকা।
- গাড়ি ভাড়া: ৪ জন শেয়ার করলে মাথাপিছু খরচ ২,০০০-২,৫০০ টাকা।
- মোট খরচ: সব মিলিয়ে জনপ্রতি ৭,০০০ থেকে ৮,০০০ টাকার মধ্যে এই মেঘের রাজ্যে ঘুরে আসা সম্ভব।
অতিরিক্ত তথ্য (বয়স্ক ও সোলো ট্রাভেলারদের জন্য):
- বয়স্কদের জন্য: মহল দিরাম বয়স্কদের জন্য খুবই ভালো কারণ গাড়ি একদম রিসর্টের গেট পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সমতলের মতো হাঁটাচলার জায়গা আছে। বারান্দায় বসেই পাহাড় দেখা যায়। তবে উচ্চতা বেশি হওয়ায় (৭০০০ ফুট) শীতকালে এখানে হাড়হিম করা ঠান্ডা থাকে। তাই বয়স্কদের নিয়ে গেলে পর্যাপ্ত গরম জামাকাপড় এবং রুম হিটারের ব্যবস্থা আছে কি না জেনে নেওয়া জরুরি। হার্টের সমস্যা বা শ্বাসকষ্ট থাকলে খুব শীতে না যাওয়াই ভালো।
- সোলো ট্রাভেলার: সোলো ট্রাভেলারদের জন্য জায়গাটি নিরাপদ, কিন্তু একটু ব্যয়সাপেক্ষ হতে পারে যদি একা পুরো গাড়ি ভাড়া করতে হয়। বাইকারদের জন্য এটি স্বর্গরাজ্য। তবে মনে রাখবেন, চিমনি থেকে মহল দিরামের রাস্তাটি বিকেলের পর খুব নির্জন হয়ে যায় এবং ঘন কুয়াশা থাকে। তাই সোলো ট্রাভেলাররা চেষ্টা করবেন দিনের আলো থাকতেই চেক-ইন করতে।

৪. বাগোরা (Bagora): পাইন বনের রহস্যময় ঠিকানা
দার্জিলিং যাওয়ার পথে কার্শিয়াং পার হলেই রাস্তার দুপাশের দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে। রোদ ঝলমলে আকাশ হঠাৎ ঢেকে যায় ঘন সাদা মেঘে। পাইন আর ধুপির লম্বা লম্বা গাছগুলো যেন আকাশ ছোঁয়ার প্রতিযোগিতায় নামে। ঠিক এই পরিবেশেই লুকিয়ে আছে ‘বাগোরা’।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ৭,১৫০ ফুট। একসময় এটি ছিল ভারতীয় বায়ুসেনার (Indian Air Force) বেস ক্যাম্প। তাই সাধারণ পর্যটকদের আনাগোনা এখানে খুব একটা ছিল না। কিন্তু এখন এর দরজা খুলে গেছে প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য। স্থানীয়রা একে ‘জিরো পয়েন্ট’ নামেও চেনেন।
বাগোরার সৌন্দর্য তার ‘বিষাদ’-এ। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। এখানকার আবহাওয়া সব সময় একটা মন-কেমন-করা মেজাজে থাকে। ঝিরঝire বৃষ্টি, হাড়হিম করা ঠান্ডা বাতাস আর ঘন কুয়াশার চাদর—সব মিলিয়ে বাগোরা যেন কোনো স্কটিশ হাইল্যান্ডের গ্রাম। এখানে গাড়ির আওয়াজ নেই, আছে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর পাইন গাছের পাতায় বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ।
আপনি যদি সেই পর্যটক হন যিনি হইহুল্লোড় নয়, বরং জঙ্গলের নিস্তব্ধতা আর নির্জন পথে একা হাঁটতে ভালোবাসেন—তবে বাগোরা আপনাকে চুম্বকের মতো টানবে।
কেন যাবেন?
বাগোরা কেন বাছবেন, তার পেছনে যথেষ্ট রোমান্টিক কারণ আছে।
প্রথমত, জঙ্গল ও কুয়াশা। উত্তরবঙ্গে এত ঘন পাইন আর ওক গাছের জঙ্গল খুব কম জায়গায় আছে। কুয়াশা যখন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে ভেসে বেড়ায়, তখন মনে হয় যেন কোনো ভৌতিক সিনেমার দৃশ্য। এই কুয়াশার মধ্যে দিয়ে হাঁটা এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা।
দ্বিতীয়ত, ওল্ড কার্ট রোড। হিলকার্ট রোড তৈরির আগে দার্জিলিং যাওয়ার জন্য এই রাস্তাটিই ব্যবহার করা হতো। একে বলা হয় ‘ওল্ড মিলিটারি রোড’। ইতিহাসের গন্ধ মাখা এই রাস্তায় হাঁটলে মনে হবে আপনি ব্রিটিশ আমলে ফিরে গেছেন। রাস্তার দুপাশে বড় বড় শ্যাওলা ধরা পাথর আর বুনো ফুলের ঝোপ।
তৃতীয়ত, পাখিদের স্বর্গরাজ্য। বাগোরা পক্ষীপ্রেমীদের কাছে স্বর্গ। জঙ্গলের নিস্তব্ধতায় এখানে নানারকম পাহাড়ি পাখির ডাক শোনা যায়। ক্যামেরা আর বাইনোকুলার নিয়ে বেরিয়ে পড়লে ফ্রেমবন্দি হতে পারে বিরল সব হিমালয়ান পাখি।
কীভাবে যাবেন?
শিলিগুড়ি বা এনজেপি (NJP) থেকে বাগোরার দূরত্ব প্রায় ৫৫ কিলোমিটার। কার্শিয়াং থেকে দূরত্ব মাত্র ১৭ কিলোমিটার।
রুট ম্যাপ: এনজেপি থেকে রোহিনী বা পাঙ্খাবাড়ি হয়ে সোজা উঠুন কার্শিয়াং। কার্শিয়াং শহর পার করে হিলকার্ট রোড ধরে দার্জিলিংয়ের দিকে এগোতে হবে। সোনাদা (Sonada) পৌঁছনোর আগেই ‘দিলারাম’ (Dilaram) বলে একটি জায়গা পড়ে। এখান থেকে ডানদিকে একটি খাড়াই রাস্তা উঠে গেছে বাগোরার দিকে। দিলারাম থেকে বাগোরা মাত্র ৩ কিলোমিটার। আরেকটি রাস্তা হলো কার্শিয়াংয়ের ডাউহিল (Dowhill) হয়ে ফরেস্টের ভেতর দিয়ে বাগোরা পৌঁছানো। এই রাস্তাটি একটু ভাঙাচোরা হলেও রোমাঞ্চকর।
গাড়ি ভাড়া ও অপশন:
- রিজার্ভ গাড়ি: এনজেপি থেকে সরাসরি বাগোরা যাওয়ার জন্য ছোট গাড়ির (WagonR) ভাড়া ৩,০০০ টাকার আশেপাশে। বড় গাড়ি (Bolero/Innova) হলে ৩,৫০০-৪,০০০ টাকা।
- শেয়ার গাড়ি: এটি সবথেকে সস্তা উপায়। শিলিগুড়ি জংশন থেকে দার্জিলিংগামী বাসে বা শেয়ার জিপে উঠুন (ভাড়া ১০০-১৫০ টাকা)। কন্ডাক্টরকে বলুন ‘দিলারাম’-এ নামবেন। দিলারামে নেমে ওখানকার লোকাল ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে গাড়ি রিজার্ভ করে বাগোরা (ভাড়া ৩০০-৪০০ টাকা)। যারা ট্রেকিং ভালোবাসেন, তারা দিলারাম থেকে ৩ কিমি খাড়াই রাস্তা হেঁটেও উঠতে পারেন।
রাস্তার অবস্থা: কার্শিয়াং পর্যন্ত রাস্তা খুব ভালো। দিলারাম থেকে বাগোরার ৩ কিলোমিটার রাস্তাটি পিচ ঢালা হলেও বেশ খাড়াই এবং সরু। ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। বর্ষাকালে রাস্তায় শ্যাওলা জমে পিচ্ছিল হতে পারে। তবে সাধারণ সময়ে যেকোনো গাড়ি অনায়াসেই যায়।
কী কী দেখবেন?
বাগোরায় দর্শনীয় স্থানগুলো খুব কাছাকাছি। হেঁটেই ঘুরে নেওয়া যায়।
- ভিউ পয়েন্ট ও জিরো পয়েন্ট: বাগোরার সবথেকে উঁচু জায়গা। আকাশ পরিষ্কার থাকলে এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার বিশাল ভিউ পাওয়া যায়। আবার উল্টো দিকে তাকালে কার্শিয়াং শহর আর তিস্তা নদী দেখা যায়।
- হার্বাল গার্ডেন (Herbal Garden): এখানে বনদপ্তরের একটি ঔষধি গাছের বাগান আছে। সিনকোনা (যা দিয়ে ম্যালেরিয়ার ওষুধ হয়) সহ নানা দুর্লভ হিমালয়ান গাছ এখানে সংরক্ষিত।
- ফরেস্ট মিউজিয়াম: ছোট হলেও এই মিউজিয়ামটি বেশ ইন্টারেস্টিং। পাহাড়ের নানা প্রাণী ও উদ্ভিদের নমুনা এখানে রাখা আছে।
- চটকপুর ট্রেক: বাগোরা থেকে চটকপুর খুব কাছে। জঙ্গলের পথে ট্রেকিং করে চটকপুর ঘুরে আসা যায়। যারা অ্যাডভেঞ্চার ভালোবাসেন, তাদের জন্য এটি মাস্ট।
কোথায় থাকবেন?
বাগোরায় থাকার জায়গাও খুব সীমিত, আর সেটাই এর সৌন্দর্য ধরে রেখেছে।
১. ডিকি’স হোমস্টে (Dicky’s Homestay): বাগোরার সবথেকে পুরোনো এবং আইকনিক হোমস্টে। দাদু-দিদিমার আমলের কাঠের বাড়ি, বারান্দায় ফুলের টব আর ফায়ারপ্লেস। এখানকার মালিকের আতিথেয়তা আর গল্পের ঝুলি আপনাকে মুগ্ধ করবে। ২. লাকি হোমস্টে: এটিও বেশ ভালো। ঘরগুলো পরিষ্কার এবং ভিউ খুব সুন্দর। ৩. ফরেস্ট রেস্ট হাউজ: সরকারি বুকিং থাকলে বনদপ্তরের বাংলোতেও থাকা যায়। তবে এটি পাওয়া একটু কঠিন।
(টিপস: বাগোরায় হোমস্টে কম, তাই যাওয়ার আগে কনফার্ম বুকিং ছাড়া যাবেন না।)
খরচ কত?
আসুন দেখে নিই কলকাতা থেকে কলকাতা—২ রাত্রি ৩ দিনের পকেট ফ্রেন্ডলি বাজেট।
- ট্রেন ভাড়া: স্লিপার ক্লাস – ৮০০-১,০০০ টাকা।
- থাকা-খাওয়া: এখানকার হোমস্টেগুলোতে থাকা-খাওয়া (জনপ্রতি প্রতিদিন) ১,২০০ থেকে ১,৫০০ টাকার মধ্যে।
- ২ দিন x ১,৪০০ = ২,৮০০ টাকা।
- গাড়ি ভাড়া: ৪ জন শেয়ার করলে মাথাপিছু যাতায়াত খরচ ১,৫০০-২,০০০ টাকা।
- মোট খরচ: সব মিলিয়ে জনপ্রতি ৫,৫০০ থেকে ৬,৫০০ টাকার মধ্যে এই কুয়াশার রাজ্যে ঘুরে আসা সম্ভব।
অতিরিক্ত তথ্য (বয়স্ক ও সোলো ট্রাভেলারদের জন্য):
- বয়স্কদের জন্য: বাগোরা বয়স্কদের জন্য মিশ্র অনুভূতির জায়গা। গাড়ি একদম হোমস্টের সামনে যায়, তাই হাঁটার কষ্ট নেই। হোমস্টের বারান্দায় বসেই সময় কাটানো যায়। কিন্তু সমস্যা হলো ‘উচ্চতা’ এবং ‘ঠান্ডা’। ৭০০০ ফুটের ওপরে হওয়ায় এখানে অক্সিজেনের মাত্রা সামান্য কম হতে পারে এবং হাড় কাঁপানো ঠান্ডা থাকে। তাই যাদের হাঁপানি বা বাত আছে, তাদের শীতকালে এখানে না আসাই ভালো। মার্চ-এপ্রিল বা অক্টোবর মাসে তারা স্বচ্ছন্দে আসতে পারেন।
- সোলো ট্রাভেলার: সোলো ট্রাভেলার এবং বাইকারদের জন্য বাগোরা স্বপ্নের জায়গা। দিলারাম থেকে জঙ্গলের রাস্তায় বাইক চালানোর অভিজ্ঞতা ভোলা যায় না। জায়গাটি নিরাপদ। তবে সন্ধ্যার পর জঙ্গলের রাস্তায় একা না বেরোনোই ভালো, কারণ চিতাবাঘ বা ভাল্লুকের ভয় থাকে।

৫. পালমাজুয়া (Palmajua): সিঙ্গালিলা অরণ্যের গোপন ডেরা
দার্জিলিংয়ের ম্যাপে পালমাজুয়া বা পালমাজু নামটা একদমই অপরিচিত। এটি কোনো সাধারণ পাহাড়ি গ্রাম নয়, এটি সিঙ্গালিলা ন্যাশানাল পার্কের ‘বাফার জোন’-এ অবস্থিত একটি অরণ্য-বস্তি।
চারপাশে বাঁশ আর ওক গাছের ঘন জঙ্গল। জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে উঁকি দেয় কাঞ্চনজঙ্ঘা। আর যদি আপনার কপাল খুব ভালো হয়, তবে এই জঙ্গলের পথেই দেখা মিলতে পারে বিশ্বের অন্যতম সুন্দর এবং লাজুক প্রাণী—‘রেড পান্ডা’র।
সান্দাকফুর ট্রেকিং রুটে যে রুক্ষ এবং বন্য প্রকৃতির স্বাদ পাওয়া যায়, পালমাজুয়াতে গাড়িতে বসেই সেই স্বাদ পাওয়া সম্ভব। এখানে জনবসতি নেই বললেই চলে। বিকেলের পর জঙ্গল যখন নিঝুম হয়ে যায়, তখন শুধুই বাতাসের শব্দ। আধুনিক সভ্যতার কোলাহল তো দূর, এখানে মোবাইলের নেটওয়ার্কও মাঝে মাঝে বিশ্রাম নেয়। আপনি যদি সত্যিকারের জঙ্গলপ্রেমী হন এবং নিজের সঙ্গে কয়েকটা দিন কাটাতে চান, তবে পালমাজুয়া আপনাকে হতাশ করবে না।
কেন যাবেন?
পালমাজুয়া যাওয়ার কারণগুলো একটু অন্যরকম, যা বাকি ৪টি জায়গার চেয়ে আলাদা।
প্রথমত, জঙ্গল সাফারির অনুভূতি। সান্দাকফু বা ফালুট না গিয়েও সেই একই উচ্চতা (প্রায় ৭,০০০ ফুট) এবং একই রকমের বনজঙ্গল উপভোগ করতে পারবেন। এখানকার বাঁশবন বা ‘ব্যাম্বু ফরেস্ট’ দেখার মতো। জঙ্গলের পথে হাঁটলে মনে হবে যেন কোনো অ্যাডভেঞ্চার সিনেমায় ঢুকে পড়েছেন।
দ্বিতীয়ত, পাখি এবং রেড পান্ডা। এটি পক্ষীপ্রেমীদের স্বর্গ। শত শত প্রজাতির হিমালয়ান পাখি এখানে দেখা যায়। আর যেহেতু এটি সিঙ্গালিলা পার্কের অংশ, তাই রেড পান্ডা, বন বিড়াল বা বার্কিং ডিয়ার দেখার সম্ভাবনা সবসময় থাকে।
তৃতীয়ত, ডিজিটাল ডিটক্স। এখানে ইন্টারনেট খুব দুর্বল। তাই ল্যাপটপ বা অফিসের মেইল আপনাকে বিরক্ত করবে না। বই পড়া, আকাশ দেখা আর জঙ্গলের গন্ধে বুক ভরে নেওয়া—এটুকুই আপনার কাজ।
কীভাবে যাবেন?
শিলিগুড়ি বা এনজেপি (NJP) থেকে পালমাজুয়ার দূরত্ব প্রায় ৯০ কিলোমিটার। সময় লাগে প্রায় ৪ ঘণ্টা।
রুট ম্যাপ: এনজেপি থেকে মিরিক হয়ে সুখিয়াপোখরি (Sukhiapokhri) পৌঁছতে হবে। সুখিয়াপোখরি থেকে রাস্তা ভাগ হয়ে গেছে—একটা দার্জিলিংয়ের দিকে, অন্যটা মানেভঞ্জনের দিকে। আপনাকে মানেভঞ্জন (Manebhanjan) যাওয়ার রাস্তা ধরতে হবে। মানেভঞ্জন পার করে ধোত্রে (Dhotrey) যাওয়ার পথেই পড়ে পালমাজুয়া। রিমবিক যাওয়ার রাস্তাতেও এটি পড়ে।
গাড়ি ভাড়া ও অপশন:
- রিজার্ভ গাড়ি: এনজেপি থেকে পালমাজুয়া সরাসরি যাওয়ার জন্য বড় গাড়ি (Bolero/Sumo) নেওয়াই ভালো। ভাড়া পড়বে ৪,০০০ থেকে ৪,৫০০ টাকা। ছোট গাড়িও যায়, তবে শেষের রাস্তা খারাপ হলে চালকরা যেতে চায় না বা বেশি ভাড়া চায়।
- শেয়ার গাড়ি: এনজেপি থেকে দার্জিলিং বা সুখিয়াপোখরিগামী শেয়ার জিপে উঠুন। সুখিয়াপোখরিতে নেমে আপনাকে আবার মানেভঞ্জন বা রিমবিকগামী গাড়ি ধরতে হবে। পালমাজুয়া নামতে চাইলে চালককে আগে বলতে হবে। তবে লোকাল গাড়ির ফ্রিকোয়েন্সি কম থাকায় রিজার্ভ গাড়ি নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। সুখিয়াপোখরি থেকে পালমাজুয়া রিজার্ভ ভাড়া ১,২০০-১,৫০০ টাকা।
রাস্তার অবস্থা: সুখিয়াপোখরি বা মানেভঞ্জন পর্যন্ত রাস্তা বেশ ভালো। কিন্তু সেখান থেকে পালমাজুয়া ঢোকার রাস্তাটি জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। এই রাস্তাটি কোথাও কোথাও কাঁচা এবং পাথুরে। বর্ষাকালে রাস্তাটি বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে। তবে এই অমসৃণ পথের দুপাশের সৌন্দর্য এতটাই যে রাস্তার কষ্ট মনে থাকে না।
কী কী দেখবেন?
এখানে দেখার বা ঘোরার জায়গা মানেই জঙ্গল আর জঙ্গল।
- সিঙ্গালিলা অরণ্য ভ্রমণ: হোমস্টে থেকে গাইড নিয়ে জঙ্গলের পথে ছোটখাটো ট্রেক বা হাইকিং করতে পারেন। ধোত্রে (Dhotrey) খুব কাছেই, সেখান থেকে সান্দাকফুর ট্রেকারদের দেখা যায়।
- শ্রীখোলা ব্রিজ: পালমাজুয়া থেকে গাড়ি নিয়ে বা ট্রেকিং করে শ্রীখোলা (Srikhola) যাওয়া যায়। সেখানকার ঝুলন্ত ব্রিজ এবং নদী খুব বিখ্যাত।
- রিমবিক মনাস্ট্রি: কাছেই রিমবিক বাজার এবং মনাস্ট্রি ঘুরে আসতে পারেন।
- ভিলেজ ওয়াক: গ্রামের শান্ত রাস্তায় হাঁটুন। গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলোর জীবনযাত্রা দেখুন।
কোথায় থাকবেন?
পালমাজুয়াতে থাকার জন্য খুব বেশি অপশন নেই, তবে যা আছে তা প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকার জন্য যথেষ্ট।
১. সিঙ্গালিলা জঙ্গল লজ (Singalila Jungle Lodge): এটি পালমাজুয়ার সবথেকে বিখ্যাত এবং পুরনো আস্তানা। জঙ্গলের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত। এদের ব্যবস্থাপনা এবং আতিথেয়তা দারুণ। বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে পাখি দেখা যায়। ২. স্থানীয় হোমস্টে: সম্প্রতি দু-একটি ছোট হোমস্টে চালু হয়েছে, যেখানে খুব কম খরচে থাকা যায়। তবে লাক্সারি আশা করবেন না।
(টিপস: জঙ্গল লজে থাকতে চাইলে অনেক আগে বুকিং করতে হয়, কারণ সিজনে বিদেশি পর্যটকরাও এখানে আসেন পাখি দেখতে।)
খরচ কত?
কলকাতা থেকে কলকাতা—২ রাত্রি ৩ দিনের আনুমানিক বাজেট।
- ট্রেন ভাড়া: স্লিপার ক্লাস – ১,০০০ টাকা।
- থাকা-খাওয়া: পালমাজুয়ার লজ বা হোমস্টেতে থাকা-খাওয়া (জনপ্রতি প্রতিদিন) ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকার মধ্যে।
- ২ দিন x ১,৮০০ = ৩,৬০০ টাকা।
- গাড়ি ভাড়া: দূরত্ব বেশি হওয়ায় এবং রাস্তা অফবিট হওয়ায় গাড়ি ভাড়া একটু বেশি পড়ে। ৪ জন শেয়ার করলে মাথাপিছু যাতায়াত খরচ ২,৫০০ টাকা মতো।
- মোট খরচ: সব মিলিয়ে জনপ্রতি ৭,৫০০ থেকে ৮,৫০০ টাকার মধ্যে এই জঙ্গল সফর সম্ভব।
অতিরিক্ত তথ্য (বয়স্ক ও সোলো ট্রাভেলারদের জন্য):
- বয়স্কদের জন্য: পালমাজুয়া বয়স্কদের জন্য মিশ্র। একদিকে এখানকার নিস্তব্ধতা খুব আরামদায়ক, গাড়ি লজের সামনে পর্যন্ত যায়। কিন্তু সমস্যা হলো—এটি খুব প্রত্যন্ত এলাকা। হাতের কাছে কোনো বড় বাজার বা ওষুধের দোকান নেই। হঠাৎ শরীর খারাপ করলে সুখিয়াপোখরি বা দার্জিলিং নিয়ে যেতে সময় লাগবে। এছাড়া শীতে প্রবল ঠান্ডা থাকে। তাই খুব বয়স্ক বা অসুস্থদের জন্য এটি রেকমেন্ডেড নয়। যারা ফিট, তারা গরমকালে (এপ্রিল-মে) যেতে পারেন।
- সোলো ট্রাভেলার: সোলো ট্রাভেলারদের জন্য এটি রোমাঞ্চকর, কিন্তু একা গাড়ি ভাড়া করে যাওয়াটা বেশ খরসাপেক্ষ। আপনি যদি বাইকার হন বা ট্রেকার হন, তবে এটি স্বর্গ। একা থাকলে জঙ্গলের রাস্তায় সন্ধ্যার পর বেরোবেন না, কারণ বন্যপ্রাণীর ভয় থাকে।
পাঠকের উদ্দেশ্যে বিশেষ জরুরি নোট
এই প্রতিবেদনে উল্লেখিত জায়গাগুলি যেহেতু ‘অফবিট’ বা দুর্গম, তাই এখানে হোটেল বা হোমস্টের সংখ্যা খুবই সীমিত। পর্যটন মরসুমে হুট করে গিয়ে রুম না পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই ভ্রমণের পরিকল্পনা করার অন্তত ১ মাস আগে বুকিং করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
দয়া করে মনে রাখবেন:
- প্রতিবেদনে উল্লেখিত হোমস্টে বা হোটেলগুলির নাম শুধুমাত্র আপনাদের তথ্যের সুবিধার জন্য উদাহরণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে। এটি কোনোভাবেই ‘পেইড প্রোমোশন’ বা বিজ্ঞাপন নয়।
- নিউজ অফবিট ডিজিটাল কোনো হোমস্টে বা হোটেলের পরিষেবার গুণমান, বুকিং সংক্রান্ত সমস্যা বা আর্থিক লেনদেনের দায়ভার বহন করে না।
- পাঠকদের অনুরোধ করা হচ্ছে, বুকিং করার আগে ইন্টারনেটে বা গুগলে (Google Reviews) ভালো করে যাচাই করে নিন। সরাসরি হোমস্টে মালিকের সঙ্গে ফোনে কথা বলে তবেই টাকা পেমেন্ট বা বুকিং কনফার্ম করুন। কোনো এজেন্ট বা দালালের মাধ্যমে না গিয়ে সরাসরি যোগাযোগ করাই শ্রেয়।
- এই প্রতিবেদনটি সম্পূর্ণভাবে তথ্য আদান-প্রদান এবং ভ্রমণ পিপাসুদের গাইড করার উদ্দেশ্যে তৈরি। পাহাড়ি রাস্তায় আবহাওয়া ও পরিস্থিতি পরিবর্তনশীল, তাই নিজ দায়িত্বে এবং সতর্কতার সঙ্গে ভ্রমণ করুন।
(আরও গুরুত্বপূর্ণ খবর ও রাশিফল আপডেট পেতে আমাদের অফিসিয়াল WhatsApp চ্যানেলে যোগ দিন! সবচেয়ে আগে পান জ্যোতিষ, অফবিট নিউজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, বিনোদন, জীবনধারা ও অফবিট এক্সক্লুসিভ আপডেট —আমাদের WhatsApp Channel-এ যোগ দিন)
সাম্প্রতিক পোস্ট
- Gen Z-এর প্রেমের নতুন শব্দভান্ডার জানেন? ভালোবাসার নতুন ব্যাকরণ শিখুন | Gen Z Love Trends 2026
- ব্যস্ত সকালে এই ৫টি Tiffin Recipe রাখুন রোজের তালিকায় | Easy Tiffin Recipes
- ঠাকুর, দেবতা, ভগবান ও ঈশ্বর কি একই? গুলিয়ে ফেলার আগে জেনে নিন আসল তফাৎ | God vs Deity Meaning in Bengali
- জানুন, ব্যক্তি সুভাষের অনন্য প্রেমকাহিনী: সুভাষ ও এমিলি
- গান্ধী বনাম নেতাজি—মূল পার্থক্যটা কোথায়? | Gandhi vs Netaji

