Pain and Aches: সময় বদলায়। বদলাবেই। নিয়নের আলো ফিকে হয়ে এলইডি’র উজ্জলতায়। স্মার্টফোন মাপে রক্তচাপ। মুহূর্তগুলো বন্দি আজ আঙুলের ছোঁয়ায়। তবু ছুটির দিনে ক্লান্ত দুপুরে ভাতঘুম মন। শিরিষ গাছের দীর্ঘ ছায়া আড়মোড়া ভাঙে তপ্ত ছাদে। আর মন কেমন করা রবিবার দুপুরে মজে থাকে ‘রোদ্দুরের কথকতা‘। কলমে-দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়
ব্যথাবেদনা জিনিসটা বড়ই বিচিত্র। জীবনে কিছু কিছু মানুষ থাকে, যাদের সঙ্গে আমাদের আলাপ করার কোনো ইচ্ছাই থাকে না, অথচ তাঁরা এমনভাবে জীবনে ঢুকে পড়েন যে পরে তাঁদের ছাড়া জীবন কল্পনাই করা যায় না। ব্যথাবেদনাও ঠিক তেমনই। তাকে নিমন্ত্রণ করতে হয় না, ফোন করে ডাকতে হয় না, এমনকি দরজায় ‘নো এডমিশন’ লিখে রাখলেও সে দিব্যি ভেতরে ঢুকে পড়ে। তারপর খুব আপনজনের মতো এসে বলে, “কী খবর? আমাকে মনে আছে তো?”
ব্যথাবেদনার সবচেয়ে বড় গুণ হলো তার সময়জ্ঞান। যখন আমাদের হাতে অঢেল সময়, তখন সে সাধারণত আসে না। কিন্তু যেদিন খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ আছে, সেদিনই সে হাজির। পরীক্ষার আগের রাতে মাথাব্যথা, বিয়ের আগের সকালে পেটব্যথা, অফিসে গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ের দিন কোমরব্যথা, আর বেড়াতে যাওয়ার ঠিক আগের রাতে দাঁতের ব্যথা। ব্যথার যেন ব্যক্তিগত ক্যালেন্ডার আছে। সে জানে কখন এলে আমাদের সবচেয়ে বেশি অসুবিধা হবে।
আমার বন্ধু বিপদতারণের একবার পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়ার খুব শখ হলো। কয়েক মাস ধরে পরিকল্পনা, হোটেল বুকিং, নতুন জুতো, নতুন জ্যাকেট—সব প্রস্তুত। যেদিন রওনা হবে, সেদিন সকালে উঠে সে ঘোষণা করল, “কোমরটা একটু টনটন করছে।” আমরা বললাম, “একটু ব্যথা নিয়ে যাওয়া যায়।” সে বলল, “হ্যাঁ, একটু তো বটেই।” স্টেশনে পৌঁছতে পৌঁছতে সেই ‘একটু’ এমন এক মহৎ ব্যথায় পরিণত হলো যে, শেষ পর্যন্ত পাহাড়ে গিয়ে সে পাহাড় দেখেনি—হোটেলের বিছানা দেখেই সন্তুষ্ট ছিল। ফেরার সময় বলেছিল, “ভ্রমণটা খুব সুন্দর হয়েছে।” আমরা জিজ্ঞেস করলাম, “কী কী দেখলে?” সে বলল, “সিলিং ফ্যান।”
ব্যথাবেদনা আবার একা আসে না। সঙ্গে নিয়ে আসে পরামর্শের বিশাল বাহিনী। মাথা ধরেছে বললেই বাড়ির একজন বলবেন, “চা খাও।” আরেকজন বলবেন, “চা খেলে আরও বাড়বে।” তৃতীয়জন বলবেন, “কফি খাও।” চতুর্থজন বলবেন, “কিছু খেও না, উপোস করো।” বাপের বাড়ির তরফের একজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ আত্মীয় এসে বলবেন, “আমারও একবার ঠিক এইরকম হয়েছিল। তখন আমি একটা ওষুধ খেয়েছিলাম।” আমরা আগ্রহ নিয়ে ওষুধের নাম জানতে চাইলে তিনি এমন একটি নাম বলেন, যা শুনে মনে হয় সেটি ওষুধ নয়, কোনো প্রাচীন রাজবংশের নাম।
সবচেয়ে বিপজ্জনক হলেন সেই আত্মীয়, যিনি বয়েসে অনেক ছোট কিন্তু জ্ঞানে জ্যাঠামশাই, যিনি ইন্টারনেটে পাঁচ মিনিট সার্চ করে নিজেকে বিশেষজ্ঞ ঘোষণা করেন। আপনি বললেন, “আমার মাথা ধরেছে।” তিনি মোবাইল বের করে দশ মিনিট পরে বললেন, “তোমার মাইগ্রেন হতে পারে।” আপনি বললেন, “আমার পেটও একটু খারাপ।” তিনি আবার সার্চ করে বললেন, “তা হলে ব্যাপারটা সিরিয়াস।” আপনি ভয়ে বললেন, “কী হয়েছে?” তিনি চোখ কুঁচকে বললেন, “ইন্টারনেট অনুযায়ী অনেক কিছুই হতে পারে।” তখন রোগের চেয়ে ইন্টারনেটই বেশি ভয়ের মনে হয়।
দাঁতের ব্যথার মতো গণতান্ত্রিক ব্যথা পৃথিবীতে খুব কম আছে। দাঁতের ব্যথা হলে মানুষ হঠাৎ বুঝতে পারে, মুখের ভিতরে একটা ছোট্ট দাঁতের ক্ষমতা কতখানি। সেই দাঁতটি সারাদিন কোনো কাজ করে না—শুধু খাবার চিবোয়। কিন্তু একদিন ব্যথা শুরু হলে সে গোটা শরীরের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। আপনি ভাত খাবেন – ব্যথা। রুটি খাবেন – ব্যথা। জল খাবেন – ব্যথা। কিছু খাবেন না – তবুও ব্যথা। এমনকি দাঁতটির কথা না ভাবলেও সে মনে করিয়ে দেয় – “আমি কিন্তু আছি!”
দাঁতের ব্যথায় মানুষের আচরণও বদলে যায়। সাধারণ অবস্থায় আমরা শক্ত খাবার খেতে ভালোবাসি। কিন্তু দাঁতে ব্যথা হলেই খিচুড়ি আমাদের কাছে আন্তর্জাতিক মানের খাবার হয়ে ওঠে। কেউ জিজ্ঞেস করলে, “কী খাব?” আমরা বলি, “যা নরম।” তখন পৃথিবীর সব নরম খাবারের প্রতি হঠাৎ এক অদ্ভুত ভালোবাসা জন্মায়।
মাথাব্যথারও নিজস্ব চরিত্র আছে। মাথাব্যথা হলে আমরা প্রথমে বলি, “আজ একটু মাথা ধরেছে।” আধ ঘণ্টা পরে বলি, “মাথাটা খুব ধরেছে।” এক ঘণ্টা পরে বাড়ির সবাইকে জানিয়ে দিই, “আমার মাথা আর নেই।” তারপর ঘরের আলো বন্ধ, ফ্যানের গতি কম, মোবাইল দূরে, টিভি বন্ধ—এমন পরিবেশ তৈরি হয় যেন বাড়িতে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের কোনো সম্মেলন চলছে। আর কেউ যদি সেই সময় এসে বলে, “একটা কথা বলব?” তখন মনে হয়, মাথাব্যথার সঙ্গে সঙ্গে সন্ন্যাসের ইচ্ছাটাও জন্ম নিচ্ছে।
কোমরব্যথার সঙ্গে বয়সের সম্পর্কও বড় অদ্ভুত। কুড়ি বছর বয়সে কেউ যদি বলে, “কোমর ব্যথা করছে,” আমরা বলি, “এত বয়সে আবার কোমরব্যথা?” চল্লিশ পেরোতেই নিজের কোমর একটু ব্যথা করলেই বলি, “এটা বয়সের স্বাভাবিক ব্যাপার।” পঞ্চাশে গিয়ে বলি, “বয়স হয়েছে তো!” আর ষাটে গিয়ে নতুন কেউ কোমরব্যথার কথা বললে আমরা অত্যন্ত জ্ঞানী মুখ করে বলি, “এগুলো মেনে নিতে হয়।” অর্থাৎ ব্যথা যত বাড়ে, দর্শনও তত বাড়ে।
তবে সবচেয়ে রহস্যময় ব্যথা হলো মনের ব্যথাবেদনা। এই ব্যথাবেদনার কোনো ব্যান্ডেজ নেই, কোনো এক্স-রে নেই, কোনো প্লাস্টার নেই। ডাক্তারকে বললে ডাক্তার জিজ্ঞেস করতে পারেন, “কী হয়েছে?” কিন্তু উত্তর দেওয়া কঠিন। কখনো মানুষ বলে, “কিছু হয়নি।” অথচ সেই ‘কিছু হয়নি’-র মধ্যেই অনেক কিছু লুকিয়ে থাকে।
কেউ কথা রাখেনি – বেদনা। কেউ ভুল বুঝেছে – বেদনা। প্রিয় মানুষ দূরে চলে গেছে – বেদনা। অনেক চেষ্টা করেও কিছু পাওয়া যায়নি – বেদনা। আর সবচেয়ে বড় কথা, নিজের কাছেই নিজের প্রত্যাশা পূরণ না হলে যে ব্যথা হয়, তার কোনো নাম নেই।
প্রেমের বেদনা তো আবার সম্পূর্ণ আলাদা বিভাগ। শরীরের ব্যথায় ডাক্তার থাকে, প্রেমের ব্যথায় বন্ধু থাকে। বন্ধু এসে বলে, “ভুলে যা।” রোগী বলে, “পারছি না।” বন্ধু বলে, “অন্য কাউকে খুঁজে নে।” রোগী বলে, “তা কী করে সম্ভব?” বন্ধু বলে, “সময় সব ঠিক করে দেয়।” রোগী বলে, “কত সময়?” বন্ধু বলে, “তা বলতে পারব না।” তারপর দুজনেই চুপ করে চা, কফি ইত্যাদি ইত্যাদি খায়। অর্থাৎ প্রেমের চিকিৎসায় ওষুধের বদলে ইত্যাদি ইত্যাদি এবং বন্ধুর উপস্থিতিই প্রধান চিকিৎসা।
বেদনার সময় মানুষ ঈশ্বরের সঙ্গেও খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে যায়। সুস্থ অবস্থায় আমরা বলি, “সময় পেলে প্রার্থনা করব।” ব্যথা শুরু হলে বলি, “ভগবান, এবার শুধু ভালো করে দাও। আর কিছু চাই না।” ভালো হয়ে যাওয়ার তিন দিন পর আবার আগের জীবনে ফিরে যাই। তারপর পরের ব্যথা এসে আবার মনে করিয়ে দেয়—“আমাকে ভুলে গিয়েছিলে?”
ডাক্তারের কাছে যাওয়ার ঘটনাও কম রসিক নয়। ডাক্তার জিজ্ঞেস করেন, “কোথায় ব্যথা?” রোগী: “এইখানে।” -“ঠিক কোথায়?” – “এই যে, এইদিকে।” -“কতদিন ধরে?” -“তা ঠিক মনে নেই।” – “ব্যথা সবসময় থাকে?” – “না, মাঝে মাঝে।” -“কী করলে বাড়ে?” -“সব করলেই।” ডাক্তার তখন চুপ করে রোগীর দিকে তাকিয়ে থাকেন। সেই দৃষ্টির অর্থ একটাই – “আপনি রোগের চেয়ে বেশি জটিল।” তারপর বলেন -“আপনার শরীরের সঙ্গে একটু মিটিং করা দরকার।”
বেদনা এমন এক আত্মীয়, যাঁর আসার কোনো নির্দিষ্ট দিন নেই, সময় নেই, বয়স নেই। শৈশবে তিনি হাঁটু ছড়ে এসে দেখা দেন, যৌবনে প্রেমের চিঠির উত্তর না পেয়ে এসে বসেন, মধ্যবয়সে কোমর ও হাঁটুর যৌথ মালিকানা নিয়ে হাজির হন, আর বৃদ্ধ বয়সে এসে বলেন—“চিনতে পারছেন? আমি সেই পুরনো বেদনা!”
তবে বেদনার একটা বড় গুণ আছে—তিনি অত্যন্ত বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তাঁর শাখা-প্রশাখার শেষ নেই। শরীরের বেদনা, মনের বেদনা, প্রেমের বেদনা, বিচ্ছেদের বেদনা, অপমানের বেদনা, পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়ার বেদনা, মাসের শেষে পকেটের বেদনা—সবই তাঁর রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত। এমনকি মোবাইলের চার্জ দুই শতাংশ হয়ে গেলে যে বেদনা হয়, সেটাকেও আধুনিক যুগের ক্ষুদ্র বেদনা বলা যেতে পারে।
ছোটবেলায় বেদনার সঙ্গে আমাদের প্রথম পরিচয় সাধারণত হাঁটু ছড়ে যাওয়ার মাধ্যমে। দৌড়তে গিয়ে পড়ে গেলাম, হাঁটুতে চামড়া উঠে গেল। ব্যথার চেয়ে কান্নাটা তখন বেশি জরুরি। মা এসে বললেন, “কোথায় লেগেছে?” আমরা চোখের জল মুছতে মুছতে বললাম, “এখানে।” মা একটু ফুঁ দিয়ে বললেন, “কিছু হয়নি।” এই ‘কিছু হয়নি’ কথাটাই আশ্চর্য! হাঁটু থেকে রক্ত বেরোচ্ছে, তবু বড়রা বলবেন—“কিছু হয়নি।” আমরা তখন মনে মনে ভাবি, এই ছোট্ট কথার কি আশ্চর্য ক্ষমতা! কি অলৌকিক শুশ্রুষা!
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেদনার চরিত্রও পাল্টায়। স্কুলে বেদনা ছিল পরীক্ষার খাতায় লাল কালির দাগ। শিক্ষক বললেন, “তোমার উত্তর ভুল হয়েছে। তুমি পাশ করতে পারোনি।” সেই মুহূর্তে মনে হতো, পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ যেন ওই একটি খাতায় এসে জমা হয়েছে। বাড়িতে ফিরে মা জিজ্ঞেস করলেন, “কত পেয়েছ?” তখন প্রকৃত বেদনা শুরু। নম্বর কম পাওয়ার দুঃখ একরকম, কিন্তু মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে নম্বর বলতে না পারার দুঃখ আরেক রকম।
তারপর আসে কৈশোর। তখন বেদনা একটু রোমান্টিক হয়। একদিন যার সঙ্গে কথা না বললে মনে হয় পৃথিবী অন্ধকার, সে হঠাৎ অন্য কারও সঙ্গে কথা বলল। ব্যস! বেদনা এসে জানালার পাশে বসে পড়ল। গান শোনা শুরু হলো, কবিতা পড়া শুরু হলো, আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলা শুরু হলো। তখন মনে হয় – “আমার মতো দুঃখী মানুষ পৃথিবীতে আর কেউ নেই।” কয়েক বছর পরে সেই একই মানুষকে রাস্তার মোড়ে দেখা গেলে মনে হয় – “এই মানুষটির জন্য আমি এত কেঁদেছিলাম?” বেদনার সবচেয়ে বড় প্রতারণা এখানেই। সে যখন আসে, তখন মনে হয় সে চিরস্থায়ী। আর যখন চলে যায়, তখন মনে হয় এতদিন তার জন্য কষ্ট পাওয়াটাই ছিল সবচেয়ে বড় বোকামি।
বেদনা আবার খুব ব্যক্তিগত জিনিস। একই ঘটনা দুজন মানুষের জীবনে ঘটলেও তাদের বেদনার পরিমাণ এক হয় না। একজনের কাছে চাকরি না পাওয়া পৃথিবীর শেষ, অন্যজনের কাছে সেটা নতুন চাকরি খোঁজার শুরু। একজনের কাছে এক কাপ চা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া মহাবিপর্যয়, অন্যজন ঠান্ডা চা-ই পছন্দ করেন। অর্থাৎ বেদনারও নিজস্ব স্বভাব আছে -সে ব্যক্তিভেদে রং বদলায়।
আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় বেদনার একটি হলো প্রত্যাশা। মানুষ যত বেশি প্রত্যাশা করে, বেদনার সম্ভাবনাও তত বাড়ে। আপনি বন্ধুকে বললেন, “কাল ঠিক সময়ে আসিস।” সে এক ঘণ্টা পরে এল। আপনার বেদনা হলো। কিন্তু যদি আপনি আগে থেকেই জানতেন যে সে দেড় ঘণ্টা দেরি করবে, তাহলে এক ঘণ্টা পরে আসায় আপনি খুশি হয়ে বলতেন, “আজ তো সময়ের আগেই!” অর্থাৎ অনেক বেদনার জন্ম ঘটনার মধ্যে নয়, আমাদের প্রত্যাশার মধ্যে। বাড়িতে বেদনার আরেকটি বড় উৎস হলো পারিবারিক অনুষ্ঠান। আপনি নতুন জামা পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছেন। আত্মীয় এসে বললেন, “জামাটা ভালো, তবে একটু মোটা দেখাচ্ছে।” আপনার সমস্ত আনন্দ পাঁচ সেকেন্ডে শেষ। আরেকজন বললেন, “চেহারাটা কেমন যেন শুকিয়ে গেছে!” এবার আপনি বুঝলেন – আপনি একই সঙ্গে মোটা এবং শুকনো! বেদনা তখন দর্শন হয়ে যায়। বয়স বাড়লে শরীরও বেদনার সঙ্গে বন্ধুত্ব করে ফেলে। আগে সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথম চিন্তা ছিল—“আজ কোথায় যাব?” এখন প্রথম চিন্তা -“আজ কোথায় ব্যথা?” একদিন ঘাড়ে ব্যথা। পরের দিন কোমরে। তার পরের দিন হাঁটুতে। তারপর মনে হয় শরীরের সব অঙ্গ যেন আলাদা আলাদা ইউনিয়ন গঠন করেছে এবং প্রত্যেকে পালা করে ধর্মঘট করছে।
বেদনার আরেকটি আশ্চর্য ক্ষমতা হলো -সে মানুষকে দর্শন শেখায়। সুস্থ অবস্থায় আমরা বলি, “জীবন উপভোগ করতে হবে।” কিন্তু রাত তিনটের সময় দাঁতের ব্যথায় ঘুম ভেঙে গেলে মনে হয়, “জীবনে শুধু শান্তিতে ঘুমোতে পারাটাই যথেষ্ট।” সুস্থ অবস্থায় আমরা দামি খাবার খুঁজি; পেট খারাপ হলে এক বাটি সাদা ভাত, একটু ঘি আর একটু নুনই রাজকীয় ভোজ মনে হয়। সুস্থ অবস্থায় দীর্ঘ ছুটি চাই; অসুস্থ হলে শুধু বিছানা থেকে উঠে বাথরুম পর্যন্ত যেতে পারাটাই বড় অর্জন বলে মনে হয়। বেদনা তাই আমাদের মূল্যবোধও বদলে দেয়। তবে শরীরের বেদনার চেয়ে মনের বেদনা অনেক বেশি রহস্যময়। এই বেদনা বাইরে থেকে দেখা যায় না। কেউ হাসছে, গল্প করছে, অফিস করছে, বাজার করছে -তবু তার ভিতরে হয়তো একটা দীর্ঘশ্বাস বসে আছে। মনের বেদনা কখনো কথায় প্রকাশ পায় না; কখনো একটি নীরবতা, একটি পুরনো গান, একটি ছবি কিংবা কোনো পরিচিত গন্ধ হঠাৎ তাকে ফিরিয়ে আনে। একটা পুরনো চিঠি খুললেই যে বেদনা হয়, তা কোনো ডাক্তার মাপতে পারবেন না। পুরনো স্কুলবাড়ি, খেলার মাঠ, পুরনো স্কুলের বেঞ্চ দেখলে যে স্মৃতি ফিরে আসে, তার কোনো প্রেসক্রিপশন নেই। বহু বছর পর কোনো পুরনো বন্ধুর নাম শুনে যে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে, তারও কোনো ওষুধ নেই। যে বন্ধুরা হারিয়ে গেছে চিরকালের জন্য, যাদের সঙ্গে দেখা হওয়ার আজ আর কোন উপায় নেই সেই সব উপকথা যে হারিয়েছে সেই জানে। যে নিজে কেঁদেছে, সে অন্যের চোখের জল একটু ভালো বোঝে। যে একদিন একা ছিল, সে অন্যের নিঃসঙ্গতা বুঝতে পারে। যে হারিয়েছে, সে অন্যের হারানোর কথা শুনে একটু নীরব হয়। সাহিত্যিকদের কাছে বেদনা তাই এত প্রিয়। কবির কাছে বেদনা কবিতা হয়ে আসে, গায়কের কাছে গান, চিত্রশিল্পীর কাছে রং, আর সাধারণ মানুষের কাছে – একটা দীর্ঘশ্বাস। কখনো কখনো অবশ্য বেদনা এতটাই বেশি হয়ে যায় যে মানুষ কবিতা লিখতে বসে, কিন্তু কবিতা হয় না; গান গাইতে বসে, কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোয় না। তখন সে চুপ করে বসে থাকে। এই নীরবতাও এক ধরনের ভাষা। যে লাজুক অনাহুতের মত দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকে। ভেতরে ঢুকতে সাহস পায় না।
শেষ পর্যন্ত মনে হয়, বেদনা জীবনের সবচেয়ে অপছন্দের অথচ সবচেয়ে বিশ্বস্ত শিক্ষক। সে আমাদের সুখের মূল্য শেখায়, অহংকার কমায়, অন্যের কষ্ট বুঝতে শেখায় এবং কখনো কখনো নিজের ভিতরের মানুষটির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। আর ব্যথা যখন বিদায় নেওয়ার সময় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলে – “আবার আসব কিন্তু!” তখন আমরা বিনীতভাবে বলি -“না না, তোমাকে আর আসতে হবে না। তোমার ব্যাপার-স্যাপার আমার বোঝা হয়ে গেছে ! যা শিক্ষা হলো!” তাই বেদনার কাছে আমার একটাই অভিযোগ -“তুমি এত কষ্ট দাও কেন?” বেদনা সম্ভবত মুচকি হেসে বলবে -“কারণ সুখের সময় তুমি তো নিজের কথাই শুনতে পাও না। আমি এলেই একটু চুপ করে বসো।” তখন আমাদের সব না বলা কথা কান্না হয় ঝরে পড়ে বেদনার মুক্তদানা হয়ে। আর শতবর্ষ পেরিয়ে পদ্মা তীরে সাজাদপুরে রবীন্দ্রনাথ আমাদের স্বান্ত্বনা হয়ে গেয়ে চলেন, – “বড়ো বেদনার মতো বেজেছ তুমি হে আমার প্রাণে”।।
#painandaches #pain #aches #bodypain #headache #backpain #stomachpain #toothache #everydaypain #healthhumor #funnyhealthstories #bengalihumor #bengalisatire #lifestylehumor
সাম্প্রতিক পোস্ট
স্কুলের শৌচাগারে সাপ! নামী বেসরকারি স্কুলের নিরাপত্তা নিয়ে উঠল প্রশ্ন, কী বলছে কর্তৃপক্ষ
নিউ মার্কেটের অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্যে আসল কারণ কী? ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য
অভিজিৎ দীপকে কি তবে এবার বিজেপিতে? রাজনৈতিক প্রস্তাব ঘিরে তুঙ্গে জল্পনা
ঋতব্রতই বিরোধী দলনেতা, হাইকোর্টের বড় পর্যবেক্ষণ, কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের পদক্ষেপ কী?

